শুক্রবার | ১৭ এপ্রিল ২০২৬

মিশন ৮৫০ !

 মিশন ৮৫০ !

বিশ্বের সর্ববৃহৎ জনবহুল দেশ ভারতের গণতন্ত্র আজ প্রকৃতঅর্থেই বিশ্বের এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে। কেননা, বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে সংসদের তিন দিনের বিশেষ অধিবেশন। আর এই বিশেষ অধিবেশন ডাকা হয়েছে যে কারণে, তারও সূচনা হয়ে গেলো বৃহস্পতিবার। বিরোধীদের প্রবল আপত্তিতে শেষে ভোটাভুটির পর সংসদে পেশ করা হলো তিনটি বিল। এই বিলগুলি হলো এক, ৩৩ শতাংশ মহিলা সংরক্ষণের জন্য ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল। দুই, লোকসভার সাংসদ সংখ্যা বাড়িয়ে ৮৫০ করার জন্য আসন পুনর্বিন্যাস বিল। তিন, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আইন সংশোধনী বিল। সংসদের তিন দিনের বিশেষ অধিবেশনে এই তিনটি বিল পাস করাতে চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার। তার আগে বৃহস্পতিবার সকালে সংসদের বিশেষ অধিবেশন প্রাক্কালেই দেশবাসীকে এক ঐতিহাসিক বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নারী শক্তির জয়গান গেয়ে তিনি সমাজ মাধ্যমে লেখেন, “আমাদের মা-বোনেদের প্রতি শ্রদ্ধার অর্থ আমাদের দেশের প্রতি শ্রদ্ধা। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে মহিলাদের ভূমিকা কয়েক গুণ শক্তিশালী করতেই তার সরকার নিয়ে আসছে বহুল চর্চিত ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম”।

সংসদের উভয় কক্ষে এই বিলগুলি পাস হলে এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেলে লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে এক ধাক্কায় বেড়ে হবে ৮৫০ আসন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এটি এখন আর নিছক জল্পনা নয়, এবার বাস্তবের পথে মোদি সরকারের ‘মিশন ৮৫০’। সংবাদ সংস্থা সূত্রে খবর, এই ৮৫০ আসনের মধ্যে রাজ্যগুলির জন্য ৮১৫টি এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির জন্য ৩৫টি আসন প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বিল কার্যকর হলে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষিত হবে। অর্থাৎ প্রস্তাবিত ৮৫০ আসনের মধ্যে প্রায় ২৭৩ জন মহিলা সাংসদ সংসদে পা রাখবেন। খবরে আরও প্রকাশ, এই বিশেষ অধিবেশনকে ঐতিহাসিক রূপ দিতে শুধু রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না কেন্দ্র। কেন্দ্রের বিশেষ আমন্ত্রণে সমাজের সর্বস্তরের মহিলারা তাঁদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত হয়ে সংসদ ভবনের ভিজিটরস গ্যালারিতে উপস্থিত থাকছেন। বিজেপির মহিলা সাংসদরাও বিলটির সমর্থনে বিশেষ বক্তব্য রাখবেন বলে খবর।

তবে এই ‘ঐতিহাসিক’ পদক্ষেপের পেছনে রাজনৈতিক চক্রান্ত দেখছে বিরোধী ইন্ডি জোট। তাদের দাবি, ২০২৯ সালের নির্বাচনকে পাখির চোখ করেই সেন্সাস (জনগণনা) ছাড়াই তড়িঘড়ি আসন সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। এনিয়ে সংসদে আবার স্নায়ুর লড়াই শুরু হয়েছে। আগামী লোকসভা ভোটের আগে মহিলা সংরক্ষণ বিল এবং সীমানা পুনর্বিন্যাস নিয়ে রাজনীতির পারদ তুঙ্গে উঠেছে। একদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই বিল পাস করাতে মরিয়া, অন্যদিকে খোদ কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ঘোষণা করে দিয়েছেন, বিরোধী ইন্ডিয়া জোট এই বিলের বিরোধিতাই করবে। কেন এই বিরোধিতা? বিরোধীদের মূল আপত্তির জায়গা হলো ‘ডিলিমিটেশন’ বা সীমানা পুনর্বিন্যাস। খাড়গের অভিযোগ, এই বিল আসলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিরোধীদের দাবি, মহিলাদের অধিকারের আড়ালে বিজেপি আসলে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি করতে চাইছে। আসন বিন্যাসের মাধ্যমে বিরোধী দলগুলোকে কোণঠাসা করার নীল নকশা তৈরি করছে। ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে এই পুনর্বিন্যাস করতে চায় কেন্দ্র। আর এখানেই আপত্তি বিরোধীদের। তাদের মতে, ২০২৬ সালের আগে এই প্রক্রিয়া শুরু করা সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।

এখন সব থেকে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, মোদি কি পারবেন এই বাধা টপকাতে? কেননা, এটি কোনও সাধারণ বিল নয়, এটি সংবিধান সংশোধনী বিল। এই বিল পাস করতে হলে স্রেফ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়, প্রয়োজন হবে দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদের সমর্থন। সেই সংখ্যা কি মোদি সরকারের আছে? এককথায় উত্তর “নেই “। পরিসংখ্যান অনুযায়ী লোকসভার মোট আসন ৫৪৩। বিল পাসের জন্য প্রয়োজন দুই-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ৩৬৪ জন। এনডিএ জোটের শক্তি ২৯৩ জন। ঘাটতি ৭১ জন। লোকসভায় কংগ্রেসের সাংসদ সংখ্যা ৯৮, তৃণমূলের ২৮, সপা ৩৭ ও ডিএমকের ২২ জন। তারা সকলে একজোট হয়ে বিলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে মোদি সরকারের পক্ষে এই ম্যাজিক ফিগারে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। তেমনি রাজ্যসভায় মোট আসন ২৪৫। বিল পাসের জন্য প্রয়োজন দুই-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ১৬৪ জন। এনডিএ জোটের শক্তি ১৪১ জন। ঘাটতি ২৩ জন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, বিল পাস করার জন্য মোদি সরকারকে হয় বড় কোনো বিরোধী দলের সমর্থন পেতে হবে, নতুবা বিরোধীদের একটি অংশকে ভোটদান থেকে বিরত থাকতে হবে। যদি উপস্থিত সদস্য সংখ্যা কমে যায়, তবেই লক্ষ্যপূরণ হতে পারে শাসক শিবিরের।আগামী তিনদিনের বিশেষ অধিবেশনে কি ইতিহাস তৈরি হবে? নাকি বিরোধীদের প্রতিরোধের মুখে থমকে যাবে নারী শক্তির এই ‘মাস্টারস্ট্রোক’? মিশন ৮৫০ কি বাস্তবায়ন হবে? উত্তরের অপেক্ষায় গোটা দেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *