লাদাখ ম্যারাথনে ৫২’র শর্বরীর সোনা জয়
নীরবে লালিত স্বপ্নকে নিয়ে কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে নিজেকে তৈরি করেছেন। বয়সকে তুড়ি মেরে সদ্য সমাপ্ত লাদাখ ম্যারাথনে স্বর্ণপদক বিজয়ী ত্রিপুরার শর্বরী দেবনাথ। আলাপচারিতায় নন্দিতা দত্ত।
লাদাখ ম্যারাথনে প্রথম হয়ে পোডিয়াম ফিনিশের মূহুর্তের অনুভূতি?
এই ম্যারাথনে বিভিন্ন এজ গ্রুপে ১৩৮০ জন প্রতিযোগীর মধ্যে মহিলা প্রতিযোগী ছিলেন ৩৩৭ জন। আর এর মধ্যে আমার গ্রুপ ৫২+ (veteran category) তে মহিলা ছিলেন ১৫ জন। দৌড় শেষে প্রথম হয়েছি জানা মাত্রই প্রথমেই মনে হয়েছে আমি পেরেছি। আমার স্বপ্ন পূরণ হল এবং সেই মূহুর্তে আনন্দে চোখে জল এসে যায়। ভিকট্রি স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে পরিবারের সবার মুখ ভেসে ওঠে। আমার স্বপ্নের পেছনে প্রতিনিয়ত পরিবার এবং শুভানুধ্যায়ীদের শুভেচ্ছা আমাকে ঋণী করেছে।
অনুশীলনের অভিজ্ঞতা এবং সাফল্যের আনন্দ?
কয়েকমাস নিয়মিত কঠোর ও সঠিক অনুশীলন করতে হয়েছে। একটা রুটিন ভিত্তিক জীবন। প্রতি মূহুর্তে সতর্ক থাকতে হয়েছে। এই লাদাখ ম্যারাথন পৃথিবীর মধ্যে সব থেকে উচ্চতম ও কঠিন ম্যারাথনগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১১,৫০০ ফুট উচ্চতায় যেখানে অক্সিজেনের মাত্রা ৫০% সেখানে একুশ কিলোমিটার দৌড়ে প্রথম স্থান অধিকার করা অনেকটাই কঠিন ছিল। এখন অবধি আমার জীবনের অন্যতম সাফল্য আমাকে আরও অনেকগুলো বৃহৎ ম্যারাথনে অংশ নিতে সাহস জোগাবে।
হঠাৎ দৌড় শুরু করার পরিকল্পনা কীভাবে নিলেন?
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আমার দৌড় শুরু আর এই দৌড় শুরুর অনুপ্রেরণা হচ্ছে আমার ছেলে। সে প্রতিদিন দৌড়ে এসে তার আনন্দের, তার পরিশ্রমের যে অভিজ্ঞতা আমার সঙ্গে শেয়ার করত তা আমাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তখনই আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছিলাম যে আমিও কি দৌড়ে অংশগ্রহণ করতে পারি না?
স্কুলজীবনে খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি?
আমি স্কুলজীবনে খেলাধুলার সঙ্গে তেমন সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলাম না। তবে স্কুলের অ্যানুয়াল স্পোর্টসের কোনও না কোনও খেলায় যোগদান করতাম।
ম্যারাথনকে বেছে নিলেন কেন?
আমি যে শুধু ম্যারাথনকেই বেছেছি এমনটা নয়। ফিটনেস সম্পর্কিত যেকোনও ধরনের প্রতিযোগিতায় আমি অংশগ্রহণ করেছি, এবং আগামীতেও করব।
প্রতিটি প্রতিযোগিতার আগে নিজেকে কীভাবে মোটিভেট করেন?
প্রতিটি প্রতিযোগিতার আগে আমি একটা সংকল্প করি যে আমাকে পারতেই হবে। আমার ভেতরের সবটুকু শক্তি দিয়ে আমাকে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে কারণ আমার ছেলে, আমার পরিবার ও আমার বন্ধুদের আমাকে ঘিরে অনেক প্রত্যাশা। আর সব থেকে বড় হল আমার স্বপ্ন আমাকেই পূরণ করতে হবে।
আপনি বর্তমানে জয়পুরে থাকেন— ত্রিপুরার মেয়ে জয়পুরের হয়েই কি প্রতিযোগিতায় নামেন?
আমি যেহেতু বর্তমানে জয়পুরে থাকি তাই আপাতত জয়পুরের হয়েই প্রতিযোগিতায় নামি।
কিন্তু আমি ত্রিপুরার মেয়ে তাই আমার আরেকটা স্বপ্ন হল আমি একবার হলেও ত্রিপুরার হয়ে ম্যারাথনে অংশগ্রহণ করতে চাই।
দৌড় থেকে কিক বক্সিং ও বক্সিংয়ের মতো খেলায় আসার সিদ্ধান্ত কেন নিয়েছিলেন?
জয়পুর আসার পর আমি আমার আশেপাশের লোকজনদের দেখতাম যে ওরা নিয়মিতভাবে শরীর চর্চা করে। সেটা আমাকে খুব উৎসাহ প্রদান করত… তখন আমি জিম জয়েন করি এবং নিয়মিতভাবে স্ট্রেংথ ট্রেনিং নেওয়া শুরু করি। এর মধ্যে আমি আমার নিজস্ব একটা জিম ওপেন করি। তখন সেখানে মেয়েরা যখন MMA (Mixed Martial Arts) শিখতে আসত আমি দেখে খুব উৎসাহ বোধ করতাম এবং এর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। শুরু করলাম MMA ট্রেনিং নেওয়া এবং ২ বছর নিয়মিতভাবে MMA অনুশীলন করি। এরপর একজন বক্সারকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তার কাছে শুরু করলাম বক্সিং শেখা। আজ প্রায় দু’বছর আমি বক্সিং নিয়মিত চর্চা করি এবং বক্সিংয়ের নানা কৌশলগুলো আয়ত্ত করার চেষ্টা করে চলেছি।
এরপর আমি শুরু করলাম রানিং। শুরু থেকেই দৌড়ানোর সময় আলাদা একটা এনার্জি অনুভব করতাম। আজ প্রায় দু’বছর আমি প্রতিদিন সকালে নিয়মিত ভাবে রানিং প্র্যাকটিস করি এবং আমি অনুভব করি এরমধ্যে দিয়ে যেন আমার সারাদিনের শক্তি সঞ্চয় হয়।
কিক বক্সিং, ম্যারাথন, জিম এগুলোর মাঝে আবার এন্টারপ্রেনার হয়ে গেলেন কীভাবে?
আমি জয়পুরে আমার জিম খুলেছি আজ প্রায় আড়াই বছর। আমি যেহেতু ফিটনেস নিয়ে থাকতে ভালোবাসি তাই এই জিম খোলার পরিকল্পনা করেছিলাম অনেকটা শখেই বলতে পারেন।
নিজের আর্থিক স্বনির্ভরতার পথে এই জিমের ভূমিকা কতটা?
যদিও এখন অবধি আমি আমার জিমকে আরো বড় করে তোলার প্রয়াস করে যাচ্ছি, এবং আশা করছি অদূর ভবিষ্যতে আমার আর্থিক স্বনির্ভরতায় এই জিম অনেকটাই সহায়ক হবে।
আপনার জিমে কতজন কাজ করছেন এবং তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ কীভাবে তৈরি হল?
আমার জিমে বর্তমানে চারজন Trainer, ১জন Zumba Instructor ও ১জন cleaner আছেন। জিমের কর্মী হিসেবে তাদের মাসিক বেতনের সঙ্গে আরও অনেক আর্থিক সহায়তাও করা হয়।
একজন মহিলা হিসেবে ব্যবসা শুরু করার ক্ষেত্রে পরিবার বা সমাজের কোনও চাপ বা প্রতিবন্ধকতা ছিল কি?
না, আমার এই ব্যবসার যাত্রাপথে আমার পরিবার বা সমাজের পক্ষ থেকে কোনও প্রতিবন্ধকতা আসেনি বরং আমি সবার থেকে আশাতীত উৎসাহ ও প্রশংসা পেয়েছি এবং আজও পেয়ে যাচ্ছি, আর এগুলোই আমাকে মানসিক শক্তি জুগিয়ে যাচ্ছে।
জিমে আসা মহিলাদের মধ্যে কী ধরনের পরিবর্তন আপনি দেখতে পান?
জিমে আসা মহিলাদের প্রথম লক্ষ্য থাকে ফিটনেস। প্রতিনিয়ত এক্সারসাইজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শারীরিক সুস্থতা ও সক্ষমতা বাড়তে থাকে এবং মানসিকভাবেও একটা আলাদা শক্তি অনুভব করেন। (এই কথাগুলো যারা আসেন তারা বলেন) এটা খুব সত্যি কথা রেগুলার এক্সারসাইজের মাধ্যমে আমাদের শরীরে পজিটিভ এনার্জির মাত্রা অনেকটাই বেড়ে যায়।
আপনার কাছে সাফল্যের অর্থ কী?
আমার কাছে সাফল্যের অর্থ যেমন নিজে রোজগার করা, তেমনি অন্যের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাটাও আমার সাফল্য এবং আমি মনে করি এটা আমার জীবনের সবথেকে বড় সাফল্য।
আগামী দিনে জিমটিকে কোথায় নিয়ে যেতে চান?
আগামী দিনে আমি আমার জিম টিকে আরও বৃহত্তর জায়গায় নিয়ে যেতে চাই। আমার জিমের সদস্যরা যেন আরও উন্নত পরিষেবা পায় সেটাই আমার চেষ্টা থাকবে সব সময়।
ম্যারাথন, ট্রেনিং এবং জিম পরিচালনা (ব্যবসায়িক দিক) কতটা চ্যালেঞ্জের?
জিম চালানোটাও অন্য যেকোনও ব্যবসায়ের মতোই। আর এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজেকে ধরে রাখা ও প্রতিষ্ঠা করাটাও ততটাই কঠিন। একদিকে আমার রানিং অন্যদিকে ট্রেনিং, আর পাশাপাশি জিম ম্যানেজ করা— সবটাই আমাকে ব্যালেন্স করে চলতে হয়। আমি বিশ্বাস করি একজন নারীর যদি মনের জোর আর ইচ্ছে থাকে তাহলে সব কাজই সে ব্যালেন্স করে করতে পারে এবং তাতে সফলতা পাওয়াটাও খুব কঠিন নয়।
প্রথম অফিসিয়াল দৌড়ে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
প্রথম অফিশিয়াল দৌড় আমার কাছে অনেকটাই উত্তেজনাময় ছিল এবং তার অভিজ্ঞতাটাও ছিল আলাদা। সেটায় আমাকে কাদামাটি, জঙ্গল, কংক্রিট সবকিছুর উপর দিয়ে দৌড়াতে হয়েছিল।
একাধিক পোডিয়াম ফিনিশ আপনাকে কতটা আত্মবিশ্বাস দিয়েছে? এবং আর কোন বিষয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন?
আমি আমার প্রথম অফিশিয়াল দৌড়েই পোডিয়াম ফিনিশ করতে পেরেছিলাম। যা আমার আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে দেয় এবং এরপর থেকে একের পর এক অফিসিয়াল দৌড়ে বয়স ভিত্তিক পোডিয়াম ফিনিশ অর্জন করতে পেরেছি আর প্রতিবারই আমার আত্মবিশ্বাস বেড়েই গেছে।
আপনি একবার Hyrox -এর কথা বলছিলেন। শব্দটা আমার কাছে নতুন। বিষয়টা যদি বুঝিয়ে বলেন।
Hyrox হল এক ধরনের ইনডোর ফিটনেস প্রতিযোগিতা, যেখানে দৌড়ের সঙ্গে বিভিন্ন functional fitness exercise মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট ফরম্যাটে প্রতিযোগিতা হয়।
সহজ করে বললে— দৌড় + শক্তি + সহনশক্তি + গতি— এই চারটির পরীক্ষা।
Hyrox-এ অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত কেন? এই প্রতিযোগিতাকে অন্যগুলোর থেকে কি আলাদা মনে হয়েছে?
সম্ভবত ২০২৫ সালের মে মাসে ইন্ডিয়াতে (মুম্বাই) অফিসিয়ালি Hyrox প্রথমবার অনুষ্ঠিত হয়। আর ঠিক তখনই সোশ্যাল মিডিয়াতে Hyrox নিয়ে বিভিন্ন রিলস্, ভিডিও আসতে শুরু করল। সেগুলো দেখার পর থেকে নিজের মনে একটা উত্তেজনা অনুভব করছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল যে আমি যেহেতু রানিং এবং স্ট্রেংথ ট্রেনিং দুটোর সঙ্গেই যুক্ত তাই আমিও হয়তো এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারি। আর এই প্রতিযোগিতাকে অন্যদের থেকে একটু আলাদা মনে হয়েছে। এতে রানিং এবং স্ট্রেংথ দুটোকেই একসঙ্গে যুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে অর্থাৎ এখানে যে কোনও ব্যক্তিরই endurance এবং strength দুটোরই টেস্ট দিতে হচ্ছে। এতে আটটি বাধা টপকাতে হয়। এটাকে Hyrox Station বলা হয়।
Hyrox-এর আটটি স্টেশনের মধ্যে কোনটি আপনার কাছে সবচেয়ে কঠিন লেগেছে এবং কেন?
বলতে গেলে Hyrox-এর সবকটা স্টেশনই কঠিন। তাও এর মধ্যে থেকে যদি বলতে হয় তাহলে আমার কাছে দুটোবেশ কঠিন ছিল। ভেঙে বলি, ৭৮ কেজি ওজন ৫০ মিটার টেনে নিয়ে যেতে হয় এবং ৬ কেজি ওজনের একটি বল নিয়ে মোট ১০০ বার একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় দেওয়ালে লক্ষ্যচিহ্নে ছুঁয়ে বলটি ফিরে এলে ধরে আবার squat করতে হবে। এভাবে ১০০টি সম্পূর্ণ repetition করতে হবে। কঠিন কেন বলছি— আমার নিজস্ব ওজনের থেকে অনেকটাই বেশি ওজন ৫০ মিটার টেনে আনা তাও একটা নিজস্ব গণ্ডির ভেতরে থেকে, আর সব থেকে শেষ স্টেশন হল wall ball, যাতে ৬ কেজির একটা বলকে হাতে নিয়ে প্রতিবার স্কোয়াট পজিশনে গিয়ে এরপর ১০ ফুট উচ্চতার একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে।
প্রতিযোগিতার সময় এমন কোনও মুহূর্ত এসেছিল, যখন মনে হয়েছিল আর পারব না?
এই প্রতিযোগিতায় ছিল ৮ কিলোমিটার রান আর ৮টা স্টেশন কমপ্লিট করা। প্রতিযোগিতা যত শেষের দিকে এগোতে থাকে ততই শরীর ক্লান্ত হয়ে আসছিল। কিন্তু পারব না মনে হয়নি, মনের মধ্যে এই জোরটুকু ছিল যে পারতে আমাকে হবেই।
প্রথমবার অংশ নিয়েই নিজের বয়সভিত্তিক বিভাগে দ্বিতীয় হওয়ার অনুভূতি কেমন?
যেহেতু Hyrox finish করাটাই অনেক বড় চ্যালেঞ্জ, সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রথমবার অংশগ্রহণ করে পোডিয়াম ফিনিশ করা সেটা যে কত আনন্দের ও গর্বের তা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। সে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা
এই সাফল্যের পেছনে আপনার ট্রেনিং, রুটিন কেমন ছিল?
সাফল্যের পেছনে আমাকে প্রায় তিন মাস অনেকটাই কঠিন অনুশীলন করতে হয়েছে… আমি নিয়মিতভাবে রোজ Hyrox based যে ট্রেনিং সেন্টার সেখানে গেছি এবং আমার coach যেভাবে instructions দিয়েছেন সেটা যথাযথভাবে পালন করেছি। ট্রেনিং, ডায়েট সবটাই ট্রেনারের নির্দেশ মতো পালন করেছি।
খাদ্যাভ্যাস, ঘুম ও মানসিক প্রস্তুতিকে কতটা গুরুত্ব দেন?
যেকোনও স্পোর্টসেই খাদ্যাভ্যাস, ঘুম ও মানসিক প্রস্তুতি এই তিনটি জিনিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমার রানিং-ই হোক, বা বক্সিং-ই হোক অথবা এই Hyrox-এ অংশগ্রহণ করাই হোক সব কিছুতেই আমাদের একটা balanced diet মেনে চলতে হয়.. যেখানে কার্ব, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন সবকিছুই নির্দিষ্ট পরিমাণ মতো বজায় থাকবে..ঘুম হচ্ছে সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ.. কমপক্ষে ৭/৮ ঘুমোতে হবে… এরপর আসছে মানসিক প্রস্তুতি… যে কোনও কম্পিটিশনে নামার আগেই সবার আগে আমাদের মানসিক প্রস্তুতি নিতে হয়… এই Hyrox-এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আগে আমার মানসিক প্রস্তুতি এটাই ছিল যে, যে কোনও পরিস্থিতিতেই আমি পিছিয়ে আসব না। আর মনে মনে এটারও প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম যে আমি চেষ্টা করব পোডিয়াম ফিনিশ করার। আর এই মানসিক শক্তিটাই আমাকে অনেকটা সাহায্য করেছে।
একজন মা হিসেবে সংসার, পরিবার ও অনুশীলনের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখেন?
একজন মা একজন স্ত্রী হিসেবে পরিবারের প্রতি কর্তব্য অবশ্যই সবার আগে। আর যেহেতু রানিং, বক্সিং ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া আমার স্বপ্ন তাই সেগুলোকে পূর্ণতা দেওয়াও আমার দায়িত্ব। আমি নিজের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার একটা রুটিন বানিয়ে সেটাকে মেনে চলার চেষ্টা করি। আমি মনে করি ইচ্ছে করলে যে কোনও মহিলাই সবকিছু করতে পারে।
পরিবার, বিশেষ করে সন্তান আপনাকে কীভাবে অনুপ্রাণিত করেছে?
অনুপ্রেরণা যদি বলতে হয় সেটা আমি সবথেকে বেশি পেয়েছি আমার ছেলের কাছ থেকে.. আমার এই ফিটনেস জগতে আসার কারণই হচ্ছে আমার ছেলে.. আমি যেহেতু এই ফিটনেস সম্পর্কিত বিভিন্ন এক্টিভিটিস গুলো ভালবাসতাম তাই শুরুর দিকে আমার ছেলে এক প্রকার জোর করেই আমাকে এই জগতটার সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিল…
তাছাড়া আমার স্বামী, আমার পরিবার সবাই খুবই সাপোর্টিভ.. কোনও কাজে আমাকে কোনওদিন বাধা দেয়নি.. আমি কিছুতে সফল হলে ওরা আমার থেকেও অনেক বেশি আনন্দিত হয়।
অনেকের ধারণা, নির্দিষ্ট বয়সের পর নতুন করে ফিটনেস যাত্রা শুরু করা কঠিন। আপনি কী বলবেন?
নির্দিষ্ট বয়সের পর ফিটনেস যাত্রা শুরু করা কঠিন— এটা অন্তত আমি বিশ্বাস করিনা। কোনও কিছু শেখার জন্য বয়স কখনওই বাধা হতে পারে না। আমাদের রানিং সার্কেলে ৬০ থেকে ৮০ বছর বয়সের ১৩/১৪ জন আসেন এবং তাদের বেশিরভাগই এই রানিং-এর জগতে এসেছেন চাকরি জীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর…ওরা বিভিন্ন ম্যারাথনে অংশগ্রহণ করে যাচ্ছেন… তাছাড়া এবার আমি দিল্লি hyrox-এ দেখেছি ৭২ বছর বয়সের একজন মহিলা অংশগ্রহণ করেছিলেন।
নারী হিসেবে এই ধরনের এন্ডিউরেন্স স্পোর্টসে কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে?
নারী হিসাবে এই ধরনের এন্ডিউরেন্স স্পোর্টসে আমি আলাদাভাবে কোনও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হইনি। এখনও অবধি চ্যালেঞ্জটা নিজের সঙ্গে নিজেরই থাকে যে আমাকে পারতেই হবে।
আপনার জীবনে ‘সহনশীলতা’ (Endurance) বলতে কী বোঝায়— শুধু শরীরের, নাকি মনেরও?
সহনশীলতা নিয়ে যদি বলতে হয় তাহলে বলব শরীরের আগে মনের সহনশীলতার প্রয়োজন.. মানসিকভাবে আমরা যতটা স্থির থাকব ততটাই সুন্দরভাবে যেকোনও চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে পারব… সে আমাদের দৈনন্দিন সংসার জীবন হোক বা ক্রীড়াজগত হোক বা কর্মজগতই হোক…। আমাদের যখন বক্সিং প্র্যাকটিস করানো হয় তখন প্রথম দশ মিনিট মানসিক স্থিরতা আনার চেষ্টা করতে বলা হয়।
লাদাখ ম্যারাথনের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন?
লাদাখ ম্যারাথন-এর প্রস্তুতি হিসাবে কঠিন অনুশীলন.. আমার রানিং কোচ যেভাবে প্ল্যান দিয়েছেন সেটাই অনুসরণ করছি.. সপ্তাহে দুদিন হিল রান করছি (১৫/২০/২৫/৩০ কিমি).. তাছাড়া বাকি দিনগুলোতেও এমনই ১৫/২০/২৫/৩০ কিমি করে রান প্র্যাকটিস করতে হয়েছে কোনওদিন easy run, কোনওদিন interval run, আবার কোনওদিন tempo run সঙ্গে চলছে full body strength training।
ভবিষ্যতে আর কোনও বড় লক্ষ্য বা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চান?
আমি আগামী দু’বছরের মধ্যে দেশে বিদেশে কিছু ম্যারাথনে ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে চাই।
যারা ৩০, ৪০ বা ৫০ বছর বয়সে নতুন করে ফিটনেস শুরু করতে চান, তাঁদের জন্য আপনার বার্তা কী?
যারা এখনও কোনও প্রকার ফিটনেস এক্টিভিটির সঙ্গে যুক্ত নন আমি তাদের উদ্দেশ্যে এটাই বলব যে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য সুষম খাদ্য এবং পর্যাপ্ত ঘুমের পরেই সব থেকে প্রথম যেটা দরকার সেটা হল শরীরচর্চা। আমাদের মন এবং শরীর দুটোকেই সজীব ও সুস্থ রাখতে শরীরচর্চার কোনও বিকল্প নেই। কাউকে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক অসুস্থতা থেকে অনেকটাই সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে এই শরীরচর্চার অবদান অপরিসীম।