ফিচার : চরণ ছুঁয়ে
ময়ূরী মিত্র
১
আমাদের সময় স্কুল রুটিনে দুটো ক্লাস আমায় খুব টানত। প্রথম লাইব্রেরি ক্লাস। দ্বিতীয় হাতের কাজের ক্লাস। লাইব্রেরি ক্লাস নিতেন বাংলার দিদিমণি কণাদি। অপূর্ব সুন্দর মুখ ছিল এই দিদিমণির। হাত ভর্তি করে গল্পের বই বয়ে নিয়ে আসতেন। বই আনার সময় সুন্দর মুখটি তাঁর আড়াল হয়ে যেত! মনে হত, বইগুলো হেঁটে হেঁটে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। এখনই ছুঁতে হবে আমাকে! এই বইগুলো স্কুল লাইব্রেরিতে থাকত। প্রতিটা বই একইভাবে বাঁধানো। বাঁধাইয়ের জন্য বেগুনি ঘেঁষা নীল আর সাদা বরফির কাগজ ব্যবহার করা হতো। ওপর থেকে বইয়ের নাম জানার উপায় নেই। এই যে ওপর থেকে কোনো বইয়ের নাম বোঝা যেত না, এটাই শিশুমনে দারুণ রহস্য তৈরি করত। শক্ত কভার। ওল্টাবার সে কী তাড়া! লাইব্রেরি ক্লাসে পড়ে অর্ধসমাপ্ত বই ফেরত দিয়ে দিতে হতো। পরের অংশ আবার পরের ক্লাসে। আমি বুকমার্ক বানিয়ে ফেলি নিজের তাগিদে। যদিও তখনও জানতাম না সেটাকেই বুকমার্ক বলে। আসলে পরের দিন “সাইলেন্ট রিডিং” মারতে গিয়ে দেখতাম, আগের দিনের পড়া অংশের অন্য মানে হয়ে যাচ্ছে! রিডিংয়ের হেরফেরে যে বাক্যের অর্থ বদলে যায়, এটা তো আর বুঝতাম না। ভাবতাম, এ বাক্য আগের দিন পড়িইনি। এইমাত্র পড়লাম কী! তাহলে আগের দিন ঠিক কোথায় শেষ করেছিলাম পড়া! এই সংশয় থেকে রাফ খাতার পাতা ছিঁড়ে হাতপাখা বানাতে শুরু করলাম। ক্লাস শেষ হওয়ার মুখে হাতপাখাটি রেখে দিতাম, যে পাতায় পড়া শেষ করছি সেখানে। তবে ঠিক কোন বাক্যে পড়া শেষ করেছি, এ ধন্দটা থেকেই যেত। এই সময় আমি স্কুলের এক দিদিমণির অন্তরের কাছাকাছি হই। বলা ভালো, ভূতের মতো তাঁর আশেপাশে রাত্রিদিন ঘুরতে লাগি। তিনি হলেন কল্পনাদি! বড়ো ক্লাসে লজিক পড়ালেও সাহিত্যে তাঁর অবাধ বিচরণ!
— দিদি, আগের দিন বই কোথায় শেষ করেছি বুঝতে পারি না কেন? পড়া বাক্য ফের নতুন লাগে! খুব মুশকিল হচ্ছে দিদিমণি। আপনি প্রতি বাক্যের একটা স্থির অর্থ লিখে দিন। চাঁদের মতো স্থির। হতো না। চাঁদের আলোর মতোই বাক্য, শব্দ আর অর্থ, সব হেরফের হয়ে যেত।
অত্যন্ত মৃদুভাষী শিক্ষক কেবল বলেছিলেন— তুমি পুরোনোকে নতুন ভাবে পড়ো! তাই তোমার খাতায় বাক্য কখনো কম পড়বে না।
— মানে?
— মানে রোজ নতুন উচ্চারণে নতুন গতিতে শুধু পড়ে চল।
সেই হয়তো ভাষার “Suprasegmental Aspect” (fluency, rhythm, pattern, intonation) বোঝার শুরু! এবার কণাদিকে ধরলাম। একদিন লাইব্রেরি ক্লাসে ফিশফিশ করে বললাম— দিদি, একটা পাকামি বই দেবেন?
কণাদি বেজায় ঘাবড়ালেন। তাও গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করলেন— কী বই?
পাকা… পাকা বই। আমি বাবার টেবিলে দেখেছি একটা লোকের বই। লুকোতে গেলাম তো বাবা বললেন, আর একটু পাকা হও। তারপর পড়!
এমনিতেই আমার বিদঘুটে কাজকম্ম দিদিমণিদের ত্রস্ত করে রাখত। তার ওপর পাকা বই চাইতে কণাদি ভাবলেন, ব্লু চাইছি। গুণে তো ঘাটতি ছিল না আমার। তবে বইটি বাবার টেবিলে আছে শুনে খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে বললেন— কোন লেখক দেখতে পেয়েছিস? যদি থাকে, তো সেই লেখকের বই তোকে পড়তে দেব ঠিক!
— নাম তার বনফুল!
দিদি বললেন— আসল নাম বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়। বনফুল ছদ্মনাম!
তীব্র স্বরে বললাম— না, বনফুল ভালো নাম। ওটাই আসল নাম।
— ও না রে…!
— ওগো হ্যাঁ, দিদিমণি। বাবা আমায় ও নামের মানে বলে দিয়েছে!
— আচ্ছা বল, কী মানে?
— বনের ফুলের গন্ধ আছে লোকটার লেখায়। ওর গল্প পড়লে হঠাৎ হঠাৎ সে গন্ধ পাওয়া যায়!
কণাদি শেষ চেষ্টা করলেন— আজ তো তোর জন্য পরশুরাম আনলাম বেছে!
