গল্প : কাহারে তাহা কব…
শুভাশিস চৌধুরী
জলেফা বাজারে আসতেই সাইকেলের চেনটা গেল পড়ে, কিছুতেই তুলতে পারছে না সমীর। এখান থেকে হেঁটে গেলে ঠিক সময়ে প্রেয়ার ধরতে পারবে না। তখীরাই দেখল দোকান থেকে। সুবোধ স্যারের পানের খিলিটা হাতে ধরিয়ে দিয়েই এক দৌড়ে এসে সমীরকে বলল, ‘আরে সাইকেলটারে একটু সোজা কৈরা ধর, আমি চেনটা তুইল্যা দিতাছি।’ সমীর সাইকেলটাকে ধরে রাখল, পাশ দিয়ে একে একে অন্যদের স্কুলে যেতে দেখছে আর সময়ের জন্য উৎকণ্ঠা বেড়েই চলছে। তখীরাই যদিও মিনিট দুয়েকের মধ্যেই চেনটা লাগিয়ে সমীরকে সাইকেলে চাপিয়ে দিয়ে ফিরে এলো দোকানে।
সুবোধ স্যার তখীরাইকে পিঠে একটা চাপড় দিয়ে ‘ভেরি গুড’ বলে পানের দাম মিটিয়ে দিয়ে অটোতে চেপে চলে গেলেন ইস্কুলে। এই জলেফা বাজার থেকে জলেফা স্কুলে পৌঁছাতে অটোতে মিনিট পাঁচেক সময় লাগে। ঘড়ির কাঁটা তাড়া দেওয়ায়, স্যার না হেঁটে অটো ধরলেন স্কুলের জন্য।
পড়াশোনায় ব্যতিক্রমী সমীরকে ভালোবাসে পাড়ার সবাই। ইস্কুলের স্যারদের মধ্যে যারা আগরতলা থেকে এখানে এসে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকেন, তাদের মধ্যে চারজন স্যার ওকে বিনে পয়সায় বাড়িতে নিয়ে পড়ান।
সমীরের এবার ক্লাস ইলেভেন। মুষ্টিমেয় সাত-আটজন ছেলে নিয়েই চলছে বিজ্ঞান বিভাগ। অনেক দিন ধরেই ভালো রেজাল্ট করেও কোনো ছাত্রই বিজ্ঞান নিয়ে ভর্তি হয় না দেখে অমল স্যারের খুব আপশোশ। পদার্থবিজ্ঞানের এই স্যার শহর থেকে প্রধান শিক্ষকের প্রমোশন নিয়ে ওখানে এলেও ভালোবাসেন স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের। শহরে বদলি হয়ে আসার কোনো ইচ্ছাই তার নেই। এলাকার মানুষের কাছে যে কয়েকজন স্যার-দিদিমণি ভীষণ প্রিয়, তার মধ্যে অমল স্যার অন্যতম। স্যারের সমবয়সি আরও তিনজন সায়েন্সের টিচার আর ইংরেজির অপর্ণা দিদিমণির ঐকান্তিক প্রচেষ্টাতেই এই স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগ খোলা হয়েছে। সরকার থেকে নতুন টিচারদেরও এই স্কুলে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনও তাদের বিজ্ঞান নিয়ে পড়ার ভয় কাটেনি। তবে তিন-চার বছর শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই বছর আটজন বিজ্ঞান নিয়ে ইলেভেনে ভর্তি হয়েছে। এর আগে প্রতিবছর দু’-তিনজন ভর্তি হলেও খুব ভালো রেজাল্ট হয়নি। তাই এবার ছাত্রদের সঙ্গে টিচাররাও কোমর বেঁধে নেমেছেন, ভালো ফলের আশায়।
সমীরের বাবা মূলত কৃষক, অন্যের জমিতেই কাজ করেন বেশি। নিজের একফালি জমিতে হয় কিছু সময়োপযোগী সবজি। কাজেই অন্যের জমিই ভরসা। একটা মেয়ে ছিল শেফালি। ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়লেও বোর্ডের পরীক্ষা দিতে পারেনি। বাংলার শিখা দিদিমণি, রবিঠাকুরের গানের শুধু ভক্ত নন, একটু উৎসাহী কাউকে পেলে মনের মধ্যে গানের কথা বসিয়ে দিতেন। শেফালির মধ্যেও সেই গুণ ছিল বলে তাকে খুব ভালোবাসতেন তিনি। কিন্তু হল না। এই দাশপাড়ার অলিখিত রেওয়াজ অনুসারেই যেন বিয়ের বাদ্যি বাজিয়ে নিল। সজল ছেলেটার মুদি দোকান। বাড়িতে জমি, পুকুর—সব মিলিয়ে অবস্থাপন্ন। সমীরের বাবার আপত্তি ঢাকা পড়ে গেল, সজলের বাবার টাকা আর সুন্দরী শেফালির নিরাপত্তার কথা ভেবে। পাঁচ ক্লাস পড়া শেফালির মায়ের, মেয়েকে পড়ানোর ক্ষীণ ইচ্ছেটা মিলিয়ে গেল, বিনা পণে মেয়েকে পার করার কথা ভেবে।
সমীর বড় হয়ে ডাক্তার হবে, এই স্বপ্ন দেখিয়েছেন অমল স্যার। বই-খাতা থেকে শুরু করে আলাদা করে বাড়িতে নিয়ে পড়ান অমল স্যার। এছাড়াও, বিজ্ঞানের আরও তিনজন শিক্ষক ওকে সাহায্য করেন এভাবেই। বাংলা, ইংরেজি তো দুই দিদিমণি ইস্কুলেই সবটা করিয়ে নেন। দুই দিদিমণির ওর ওপর আস্থা বেড়ে গেছে। সমীরের আর্থিক অস্বচ্ছলতা ওকে যেন জেদি করে তুলেছে। অন্য ছাত্ররাও চলছে সমানে পাল্লা দিয়ে, তবে ওদের আর্থিক অবস্থার পেছনে রয়েছে প্রত্যেকেরই বাড়ির লোকেদের আয়ের ভালো উৎস। কিন্তু মেধায় ওরা সমীরের ধারে কাছে নেই।
মিষ্টি ছিপছিপে ফর্সা সমীরের কোঁকড়ানো একমাথা চুল, আর সামনের পাটিতে একটি গজ দাঁতের অমল হাসি, স্যার-দিদিমণিদের যেন আদরের একমাত্র আধার। যখন তখন ওরা গাল টিপে দেয়। আশ্চর্য এই যে, খুব সাধারণ ঘরের ছেলে হলেও ওর মুখাবয়বে একটা মায়াময় ভালোবাসা, আনুগত্যের ছায়া যেন আঁকা। স্যার-দিদিমণিদের আর পাড়ার লোকের ভালোবাসা, ওকে আরও বেশি জড়িয়ে ধরেছে, গত বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলে। সাব্রুমের এই স্কুলের নাম, সঙ্গে ওর নাম ছড়িয়ে পড়েছে পুরো দক্ষিণ জেলায়। তাতে কিন্তু সমীরের মুখে-চোখে অহংকারের কোনো ছাপ নেই, বরঞ্চ পরবর্তী পরীক্ষার ফলাফলের চিন্তার ছাপ পড়ে গেছে। পড়ার বাইরে বলতে, ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটা বিজ্ঞান মেলা আর বিজ্ঞানের আলোচনায় ওর বিষয়-ভাবনা এবং বক্তব্য নজর কেড়েছে সবার। এই সবই স্যারেদের পরিশ্রমের ফল, শুধুমাত্র ওর প্রতিনিধিত্ব বলেই, সমীর সবার কাছে তুলে ধরেছে।
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পাশাপাশি জয়েন্ট পরীক্ষার পড়াও চলছে জোর কদমে। ওর সঙ্গে সঙ্গে বাকিদেরও একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। তবে এই লড়াইয়ে প্রত্যেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে আশেপাশের স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে। নিজেদের মধ্যে আছে দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্ক।
