বুধবার | ১৩ মে ২০২৬

গল্প : বিকৃত ফাঁদ

 গল্প : বিকৃত ফাঁদ

গণেশ দেবরায়

ঘরে ঢুকেই নিশান চেঁচিয়ে উঠল – ‘আমার মোবাইলের চার্জারটা কোথায়?’ পৃথা তখন ইনডাকশানে বাঁধাকপির পকোড়াগুলো সবে মাত্র তেলে ছেড়েছে, ঝট করে ইন্ডাকশনটা বন্ধ করে ছুটে এলো – ‘এত চিৎকারের কী হলো?’
‘একটা কাজের জিনিস নির্দিষ্ট জায়গায় এসে পাই না, কোথায় যায় এসব?’
‘সেটা তোমার ছেলেকে জিজ্ঞেস করো। তার জন্য এত হৈচৈ!’
নিশান এই কথার উত্তর না দিয়ে ছেলেকে ডাকে – ‘বাবান, বাবান আমার মোবাইল চার্জার কোথায়? পাঁচ বছরের ছেলে বাবান ঝট করে নিজের হাত থেকে বাবাকে দিয়ে দেয়।’
‘এটাও তোমার খেলার জিনিস? ’
বাবান ‘হুঁ’ বলে দাঁড়িয়ে থাকে। নিশান তবুও গজগজ করছে, অবশ্য তাতে বাবানের কিছু যায় বা আসে না। সে এবার বাবার কলমটা টেবিল থেকে নিয়ে পত্রিকার ওপর ছবি আঁকতে থাকে। পকোড়াগুলো ভাজতে ভাজতে পৃথা ভাবতে থাকে আজকাল নিশান বাড়ি এলেই বেশি চিৎকার-চেঁচামেচি করে, কারণে অকারণে হঠাৎ ক্ষেপে ওঠে। এর নেপথ্যে কী কোনো কারণ আছে! নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু সেটা কী?
মানুষের বিচিত্র জীবনে বিবাহিতের অধ্যায় একটা বিশেষ অংশ। যৌবনের শুভারম্ভ বা তারও আগে বিয়ে নিয়ে একটা অসম্ভব কল্পনা এবং আগ্রহ থাকে প্রত্যেক যুবক-যুবতীর। কিন্তু বিয়ের পর সেই উৎসাহ, সেই উদ্দীপনা, সর্বোপরি সব কল্পনা কয়েক বছরের মধ্যেই যেন ধীরে ধীরে অস্তমিত হতে থাকে। তখন যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় তা হলো – দায়িত্ব এবং কর্তব্য। তবে এর মধ্যেও যে ব্যতিক্রম নেই এমনটা নয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় তার চূড়ান্ত ব্যতিক্রম। মান-অভিমান হয় নিজেদের দায়িত্ব-কর্তব্য বা কখনো কখনো চাওয়া-পাওয়া নিয়ে। অবশ্য নিশানের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা। সে অতি সাধারণ তালিকার মানুষদের মতো অতি তুচ্ছ জিনিস নিয়ে ভাবে না। তাহলে তার ভিতরে এখন কী চলছে? যার প্রকাশ ঘটছে তার আচরণে, এটা জানার জন্য পৃথা ব্যাকুল হয়ে উঠছে।
দীর্ঘ প্রায় আট বছর ধরে একই অফিসে চাকরি করছে নিশান। বিয়ের পর পৃথা লক্ষ করছে সব সরকারি কর্মচারীদের মতো নিশানও অফিস বন্ধ থাকলে যেন হাতে স্বর্গ পেয়ে যায়। সারাদিন হৈ-হুল্লোড়, গল্পগুজব, কোথাও বেড়াতে যাওয়া ইত্যাদির মধ্যেই কেটে যেত সময়। কিন্তু ইদানীং নিশান যেন অফিস কামাই করতেই চায় না। বরং বন্ধ থাকলেও বলে ওভারটাইম কাজ করতে হবে, তাই অফিসে যেতে হবে। অফিসে যাওয়ার জন্য হঠাৎ এত উৎসাহ, ছ্য! পৃথার মনে প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে! অবশ্য প্রশ্ন জাগার আরও একটা কারণ – বাড়িতে এলেই নিশানের খিটখিটে মেজাজ যেন বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু তার পেছনে কী রহস্য লুকিয়ে আছে, পৃথার এখন এটা জানা ভীষণ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আসলে নিশান তো কখনো এমন ছিল না, সবসময়ই হাসিখুশিতে থাকত। মনে নানান প্রশ্ন জাগে পৃথার। আজকাল মোবাইল খুললেই বিভিন্ন অদ্ভুত ঘটনা দেখা যায়। পরকীয়া আজকাল এতটাই প্রখর হচ্ছে, যাতে কোনো বাদবিচার থাকছে না। এমনকি সম্পর্ক বা বয়সও যেন কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না এই পরকীয়ার সম্মুখে। তাই পৃথার ভীষণ ভয়, কারণ অফিসে আছে আবার একটা উদ্ভট মহিলা, যেমন গায়ের রং, তেমন বেশভূষা! এই পঞ্চাশোর্ধ্ব মহিলার ড্রেস, পোশাক আর সাজের বাহার দেখলে, মৃতপ্রায় মানুষও হেসে ওঠে! তারপরও সন্দেহের তালিকায় চলে আসে ওই মহিলাই পৃথার কাছে, কারণ নিশান যেমন হ্যান্ডসাম তেমন স্মার্ট। তাই যেকোনো কেউ সহজেই আকৃষ্ট হয়ে পড়ে নিশানের প্রতি। ঐ মহিলা আবার কোনো প্ররোচনায় ফেলেনি তো নিশানকে? পৃথার ভাবনা যেন দিন দিন বেড়েই চলছে বাড়িতে নিশানের অযৌক্তিক আচরণগুলো দেখে। কিন্তু এই ব্যাপারে তো সরাসরি নিশানকে কিছু জিজ্ঞেস করাও যায় না। তাই আড়চোখে নিশান বাড়িতে এলে কড়া নজর রাখে তার ওপর পৃথা। অবশ্য এইভাবে কি আর কিছু বোধগম্য হয় নিশানের সম্পর্কে। সেই জন্যই বাধ্য হয়ে অফিসে নিশানের কলিগ দিগন্তবাবুকে ফোন করে পৃথা। ফোনটা রিসিভ করেই দিগন্তবাবু বলে ওঠে – আরে ম্যাডাম, কেমন আছেন? অনেক দিন পর। তা কী মনে করে?
দিগন্তবাবু সবসময়ই পৃথাকে ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করে। পৃথা মিষ্টি করে হেসে বলে – ‘আসলে নিশানের ফোনে অনেক বার চেষ্টা করলাম, কলটা যাচ্ছে না, তাই বাধ্য হয়ে…’
পৃথার কথা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে দিগন্ত বলে – ‘নিশান এখনও বাড়ি যায়নি? সে তো অনেকক্ষণ হলো বেরিয়েছে।’
‘বেরিয়েছে? কোথায়? কার সঙ্গে?’
‘অফিস শেষ, তাই নিশ্চয়ই বাড়ির উদ্দেশ্যেই বেরিয়েছে। তবে হ্যাঁ, প্রতিদিনের মতো সৌগতর সঙ্গেই বেরিয়েছে।’
‘সৌগত কে? ’
‘আমাদের অফিসের নতুন কলিগ। ওর সঙ্গেই এখন নিশানের বন্ধুত্ব। কেন, সৌগতর কথা আপনাকে বলেনি?’
দিগন্তর প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে গেলে নিজের সংসারের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়ে যাবে, তাই ঝট করে উত্তর দিল – ‘ও সৌগত, হ্যাঁ হ্যাঁ বলেছে বলেছে। ঠিক আছে রাখছি, একদিন আসবেন বাড়িতে’ বলেই ফোনটা কেটে দেয়। আপন মনে ভাবতে থাকে – যাক বাবা, সন্দেহের কিচ্ছু খোঁজ পেলাম না। কিন্তু তাহলে নিশান এমন করে কেন বাড়িতে এলে! আবার অফিস শেষ করেই বা কোথায় গেল তাহলে? সে তো যেতেই পারে, কিন্তু প্রত্যেকদিনই কী এভাবে চলে যায়? কারণ এখন বেশ কিছুদিন যাবৎ তো অফিস থেকে রাত আটটার আগে ফেরে না, জিজ্ঞেস করলেই বলে ওভারটাইম ছিল! আজকের দিনটা দেখা যাক ক’টায় ফেরে? ভাবতে ভাবতেই নিশান ঘরে ঢোকে। পৃথা নিজের মনেই সংকোচ বোধ করে – আসলে সন্দেহ জিনিসটা ভীষণ খারাপ। সন্দেহের বশে দিগন্তকে ফোন করাটা ঠিক হয়নি। আগামীকাল অফিসে গিয়ে যখন জানতে পারবে আমি দিগন্তকে ফোন করেছি, তখন কী ভাববে নিশান। মনের ভাবনাগুলোকে মনে চেপেই চায়ের জল বসায় ইন্ডাকশনে। কারণ নিশান যখনই ঘরে ফিরে তখনই এক কাপ চা চায়। দুই কাপে চা নিয়ে পৃথা প্রবেশ করে। নিশান তখন বাবানের সঙ্গে খাটে বসে খেলছে। পৃথা এসেই চিৎকার করে – ‘একি, এখনো চেঞ্জ করনি! আমি তো চা নিয়ে এলাম।’
‘দাও।’
পৃথা নিশানের হাতে চা দিয়ে নিজের চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে সোফায় গিয়ে বসল। আজ অনেক দিন পর দু’জন একসঙ্গে সন্ধ্যেবেলা চা খাবে। আগে সবসময় নিশান অফিস থেকে ফিরলেই একসঙ্গে চা খেত ওরা। কিন্তু এখন নিশান দেরিতে ফেরার জন্য সেটা সম্ভব হয় না। তাই আজ পৃথার বেশ ভালো লাগছে। চায়ে চুমুক দিয়ে পৃথা প্রশ্ন করল, ‘আজ ওভারটাইম নেই?’
‘না।’
বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে নিশান বলল – ‘একটা কথা বলি পৃথা?’
‘তার জন্য এত ভণিতার কী হলো, বলে ফেল।’
‘আজ রাতে তুমি বাবানকে নিয়ে থাকতে পারবে ঘরে?’
‘কেন, তুমি কোথায় যাবে?’
‘না মানে, আজকে আমাদের অফিস স্টাফদের একটা পার্টি আছে, তাই।’
‘পার্টি কি সারারাত ধরে চলবে?’
‘না না, সারারাত না, কিন্তু যদি দেরি হয়ে যায়? তাই বলছিলাম।’
পৃথা ভাবে – এত বছরে তো কোনোদিন এমন পার্টি শুনিনি! হঠাৎ কী এমন পার্টির পরিকল্পনা হলো! অফিসের সব কলিগ সম্পূর্ণ পরিবার-সহ বছরে একদিন পিকনিকের আয়োজন করা হয়। সেটা প্রতিবছর হয়। কিন্তু এই পার্টিটা কেমন পার্টি?
পৃথাকে চুপ করে থাকতে দেখে নিশান বলল, ‘কী হলো, কিছু বলছো না যে?’
‘ভাবছি কী বলব, এমন কথা তো এই প্রথম শুনলাম তাই।’
উত্তর শুনে ঝট করে উঠে দাঁড়ায় নিশান, ‘ঠিক আছে ঠিক আছে, আসব কিন্তু দেরি হবে।’
‘না এলেও সমস্যা নেই। আমরা বসেই কাটিয়ে দেব।’
পৃথার কথার উত্তর না দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যায় নিশান। পৃথা ভাবতে থাকে এটা কি সত্যি যে ওরা পার্টি করবে? কিন্তু সেটা কী করে জানতে পারব? এখন তো কাউকে ফোন করাও যাবে না, কারণ যদি সত্যিই পার্টি হয় তাহলে তো সবাই এক জায়গায় থাকবে। তাই অপেক্ষা করতে হবে কাল সকালের জন্য।
সত্য কখনো গোপন রাখা যায় না। সত্য ঠিক জলের মতো। জল যেমন আপন পথ আপনি খোঁজে নেয় ঠিক তেমনি সত্যও। ছোট্ট কোনো সুযোগ পেলেই সত্য উদ্ঘাটিত হয় নিজে থেকেই। তাই নিশানের গোপন করা সত্যও ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয়ে যায় পৃথার কাছে। নিশান এক অদ্ভুত নেশায় জড়িয়ে পড়েছে। যে নেশা অন্য সব নেশা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এ নেশা কোনো তামাক বা তরল পদার্থ নয়, নয় কোনো মাদকজাতীয় দ্রব্য! তাহলে কি অন্য কোনো মেয়ে মানুষের প্রতি আকৃষ্ট? মেয়ে মানুষ নয়, তবে নিশান আকৃষ্ট অপর এক পুরুষ মানুষের প্রতি। আর সেই পুরুষ মানুষ হলো সৌগত। সৌগত অবিবাহিত ছেলে। অফিসে জয়েন করার পর থেকেই সে নিশানের পিছনে পড়ে যায়। ধীরে ধীরে একটু একটু করে কী করে যে নিশানকে নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসে, নিশান বুঝতেই পারেনি। কিন্তু এখন সে সৌগতর দাসত্ব এমন ভাবেই গ্রহণ করেছে যে সৌগতর নির্দেশ ছাড়া এক পাও নড়তে চায় না। তাই নিশান এখন নিজের সংসার-স্ত্রী-সন্তান সব ভুলে যাচ্ছে!
যে কোনো নেশাখোরকেই মানুষ সবসময় ঘৃণা করে। সভ্য সমাজ কোনো ধরনের নেশাখোরকেই গ্রহণ করতে চায় না। সেখানে এক ব্যতিক্রমী ও নিম্ন মানসিকতার নেশাখোরকে পৃথা কী করে গ্রহণ করবে! সমস্ত ঘটনা যখন দিগন্তর কাছ থেকে জানতে পারে, তখন সে যেন নিজের কানকেই প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার মনে একটা ঘৃণা সৃষ্টি হয়ে যায় নিশানের প্রতি। সারাদিন শুধু মনের মধ্যে যন্ত্রণাই বাসা বাঁধতে লাগল এই নিয়ে। সেদিন অফিস সেরে রাত প্রায় দশটায় বাড়ি ফেরে নিশান। ঘরে ঢুকতেই নিশানকে প্রশ্ন করে পৃথা, ‘কোথায় ছিলে এতক্ষণ?’
‘ওভারটাইম কাজ ছিল।’
‘কাজটা কি অফিসে, না সৌগতর ঘরে?’
‘মানে!’
‘মানেটা তো তুমি খুব ভালো করেই জানো, কারণ তোমার তো এখন সারাদিনই কাজ থাকে সৌগতর সঙ্গে, তাই না?’
‘তাতে অসুবিধার কী আছে? সৌগত আমার বন্ধু।’
‘এই উদ্ভট নিম্নরুচির বন্ধুটার সঙ্গে মেলামেশা করতে তোমার বিবেকে বাঁধে না? তুমি একজন বিবাহিত পুরুষ, সেটাও কি ভুলে গেছ?’
‘মানে?’
‘তুমি কি ভাবছ, আমি অবুঝ খুকি! যে বন্ধুর সঙ্গে রাত কাটাতে হয়, সে কী ধরনের বন্ধু হতে পারে, সেটা বুঝতে আমার অসুবিধা হয়!’
‘না হয় গেলাম, তাতে তোমার অসুবিধা কোথায়?’
‘ছিঃ নিশান ছিঃ, তুমি এত নিম্নরুচির!’
‘বন্ধুত্ব থাকতেই পারে, তাতে দোষের কী হলো?’
‘বন্ধুত্ব দোষের নয়, তোমাদের সম্পর্কটা দোষের।’
‘তোমার যদি না ভালো লাগে, আমার সঙ্গে থেকো না তুমি, কিন্তু আমাদের সম্পর্ক নিয়ে কোনো কথা বলবে না।’
‘ভালো লাগবে! সত্যি বলতে কী জান — তোমাদের সব গোপন রহস্য জানার পর তোমার সঙ্গে কথা বলতেও আমার ঘৃণা হয়। জাস্ট ঘৃণা।’
কথাগুলো শুনেই ঝট করে উঠে দাঁড়ায় নিশান। সোজা বেরিয়ে যাচ্ছে বাইরে। পৃথা জিজ্ঞাসা করে, ‘এখন কোথায় যাচ্ছ?’
‘আমাকে যেহেতু তোমার ঘৃণা করে, তাহলে এখানে আর থেকে কী করব?’
‘আসল কথাটা বলো যে সৌগতকে ছাড়া তোমার এখন থাকা অসম্ভব!’
‘হ্যাঁ, ধরে নাও তাই।’
‘তাহলে তো তোমার সঙ্গে আমার থাকাও অসম্ভব।’
নিশান এই কথার কোনো উত্তর না দিয়েই বাইক নিয়ে বেরিয়ে যায়। পৃথা চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। বাবান ছুটে এসে মায়ের পা জড়িয়ে ধরে বলে, ‘মা মা, কী হয়েছে তোমার? বাবা বকেছে? তুমি কেঁদো না, বাবা এলে আমি বকে দেব।’ পৃথা এই অবুঝ শিশুকে কী বলবে ভেবে না পেয়ে, ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে আরও জোরে কাঁদতে থাকে। ছেলের সেই এক কথা — ‘আমি বাবাকে বকে দেব।’
এই অবুঝ শিশু কী করে বুঝবে যে বাবা আর আসবে না, বাবা বেরিয়ে গেছে অন্য এক নেশায় আক্রান্ত হয়ে। যে নেশার কারণে আজ নিজের স্ত্রী-সন্তানকেও মনে হয় পর। যে নেশার কারণে নিজের সন্তানকে ছেড়ে দূরে থাকতেও কোনো অসুবিধা হয় না, অসুবিধা হয় না নিজের জীবনসঙ্গীকে ছেড়ে দূরে থাকতে! এই অদ্ভুত বিকৃত নেশার ফলে আজ শত শত পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। যার শিকার হলো পৃথার ছোট্ট সুখের সংসারটি।
এক এক করে দিন যেতে লাগল, কিন্তু নিশান আর ফিরে আসে না। সে এখন এই বাড়ি সম্পূর্ণরূপে ছেড়েই দিয়েছে। পৃথাও আর নিশানের অপেক্ষায় থাকে না, ফোনও করে না। উল্টো তার বিরুদ্ধে ডিভোর্স মামলা ঠুকে দিয়েছে সে।
ভালোবাসা এমন একটা জিনিস, যা কেউ ভাগ করে ভোগ করতে চায় না। প্রিয় ব্যক্তির কাছ থেকে সবাই একাই নিজের ভালোবাসা অধিকার করতে চায়, সেখানে অংশীদার একেবারেই বেমানান। তাই রাগে, ক্ষোভে, ঘৃণায় একটু একটু করে পৃথা দূরে সরে যায় নিশানের কাছ থেকে। ছেলেকে নিয়ে একাই চলতে থাকে পৃথা। প্রথম দিকে আর্থিক টানাপোড়েন থাকলেও ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পর থেকে কোর্টের নির্দেশে নিশানের মাইনের অর্ধেক টাকা দিতে হয় পৃথাকে। পৃথার এখন ভালোভাবেই চলে যায়। এত বছর একাই যুদ্ধ করে ছেলেকে গড়ে তোলে নিজের মতো করে। যদিও এই অল্প বয়সে ছেলেকে নিয়ে একা থাকতে শুরুতে অনেক যন্ত্রণা পোহাতে হয়েছে, তার একাকীত্বের সুযোগ নিয়ে কত জানোয়ারা সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে বারবার, কত প্রলোভন, কত ফাঁদ — সব নস্যাৎ করে দিয়েছে পৃথা। নিজেকে আড়াল করতে শহর ছেড়ে গ্রামে আশ্রয় নিয়ে সেখান থেকেই বাবানকে বড় করে তোলে সে। আজ পঁচিশ বছর পরে বাবান সরকারি চাকরি পেয়ে স্বাবলম্বী।
