মঙ্গলবার | ২১ এপ্রিল ২০২৬

পুস্তক পর্যালোচনা : সৈকত সুবর্ণ জয়ন্তী পূর্তি সংখ্যা: লিটল ম্যাগাজিন চর্চার ইতিহাসে এক স্পর্ধিত উচ্চারণ

 পুস্তক পর্যালোচনা : সৈকত সুবর্ণ জয়ন্তী পূর্তি সংখ্যা: লিটল ম্যাগাজিন চর্চার ইতিহাসে এক স্পর্ধিত উচ্চারণ

ড. মলয় দেব
ত্রিপুরায় বাংলা লিটল ম্যাগের জয়যাত্রার ইতিহাসে ‘সৈকত’ এক বিস্ময়ভরা নাম। পঞ্চাশ বছরের স্পর্ধিত পথ-পরিক্রমায় ‘সৈকত’ স্বকীয়তায় ভাস্বর। মূলত কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ—এই ত্রয়ীর ত্রিবেণী সঙ্গম ঘটেছে এই পত্রিকার সিকতাময় প্রদেশে। সমাজ-সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে সত্তরের দশকের আরও অনেকের মতো অন্তরের অসীম জিজ্ঞাসাকে, তার্কিক প্রণোদনাকে প্রেমে ও দ্রোহে প্রকাশের আকুলতা থেকেই সম্পাদক মানস পাল এক বালিতটময় প্রদেশের সন্ধান করতে থাকেন। আর এই বীক্ষণ থেকেই ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে আত্মপ্রকাশ করে ‘সৈকত’। সৈকত সুবর্ণ জয়ন্তী পূর্তি সংখ্যা (প্রথমাবধি ২৮তম সংখ্যা) বিশেষ আলোচনা সংখ্যা রূপে ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ জানুয়ারি আগরতলার সুকান্ত একাডেমি সভাগৃহে সুবর্ণ মুহূর্ত উদযাপনের অঙ্গ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়।
উনিশ শতকের সূচনালগ্নে ঔপনিবেশিক শাসকদের হাত ধরে ভারতবর্ষের তৎকালীন রাজধানী কলকাতায় মুদ্রণযন্ত্রের স্থাপনা ও ছাপাখানার প্রতিষ্ঠা বঙ্গীয় জীবন-সংস্কৃতিতে এক বড়ো ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল। এ যেন আজকের সময়ের এ আই-এর মতোই এক বিস্ময়-উদ্রেককারী ঘটনা। মুদ্রণ-সংস্কৃতির বিস্তারের সূত্রে কিছুদিনের মধ্যেই কলকাতার বৃত্তের বাইরে বাংলার মফসসল শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চল থেকেও একাধিক সাময়িক পত্রিকার প্রকাশ ঘটতে থাকে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে চাকলা রোশনাবাদ অর্থাৎ জিলা ত্রিপুরায় সাময়িক পত্রিকার প্রকাশ শুরু হয়। সমতল ত্রিপুরা থেকে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয় ‘ত্রিপুরা জ্ঞান প্রকাশনী’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা। তারপর এই শতকেই একে একে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ‘ত্রিপুরা হিতৈষী’, পাক্ষিক ‘ত্রিপুরা’, মাসিক ‘উষা’ ও ‘হীরা’ এবং সাপ্তাহিক ‘ত্রিপুরা বিকাশ’। সমতল ত্রিপুরার পূর্ব পাকিস্তানভুক্তির পরও ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ‘ত্রিপুরা হিতৈষী’ কমনীয় কুমার সিংহ ও উর্মিলা সিংহের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে। এদিক থেকে উর্মিলা সিংহকে জিলা ত্রিপুরার প্রথম মহিলা সম্পাদক হিসেবে অভিহিত করা যায়। অন্যদিকে পার্বত্য ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় সাময়িক পত্রিকার যাত্রা শুরু হয় ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে, কিশোর সাহিত্য সমাজের মুখপত্র ‘রবি’-র আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে। ধীরে ধীরে আগরতলা ছাড়াও ত্রিপুরার অন্যান্য মফসসল শহর থেকে সাময়িক পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে। ত্রিপুরার সাময়িক পত্রিকা প্রকাশের যথেষ্ট ইতিহাস রয়েছে। এ বিষয়ে দীর্ঘ গৌরচন্দ্রিকার পরিসর এটা নয়।
সাময়িক পত্রিকার সমান্তরালে বঙ্গীয় সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠানবিরোধী ও তীব্র নিরীক্ষাধর্মী ছোট কাগজও বিশ শতকে প্রকাশিত হতে শুরু করে ‘সবুজপত্র’, ‘কল্লোল’, ‘কালি-কলম’, ‘প্রগতি’-র হাত ধরে; হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এর পূর্ণতা। বাংলা লিটল ম্যাগাজিন চর্চার ইতিহাসে বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘পরিচয়’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কৃত্তিবাস’ ব্যতিক্রমধর্মী চিন্তাধারার প্রকাশে অনন্য ভূমিকা পালন করেছে। আকারে ছোট হলেও চরিত্রে বটবৃক্ষসম এই পত্রিকাগুলি প্রতিষ্ঠানের আলোকিত শ্বেতপাথরের বাইরে অসীম দিগন্তে নতুন সৃষ্টির জেদকে আঁকড়ে ধরে শিল্প-সংস্কৃতির প্রতিবাদী স্বরকে লালন করে, চেতনার বহুস্বরকে, তার্কিক ঐতিহ্যকে পুষ্ট করে। নতুন সম্ভাবনাময় লেখকদের অন্বেষণ ও আত্মপ্রকাশের সাধনভূমি এই ছোট পত্রিকাগুলি। যাঁরা নিরীক্ষাধর্মী চিন্তা, ঋজু মনন, প্রতিস্পর্ধী উচ্চারণে বিশ্বাসী, তাঁদেরই অবাধ বিচরণভূমি এই লিটল ম্যাগাজিন।
ত্রিপুরার সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও সতর্ক প্রহরীর মতো সত্য-শিব-সুন্দরের মশাল জ্বালিয়ে রেখেছেন এক একজন লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক। পীযুষ রাউতের ‘জোনাকী’, স্বপন সেনগুপ্তের ‘নান্দীমুখ’, নিলিপ পোদ্দারের ‘পৌণমী’—লিটল ম্যাগাজিনের অনিবার্য, অপ্রতিরোধ্য নিয়তি অনুযায়ী কালগর্ভে হারিয়ে গেলেও এখনো পত্রিকাগুলোর স্ফুলিঙ্গ অন্তরে বিলিক জ্বালে। আবার সাম্প্রতিক অতীতে এই ভূগোলের অন্যতম লিটল ম্যাগাজিন রামেশ্বর ভট্টাচার্যের ‘পূর্বমেঘ’ সুবর্ণ জয়ন্তী উদ্‌যাপন করেছে এবং আগামীতে বিমলেন্দ্র চক্রবর্তীর ‘ঝিনুক’, রসরাজ নাথের ‘অনার্য’ এই শুভক্ষণকে উদ্‌যাপন করবে। লিটল ম্যাগাজিন না হয়েও ত্রিপুরার সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় ১৯৬২ থেকে ১৯৭৭-৭৮ পর্যন্ত মহারাজা বীরবিক্রম কলেজের মুখপত্র ‘প্রাচী’-র অসাধারণ সব সংখ্যা অসম্ভব এক সাহিত্যিক ভূমিকা পালন করেছে।
এই ধারায় এক ব্যতিক্রমী লিটল ম্যাগাজিন ‘সৈকত’। সম্পাদক মানস পাল অর্ধশতক ধরে জহুরির মতো বালিতট থেকে আগামীর মণি-মুক্তো বিশেষ বীক্ষণে পাঠকের দরবারে হাজির করে চলেছেন। সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি সম্পর্কে তীব্র ও তীক্ষ্ণ সচেতনতা, শিল্পের প্রতি সামাজিক দায় থেকে তাঁর অন্তরে প্রতিনিয়ত যে রক্তক্ষরণ ঘটে, তারই শিল্পিত রূপ ‘সৈকত’-এর এক একটি সংখ্যা। সুবর্ণ জয়ন্তী পূর্তি সংখ্যাও এর ব্যতিক্রম নয়। এই সংখ্যায় ত্রিপুরার সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতে অসামান্য কৃতিত্বের অধিকারী নয়জন সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের সৃজনবিশ্বের একটি সামগ্রিক ছবি অঙ্কনের পাশাপাশি একটি করে গ্রন্থালোচনা ও চলচ্চিত্রবিষয়ক সমালোচনা সন্নিবেশিত হয়েছে। প্রথম নয়টি প্রবন্ধের মধ্যে আটটি প্রবন্ধে বিগত সাতাশ বছরে ত্রিপুরার সাহিত্যাকাশে যেসব নক্ষত্রপতন ঘটেছিল, তার মধ্য থেকে আটজন লেখককে প্রাবন্ধিকেরা বেছে নিয়েছেন। এই তালিকায় প্রথমেই রয়েছেন কথাকার ভীষ্মদেব ভট্টাচার্য। তার আখ্যানবিশ্বে জনমানসের ইতিহাসের দিকটিকে সাবলীল বীক্ষায় পর্যালোচনা করেছেন ড. পরমাশ্রী দাশগুপ্ত। দ্বিতীয় প্রবন্ধে সুস্মিতা দাস কালীপদ চক্রবর্তীর মতো ধীসম্পন্ন লেখকের গল্পভুবনে অন্ত্যজ মানুষের যাপিত জীবনের সুর ও স্বরকে নিজস্ব আঙ্গিকে রূপ দিয়েছেন। মেধাবী পাঠক ও কবি মিলনকান্তি দত্ত মূর্ধন্য কবি প্রদীপবিকাশ রায়ের কবিতার বিষয় ও প্রকরণ নিয়ে মননঋদ্ধ আলোচনা করেছেন। বিস্মৃতপ্রায়, বিরলপ্রজ কথাশিল্পী দীপক দেবের উপন্যাসলোকের বিষয়-চরিত্র ও প্রকরণ-সৌকর্য নিয়ে ঋদ্ধ আলোচনা করেছেন কবি ও সম্পাদক সেলিম মুস্তাফা। বিশিষ্ট সমাজ-ইতিহাসকার বিমান ধর তার লেখায় মানস দেববর্মণের অসম্পূর্ণ উপন্যাস ও গল্পভুবনের বহুস্বরিক দ্যোতনাকে নিজস্ব ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন। মণিপুরি, বাংলা ও ইংরেজি ভাষার বিশিষ্ট লেখক রাজকুমার জিতেন্দ্রজিৎ সিংহের জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন বিশিষ্ট লেখাকর্মী এল. বীরমঙ্গল সিংহ। মিশ্র-সংস্কৃতির বার্তাবাহী বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ধবলকৃষ্ণ দেববর্মণকে ব্যক্তিগত অনুভবের ক্যানভাসে চিত্রিত করেছেন ড. প্রফুরজিৎ সিংহ। সম্রাট কবি শঙ্খপল্লব আদিত্যের কাব্যভুবনে মননশীল বিচরণ করেছেন কবি ও গল্পকার অর্পিতা আচার্য। নবম প্রবন্ধটি লেখা হয়েছে এই সময়ের বিশিষ্ট কথাকার দুলাল ঘোষের কথাবিশ্বের বিষয় ও শিল্প-সৌকর্য নিয়ে। লিখেছেন কবি ও গল্পকার কিশোর রঞ্জন দে। সমর চক্রবর্তীর ‘লোকসংস্কৃতি ও লোকপার্বণ’ গ্রন্থের নিরাসক্ত আলোচনা করেছেন ফুলন ভট্টাচার্য এবং চলচ্চিত্রের সাংগীতিক দিক সম্পর্কে মননঋদ্ধ আলোচনা করেছেন দীপক চক্রবর্তী।
তাছাড়া নিষ্ঠাবান, পরিশ্রমী সম্পাদক মানস পাল ম্যাগাজিনের পরিশিষ্টে ‘সৈকত’-এর বিগত কয়েকটি সংখ্যার লেখকসূচি ও সৈকত প্রকাশনের বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানের কিছু ছবি সংযোজন করেছেন, যা পাঠকদের বাড়তি পাওনা হিসেবে বিবেচিত হবে। সংখ্যাটির দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ নির্মাণ করেছেন সম্পাদক নিজেই। সব মিলিয়ে সৈকতের এই স্পর্ধিত সংখ্যাটি ত্রিপুরার সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় এক অনন্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য। আশা রাখি, সংখ্যাটি সর্বস্তরের পাঠক ও গবেষকদের দ্বারা আদৃত হবে।
সৈকত সুবর্ণ জয়ন্তী পূর্তি সংখ্যা
(প্রথমাবধি সংখ্যা ২৮)
সম্পাদক: মানস পাল
জানুয়ারি ২০২৬: মাঘ ১৪৩২
মূল্য: ২০০ টাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *