বুধবার | ০৭ অক্টোবর ২০২৬

ধৃতি-মান

 ধৃতি-মান

শুভাশিস চৌধুরী

পর্ব-৭

দীর্ঘ ভাঙা রাস্তার প্রচন্ড ঝাঁকুনিতে ওরা বিধ্বস্থ দুজন।ঘরে ঢুকে যে যার বিছানায় শরীর ফেলল কিছুক্ষনের জন্য।এটেন্ডেন্ট মেয়েটি হাজির ডিনারের অর্ডার নিতে। রাতে ওরা দুজনেই হালকা খাবার হিসেবে, ডাল ভাতের সাথে ডিম ওমলেট বলে দিল। ফ্রেশ হতে গেল না কেউ।পরিশ্রান্ত ধৃতি বিছানায় । মানস চুপ করে পাশে বসে ভাবতে লাগল,কাল সকালের কথা।ও কোথায় যাবে?ধৃতির এই জীবনের কিছুই তো জানল না।ও কি এখনও একা? না কি ওর সঙ্গী কেউ আছে?

একটু পরে আলতো ঘুমে জড়িয়ে থাকা ধৃতিকে গায়ে হালকা ঝাঁকুনি দিয়ে ডাকল মানস।

কী রে! যা। হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়ে নে,একটু পরেই ডিনার এসে যাবে তো!

ও!হ্যাঁ। আচ্ছা যাচ্ছি।তার চে বরং তুই আগে গিয়ে আয়,তারপর না হয় আমি যাচ্ছি।

আচ্ছা, বলে সকালের ছেড়ে যাওয়া সেই তোয়ালে, পায়জামা-পাঞ্জাবী নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল।

মানস বেরিয়ে এসে দেখে ধৃতি পোশাক বদলে নিয়েছে রাতের জন্য।হাতে তোয়ালেটা নিয়ে জানলার বাইরের দিকে গভীর ভাবনায় মগ্ন।

মানস ডাকতেই নিজেতে ফিরে এসে, হাত-মুখ ধুতে গেল।

কলিং বেল বাজিয়ে ঘরে ঢুকে,মেয়েটা ডিনার হাতে।মানস ওদের দু দিনের বিল ঘরে পাঠিয়ে দিতে বলল,সে সঙ্গে কাল সকালে ওদের চেক আউটের কথা মনে করিয়েছে।কী মনে করে বলল,দু কাপ গরম কফি পাওয়া যাবে? মাথা নেড়ে ওয়েটার মেয়েটি সম্মতি জানাতেই,নিয়ে আসতে বলল।

ধৃতি বেরুনোর আগে বিল এসে যাওয়ায়, মানস পুরো বিলটা মিটিয়ে দিশ, এ যেন মানসের আত্মতৃপ্তি।

ধৃতির এবার আসতে একটু সময় নিল। খুব ক্লান্ত লাগছে এখন। মানস ওকে বলল,তুই ব’স। আগে একটু কফি খেয়ে নে,শরীরের ক্লান্তি একটু কাটবে।

ধৃতির মুখে তৃপ্তির হাসি।যেন বলতে চায় এই মানসটাকেই তো আজীবন নিজের সঙ্গে বেঁধে রাখতে চাইছিল,কিন্তু হল না।মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে এই কথাটা বলে, তোয়ালেটা হালকা ভেজা চুলে মাথায় জড়ালো।সামনে এসে বসল দুজনে মুখোমুখি।কফির কাপের উপর মুড়ে দেওয়া রেপার দুটো খুলে, একটা মানসকে দিল।একটা মুখে তুলে নিল নিজে।

কফি খেতে মানসের মুখে একটা বিশ্রী শব্দ হতেই, সেই কফি হাউজের কথা মনে পড়ে।মনে পড়ে ধৃতির সেই চাউনি।মানস নিজেকে শুধরে নেওয়াতে,কফি শেষ ক’রে ধৃতিই নীরবতা ভাঙল।

তোকে আমি কেন ধরে রাখতে পারলাম না মান্?

কেন চলে গেলি এভাবে ধৃতি?আমার তো সেটাই প্রশ্ন?আমি কিন্তু অপেক্ষায় আছি,তোর জন্য এখনও।

সে কী? আমি তো পেরেছি আর একজনের সাথে নিজেকে জড়াতে।সে তো হয়ে গেল সাত বছর।

তুই সুখী তো?

কেমন করে?

কেন?তোর বর তোকে-

দেখছিস না কত স্বাধীন।বিয়ের কোনো চিহ্ন নেই।কোনো বাঁধনে রাখে না ও আমাকে।দেখেছিস!এই দীর্ঘ সময়ে একবারও কল করে নি।

তবে তোকে আমার কেন অসুখী মনে হয়?

তোর ভাবনা একেবারে ভুল না।দেখ ,এই যে অরুনেষকে আমি বিয়ে করলাম, সে তো আমার আশ্রয়দাতা মা বাবার জন্য।

কী বলছিস ধৃতি?

হ্যাঁ।মা মারা যাওয়ার পর এক বছর কাটল।আমার গবেষনার কাজ চলাকালিন বাবা আমাকে একদিন ডেকে বললেন,তুমি কাল ইউনিভার্সিটি যাবেনা।

আমি বললাম কেন?