পৃথিবীতে কোনো মানুষের জীবনই একরকম যায় না। রাতের অন্ধকারের পরই যেমন ভোরের আলো ফুটে ওঠে, তেমনি দিনের আলো ধীরে ধীরে মুছে গিয়ে রাত্রির অন্ধকার প্রকট হতে থাকে। আর রাতে মানুষ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সারাদিনের কাজের হিসাব মিলায়, কিন্তু সব হিসাব কি সঠিকভাবে মেলে? অবশ্যই না! কিছু হিসাব খুব সহজে মিলে গেলেও অনেক হিসাব কিছুতেই যেন মেলে না। নিশানের জীবনে এখন আর কোনো হিসাব মেলে না। সৌগতের সঙ্গে একই অফিসে প্রায় সাত-আট বছর কাজ করেছে। এই সময়টাতে একসঙ্গেই থাকত ওরা। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে নিশান লক্ষ করে সৌগতের এক ভয়ঙ্কর চরিত্র। তার নিশানের মতো বেশ কিছু অন্তরঙ্গ বন্ধু আছে! এটা সৌগতের এক ভয়ঙ্কর জঘন্য নেশা, নতুন নতুন বন্ধু তৈরি করা। আর খুব সহজেই সে অন্য ছেলেদের নিজের আয়ত্তেও নিয়ে আসতে পারে! নিশান সৌগতর এই জঘন্য নেশার কথা যখন উপলব্ধি করে, তখনই সে ক্ষেপে ওঠে। সৌগতর সঙ্গে এ বিষয়ে দীর্ঘ বচসা হয় একরাতে। সৌগত সেদিন পরিষ্কার জানিয়ে দেয়— ‘নিশান, এটা তোমার ভুল ধারণা। আমি শুধু তোমার সঙ্গে সারা জীবন কাটাব, সেটা কি আমি কখনো বলেছি তোমাকে?’
‘মানে কী বলতে চাইছ তুমি, সৌগত!’
‘আমি যা বলতে চাইছি, সেটা তো জলের মতো পরিষ্কার।’
‘আমি তোমার জন্য ঘর-সংসার সব ছেড়ে’
‘মিথ্যে কথা। আমার জন্য নয়, তোমার স্ত্রী তোমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তাই তুমি আমার কাছে আশ্রয় নিয়েছ।’
‘আশ্রয় নিয়েছি!’
‘নিশ্চয়ই। আর তার মানে তো এই নয়, আমাকে তোমার পছন্দ, ইচ্ছা — এই সবকে মান্যতা দিয়ে চলতে হবে! শুনে রাখ নিশান, বিভিন্ন বন্ধুদের সঙ্গে রাত কাটানো আমার হবি।’
‘হবি!’
‘তোমাকে একটু বেশি সময় দিয়েছি, তাই বলে সারাজীবন কাটাতে হবে তোমার সঙ্গে! সেটা তোমার ভুল ধারণা।’
কথাগুলো বলেই সৌগত চলে গেল তার আরেক নতুন বন্ধুর বাড়িতে, এই রাতদুপুরে।
সৌগতর কথা শুনে যেন আকাশ ভেঙে পড়ে মাথায়! এতদিনের স্বপ্ন, আশা সব একমুহূর্তেই ভেঙে গেল! এখন মনে হচ্ছে, সৌগত মস্ত বড় চিটার। কীভাবে মিষ্টি মিষ্টি কথায় নিশানকে বশ করে তার সুন্দর সংসারটা ভেঙে দিল। অথচ সে এখন মুহূর্তেই যেন বদলে গেল। রাতটা কোনো রকমে বিনিদ্র কাটিয়ে দিয়ে পরদিন সৌগত আসার আগেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল নিশান, নতুন ঘরভাড়ার খোঁজে। এই নোংরা মনের সৌগতের সঙ্গে এক ছাদের তলে থাকা অসম্ভব! পৃথা সেদিন সত্য কথাই বলেছিল— ‘তোমায় দেখলে ঘৃণা হয়’। ঘৃণা হওয়াটা খুব স্বাভাবিক, যারা সৌগতর মতো নোংরা মনের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করে, তাদের অবশ্যই ঘৃণা করা দরকার। আজ পৃথার মুখটা ভীষণ মনে পড়ছে। মনে পড়ছে বাবানের মিষ্টি মুখটাও, মোটা গলায় ‘বাবা’ শব্দটা। নিজের ওপর নিজেরই ভীষণ অভিমান হচ্ছে এখন! কী ভুল করেছিল সেদিন নিশানের ফাঁদে পা দিয়ে, সেটা এখন উপলব্ধি করতে পারছে নিশান। সৌগতও কিছুদিনের মধ্যেই বদলি হয়ে চলে যায় অন্যত্র।
মানুষের রূপ কত বিচিত্র হয়, কত রং পরিবর্তন করতে পারে মানুষ মুহূর্তে মুহূর্তে, ভাবলে অবাক হতে হয়। সৃষ্টিকর্তা এত ভিন্ন ভিন্ন মানুষ সৃষ্টি করেছেন এই পৃথিবীতে, একজনের সঙ্গে অন্যজনের কোনো মিল নেই। এত বৈচিত্র্য, এত পার্থক্য সত্ত্বেও কিছু কিছু মানুষের চিন্তাভাবনায় কিছুটা মিল পাওয়া গেলেও প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি মানুষই ভিন্ন। নিশান এখন সম্পূর্ণ একা এই পৃথিবীতে। ক্ষণে ক্ষণে শুধু পৃথা আর বাবানের কথাই মনে পড়ে। তাই চেষ্টা করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার বিভিন্নভাবে। কিন্তু নিশানের সব চেষ্টাই ব্যর্থ করে দিয়েছে পৃথা। বাবান সরকারি চাকরি পেয়ে একবছরেই বেশ সুনাম অর্জন করেছে। নিশান যে অফিসে অবসরের সময় ছিল, সেই অফিসেই কিছুদিন হলো বাবান জয়েন করেছে অফিসার পদে। আজ অফিসে তাকে অভ্যর্থনা জানানো হবে। এই নিয়ে সকল কর্মচারী এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এই অনুষ্ঠানে অফিসের নতুন-পুরনো সব কলিগকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। অনেকেই নিমন্ত্রণ পেয়ে হাজির, হাজির নিশান নিজেও। নিশান একা মানুষ, তাই কেউ নিমন্ত্রণ করলে মিস করতে চায় না। সেখানে নতুন স্যারের নামটা দেখে প্রচণ্ড কৌতূহল হয় নিশানের। অরিত্র চৌধুরী, ঠিক একই নাম বাবানের। অরিত্র নামটা নিশানেরই দেওয়া। কে এই অরিত্র, সেটা তো দেখতে হয়। আবার পদবিও একই! ভাবতে ভাবতে অফিসে প্রবেশ করার সময়ই বিপিনবাবুর সঙ্গে দেখা। সারা জীবনটাই প্রায় কাটিয়ে দিয়েছেন এই অফিসে। বর্তমানে অবসরের সময় চলে এসেছে। নিশানকে দেখেই চিৎকার করে ওঠে— ‘আসুন, আসুন নিশানদা, আপনারই কথা হচ্ছিল।’
‘কী ব্যাপারে আমার কথা?’
‘আমাদের নতুন অফিসার অরিত্র স্যার দেখতে ঠিক আপনার মতো। অর্থাৎ যৌবনে আপনি যেমন ছিলেন, অবিকল সেই রকম। একসঙ্গে দেখলে তখন সবাই ভাবত দুই ভাই।’
বলেই হাসতে থাকে। কিন্তু নিশানের মনের ভেতরটা যেন কেমন করছে। অরিত্রকে দেখার জন্য আগ্রহটা আরও অনেক বেড়ে গেছে।
সমস্ত কলিগরা প্রবেশ করার পর ধীরে ধীরে প্রবেশ করে অরিত্র। নিশান হাঁ করে তাকিয়ে থাকে অরিত্রর দিকে। ছোটবেলায় সবাই বাবানকে দেখলেই বলত, একেবারে বাবার চেহারা পেয়েছে। তাহলে কি এই আমার বাবান! আজ কত বছর পর দেখলাম! ইচ্ছে করছে দৌড়ে গিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বলি, সে আমার বাবান। কিন্তু সেই অধিকার কি আছে? আসলেই কি সে আমার বাবান! সেটা তো এখনো নিশ্চিত হয়নি! নিশান মুগ্ধ হয়ে সম্পূর্ণ অনুষ্ঠান শুধু তাকিয়ে রইল অরিত্রর দিকে। মন দিয়ে শুনল তার বক্তব্য। এত সুন্দরভাবে কথা বলে ও। সত্যিই পৃথাকে ধন্যবাদ দিতে হয়। অনুষ্ঠান শেষ করে অরিত্র গিয়ে ঢুকল নিজের কক্ষে। কিছুক্ষণ পর খাওয়াদাওয়া হবে। নিশানের আর কিছুতেই তর সইছে না। মনে অনেক কৌতূহল, অনেক আশা নিয়ে গিয়ে ঢুকল অরিত্রর কক্ষে।
আপনজনের প্রতি একটা আকর্ষণ সবসময় সবার মনেই থাকে। সেক্ষেত্রে যদি নিজের সন্তান হয়, তাহলে তো তার প্রতি তীব্র একটা স্নেহ, মমতা থেকেই যায়। কারণ সন্তানের জন্য প্রকৃত মা-বাবা সবকিছু ত্যাগ করতে রাজি থাকে, এমনকি মৃত্যুবরণ করতেও পিছপা হয় না। নিশান তাই সব ভুলে অরিত্রর পেছনে দাঁড়িয়ে ডাকল — ‘বাবান।’
অরিত্র মুহূর্তেই চমকে ওঠে। এই নামে তো মা ছাড়া পৃথিবীতে এখন আর কেউ ডাকে না। ছোটবেলায় বাবা ডাকত, সে এখন অতীত। ফিরে তাকিয়ে দেখে একগাল সাদা দাড়ির ফাঁকে সেই হাসি, যে হাসি কোনো পরিচিত মানুষের বলে মনে হচ্ছে। কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘কে আপনি? এই নামে তো আমায় কেবল আমার মা ডাকে! আপনি কী করে এই নাম জানলেন?’
‘বাবান, আমি তোর বাবা। আমাকে চিনতে পারছিস না?’
মুহূর্তের মধ্যেই অরিত্র নিজের বুক, চোখকে শক্ত করে নিয়ে বলে ওঠে, ‘বাবা! কে বাবা! কার বাবা! আমি শুধু পাঁচ বছর থেকে আমার মাকেই জানি, মাকেই চিনি। পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় কাউকে আমি জানতে চাই না।’
‘বাবান, বাবা আমি জানি সেদিন আমি চূড়ান্ত ভুল করেছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস কর, তারপর অনেক চেষ্টা করেছি তোদের কাছে যেতে। কিন্তু পৃথা—’
নিশানকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বাবান বলে ওঠে— ‘যে পিতা-মাতা শুধুমাত্র নিজের স্বার্থ আর সুখভোগের জন্য তার শিশু সন্তানকে বিসর্জন দিতে পারে, তিনি আর যাই হোন, অন্তত ওই সন্তানের মাতা-পিতা হতে পারেন না কোনো মতেই।’
‘বাবান!’
‘ওই নামে আপনি আমাকে ডেকে দুর্বল করবেন না। এই নাম ডাকার অধিকার আপনি অনেক বছর আগেই হারিয়ে ফেলেছেন।’
কথাগুলো বলেই অরিত্র বুকটা চেপে ধীরে ধীরে বসে পড়ে চেয়ারে। নিশান কোনো মতে নিজেকে সামলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে যায় অফিস থেকে। কে একজন পিছন থেকে ডাকল— ‘নিশানদা, কোথায় যাচ্ছেন? খাবার তৈরি।’
‘এক মিনিট, আসছি।’
আর কি খাওয়া চলে এ সময়, ভাবতে ভাবতে এগিয়ে যায় নিশান।
অফিসের একটু সামনেই একটা মন্দির আছে। এই দুপুরে সম্পূর্ণ ফাঁকা মন্দিরে গিয়ে বসে পড়ে নিশান। নিস্তব্ধ নিঝুম মন্দির-লাগোয়া বটগাছে একটা শালিক পাখি তার ছোট্ট ছানাকে খাবার খুঁজে এনে তুলে দিচ্ছে মুখে। ছানাগুলো কিচিরমিচির করে যেন মায়ের কাছে কত আবদার করছে। নিশান সেই দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখের জল মুছতে থাকে বারংবার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *