গল্প : ক্ষুদে তারা
ময়ূরী মিত্র
পর্ব—১
ভালো নাম ক্ষুদিরাম। নিজে নিজেকে ডাকত কাসুটি বলে। খেয়াল করতাম, নিজেকে কাসুটি নামে পরিচয় করানোর সময় এক আরাম লাগত তার কণ্ঠে, জিহ্বায়। জিজ্ঞেস করলে গম্ভীর মুখে বলত— এ আমার ফ্রান্সি নাম। ফরাসি না বলে বলত ফ্রান্সি। যেমন তার বিশেষ্য, তেমনি তার বিশেষণ। আর তেমনি সে নিজে। খোঁচা নোংরা চুল, চকরা হাফ প্যান্ট, লাল-সবুজ গেঞ্জি। মুখে ভাঙা পাইপ। তার ডগায় বিড়ি— জ্বলছে ফুকফুক— সবসময় জ্বলছে রাবণের চিতার মতো।
নিজের সম্পর্কে ক্ষুদিরামের প্রাথমিক এবং প্রধান দাবি ছিল— সে নাকি actually ফ্রান্সের চিত্রকর। বিয়েও করেছে ফ্রান্সি মেয়েকে। নীল নীল চোখের, ফর্সা ফর্সা ফ্রান্সি ছেলেমেয়ের জন্ম দিয়েছে ফটাফট। আর তারপর just ভালো লাগেনি বলে কদিন কলকাতায় এসেছে। মিশকালো ক্ষুদিরাম যখন এইসব ঢপ দিত, খুকিটা সহ্য করে যেত। তার পাখিমন বিশ্বাস করতে চাইত ফ্রান্স দেশের এক বাঙালি শিল্পীকে। পাখি যেমন অনন্ত আকাশকে বিশ্বাস করে, কোনো দেশকেই স্থায়ী করে না— ঠিক অমন বিশ্বাস গড়ছিল খুকি তার ক্ষুদি সম্পর্কে। কে জানে— ক্ষুদি সম্পর্কে খুকির বিশ্বাসের শুরুই বোধহয় ক্ষুদির দেওয়া গুল হজম করতে করতে।
মানুষের মুখের পোর্ট্রেট আঁকত ক্ষুদি। ক্ষুদিরাম অবশ্য বলত— মুখের নয়, মনের পোর্ট্রেট। মানে মানুষটাকে সামনে বসিয়ে যে মুহূর্তে ছবিটা আঁকতে শুরু করবে— তখন সে মানুষের মনের যে অবস্থা, তাই নাকি ফুটবে ক্ষুদির তুলিতে। আপনা থেকেই মনের প্রতিবিম্ব তৈরি হয়ে মানুষটার বাইরের মুখটাই পাল্টে দেবে। খুকি ততদিনে চালাক হয়েছে। বুঝল— আবার গুল।
খুকির বায়নায় বাবা কাজ দিলেন ক্ষুদিকে। প্রথমদিন সে আঁকল খুকিদের বাড়ির সবথেকে বুড়ো ঠাকুর্দাকে। ড্যাবা চোখে খুকি দেখল— তার প্রিয় ক্ষুদির ছবিতে ঠাকুরদার মুখের বদলে মাস্টারদা সূর্য সেনের মুখ। কপাল চাপড়াতে গিয়ে খুকির চোখে ঘরে পাতা কাজলটাই থেবড়ে গেল। খুকি চিৎকার করে উঠল— এই ক্ষুদি শয়তান, আমার ঠাকুর্দা ফেরত দে— দে বলছি। বলতে বলতে কেঁদেই ফেলল সিকনি বের করে। তুলি দিয়ে খুকির চোখের নিচে একটা সবুজ লাইন এঁকে কাজলের ব্যাপারটা সামলাল ক্ষুদি। আজকাল খুকি কাঁদলে তারও একটু কষ্ট হয়। তবে তারপর পাইপে টাটকা বিড়ি ধরিয়ে অনেকখানি বেকার তৃপ্তি নিয়ে ক্ষুদির দাবি— ওটাই নাকি real ঠাকুরদা। এতদিন ঠাকুর্দার ছেলে, বউ, নাতিপুতি নাকি কেউ তাঁকে চিনতে পারেনি। সেদিন খুকিদের বাড়িতে ক্ষুদির প্রথম রোজগার একশো টাকা।
একে একে ক্ষুদির কলায় বাড়ির চিরশান্ত ঠাকুমা হলেন মাতঙ্গিনী। আর খুকির বাবা নিজে হলেন উপেন্দ্রকিশোর আর সুকুমারের রঙভরা mixture। অনেক একশো গেল বাবার, আর অনেক কটা বিড়ি গিলে আরও প্যাকাটি হল গ প্রিয় ক্ষুদি। তার নিয়মিত খোরাকি আর জুগিয়ে পারেন না বাবা। পাঠালেন এক থিয়েটারের অফিসে— পুরোনো কালের কিছু নাট্যজনের ছবি আঁকতে হবে। সেখানেও শিগগির শিগগির অনাসৃষ্টি করে ফেলল ক্ষুদি। গিরিশ ঘোষের মুণ্ডু আর শিশিরবাবুর ধড় মিশিয়ে তুলকালাম করল। কোনটা কার, কেউ কিচ্ছু বুঝতে পারছে না। ক্ষুদি নিজেও না। থিয়েটারের লোকজনকে বুঝিয়ে দিল— এ হল একজন ফ্রান্সি শিল্পীর genuine confusion। ক্ষুদির প্রতিভায় খুকি মুগ্ধ। পাঁচিলের নিমগাছের তলায় ফুচকাওয়ালা দাঁড় করিয়ে দুজনে কুড়িটা কুড়িটা খেল।
পর্ব—২
বাড়ি ঢোকা বন্ধ হল ক্ষুদিরামের। হাতে তখন তার টাকা-পয়সা নেই। এদিকে খুকির ক্ষুদিপ্রেম বাড়ছে ব্যারাজের জল ছাড়ার মতো।
— খুকি বলল— আমার ছবি আঁক। তোর যা খুশি আঁক। অনেকগুলো আঁক। একবার মুণ্ডু ওপরে— একবার পা ওপরে করে আঁক। মায়ের অনেকগুলো পয়সার ঘট— ঝনঝন করছে। এক একটা করে ভাঙব, আর তোকে প্রতি ছবির টাকা দেব।
সেদিন অদ্ভুতভাবে পাশ কাটাল ক্ষুদি। বলল— আঁকার সময় সবার মন তার চোখে আসে। শুধু খুকির মনটাই নাকি সে দেখতে পায় না। এমন প্রত্যাখ্যানে বুক ফাটলেও ক্ষুদি বাঁচাতে বাড়ি থেকে এনতার চুরি শুরু করল খুকিরানি। মাছের মাথা দিয়ে ডাল [ক্ষুদির প্রিয়], আধখাওয়া সিগারেট, টুথপেস্ট। বাড়ির নিমগাছের ডাল কেটে ব্রাশের মতো ছেঁটেও দিল। খুকির চুরি অনুযায়ী চলল ক্ষুদির জীবন। কোনোদিন খুকি পাউরুটি আর সর চুরি করেছে আগে। ক্ষুদি খেয়েও ফেলেছে সরে পাউরুটি মাখিয়ে। খাবলা মেরে চুরির সর তো— পাউরুটির চেয়ে তার পরিমাণ বেশি।
সরের পর পেস্ট চুরি করল খুকি। তখন ক্ষুদি বসল মর্নিং ব্রাশ করতে। প্রেম যেদিন বাড়ত, উকুন বেছে চুলও আঁচড়ে দিতে কতবার গেছে খুকি। ক্ষুদি তাড়া করেছে খুকিকে। তারপর পাড়া ভরে খিস্তি দিয়ে ফাটিয়েছে। হাতে পয়সা না থাকায় সেসময় তার মেজাজ এমনই খচ্চর টাইপ হয়ে থাকত। যত রাগত সে, তত খুকির ইচ্ছে হতো ওই গাছতলাতেই বসে থাকে ক্ষুদির গা চটকে।
চুরির সর গিলে— চুরির মাজন মেখেও খুকির ছবি কিন্তু আঁকল না ক্ষুদি। খুকি কত কাঁদল। কত খারাপ খারাপ কথা বলল। ক্ষুদির সেই এক কথা— খুকির মন কল্পনায় আসে না তার।
জ্বরে পড়ল খুকি— সে এক মস্ত জ্বর। কোনোরকমে দোতলার ঘরের জানলা দিয়ে মুখ গলায় সে। নিমগাছের তলা দিয়ে ক্ষুদি চিল্লাচ্ছে— ও মা, ও মা, এই যে আমি।
জ্বর সারল। বাড়ির বাইরে এসে খুকি দেখল— গাছতলায় অনেক রোদের মাঝে ক্ষুদির কালো ছায়াটা নেই— জামাকাপড়, বিড়ি, পাইপ কিছু নেই।
আর্তনাদ করে ঘরে এল। মা খুকির হাতে দিলেন একশো টাকা। ক্ষুদি দিয়ে গেছে। বলে গেছে— “জ্বরমুখ তো মেয়েটার। কিছু ভাজাভুজি কিনে খাবে।”
আর ফেরেনি খুকির ক্ষুদকুঁড়ো। বাইরের রোদ পাল্টে যাচ্ছিল মধ্যদুপুর থেকে বিকেলে। সাঁঝের পাখি সব ফিরেছিল ঘরে। সারাটাদিন খুকি দেখছিল রোদসন্ধের চলাফেরা— পাখিদের উড়ে যাওয়া— উড়ে আসা।
সে চোখে খরা বয়।
খুকির সেদিন কাঁদতে বড়ো লজ্জা।
আসিস আবার— একদিন।