মাথা নেড়ে বললাম— ওটা আমার জন্য ‘বাচ্চা বাচ্চা’ বই! চাই বনফুল!
— বুঝবি কিছু?
— বুঝব না। এমনি পড়ব। বুনো ফুলের গন্ধ পাব! লাইব্রেরির বই লোকে এমনি পড়ে। আমার বাবা মিছে কথা বলে না!
কণাদি বললেন— লাইব্রেরিতে আছে। নাইন-টেনদের জন্য। তুই যদি এবার অঙ্কে পাশ করিস, তোকে পড়তে দেব!
বাংলার দিদিমণি অঙ্ক পাশের শর্ত দেওয়ায় মুষড়ে পড়লাম। নিয়মিত অঙ্কে ফেল করাই ছিল আমার দস্তুর! দস্তুর পাল্টানো কি উচিত! আরও এক-দু’ বছর বনফুলের অপেক্ষায় থাকা শ্রেয় মনে করলাম! কারণ দু’বছরের বেশি একই সিলেবাসের অঙ্কে ফেল করব না, এটা একটা বিশ্বাস ছিল! প্রথম যেদিন বনফুল পড়লাম, সেদিন বুকমার্ক বানিয়েছিলাম কাগজের নৌকো! বনফুলের জঙ্গলে একটি নৌকো চলতেই পারে! ভূ-নৌকোয় বসলে বনফুলের একটানা গন্ধ পাওয়া যায়।
পাড়ার বন্ধু রাধুর সঙ্গে ঝগড়া হয়ে গেল। ও পড়ে হেমেন্দ্রকুমার। আমি বনফুল! রাধু বলল— জয়ন্ত মানিকে রহস্য আছে, বেশ একটা দাঁত কিড়মিড় ব্যাপার আছে। আমাদের পাড়া ক্রাইম পাড়া। এ বই আমার খুব কাজে লাগবে।
নতুন পাড়ার বস্তির গায়ে রাধুদের বসতবাড়ি। দোতলা থেকে বেলগাছিয়া ব্রিজ দেখা যেত। সেখান থেকে আমি আর রাধু দেখতাম, ব্রিজের ওপর দু’ দলের ওয়াগন ব্রেকাররা বোমা ফেলছে। দুমদুম আওয়াজে রাধু সুন্দরী নাচত আর চেঁচাত— ওই দ্যাখ, জয়ন্ত-মানিক বোম খেলছে!
ছোটোকাল শেষ হওয়া মাত্র এইসব বন্ধু হারিয়ে যায়। রাধুকে বলা হয়নি, বনফুলের এক একটি ফুল বোমবিশেষ! তার আবার প্রতি মশলায় হেভিওয়েট রহস্য!
২
তখন এম এ টেম এ পাশ করে গেছি। জমাটি এক প্রেমবিয়ে সেরে বেলগাছিয়া ইন্দ্রবিশ্বাস রোডের কালিকা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ওপরে বিছানা পেতেছি। এখানে একটি এককামরার ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন আমার বর। বাড়িটি আমার ঠাকুরদার সাবেক ভাড়াবাড়ি থেকে ছ’-সাত বাড়ি পরে। এই বাড়ির একটি গৌরবময় ইতিহাস আছে। সেটি বলি। এই বাড়ি ছিল সজনীকান্ত দাসের ‘শনিবারের চিঠি’র অফিস। আমি যখন বিয়ে করে বাড়িটিতে যাই, তখন সজনীকান্ত দাসের ছেলে রঞ্জন দাস বাড়িটির মালিক। লেখকের মেয়ে বলে আমার তো খুব দেমাক ছিল! প্রেম অবস্থায় বরকে প্রায়ই হুমকি দিতাম—
আমাদের বাড়ি শুধু এলোমেলো প্রচুর বই নয়। পৃথিবীর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয়ের বই আছে।
আমার তখনকার মতে ছাত্র ও সাধারণ পাঠক উভয়ের জন্যেই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস আর দর্শন। যুক্তিও ছিল স্বপক্ষে। ইতিহাস ও দর্শন উভয় দিয়ে মানুষ অতীতের মতোই বর্তমানও দেখতে পাবে। আজও আমার কাছে এ দুটো হল মানুষের ঘটমানকে দেখার সেরা বিষয়।
বর অবশ্য এত সহজে এসব মানতে চাইতেন না। ভুরু
কুঁচকেই থাকত….
— ও তাহলে রাজনীতি বিজ্ঞান, এগুলো তোমার মতে বিষয় নয়?
পাত্তা দিতে চাইতাম না। বলতাম— ও দুটোও বিষয়। তবে লাইব্রেরিতে এসব বিষয়ে বই রাখলে জায়গা নষ্ট। বিজ্ঞান ক্লাসে পড়ার বিষয়। দোকানে ও স্কুলের বইয়ের আলমারিতে থাকবে। আর রাজনীতি তো জাস্ট…. এমনিই…. ও জাস্ট আলোচনা করে নেব।
তখন কিন্তু যথেষ্ট ধাড়ি আমি। তবু ছেলেমানুষি ভাবনায় মরতাম। সে হয়তো ইতিহাস ও দর্শনের প্রতি অগাধ প্রেম থেকে। আমাদের যৌবনে, মানুষের প্রেমে পড়লে যেমন তাকে ছাড়ার কথা কল্পনায় আনতে পারতাম না, বিষয়, বিষয়ের গ্রন্থ ও গ্রন্থাগারও তাই। ধরলে ভাই ছাড়া নেই।
বরকে বাড়ির বইগুলো দেখাবার তীব্র নেশা পেয়ে বসল। বারবার বলতে লাগলাম— তুমি যখন বিয়ে করতে যাবে, তখন দেখবে বাবা আর মেজোকাকার ঘরের সব দেওয়ালে ছাদ অব্দি বই দাঁড় করানো আছে। এগুলোকে বিদেশে কী বলে জানো! ওয়াল লাইব্রেরি।
বিদেশে ওয়াল লাইব্রেরি কাকে বলে, আদৌ পৃথিবীর কোনো দেশে লাইব্রেরির এই বিশেষ শ্রেণিটি আছে কিনা, আজও জানি না। সেদিন কিন্তু বাবা-কাকার সারা জীবন ধরে জমানো রাশি রাশি বইয়ের গুরুত্ব বৃদ্ধির জন্য ‘ওয়াল লাইব্রেরি’ নামক টার্মটি সৃষ্টি করে ফেললাম। ওয়াল পত্রিকার মতো ওয়াল লাইব্রেরি। আমার বাবার অবশ্য ‘বই সঞ্চয়’ কথাটায় তীব্র আপত্তি ছিল। বলতেন— অর্জন… অর্জন। বইকে অর্জন করতে হয়। তোমার পড়ার ইচ্ছে সুতীব্র হবে, তবে তো বই আসবে তোমার কাছে। তা নয়, তুমি গোটা কতক বই কিনলে! তারপর তাক সাজালে! তাতে কি লাইব্রেরি হল তোমার? ওকে বলে ডাঁই। বই ডাঁই করে তুমি উঁইকে প্রতিবেশী দিলে। বস্তাবন্দী বইয়ের মতো তাকবন্দী বই।
ওয়াল লাইব্রেরির ধাঁচা আরো এক জায়গায় দেখেছিলাম। তিনি আমার মাস্টারমশাই, নিউ আলিপুর কলেজের ইতিহাসের শিক্ষক অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী। অনিরুদ্ধবাবু ছিলেন আমার বাবার বন্ধু। আমার ইতিহাসে আগ্রহ দেখে বললেন— আমার বাড়িতে ইতিহাসের অনেক বই আছে। যদি সিলেবাসের বাইরের ইতিহাস জানতে চাও, তো একদিন এসে দেখতে পার। যেতে যেতে আর দেওয়াল-ভর্তি বই দেখতে দেখতে আমি তাঁর কাছে পড়তেও শুরু করলাম। এত বই যিনি পড়েন, এত যত্নে এত বৈজ্ঞানিকভাবে যিনি পরের প্রজন্মের জন্যে নিজের বই গুছিয়ে রাখেন, তিনি না জানি কত ভালো মানুষ!
বাস্তবিক চমৎকার মানুষ ছিলেন অনিরুদ্ধবাবু। এত ছাত্রদরদী শিক্ষক কম দেখেছি জীবনে। নির্দ্বিধায় দুর্লভ বই তুলে দিতেন আমাদের হাতে। তখন থেকেই চোখের খুব সমস্যা ছিল স্যারের। দিনের আলোতেও বই খোঁজার সময় তাকগুলোর কাছে বড়ো টেবিল ল্যাম্প জ্বলত। ম্যাগ্নিফাইং গ্লাস দিয়ে বইয়ের নাম দেখতেন। কী জানি! ওই অসহায়ের মতো বই খোঁজা দেখেই হয়তো স্যারকে প্রাণ ঢেলে ভালোবেসেছিলাম। একদিন ইউনিভার্সিটি থেকে স্যারের বাড়ি গিয়েছি। তখনও বিকেল নামেনি। রোদ পালপাড়াফাঁড়ির রাস্তায় চরকি কাটছে। রোদ স্যারের পুরোনো দিনের বাড়ির খাঁজে খাঁজেও। পড়ার ঘরে ঢোকার মুখে ছোটো লাল সিমেন্টের বারান্দা। ইঁটের ফাঁক দিয়ে ঘাস উঁকি মারে। সে ঘাসে আকাশের নীল ছায়া। নাটক করি তো! এত রকম আলো-ছায়া দেখে ঘরে ঢুকেই ফটাফট জানলা বন্ধ করে দিলাম। তারপর ল্যাম্পগুলো জ্বালিয়ে বলে উঠলাম—
স্যার, আপনার ওয়াল লাইব্রেরিকে বই-থিয়েটার বানিয়ে দিলাম। চারদিকে উঁচু উঁচু বইয়ের তাক হল দর্শক। আপনি আর আমি মেঝে-মঞ্চের অ্যাক্টরস। অন্যদিন আমরা বই দেখি। আজ বইগুলো আমাদের দেখছে!
বিড়বিড় করলেন ইতিহাসের প্রবাদপ্রতিম অধ্যাপক…!
— আমরা তাদের খুঁজি কিনা, তারা সেটা দেখছে!
অনিরুদ্ধবাবু শেষবয়সে অন্ধ হয়ে যান। কিন্তু অর্জিত বই যার শক্তি, তাঁর অন্তর্জগত আঁধার করে কার সাধ্য! আমার দৃষ্টিহীন স্যার বাঁধানো খাতায় কাহিনি লেখা শুরু করেন। খাতার পর খাতা। যেদিন তিনি শ্মশানে চলে গেলেন, সেদিনই তাঁর স্ত্রী খাতাগুলো আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। খুলে দেখলাম, লাইনগুলো আঁকাবাঁকা। একটি লাইনের মধ্যে আরেকটা লাইন ঢুকে গেছে। চলে আসার সময় একটি খাতা তাঁর পড়ার ঘরের তাকে রেখে দিলাম। স্যার ও আমার থিয়েটার-লাইব্রেরির আরেকটি দর্শক বাড়ল।
বাবাগো! গ্রন্থাগারের কথা বলতে বলতে গ্রন্থি বেঁধে বেঁধে আমি তো একটা গাছই বানিয়ে ফেললাম! কথা হচ্ছিল, বরকে বই নিয়ে হুমকি আর বরের বাড়ির ‘শনিবারের চিঠি’র সঞ্চয় নিয়ে। বিয়ে হয়ে ঢুকতেই পাল্টা হুমকি এল। বর বললে— এত যে ওয়াল লাইব্রেরি, ওয়াল লাইব্রেরি কর, এ বাড়িতে সজনী দাসের বিশাল সংগ্রহ ছিল, জানো! অত বই জীবনে দেখনি! রঞ্জনদাদা (সজনীবাবুর ছেলে) আমাকে ছেলেবেলায় ওই লাইব্রেরির মধ্যেই খেলা দিত। এবার থেকে কথাটা মাথায় রেখো! তুমি যেমন লাইব্রেরির মধ্যে বড়ো হয়েছ, আমিও তেমনি!
হাসলাম।
— তবে তো তোমার আমার নয়। লাইব্রেরি লাইব্রেরিতে বিয়ে হয়েছে।
ঠোঁটে ঠোঁট চেপে আছি। দুপুর হতেই উঠে গেছি চারতলায়, যেখানে পরবর্তীতে সজনীবাবুর ছেলে থাকতেন। উঠে দেখি, ঘরগুলো বইহীন। নতুন এক মানুষ ঘরে ঘরে নতুন ফার্নিচার সাজাচ্ছেন। নতুন মানুষের কাছে বাড়ি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, এ বউভাতের দিনই শুনেছি। কিন্তু সজনীকান্তের ছেলে চলে যাওয়া মানে ‘শনিবারের চিঠি’র কালাতিহাস ধুলো হয়ে যাবে, এ ভাবিনি।
তুমি যাচ্ছ যাও! কে আটকাচ্ছে! বাবার বইগুলো নিয়ে যাওয়ার কী দরকার! মানুষ আটকানো যায় না। কিন্তু মানুষের জন্যে বই আটকে রাখতে হয়!
বুঝলাম, আমার প্রিয় ইতিহাস বাঁচাতে গেলে একটা, দুটো, তিনটে… ওয়াল লাইব্রেরি চাই বাপু!
৩
বেলগাছিয়া ব্রিজের যে দিকে আমরা থাকতাম, তার উল্টোদিকে ওলাইচণ্ডী কালীবাড়ি। এই কালীবাড়ির নিজস্ব লাইব্রেরি ছিল। নাম—কচিসংসদ। লাইব্রেরিয়ান কালীবাড়িরই ছেলে। জীবনের প্রথম পাবলিক লাইব্রেরি কিন্তু আমার এটি। এখানে একটা কথা বলে রাখি, আমার পাবলিক লাইব্রেরিতে ঘুরে বেড়ানো কিন্তু স্কুলজীবনের একেবারে গোড়ার দিকে। তখন আমি স্কুল লাইব্রেরিরই সংস্পর্শে আসিনি। পাঁচ-ছ’ বছর বয়স। বই বলতে বাংলা বই ‘চাঁদমামা’। কারণ সে বইয়ে মায়ের কোলে আমার মতোই একটা বাচ্চা বসে থাকে আর জানলা দিয়ে বড়ো একটা চাঁদ দেখে। আর ইংরেজি বই বলতে বাবার নিয়ে আসা বিদেশি রূপকথা। এইসব বইয়ে আবার ঝুঁটিওয়ালা মোরগ, ধোঁয়া ওঠা কেক, অনেক বাচ্চা। বইয়ে সাঁটা কাগজের স্ট্রিপ ধরে নাড়ালেই মুরগি-বাচ্চা সব নেচে ওঠে। এমনকি কেকটাও জ্যান্ত হয়ে ফোঁসফোঁস করে। টিনের সুটকেশে এই সব বই ভরে চলে যেতাম ওলাইচণ্ডী বাড়ি। সে বাড়ির মেয়ে মারফি আমার বন্ধু। সে আর আমি গলা জড়াজড়ি করে হোম টাস্ক করি। একজন দিদিমণি আমাদের দুজনকে একসঙ্গে পড়ান। নাম ভুজিদি। ভুজিদির প্রাইজ আর শাস্তি দুটোই খুব অদ্ভুত। অঙ্ক পারলে ডিমসেদ্ধ আর না পারলে আরশোলা। ভুজিদি মারফি আর আমার সামনে দুটো গার্ডার মারা ঠোঙা রাখতেন। একটিতে তাঁর বাড়ি থেকে আনা ডিমসেদ্ধ আর আরেকটিতে আরশোলা। ওটাও বাড়ি থেকেই আনতেন। মারফি অঙ্ক পারত। ডিমসেদ্ধ পেত। আর আমার নাকের ডগায় ঠোঙা ভর্তি আরশোলা ঘুরত। মানে, তারা ঠোঙায় ঘুরত। আমি ফড়ফড় শুনতাম। এতে খুব ভয় পেতাম। ঘরময় দৌড়োতাম। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ওলাইচণ্ডীর বড়ো পুরোহিত ভুরু কোঁচকাতেন। খুব পাকা ছিলাম তো! বুঝে যেতাম, বাচ্চাদের এমন ভয় দেখানো এ মানুষটার পছন্দ নয়। অতএব এ ভালো লোক। তাছাড়া ওলাই মাকে ঘি মাখানো ভাত দিয়ে পুজো করে। সব মিলিয়ে পুরোহিতমশাই তখন আমার খুব বন্ধু। ভুজিদি এলেই ছুটতাম তাঁর কাছে। ভুজিদিকে অস্বীকার করার জন্যে ওঁকেই তখন স্যার বলতে শুরু করেছি।
— ও স্যার। আমি পড়ব না। একদম পড়ব না। বই দেখলেই ভয় করছে। তুমি আমায় ওলাই মায়ের পুজোয় বসিয়ে দাও। আমি পুজো করে, মায়ের থালা থেকে ঘি-ভাত খেয়ে বাড়ি চলে যাব।
এইসব বলার সময় ভয়টাকে কণ্ঠ দিয়ে দুগুণ করে ফেলতাম। গোপন ইচ্ছে, ভুজিদি বকুনি খান।
পুরোহিতমশাই কিন্তু এ বদমাশি খেয়াল করতেন না। বা খেয়াল করলেও আমাকে বুঝতে দিতেন না। নিজের লোক মারফিকে ছেড়ে কেন যে আমাকে বই পড়ানোর জন্য এত উদগ্রীব হতেন, বুঝতাম না। আজ মনে হয়, ওলাইচণ্ডীর এই সেবক শিশুর মন বুঝতে এবং শিশুর শিক্ষা বেগবান রাখায় এক নম্বর ছিলেন। একদিন ঐরকম “উরি বাবা উরি বাবা ও স্যার বইয়ের ভয়… ওগো ওই দেখো ভুজিদি আসছে বই নিয়ে… ভয় ভয়…” এই সব নৌটঙ্গিবাজি করছি, পুরোহিতমশাই বললেন—
তুমি কি কখনো ছবি আঁকা বই দেখেছ? দেখবে দু’-একটা? ছবির বইয়ে ভয় লাগে না।
একদৌড়ে সুটকেশ নিয়ে এলাম। আনতে আনতেই টিনের ঢাকনা গেল খুলে। ওলাইচণ্ডীর দালানে ছড়িয়ে পড়েছে একরাশ চাঁদমামা আর ফেয়ারি টেলস।
চাঁদ আর জুতো-মোজা পরা রাজকন্যাদের ছবিগুলো বেরিয়ে পড়েছে। তার ওপর টুকটাক পা ফেলে খেলছে একটি পোষা ময়ূর। দৃশ্যটি আজও বয়ে বেড়াই।
পুরোহিতমশাই মেয়েদের মতো গালে হাত দিয়ে সুর করে বলছেন—
ওমা! তোমার এত ছবির বই! আমি তো অবাক। তা আমারও কিছু ছবির বই আছে। দেখবে তুমি? ওই দেখো, ওই ঘরে কত বই! যাও না, যাও।
দেখলাম, পুজো ছাড়া অন্য সময় পুরোহিতমশাই যে ঘরটার চৌকাঠে বসে থাকেন, সে ঘরে অনেক বইয়ের আলমারি। এ আলমারি শুধু দেওয়ালের গায়ে নয়। ঘরের মাঝখানেও সার বেঁধে দাঁড়িয়ে। পাল্লা নেই। বইগুলো সব বাইরে থেকে দেখা যায়। দিনের বেলাও টিউব জ্বলে। পুরোনো দিনের টিউবের অল্প আলো আর আলমারির মাঝ দিয়ে দিয়ে সরু সরু রাস্তা আমার চোখে এক অরূপদৃশ্য রচনা করল। কালীবাড়ির সেই পুরোহিত হাত ধরে আমায় নিয়ে গেলেন জীবনের প্রথম লাইব্রেরিতে।
ঘুরছি আর বলছি—
ও স্যার! তোমার তো আরও বই! এত বইয়ের এত ছবি কারা আঁকলে গো! ভগবান-টগবান বোধহয়! চল, চল পাশের গলিতে যাই।
হাত ভর্তি ধুলো। আর সবচেয়ে আশ্চর্য কী জানেন! লাইব্রেরি ঘরের পাশেই বাড়ির মূল উঠোন। সেটি রোদঝকঝকে। সারাদিন সেখানে সেই পোষা ময়ূর। প্রতিযোগিতার প্রতিপক্ষ দুটিকে ভাবুন একবার! একটি প্রাণী, যার দু’-তিনরকম মিশ্রিত রঙ, আর কয়েকটি ছায়াময় নীরব কাগজরাশি। একবার ভাবি! যাই যাই, বইয়ের আলমারির মধ্যকার গলিপথ দিয়ে ছুটতে ছুটতে শেষ বই ছুঁয়ে ফেলি! সঙ্গে সঙ্গেই লোভ জাগে— “আরে, আমি তো ময়ূরী! বই ফেলে তবে ময়ূরের সঙ্গে নাচি!”
কিন্তু ওই যে… ওই যে পুরোহিতমশাই বলেছিলেন… “সব বই ভয় পাওয়ার নয়”—কথাটা মারাত্মক ছাপ ফেলেছিল।
ছবির বই ছেড়ে তখন শব্দরাজিতে ছুটছি। বিভূতিভূষণের লীলা অপুকে বাঁধানো ‘মুকুল’ দেখিয়েছিল। আর আমি একদিন বাঁধানো ‘আনন্দমেলা’ নিয়ে ছুট্টে এসে পুরোহিতমশাইকে বললাম— স্যার, পিচবোর্ডের খোলায় অনেককটা আনন্দমেলা একসঙ্গে! কী আনন্দ! সেদিন আমার নতুন নামকরণ হল— বিবি।
একবার কার্তিক মাসে টিউশনি পড়ে, ওলাইবাড়ি থেকে বেরোচ্ছি, দোরের কাছে পুরোহিতমশাই দাঁড়িয়ে। মাকে বললেন— বৌমা। মন্দিরের ওপর আকাশপ্রদীপ জ্বেলেছি। তুমি খানিকটা এগিয়ে, একটু দূর থেকে বিবিকে দীপটা দেখিও। তখন আমি আরও খানিকটা বড়ো হয়ে গিয়েছি। শব্দবইয়ের সঙ্গে খুব ভাব। প্রায়ই কচি সংসদ থেকে দু’-তিনখানা করে জয়ন্ত-মানিক নিয়ে চলে আসি। মানে বুঝে রিডিং দেওয়ার চেষ্টা করি। পুরোহিতমশাইয়ের এ হেন অদ্ভুত নির্দেশের মানে বুঝলাম না। বড়ো হলে ক্ষুদ্রকে বোঝার ক্ষমতা যে কমে যায় গো! মিচকে হেসে বললাম— স্যার, তুমি কি বোকা বোকা কথা বলো! এটা তো ভগবানের বাড়ি! ভগবানের আবার আলো লাগে নাকি!
বলতে বলতে এগিয়ে গেছি। পিছন থেকে উত্তর এল।
— আলো সব জায়গায় লাগে রে! যেখানে আলো আছে, সেখানে নতুন আলো লাগে। পিছু ফিরে দ্যাখ রে, বিবি! লাইব্রেরির জানলায়ও একটা প্রদীপ বেঁধে দিয়েছি।
— কাল এসে ভালো করে দেখব গো!
হো হো হাসছেন।
— কাল আর প্রদীপটা জ্বালব না। তুই এসে বইঘরের জানলায় দাঁড়াবি। দূর থেকে লোকে বলবে, বোকা লোকটা বিবিদীপ জ্বেলেছে।
৪
ভুল জেনেও পাবলিক লাইব্রেরিকে চিরকাল গল্পের বইয়ের লাইব্রেরি ভেবে এসেছি। এই মিছে ভাবায় সুখ ছিল। গল্প শব্দে আনন্দ ছিল। পড়ছি, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাঙলার ইতিহাস! ভাবছি, রাখালদাসের বাঙলার গল্প পড়ছি! “প্রাচীন মুদ্রা” পড়তে পড়তে গুপ্তধনের গল্পের স্বাদ নিচ্ছি। আসলে বই পড়ার একটা মজা আছে। যতক্ষণ তুমি বই পড়ছ, ততক্ষণ তুমি বইয়ের। পড়া শেষ হলে বই কিন্তু তোমার হয়ে গেল। অর্থাৎ তখন তুমি সে বই কীভাবে গ্রহণ করছ বা তার কী ব্যাখ্যা করছ, সব তোমার সিদ্ধান্ত। পাঠক হিসেবে স্বাধীন মন ও চিন্তাকে গুরুত্ব দিতে শিখেছি কিন্তু পাড়ার লাইব্রেরি থেকেই।
আধুনিক ইতিহাসের ছাত্রী হয়ে কতদিন যে প্রাচীন ইতিহাসের গলি-গলিতে ঘুরেছি! এ বিষয়ে আমি সময়ের কিছু সুবিধা পেয়েছিলাম। আমাদের সময় ছাত্রছাত্রীদের পড়ার ব্যাপারে বিষয় নির্বাচনের এত বাছবিচার ছিল না। এখন যেমন বিশেষ থেকে বিশেষতম বিষয়ের যুগ, তখন কিন্তু তেমন ছিল না। বিশেষ করে, আমরা যারা পাবলিক লাইব্রেরির নেশায় পড়েছিলাম, তারা নানা বিষয় পড়তে চাইতাম। এই নানারকম পড়ার মধ্যে যেমন ব্যক্তিগত গর্ব ও জ্ঞানের বিষয়টি ছিল, ঠিক তেমন করেই নতুনকে পড়ার ইচ্ছেটাও তৈরি হতো। আর ইচ্ছে রোজ রোজ।
১৯৯৭ সালে নাট্যশোধ সংস্থানে রিসার্চ ফেলোর কাজে যোগ দিই এবং ড. পবিত্র সরকারের তত্ত্বাবধানে নাট্যকোষ নির্মাণের কাজও শুরু করি। কিন্তু গোড়া থেকেই এখানের লাইব্রেরির প্রতি আগ্রহ হারাতে থাকি। প্রথম কারণ, পাড়ার পাবলিক লাইব্রেরির পুরোনো বইয়ের গন্ধ তেমন পেতাম না। আর দ্বিতীয়ত, এখানে বইয়ের এক পৃষ্ঠার জেরক্স করাতে দশ টাকা লাগত। কর্তৃপক্ষের যুক্তি, বইগুলো এক্সক্লুসিভ। আমার খালি মনে হতো, লাইব্রেরি কখনো অন্যায্য লাভের ব্যবসা হতে পারে না। আপনারা বলতেই পারেন, পৃথিবীর কোনো ব্যবসাতেই অন্যায্য লাভ কাম্য নয়। কিন্তু বিশ্বাস করুন, লাইব্রেরি বা লাইব্রেরির বইয়ের ক্ষেত্রে আমার উচিত-অনুচিত বা ন্যায্য-অন্যায্য বোধ একেবারে বাঁধনছাড়া হয়ে উঠেছিল। আজও ভাবি, একজন গরিব ছাত্র কীভাবে এত টাকা দিয়ে পাতার পর পাতা জেরক্স করবে! একটি বইয়ের অনেকগুলো পাতা যদি তার গবেষণার জন্য জরুরি হয়, তাহলে সে কতটা অনন্ত ধরে কপি করে যাবে। ওয়াল লাইব্রেরিই বলুন, আর পাবলিক লাইব্রেরিই বলুন, আমার কাছে লাইব্রেরির প্রাথমিক ও শেষ সংজ্ঞা—গরিবের একস্থানে অনেকগুলো দুর্লভ বইয়ের যোগান। পরবর্তীকালে থিয়েটার নিয়ে গবেষণা করলেও আমি কখনো নাট্যশোধ সংস্থানের লাইব্রেরি ব্যবহার করিনি। ব্যবহার করার কথা মনেই আসেনি। গবেষণার চলাকালীন তিনটি লাইব্রেরি আমার খুব পছন্দের ছিল—সাহিত্য পরিষদ, বাগবাজার রিডিং লাইব্রেরি ও বালি সাধারণ পাঠাগার। আর পছন্দের মূল কারণই ছিল, লাইব্রেরিগুলোতে সত্যিকারের দুর্লভ বই ছিল এবং সাধারণ বার্ষিক চাঁদা দিলেই সেগুলো পাওয়া যেত। একটা কথা বলি, লাইব্রেরি নিয়ে আমার যৌবনের সব চিন্তা যে ঠিক এমন নাও হতে পারে। কিন্তু চিন্তাগুলোয় যে শেষ অবধি অন্তরই সত্য হয়ে উঠত, আজ আরও বেশি করে বুঝতে পারি। ঠিক যেমন করে যৌবনে পড়া কোনো বইয়ের ব্যাখ্যা বুড়োবয়সে বদলে যেতে পারে বা বেশি সঠিক মনে হতে পারে!
দ্বিতীয়বার লাইব্রেরির ভুল সংজ্ঞা তৈরি করি রাবেয়ার জন্য। ঘটনাটা বিশদে না বললে বুঝবেন না। বিয়ের সময় আমার ঠাকুরদা গহনার সঙ্গে উপহার দেন যুবক রবীন্দ্রনাথের সামান্য ছেঁড়া একটি ছবি। ছেঁড়া বলে কবির ঔজ্জ্বল্য কিছু কমেনি। তাই হয়তো ছেঁড়াটা নিজেও জোড়িনি, কাউকে জোড়াতেও দিইনি। কেবল একটা পুরোনো ফ্রেমে ছবিটা পুরে নিয়েছিলাম। বরের ভাড়া বাড়ির দেওয়ালে ঝুলতে লাগল আলো-আলো রবির ছিন্ন ছবি। আমার নতুন সংসারে বাসন মাজতে এসে রাবেয়া বিবি তো মুগ্ধ। বাসন মেজে হাজার হাত বুলোয় কবির গালে। জিজ্ঞেস করলে—
ইনি কে? তোমার আত্মীয়? খুব ভালো দেখতে। সাধুর মতো।
মনে মনে বললাম—ইনি সবার আত্মীয়। তোমারও।
আর সহজ করে বোঝাবার জন্য মুখে বললাম—
ইনি হলেন রবীন্দ্রনাথ। শায়েরি করে কথা লেখেন।
রাবেয়া তখন ছেঁড়া ছবির মোহে। চোখ বনবন ঘুরছে কবির যুবক চোখে। বারবার বলতে লাগল—
শায়ের লোক খুব সুন্দর হয়। ওঁর শায়েরির কিতাব অনেক?
—হ্যাঁ হ্যাঁ, অনেক। তুমি দেখবে? মাঠের ওপারে একটা ঘরে বইগুলো রাখা আছে। সব ওঁর বই। তুমি দেখবে তো, চল।
হাঁ ক্রমশ বড়ো হচ্ছে। চোখ ঠিকরে বলল—এ শায়ের এক ঘর বই লিখেছে! বাপ্ রে!
শেষ সিদ্ধান্তে এলাম, যেটাতে অনেকক্ষণ ধরে উপনীত হতে চাইছিলাম।
—বইভরা ঘরটাকে কী বলে জানো, মাসি! বলে লাইব্রেরি।
রাবেয়ার কাছে লাইব্রেরির সংজ্ঞা দাঁড়াল—যে ঘরে ছাদ অব্দি রবীন্দ্রনাথের শায়েরি তাকে লাইব্রেরি বলে।
আমি তখন মাঠের ধারের রাস্তা হেঁটে খেলাতবাবু লেনের একটি পাবলিক লাইব্রেরিতে যাই। এটি ছিল আমার নতুন শ্বশুরবাড়ি ও পুরোনো বাপের বাড়ি—দুই পাড়ারই লাইব্রেরি। ঠাকুরমশাই চলে গিয়েছিলেন আমার বিয়ের আগে। কচি সংসদে আর যেতাম না। কেন যে কচি সংসদ আমার এত অনিচ্ছার হয়ে উঠল, নিজেও কি বুঝেছি ছাই! হয়তো বইপ্রেমী ঈশ্বরপূজারীকে আর দেখতে পাব না বলে। আজ মনে হয়, লাইব্রেরি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠার সঙ্গে বইপ্রেমী সঙ্গীদের একটা যোগ থাকে। একা একা একটা বই উপভোগ করা গেলেও লাইব্রেরির গুণাগুণ ভোগে সঙ্গীসাথীদের ভূমিকা থাকে।
খেলাতবাবু লেনের যে লাইব্রেরিটিতে রাবেয়াকে নিয়ে গেলাম, তার একটা চলতি নাম ছিল—হিমানি বাড়ির লাইব্রেরি। আসলে লাইব্রেরিটির পাশেই ছিল হিমানি স্নোর ফ্যাক্টরি। একটা ছোট্ট সবুজ ঘাসে ঘেরা চত্বর পেরিয়ে লাইব্রেরি। হিমানির গন্ধমাখা ঘাসে হেঁটে যখন লাইব্রেরি ঘরে ঢুকতাম, নাকে ঝাপটা দিত উগ্র ব্লিচিং পাউডার। পোকামাকড়ের উৎপাতে বইঘরের মেঝেতে সারাদিন ব্লিচিং ছড়ানো থাকত। লাইব্রেরিয়ান রবি চক্রবর্তী ছিলেন আমার পিসেমশাই। পিসেমশাই হলেও তাঁকে দাদা ডাকতাম। অনেক পরে বুঝেছি, লাইব্রেরিয়ান অন্যজন। রবিদা আসলে শাটার। কিন্তু নানা দুর্লভ বইয়ের খবর রাখা, পাঠকদের সে খবর দেওয়া—আমার চোখে রবিদাকেই মূল লাইব্রেরিয়ান করে তুলেছিল। রবিদা পিসেমশাই বলে অন্যায্য ফায়দা তুলতে লাগলাম। একসঙ্গে তিন-চারটে বই বগলদাবা করে নিই। এটা শুধু লেন্ডিং লাইব্রেরি ছিল। আমি কিন্তু চেয়ার নিয়ে আলমারির গলিতে লুকিয়ে বসে বই পড়তাম। একদিন ঝুপ করে কোলে একটা বই পড়ল। কভার নেই। লেখকের নাম নেই। শুধু উপন্যাস দুটোর নাম দেখলাম—‘বঙ্গবিজেতা’ ও ‘মাধবীকঙ্কন’। পড়ে আমি তো আত্মহারা! রবিদাকে বললাম—
—অপূর্ব, অপূর্ব। এতদিন বঙ্কিমচন্দ্রের এ উপন্যাস দুটোর নাম কেন যে শুনিনি! বুঝলে রবিদা… বঙ্কিম কিন্তু ঔপন্যাসিক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের থেকেও বড়ো।
রবিদা হাসছেন।
—ও দুটো রমেশচন্দ্র দত্তের লেখা।
—যাহ! পুরো বঙ্কিমী শব্দ! বঙ্কিমের মতোই পরিণতি নির্ধারণ।
রমেশচন্দ্র দত্তকে এতদিন ঐতিহাসিক হিসেবে জেনে এসেছি। তিনি এমন খাঁটি উপন্যাস লিখেছেন!! কী এক মহার্ঘ আবিষ্কারে চোখ জ্বলছে। এতদিন যে রমেশচন্দ্রের উপন্যাস না পড়াটা আমার ব্যর্থতা, সেই ব্যর্থতার কথা কে মনে রাখে তখন!
তখন তো গুগল ছিল না। রবিদার কাছেই প্রথম খবর পেলাম, রমেশ দত্তকে উপন্যাস লিখতে বলেন বঙ্কিমচন্দ্রই। তাই হয়তো তাঁর লেখার সর্বত্র বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের গঠনরীতি ও বিষয়নির্বাচনের প্রভাব। একই ধারার দুই লেখকের তুলনামূলক আলোচনা লাইব্রেরির আড্ডায় যেমন হয়, তেমনটি আর কোথাও নয়। যতদূর মনে পড়ে, ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ভারতউদ্ধার’ এখানেই পড়েছিলাম। তবে অর্ধ পুস্তক—বাকিটা উঁই। ইন্দ্রনাথ ও রমেশচন্দ্র উভয়েই বঙ্কিমচন্দ্রের থেকে নয়-দশ বছর করে ছোটো। তিনজনের মধ্যে সুতো বাঁধার একটা আন্তরিক চেষ্টা করেছিলেন রবিদা। এদিন আলোচনা চলছে। বাইরে বৃষ্টি। একটা ভেজা কালো মুখ উঁকি দিল। দাঁত পানে লাল।
—আমি একটু লাইব্রেরি দেখব। দিদি বলছিল দেখাবে। এখানের সব বই যে লিখল, সে দিদির রিলেটিভ আছে। তার ছবি দিদির দেওয়ালে টাঙানো আছে।
—এই রে! আমার আবোলতাবোল কথাগুলো হুড়মুড়িয়ে বলে চলেছে রাবেয়া। ভিজে পায়ের ছাপ ফেলে ঠিক আমারই মতো ঘুরছে হিমানি লাইব্রেরির আলমারির গলিতে। ছপ ছপ। আমার একটি বন্ধুদীপ।
এরকম আরও একজন শাটারকে জেনেবুঝে লাইব্রেরিয়ান ভেবে এসেছি। ইচ্ছে করেই ভেবেছি, ইচ্ছে করেই লাইব্রেরিয়ানের সম্মান দিয়েছি। তিনি হলেন বাগবাজার রিডিং লাইব্রেরির শিহরণদা। আমি তাঁকে ডাকতাম সরীসৃপদা। তখন পশ্চিমবঙ্গ শিশু কিশোর একাডেমির হয়ে জ্ঞানদানন্দিনী দেবী থেকে শুরু করে আগামী দেড়শো বছরের একটা অ্যান্থলজি বানাবার চেষ্টা করছি। দুই খণ্ডের সংকলন হবে। শিহরণদা এত নাটকের সন্ধান দিলেন, সে বই তিন খণ্ডে পৌঁছল।
এই ক’দিন আগে গিয়েছিলাম একটি স্কুলে থিয়েটার ওয়ার্কশপ করাতে। লাইব্রেরি ঘরে ক্লাস করাচ্ছি। একটি বারো-তেরো বছরের ছেলে নাটক না করে লাইব্রেরির বই পড়ছে। কাছে ডাকলাম—
—নাটক করবি না?
—না। বই পড়ব।
—বই পড়তে ভালো লাগে?
—লাইব্রেরির বই পড়তে ভালো লাগে। স্যাররা ডেস্কের ওপর ছড়িয়ে রাখে। বলে, ইচ্ছেমতো পড়বি। তাই পড়তে ভালো লাগে। তাছাড়া…
কৌতূহল হচ্ছিল খুব। জিজ্ঞেস করলাম—তাছাড়া কী?
—কী আবার! মিড-ডে মিলের ঘণ্টা পড়তে দেরি আছে।
—হ্যাঁ, দেরি। তাতে কী! টিফিনের ঘণ্টা রোজ তো একই সময়ে পড়ে!
—আমি আজ খেয়ে আসিনি। মা সকালে আয়ার কাজে বেরিয়ে গেছে। ভাত করতে পারেনি। তাই আমাকে বই পড়তেই হবে।
—কেন?
ক্ষুধার্ত বলল—খিদে ভুলব।