স্যার-দিদিমণিরা অনেক চেষ্টা করেও মেয়েদের সায়েন্স স্ট্রিমে আনতে না পারলেও আর্টস স্ট্রিমে কিন্তু মেয়েরা ভালো ফল করছে। এলাকার অভিভাবকরা একটু রেজাল্ট খারাপ বা বেচাল দেখলেই মেয়েদের বসিয়ে দিচ্ছে বিয়ের পিঁড়িতে। এ এক ভিন্ন লড়াই লড়ে যাচ্ছেন স্যার-দিদিমণিরা। খবর পেয়ে কম বয়সে বিয়ের প্রতিবাদ করলে বা বোঝাতে চেষ্টা করলে, অমান্য করেন না অভিভাবকরা। কিন্তু নীরবে তারা সেই কাজটা করেই চলেছেন। কেউ কেউ আবার বিয়ের সময় শর্ত রাখছেন, বিয়ের পর মেয়েকে যেন শ্বশুরবাড়ির লোকজন পড়াশোনায় বাধা না দেয়। তাও হচ্ছে। তবে ওই এক-দু’ বছর কলেজে যাওয়া, তারপর ঘোর সংসারী হওয়া— এইটাই যেন উন্নতি। বলার মতো একটাই কথা, পাশ করা বউ।
বাজার থেকে জলেফা স্কুলের পথে ডান হাতে খেতের আল পেরিয়ে আমতলী গ্রাম। সেখান থেকে আসত অঞ্জনা। অঞ্জনাকে তো সাব্রুম কলেজের প্রিন্সিপাল স্যার বাংলার রেজাল্ট দেখে স্তম্ভিত হয়ে বলেছিলেন, ‘আরে! তুই তো আমার থেকেও ভালো রেজাল্ট করেছিস, সব বিষয়ে। চেষ্টা চালিয়ে যা, একদিন এই কলেজের দিদিমণি হিসেবে তোকে দেখতে চাই, আমি আছি তোর পাশে।’ কিন্তু বছর দুই গড়াল না, সদ্য আঠারো পেরোনো মেয়েটা যমজ বাচ্চার জন্ম দিতে গিয়ে চলল জমে-মানুষে টানাটানি। সেই অঞ্জনা ঘরের বউ হয়ে ফিরে এলেও, কলেজে আর ফেরা হল না।
সমীরদের উচ্চমাধ্যমিক টেস্ট পরীক্ষার ফল বেরোনোর পর বিদায়ী অনুষ্ঠানে গান, কবিতা, নাচ হল, কিন্তু সবেতেই বিষাদের সুর। সবারই মন খারাপ। সমীরের বইয়ের ব্যাগ সঙ্গে আছে, কেননা এরপর অমল স্যারের বাড়িতে ফিজিক্স পড়ে, তারপর ঘরে আসবে। অন্যরাও যে যার মতো টিউশনের পড়া সেরে তারপর ঘরমুখো হবে। তবুও বিদায়বেলায় ওরা সবাই ইস্কুলের স্যার-দিদিমণিদের কথা বলল, নিজেদের বক্তব্যে। বলল ইস্কুলের সোনালি দিনের কথা। সব শেষ করে সমীর যখন ঘরে এলো তখন প্রায় সন্ধ্যা সাতটা। এই দিকটা, মানে সমীরদের পাড়াটা হল পূর্ব জলেফা। তখনও রাত আটটা মানে গভীর রাত। ঘরের সবার খাওয়া-দাওয়ার পর, সমীর রাত জেগে পড়ে।
সেদিন রাতের খাওয়া শেষে পড়ার টেবিলে বসতে বসতে ন’টা হয়ে গেল। স্যারের বাড়ি ছিল বলে, স্কুলের অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় ব্যাগে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রির বই ভরাই ছিল। ছিল নোটখাতাও। তখনও মোবাইল-নির্ভরতা এই অঞ্চলে এতটা হয়ে ওঠেনি। ব্যাগ থেকে বই-খাতা বের করতে গিয়ে হঠাৎ একটা ভাঁজ করা ছোট্ট কাগজ পড়ে গেল। আঁতকে উঠল। এটা কী? সমীর আশেপাশে তাকিয়ে দেখল, মা-বাবা নিজের নিজের বিছানায় যেতে ব্যস্ত। সমীর কাগজটা বইয়ের পাতার ভেতর ঢুকিয়ে রাখল। তারপর পড়তে বসল। মনটা খচখচ করছে কাগজটা খোলার জন্য।
সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারে না সমীরের বাবা-মা। আবার তো ভোরে উঠে শুরু হয়ে যায় গেরস্থালি। মা, বাবা ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝেই, পড়ার টেবিলে বসে অনেক কিছু ভাবল। কাগজটা খুলে দেখে, তাতে একটাই লাইন লেখা, তাও আবার সামনে-পেছনে ডট আর কোড চিহ্ন। দেখে সমীরের বুঝতে অসুবিধা হলো না, এটা কোনো একটা বাক্যের মাঝখান থেকে নেওয়া। কোনো নামধাম নেই। খুব ধন্দে পড়ল। লেখাটা মেয়েলি হাতের, তা স্টাইল দেখেই বুঝতে পারল। প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় চিরকুটটা নিয়ে ভাবল। এ তো আর পাঁচটা কথার মতো নয়, একেবারে আলাদা। ও অনেক ভেবে কথাটার গভীরে গেল। তারপর মনে হল, ওর এখন এসব নিয়ে ভাবলে চলবে না। ওর রেজাল্টের দিকে তাকিয়ে আছে সবাই। কাজেই সেই লক্ষ্যে ওকে স্থির থাকতে হবে। চিরকুটটা রেখে দিল বইয়ের ভাঁজেই।
সমীরের পড়াশোনার বাইরের জীবনের ভাবনা যে নেই, তা ঠিক নয়। গান শোনে, বেসুরে গায়। শিখা দিদিমণির গলায় রবিঠাকুরের গানের তো অন্ধ ভক্ত। কবিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, আকস্মিক বক্তৃতা— সব কিছতেই একটু-আধটু স্যারেদের উৎসাহে সে জড়িয়ে যায়। বয়সোচিত চাঞ্চল্য থাকলেও ভালো ছাত্রের চাপে এবং আর্থিক দুর্বলতার কারণে নিজেকে খুব সামলে চলে। বিজ্ঞানের ছাত্র। এই দু’বছরে শারীরিক বিষয়ের অনুভবটুকু নিয়ে একটু বেশিই সচেতন হয়ে গেছে সে। সঙ্গের অন্য বন্ধুরা ইতিমধ্যেই প্রেম, আধো-প্রেম, কাঁচা-পাকা প্রেম নিয়ে নানান গল্পের যেন ঝুরি বয়ে নিয়ে আসে স্কুলে, স্যারের বাড়িতে, যাওয়া-আসার পথে।
আর ক’দিন পর উচ্চমাধ্যমিক আর জয়েন্ট একসঙ্গে। সমীর ওই চিরকুট নিয়ে আর ভাবতে চায় না। কিন্তু ভাবনা ওকে ছাড়ে না, ফাঁক পেলেই ঢুকে পড়ে। আসলে এই তো আঠারো শেষের পথে, উনিশে পা দেবে-দেবে করছে। সব কিছু সরিয়ে রেখে মন দিল পড়ায়। মন বলছে এটা একটা গানের মাঝের কথা। আমাকে কেন? বিদায়বেলায় কেউ কি এ গান গেয়েছিল? মনে করতে পারছে না কেন! আবার শুরু করল পড়া। অনেকগুলো মুখ ভেসে আসছে। আগামীকাল টিচারের বাড়িতে গিয়ে কি বন্ধুদের দেখাবে? না। এতে করে তো, যে এটা দিয়েছে, ওকে নিয়ে সবাই হাসাহাসি করবে। এর চেয়ে থাক নিজের কাছেই। বাজুক মনের গহনে। সময়ে নিশ্চয়ই দেখা হবে। নিশ্চয়ই এ কথা প্রকাশিত হলে ও বাড়িতেও বিপদে পড়বে। আমিও যে খুব ভালো থাকব, তাও তো নয়। এর চেয়ে ভালো নিজের পায়ে আগে দাঁড়াই, তারপর ভাবা যাবে। এই স্কুলের যখন, তখন নিশ্চয়ই আশেপাশেই থাকে। ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল পড়ার টেবিলেই, মনে করতে পারছে না।
হাফ-ওয়ালের ওপর বাঁশের ঘরের ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ল মুখে। ভোর হতেই শূন্য মাঠের পাশে ওর ঘরে আলো ঝলমলে হয়ে যায়। মা উঠে ডাকল, ‘সমীর! এই সমীর! কিতা রে! টেবিলেই ঘুমাইলি? তর না রাইত পোহাইলেই পরীক্ষা। এমনে করলে চলব? আবার ত যাইবি মাস্টারের বাড়ি। যা চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিয়া আয়। আমি চা-মুড়ি দিতাছি।’
মুহূর্তে নিজেকে তৈরি করে নিল। স্যারের বাড়িতে এখন চলছে চ্যাপ্টার ধরে ধরে পরীক্ষা। নোটস, রিভিশন— এভাবে নিজেকে তৈরি করল পরীক্ষার জন্য। ফল হল সেরকমই। ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল— দুটোর জয়েন্টেই প্রথম পনেরোজনের তালিকায় চলে এল তার নাম। পরীক্ষার ফল দেখে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ওকে সংবর্ধনা দিয়েছে। দিয়েছে সামান্য আর্থিক সাহায্য। সবই তুলে দিয়েছে বাবার হাতে।
অমল স্যারের ইচ্ছে আর স্কুলের অন্যান্য স্যার-দিদিমণিদের আর্থিক সাহায্যে আর উৎসাহে ভর্তি হল মণিপুরের মেডিকেল কলেজে। আসলে এ পাড়ায় একজন ডাক্তার হোক, মানুষের সেবায় লাগুক— এটাই ছিল স্যার-দিদিমণিদের ইচ্ছে।
পড়াকালীন সময়ে ও যতবারই বাড়িতে এসেছে, ততবারই ওর স্কলারশিপের টাকা বাঁচিয়ে বাড়িঘর একটু একটু করে সাজিয়ে নিয়েছে। দেখা করেছে স্কুলের স্যারেদের সঙ্গে। কলেজে পড়াকালীন হস্টেলের অন্যদের সঙ্গে যেমন ভালো ভাব, তেমনি ওর রূপের মোহে পড়েছে বেশ কয়েকজন সহপাঠিনী। কিন্তু ওর বাড়ির স্ট্যাটাস আর নিজের গাঁয়ে ফেরার কথা ভেবে সযত্নে ফিরিয়ে দেয় সেই সব প্রেমের হাতছানি।
বছর আটেকের মধ্যেই একেবারে গাইনোকোলজিতে এম.ডি. শেষ করে চাকরিতে জয়েন করল আগরতলার আই.জি.এম. হাসপাতালে। থাকার জায়গা হল হাসপাতালের কোয়ার্টারে। তখনও মোবাইল না থাকলেও হাসপাতালে ওর কোয়ার্টারে ছিল ল্যান্ডফোন। মা-বাবা তখনও ফোনে কথা বলতে পারে না। তাই সপ্তাহে এক-দু’বার বাড়িতে আসে। বিনে পয়সায় পাড়ার বাড়িঘরের পরামর্শ দেয়, দেয় চিকিৎসা।
চাকরিতে জয়েন করার পর, সেদিন ছিল ওর রাতের ওয়ার্ড ডিউটি। হঠাৎ করেই রাত আটটা নাগাদ সাব্রুম জেলা হাসপাতাল থেকে রেফার নিয়ে, অ্যাম্বুলেন্সে করে একটা পেশেন্ট এসেছে। সঙ্গে আছে বাড়ির লোকজন। যে লোকটি বলছে তার বউমাকে এবারের মতো বাঁচিয়ে দিতে, তাঁর গলায় সোনার মোটা চেন দেখেই বোঝা যাচ্ছে, যথেষ্ট পয়সাওয়ালা মানুষ ওরা। পেশেন্টের চোখমুখ চাদরে প্রায় ঢাকা। সাব্রুম বললেই সমীরের মনের কোণে এক আত্মিক ভাবনা চলে আসে। কী হলো, জানার আগেই ইমার্জেন্সির দায়িত্বে থাকা ডাক্তার, সিস্টার আর ওয়ার্ডবয়কে ডেকে আগে ও.টি.-তে নিয়ে যেতে বলল ইমার্জেন্সিতে থাকা ডাক্তারবাবু। সমীর ছিল ওয়ার্ডে। খবর শুনে ছুটে এসে আগেই দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তারপর হাত লাগাল ও.টি.-র কাজে।
বুঝতে পারল জোর করে ক্ষুদে প্রাণটাকে শেষ করে দিতে গিয়ে এখন মেয়েটার অবস্থাই খারাপ করে ফেলেছে বাড়ির লোক। সিনিয়র ডাক্তার শ্যামল রায়ের উপস্থিতিতে দ্রুত সব ব্যবস্থা নিল সমীরের অপারেশন টিম। কিছু একটা খেয়েছিল বউটা, তৃতীয়বারও মেয়ে আসছে জেনে। এতে করে শ্বশুরবাড়ির মান রক্ষা না হলেও নিজেকে বাঁচাতে পেরেছে কোনোমতে। সারা মুখে কালি মেখেছে যেন মেয়েটা। বয়স তেইশ। নাম সুলগ্না সরকার।
অপারেশন সাকসেস। এইবার ওকে ইনটেনসিভ কেয়ারে পাঠিয়ে বাড়ির লোককে ডেকে সব বলা হল। শুনে শ্বশুরমশাই যেন নিজেও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। নার্সদের অক্লান্ত সহযোগিতায় তিন দিন পর ওকে ওয়ার্ডে আনা হল।
জলেফার রামজি পাড়ায় মেয়ের বাবার বাড়ি। নার্সরা বলাবলি করছে, কালে দিনে কী সুন্দর ছিল মেয়েটা! দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
ততক্ষণে বয়স চল্লিশের স্বামী এসে পৌঁছেছে। বিশ্বের বিরক্তি মুখে নিয়ে এসেছে শাশুড়ি। মুখাবয়ব দেখেই বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, বউ বেঁচে গিয়ে কী অন্যায়টাই না করেছে। নাতির মুখ আর দেখা হলো না এ জীবনে।
সুলগ্না সরকার! সমীরের যেন শোনা নাম। ও কী জলেফা স্কুলের ছাত্রী! হিসেব কষে দেখল ওর থেকে বছর পাঁচ-সাতেকের ছোট হবে। কিন্তু রামজি পাড়া থেকে সেই সময় তো ওদের স্কুলে দু’-তিনটে মেয়েই মাত্র পড়ত। তাও নিচের ক্লাসে। একমাত্র একটা মেয়েকে সবাই চিনত, শিখা দিদিমণির আদরে আর চেষ্টায় ও খুব ভালো গাইত। রবিঠাকুরের গান গেয়েছিল মেয়েটা ওদের ফেয়ারওয়েলের অনুষ্ঠানে। ওর নাম ছিল সরস্বতী। হঠাৎ করে স্মৃতি হাতড়ে ফিরতে লাগল স্কুলবেলায়। কখনো কি দেখেছে মেয়েটাকে? মনে পড়ছে না। আসলে চেহারায় তো তখন হয়তো ছিল বিনুনি আর জামা, এখন তো মহিলা। মিল পায় না কিছুতেই।
চতুর্থ দিনে পেশেন্টের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই মেয়েটা ডুকরে কেঁদে ফেলল। সমীর বলল, ‘বাড়ি যাবেন, এখন এতে কান্নার কী হল? আপনার স্বামী, শাশুড়ি বসে আছেন বাইরে। আপনার শ্বশুরমশাই সময়মতো না নিয়ে এলে তো, আপনাকে বাঁচানোই যেত না। এইরকম কাজ কেউ করে?’
‘কী আর করতাম কন? নাতির শখ আমার শাশুড়ি মায়ের। আমার কী দোষ ডাক্তারবাবু? এদের কোনো ধারণা আছে যে, এতে আমার দায় নাই। আমারও তো বিজ্ঞান পড়া আছিল কোনো এক সময়।’ দুর্বল শরীরের সুলগ্না ধীরে কিন্তু দৃঢ়তার সঙ্গে কথাগুলো বলে।
ডাক্তার মন দিয়ে শোনে ওর সব কথা। বুঝে নেয় পাড়ার সোনোগ্রাফির রিপোর্ট থেকে জেনে গিয়েছিল এবারও মেয়েই হবে। তারপর কী হবে সে ভেবেই এই সিদ্ধান্ত। তবে বিষ খাওয়ার থেকে বেশি হল রাস্তায় গাড়ির ঝাঁকুনি। সে যাক। কিন্তু পরের সিদ্ধান্ত ওর নিজের, যা পরিবারের লোক জেনে গেছে।
ওর স্বামী প্রদীপের কাছ থেকে জেনে নেয় জলেফা স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পাশ করেছিল মেয়েটা। সুলগ্নার বাবা ছিল সাব্রুম শহরে প্রদীপদের ছোট্ট মিষ্টির দোকানের কর্মচারী। নিজের আর্থিক অবস্থা ভেবে মেয়েকে প্রায় জোর করেই বিয়ে দেয় দোকান-মালিকের একমাত্র ছেলের সঙ্গে। ছেলে কোনোরকমে মাধ্যমিক পাশ করলেও আর পড়াশোনায় মন নেই দেখে দোকানেই বসিয়ে দেয়। বয়স বত্রিশের ছেলে। ওই ছেলের পর বাকি দুই মেয়ে আছে এ সংসারে।
বিয়ের বছর গড়াতেই সুলগ্নার একটি মেয়ে। সেই সময় ডাক্তারের মতে, বয়স কম বলে, সেবার ভয়ানক পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠেছে। বড় মেয়েটার এখন ক্লাস টু। বিয়ের পর পড়ানোর কথা থাকলেও, সুলগ্নার গান, পড়াশোনা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় তখন থেকে। এরপর আবার একটি মেয়ে, তার বয়স চার। — আর শুনতে চায় না সমীর। শুধু বলে, ‘আমিও এই স্কুলেরই ছাত্র।’
প্রদীপ বলে, ‘জানি তো স্যার, এর লাইগাই তো এইখানে আইছি। আপনার সুনাম সাব্রুমের সবাই করে স্যার। আপনে যখন ইস্কুল শেষ করেন, তখন বলে তাই ক্লাস সেভেনে পড়ত। পড়াশোনা, গানের গলা সব বলে তাইর ঠাকুরের দান। শিখা দিদিমণি তো রেডিওতে রবীন্দ্রসংগীত গাইত, তাইনেই তারে শিখাইত। এই দিদিমণি নাকি আদর কৈরা তার নামটা পাল্টাইয়া দিছিল। ইস্কুল থেকে বোর্ড পরীক্ষার ফর্ম ফিল-আপ করার সময় দিদিমণি স্যারেদের সঙ্গে কথা কইয়া সরস্বতী থিকা সুলগ্না কইরা দিছিল।”
হঠাৎ করেই প্রদীপের মোবাইল ফোন বেজে ওঠে, খুঁজে পেতে ধরতে ধরতে বাজতে থাকে একটা রিংটোন, ‘—কত যে তান বাজালে ফিরে ফিরে কাহারে তাহা কব’। সমীর বিস্ময়ে তাকায় প্রদীপের মুখের দিকে, কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই প্রদীপ বলে, ‘স্যার, সুলগ্নার ফোন। নিজে গাইয়া রিংটোন বানাইছিল, কয়েকদিন আগে নতুন ফোনে।’
সমীরের মনে পড়ে সেই চিরকুটের কথা, যাতে লেখা ছিল, ‘…কাহারে তাহা কব…’ আর বুঝতে পারে, কতটা গভীরে জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে ওই বয়সেই গানের কথা সুলগ্নাকে ছুঁয়ে ছিল।
অলঙ্করণ : পিনাকী ঘোষ