সোমবার | ০২ নভেম্বর ২০২৬

৭৯ বছর পরে আবার দেশে ফিরল সেই কলঙ্কের দাগ

 ৭৯ বছর পরে আবার দেশে ফিরল সেই কলঙ্কের দাগ

ভোপাল: কুনোর চিতা খুনে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট সামনে এল। ভারতের মাটিতে জন্মানো মাত্র ১৯ মাস বয়সি ওই পুরুষ চিতাকে গুলি করে যে ‘খুন’ করা হয়েছিল, তা স্পষ্ট করে লেখা রয়েছে ময়নাতদন্তের রিপোর্টে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, সর্বক্ষণ নজরদারির মধ্যে থাকা চিতা কীভাবে চোরাশিকারি বা স্থানীয় কোনও বন্দুকধারীর টার্গেট হলো?
বুধবারই জানা গিয়েছিল, মধ্যপ্রদেশের কুনোর জঙ্গল থেকে বেরিয়ে একটি পুরুষ চিতাকে (কেএনজি ২২) মারাত্মক জখম অবস্থায় শেওপুর টেরিটোরিয়াল ফরেস্ট ডিভিশনের প্রান্তে, মোরেনার পাহাড়পুর এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। পরে জানা যায়, মঙ্গলবার সকালে মনিটরিং টিম যখন জখম চিতাটিকে উদ্ধার করে, তখন তার নড়াচড়ার ক্ষমতাও ছিল না। আর বুধবার চিতাটির মৃত্যুর পরে জানা গেল, তার শরীরে ছররা বন্দুকের পাঁচটি টুকরো বা স্প্লিন্টার এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল, যা চিতাটির স্নায়ুতন্ত্র থেকে মাথার খুলি থেকে শুরু করে শরীরের একাধিক অঙ্গ কার্যত বিকল করে দিয়েছিল।
জখম চিতাটিকে প্রথমে মোরেনা সীমানা থেকে কুনোর পশুচিকিৎসালয়ে আনা হলেও মঙ্গলবার রাতে পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় তাকে জব্বলপুরের নানাজি দেশমুখ ভেটেরিনারি সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হয়নি।
ভেটেরিনারি মেডিক্যাল কলেজের রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রাথমিক চিকিৎসায় এক্স-রে করার পরে চিতাটির শরীরে বেশ কয়েকটি ‘ফরেন বডি’ মেলে। পরে জব্বলপুরে চিতাটির সিটি স্ক্যানের পরেই স্পষ্ট হয়, ওই ‘ফরেন বডি’র জন্যই চিতার ‘মাস্কিউলোস্কেলিটাল সিস্টেম’, নার্ভাস সিস্টেম এবং একাধিক অঙ্গ কাজ করেনি। জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচারের পরে দেখা যায়, ওই ‘ফরেন বডি’ আসলে পাঁচটি স্প্লিন্টার বা ছররার টুকরো, সহজ ভাষায় বললে, বন্দুকের গুলির অংশ। তবে কোন বন্দুক থেকে সেই গুলি চলেছে, তা ছররার ব্যালিস্টিক পরীক্ষার পরেই জানা সম্ভব হবে বলে মধ্যপ্রদেশের বন দফতর জানিয়েছে।
ঘটনার তদন্তে স্টেট টাইগার স্ট্রাইক ফোর্সের পাশাপাশি পুলিশকে নিয়ে স্পেশাল টাস্ক ফোর্স গড়া হয়েছে। চিতা শিকারের তদন্তে সিবিআইয়ের হস্তক্ষেপ চাইছেন আরটিআই কর্মী অজয় দুবে। তাঁর যুক্তি, এর আগেও কুনোর চিতা ল্যান্ডস্কেপে লেপার্ডের চোরাশিকার হয়েছে। সেই ঘটনায় উত্তরপ্রদেশের যোগও ছিল। তার পরেও মধ্যপ্রদেশের বন দফতর সতর্ক হয়নি। কেন্দ্রীয় বন মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী কীর্তিবর্ধন সিংকে ই-মেল করে অজয়ের দাবি, চিতাদের মূল দায়িত্বে থাকা কুনোর শীর্ষ বনাধিকারিকদের সরানো হোক বা সিবিআইকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হোক।
যদিও কুনোর শীর্ষ বনাধিকারিকদের দাবি, চিতাদের গ্রাউন্ড ট্র্যাকিং টিমের কাছে প্রযুক্তিগত সুবিধা থাকলেও তারা ‘আর্মড’ নয়। বনাধিকারিকদের একাংশের দাবি, কুনোর জঙ্গলের বাইরে ঘোরা চিতাদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিটি ট্র্যাকিং টিমের সঙ্গে অন্তত স্থানীয় একজন বন্দুকধারী বনকর্মী থাকুন।
ঘটনাচক্রে ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, ভারতের মাটিতে শেষবার কোনও চিতাকে মারা হয়েছিল স্বাধীনতার বছরে। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে। তদানীন্তন পূর্ব ভারতের ‘প্রিন্সলি স্টেট’ কোরেয়ার (অধুনা ছত্তিশগড়ের কোরেয়া জেলা) মহারাজা রামানুজ প্রতাপ সিংহ দেও সালওয়া এলাকার শালবনে রাতের অন্ধকারে গাড়ির হেডলাইটের আলোয় মাত্র দু’টি বুলেট খরচ করে তিনটি এশিয়াটিক চিতা শিকার করেছিলেন। তার প্রায় ৮০ বছর পরে ফের ভারতের মাটিতে চিতা শিকারের ঘটনা ঘটল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *