ট্রাম্পের প্রাণভোমরা
ইরান যুদ্ধ দিয়েই কি একমেরু বিশ্বের অধিপতি আমেরিকার প্রভুত্বের অবসান ঘটতে চলেছে?এই ধরনের চিন্তাভাবনা ও কথাবার্তা আজকের ই দুনিয়ায় খুব স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁ ড়িয়েছে। টানা চল্লিশ দিনের যুদ্ধের পর একসময় যুদ্ধবিরতি সামনে এলো। যদিও ইজরায়েল এই যুদ্ধবিরতি মানতে চায়নি। আবার ইজরায়েলকে যুদ্ধবিরতিতে পক্ষভুক্তও করা হয়নি। ফলে ইরানের ওপর হামলা বন্ধ করলেও ইজরায়েল লেবাননের ওপর হামলা হুজ্জতি চালিয়েই আসছিল। এর পরেও সেই সময়ে বিশ্বের অনেক দেশ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল এই ভেবে যে, দুইটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে এক টেবিলে বসতে রাজি হয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আমেরিকা ও ইরানের যুদ্ধবিরতি থেকে স্থায়ীভাবে একটি শান্তি চুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়া যাবে, হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেওয়া হবে।
যদিও প্রথম দফার বৈঠকে সেই রকম কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি তবে যুদ্ধবিরতি বা শান্তিচুক্তিতে আসার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই নমনীয়তা কিন্তু আচমকা আসেনি। প্রকারান্তরে ওয়াশিংটন স্বীকার করেছে ইরান যুদ্ধ এত দীর্ঘ হবে তা ভাবতেই পারেননি তারা। হয়তো ইজরায়েল লবি ট্রাম্পকে ভুল বুঝিয়েছিল কিংবা মুসাদের মতো সংগঠনগুলি বিষয়টি বুঝতেই পারেনি। চল্লিশদিনের যুদ্ধে ইউরোপে, ন্যাটোতে বন্ধুহীন হয়ে পড়া আমেরিকার পক্ষে একা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া আর বুঝি সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে আড়ালে মার্কিন কর্মকর্তারাই পাকিস্তানকে চাপ দিয়েছিলেন ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা করাতে। এই সমঝোতা আরও বেশি দরকার ছিল ট্রাম্পের মানসম্মান রক্ষার জন্য। কারণ ট্রাম্প চরম হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ইরান নতি স্বীকার না করলে সমগ্র সভ্যতাকে ধ্বংস করা হবে। ট্রাম্প জানেন পারমাণবিক বোমার মতো ঘটনা ঘটানো তাঁর পক্ষে আজকের দিনে সম্ভব নয়। অন্তত তাঁর নিজের দেশ তাহলে তাকে ছাড়বে না। দক্ষিণের শক্তিধর চিন, রাশিয়া ছাড়বে কিনা সে কথা অবশ্য পরে আসছে।
এতে বিষয়টি স্পষ্ট যে যুদ্ধবিরতি শক্তির দাপটে আসেনি, বরং নিজের তৈরি সংকট সামলাতে বাধ্য হওয়ার কারণেই এসেছে। প্রথম পর্যায়ের শান্তি বৈঠক সিদ্ধান্তহীন হয়ে যাওয়ার পর ইরান একাধিকবার বলেছে, আমরা তো যুদ্ধবিরতি চাইনি। চেয়েছে আমেরিকা। ওয়াশিংটন কিন্তু এই বক্তব্যের খন্ডন করেনি কখনো। এই কথা ঠিক যে যুদ্ধবিরতি নিয়ে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা খুবই নড়বড়ে ও দুর্বল। ইরান এখনো হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় ট্রাম্প আবার হুমকি দিতে শুরু করেছে এবং হরমুজ প্রণালী অবরোধ করার চেষ্টা করছেন। যদিও তাঁর অবরোধ চলার মধ্যেই চিন, ইরানের জাহাজের চলাচল রয়েছে এই জলপথে। এই ঘটনাগুলি বড় একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ইঙ্গিত দেয় আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্যের যুগ শেষের। নতুন এক বিশ্বব্যবস্থায় যেখানে উঠে আসবে অন্য শক্তি, দক্ষিণ বিশ্বের দেশগুলোর নেতৃত্ব।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে থাকে বারবার। ১৯৫৬ সালে সুয়েজ খাল দখল নিতে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইজরায়েল যৌথভাবে মিসরে হামলা চালিয়েছিল এবং চেয়েছিল প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসেরকে সরাতে। কিন্তু সে উদ্যোগ ব্যর্থ হলে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের পতনের সূচনা ত্বরান্বিত হয়। ইরান যদি নাসেরের পথ অনুসরণ করে, এবং রণকৌশল হিসাবে যুদ্ধ প্রলম্বিত করতে চায় তাহলে একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। নির্বান্ধব ট্রাম্প যেভাবে নিজ দেশের ভেতরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের সম্মুখীন তাতে হরমুজ প্রণালী বুঝি এখন তাঁর প্রাণভোমরা। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি রেশনিং শুরু হয়েছে, খাদ্যের দাম বেড়েছে। জ্বালানি ও সার পাওয়ার প্রতিযোগিতায় উন্নয়নশীল দেশগুলো ধনী দেশগুলোর কাছে হারবে, এটাই স্বাভাবিক। এই ঘটনাগুলি থেকে ক্রমে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে আসলে কার হাতে ভূরাজনৈতিক ক্ষমতা রয়েছে। সেই ক্ষমতা আজ আর জি-সেভেনের হাতে নেই। জি সেভেন সাম্প্রতিক বৈঠকে আমেরিকার হালকা সমালোচনা করেছে। আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে অসামরিক সম্পদ ও ব্যক্তির ওপর হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।
আমেরিকাকে শেষ পর্যন্ত নিজের তৈরি সংকট সামলাতে দক্ষিণের দেশগুলোর সাহায্য নিতে হচ্ছে। একসময় যুদ্ধবিরতির আলোচনা হতো ইউরোপের রাজধানীগুলোয়। এখন ইরান ও আমেরিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক বসছে ইসলামাবাদে। চিনের সঙ্গে কথা বলছেন ট্রাম্প নিজে। যদিও পরিতাপের বিষয় রুশ- ইউক্রেন যুদ্ধের যুদ্ধবিরতি নিয়েও কথা বলেছে নয়াদিল্লি, বরাবর জোট নিরপেক্ষ ও যুদ্ধবিরোধী অবস্থান থেকে দেশটির জন্মলগ্ন থেকেই কথা বলে আসছে সেই নয়াদিল্লি, এই সময়ে কোথাও নেই। যদিও প্রসঙ্গান্তর তবুও এই কথাগুলি এসেই যায় আজকের দুনিয়ায়। হরমুজ প্রণালীতে ইরান কখনোই শত্রু-বান্ধব দেশ ছাড়া অন্য দেশের জাহাজ চলাচল বন্ধ করেনি। ট্রাম্প প্রশাসন বিষয়টি বুঝেছিল বলেই একদিকে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছে, অন্যদিকে গোপনে পাকিস্তানকে দিয়ে সমঝোতা করিয়েছে।
পাকিস্তান এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পেরেছে। তাদের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা চুক্তিও আছে। তবু পাকিস্তান প্রথম থেকেই মার্কিন-ইজরায়েলি হামলার নিন্দা করেছে। তারা চিনকে যুক্ত করেছে, আমেরিকাকে ইজরায়েলের হামলা কমাতে রাজি করিয়েছে এবং সৌদি আরবের ক্ষোভও নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। তারপরও পরিস্থিতি অনিশ্চিত। যুদ্ধবিরতি ভাঙনের মুখে, ইজরায়েল লেবাননে হামলা চালাচ্ছে। হরমুজ প্রণালীতে শত শত জাহাজ আটকে আছে। ট্রাম্পের প্রতিটি বক্তব্যে তেলের দাম আর বাজার ওঠানামা করছে। সবাই ইরান নয়। একটি প্রতিশোধ পরায়ণ কিন্তু দুর্বল হয়ে পড়া শক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি দাঁড়াতে এখনো অনেক দেশ দ্বিধাগ্রস্ত। এর পরেও এই যুদ্ধবিরতি দেখিয়ে দিয়েছে একটি ভিন্ন ভবিষ্যৎ সম্ভব। পশ্চিমী দুনিয়ার পরিবর্তে দক্ষিণের দেশগুলো নিজেরাই সংকট সামলাতে সক্ষম হবে, নিজেদের শর্তে ও স্বার্থে।