কাল অরুনেষের সাথে কথা পাকা করে, তোমাকে আমি ওর হাতে তুলে দিতে চাই পাকাপাকিভাবে।

সে কি আমি তো অরুনেষদাকে সেইভাবে জানিই না!বাড়িতে আসেন,কথা বলি,এইটুকুই যা।আর তাছাড়া বাবা! অরুনেষদা আমার থেকে বছর আটেকের বড়। উনি যখনই আসেন,টাকা-পয়সা,তোমার সম্পত্তির আয়কর নিয়ে, কথাবার্তা বলেন।এর বাইরে—-

থামিয়ে দেয় , আমার বাবা।

শোনো!তোমার ইচ্ছো মতো এতদিন সব করেছ,তোমার মা ছিলেন,এখন আমি আর এক মুহুর্ত সময় নষ্ট করব না।বাকিটা তুমি অরুনেষের সঙ্গে বুঝে নিও।ও একজন প্রতিষ্ঠিত চার্টার্ড।এই বয়সে নিজের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত।এরকম ছেলে সচরাচর এই কলকাতার বুকে নেই।আমি সব ভেবে চিন্তেই ঠিক করেছি।

বাবা!টাকা পয়সার বাইরেও একটা জীবন আছে,সে আমি-আমরা দেখেছি।অরুনেষদার কাছে আমি জানি, এ সবের কোনো মৃল্য নেই।

অর্থ থাকলে সব হয়।আর কী বললে ‘আমরা’?এ ভয়টাই আমি পেয়েছিলাম।আমি যা বলছি সেটাই হবে।

না।মানি না।তোমার কাছে আসার সুবাদেই উনার সাথে আমার কথা,মা বলতেন,সরস্বতী ছেলেটাকে লক্ষ্মীর কোলে ফেলে রোখে গেছে।এর অর্থ তোমাকে স্পর্শ করে নি, কিন্তু আমাকে করেছিল সেই তখনই। আর তাছাড়া অরুনেষদা কোনোদিন আমার পড়া,গান হবি এসব নিয়ে একটি কথাও বলেন নি।আমি একদিন বলেছিলাম,সারাক্ষন হিসেবের কথা না বলে,একটু ‘ঋজুদা’র খোঁজ নিন।উনি তো আকাশ থেকে পড়লেন।ওই লোককে আমি!

হ্যাঁ।তুমি।

বাবা কেমন যেন ক্ষেপে গেলেন। হঠাৎ করে এ কী বললেন!এ তো আমি এই প্রথম শুনছি!

পয়সা থাকলে সব হয়,নিঃসন্তান তোমার মাকে আমি তোমায় এনে দিয়েছি।সব জানে অরুনেষের বাবা।আমি ফেরাতে পারব না।ওরা সব জেনে-শুনে রাজি হয়েছে। বলতে বলতে হয়তো লক্ষ্য করলেন,আমার মুখের পরিবর্তণ।

প্রথম এই সত্য শুনে,আর একটি কথাও না বলে, নিজের ঘরে গেলাম।মায়ের ছবিটার দিকে কেন যে চোখ গেল জানি না।

আকাশ ভেঙে পড়ল মাথায়। গুমরে উঠে শুধু মনে মনে একটা কথাই বলেছি ,সে জন্য?

এবার আশ্রয়দাতা বাবার দায়িত্ব কর্তব্যকে সম্মান জানিয়ে, কাছে গিয়ে শুধু বললাম,আপনার কাছে একটাই অনুরোধ,ঘটা করে নয়,উকিল কাকুকে ডেকে আনুন বাড়িতে।আমি অরুনেষদার কাগজে সই করে দিচ্ছি।

বাবা লক্ষ্য করলেন,এই প্রথম তাঁর মেয়ে তাঁকে আপনি বলে সম্বোধন করলেন।

রেজিষ্ট্রি শেষ করে কয়েকদিনের জন্য লখনৌ বেড়াতে যাওয়ার নির্দেশ পেলাম অরুনেষের কাছ থেকে। এটা যে আগে থেকে তৈরি করা, বুঝতে পারি নি।মেনে নিলাম। নিজের ঘরে গিয়ে তোকে আর স্যারকে একবার ক’রে ফোন ক’রে, ফোনের স্যুইচ অফ করলাম।যদিও দুজনই বিজি।

এক নিঃশ্বাসে নয়,যথেষ্ঠ সময় নিয়ে কথাগুলো বলল ধৃতি।জানিস! এই ফোন দুটো তোদের ক’রে সব কনটাক্ট ডিলিট করে ফোন বন্ধ করেছিলাম।

কেন গতকাল ওই সেঙ্গিয়াজিক জয়া থৌসেনের কথা বলছিলাম,এইবার বুঝতে পারছিস তো? আমার যে সত্যিকারের মা-বাবা বাস্তবে নেই,সেদিনই প্রথম জানা হল।বাবা কেমন সহজ ভাবে বলে ফেললেন,”নিঃসন্তান তোমার মাকে আমি তোমায় এনে দিয়েছি”।

রাত গভীর হল।

এখন তুই সুখী তো ধৃতি?

জানি না।তবে আমার বাকি কাজে ও কোনো বাধা দেয় না।আমার গবেষণার কাজে ও কোনো বাধা দেয় নি।একটু দূরে মহিষাদলে একটা কলেজে এখন পড়াই।কোয়ার্টারে থাকি।মাঝে মাঝে ও আসে,আমিও যাই। আমার পালিতা মায়ের সাথে আমার দুটো মিল আছে জানিস।

সে দুটো কি?

এক হচ্ছে তাঁর শান্তিনিকেতনের শেখা গায়কী।তাঁর কাছ থেকে পাওয়া,যা তোকে আমার এত কাছে এনে দিয়েছে আর দ্বিতীয় হল,আমি কখনো স্বাভাবিক নিয়মে মা হ’তে পারব না।

যে অরুনেষ ঋজুদাকেই জানে না,তার সাথে বাকি জীবন! কাটাতে তো হবেই।আমার আশ্রয়দাতা বাবার জীবনধারার সঙ্গে অরুনেষের এক আশ্চর্য মিল।

স্মৃতি থেকে ফিরে এসে ধৃতি যেন হালকা।

যাক গে মান!এই দুটো দিন তুই জীবনে আমার জীবন যোগ করলি।

-কিন্তু আমি তো তোকে!

তুই আমাকে হয়তো সব দিতি কিন্তু তোর পারিবারিক জীবন?সেটাকে তো, বুঝে হোক বা না জেনে হোক, বাঁচিয়ে দিলাম, বল। পরিবার হয়ে গেলে তখন তো শুধু তুই আর আমি নই।একটা সন্তানও চাই,আপন গর্ভের।

ধৃতি তার মান্ কে জানতে চাইতেই মানস বলল, কলেজের সেই দিন থেকে ধ’রলে, তোকে ছাড়া প্রায় দশটা বছর কাটালাম।বাড়িতে এ সব কথা বলি নি কখনো।এবার হয়তো-

ধৃতি এই প্রথম মানসকে সবটা শরীর দিয়ে জড়িয়ে ধ’রে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল।মানস আজ আর জোর করে ওকে ছাড়ালো না। আঁকড়ে ধরল,আর কোনোদিন ওকে এভাবে কাছে পাবে না ভেবে।

মানস ওকে জড়িয়ে ধরে বলল,ভাবিস না সন্তান হবে না নিশ্চিত জেনে,আজ তোকে খুবলে খাব।

ধৃতি শরীর থেকে মানসকে না সরিয়ে বলল,

সে আমি জানি মান্,এ বিশ্বাসেই তো আঁকড়ে ধরি।তুই যেন আরেকটা সম্পূর্ণ ধৃতি পাস ,সেটাই আমি আজীবন চাইব। হয়তো আবার জীবনের কোনো এক মোড়ে তোর সাথে দেখা হবে,কিন্তু রাত কাটাব না। তোর সাথে সেদিন তোর জীবনসাথী থাকুক, সেটাই চাই।তাকে যেন তোর সম্পূর্ণ করে পাওয়া হয়।

তুই কী করে বুঝলি যে আমি এখনও একা?

তোর গবেষনার প্রথম কাজটা তো গতবছর আমার কলেজের লাইব্রেরীতে গেল।তাতেই তোর বায়োগ্রাফী দেখে কেন জানি না এটা মনে হল। আজকে তোকে এভাবে আমার সাথে নেমে যেতে দেখে, কনফার্ম হলাম।

বাজে বকিস না,বইয়ে লেখক পরিচিতিতে কি ও সব থাকে?

তাই তো বলছি, অনুমান।

তোর অনুমান ভুল না।তবে এবার তোকে বলি,বাড়ি থেকে বিয়ের তাড়া খেয়ে পালিয়ে এসেছিলাম, শেষবারের মতো তোকে খুঁজতে।কোন্ ট্রেনে উঠে কোথায় যাব ঠিক না করেই উঠেছিলাম। তোর নতুন ঠিকানাই তো জানতাম না।

এই হাফলং শহর ফিরিয়ে দিল আমার ধৃতিকে।আর কিছু চাই না জীবনে।

রাত কেটে গেল।ডিনার রইল অধরা।প্রদীপের গাড়ি এসে সকালে ওদের নিয়ে পৌঁছে দেবে নিউ হাফলং স্টেশনে।

কাল তো সকাল সকাল ট্রেন ধরতে হবে এখন খেয়ে শুয়ে পর ধৃতি।

না, এই রাত,আর কাল সকালে ট্রেন ধরা পর্যন্ত আমি জেগেই থাকব মান।এই সময়টুকু তুই আমার জন্য রাখ।

পাগলী আমার!

অনেক দিন পর মান-এর কথাটা ধৃতিকে যেন জাগিয়ে রাখল বাকি দীর্ঘ রাত।

কাল সকালটা যদি না আসে?

প্রকৃতির নিয়মকে কি আর তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারি?

রাত জাগে দুটো প্রাণ, ভোরের অপেক্ষায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *