বুধবার | ২৭ মে ২০২৬

দুদুবতীর গাথা

 দুদুবতীর গাথা

ময়ূরী মিত্র

মায়ের বুকের স্বাদ আমি পাইনি৷ শুনেছি দিল্লিতে আমার জন্মের পরে পরেই মা অসুস্থ হয়ে পড়েন৷ এবং জল জমে আমার মাথা পটল হয়ে যায়৷ জন্মের তিনদিনের মধ্যেই আমি এই কুকাজ সম্পন্ন করি৷ দাদু যৎপরোনাস্তি ব্যস্ত হয়ে আমাকে এবং আমার ততোধিক অকম্মা মাকে দেখাশুনোর জন্য একজন হিমাচলী মাসিকে নিয়োগ করেন৷ মাসি প্রতিরাতে একটি করে মোম পুড়িয়ে পটলে তাপ দিতে থাকেন৷ মোমতাপে পটল ফাটে ফট এবং আমি মানুষের বাচ্চা হই! অর্থাৎ আমার মাথা মানুষের মতো হয়৷ পটল থেকে মানুষ হবার ফাঁকে দু’বেলা আমি হিমাচলী মায়ের দুধ টানি৷ দুধ দিয়ে মাসি আমার মা হয়েছিল৷ এই হল মায়ের পটল মেয়ের প্রথম দুগ্ধপান৷
আটমাসের মাথায় যখন কলকাতায় আসি তখন আমার জিভভর্তি দুধখিদে৷ ফলে যখন তখন মায়ের বুকে মুখ গুঁজে থাকা এবং দুধ খোঁজা৷ না পেয়ে ছোট ছোট আঙুল দিয়ে বুকের বিভিন্ন অংশ টিপে টিপে দেখা৷ জ্বালা সহ্য করতে না পেরে আমার ছেলেমানুষ মা আমায় চিমটি টিমটি কাটতেন কিনা বলতে পারি না৷ পৃথিবী চেনার আগে অব্দি মায়ের আদর বা কামড় কোনোটাই চেনা যায় না৷ মাটির রঙ চোখে লাগলে তবেই গর্ভধারিণী মায়ের মনটি পড়া যায়৷ ভারতীয় দর্শনের এই সত্যটি অবশ্য অনেক পরে জেনেছি।
ফিরে আসি আমার পাঁচ বছরের দুধখিদেতে৷
এইসময় আমার মেজকাকা কুমার আশুতোষ স্কুলের অনাথ দেব লেনস্থ শাখায় ইতিহাস শিক্ষক হন এবং প্রথম মাসে চল্লিশ টাকা মাইনের আদ্দেকের বেশি খরচ করে আমাকে চাবি দেওয়া রেলগাড়ি কিনে দেন৷ মেজকাকা হাতের টাকা নষ্ট করতে খুব ভালোবাসতেন৷ ফলে আমার রেলগাড়ির কামরা সংখ্যা ছিল আট৷ আটটি কামরার গাড়ি পেয়ে কল্পনা বাড়ল ধাঁই! চাবি ঘোরাতাম ….কুঁই কুঁই কুত্তাধ্বনিতে কু ঝিকঝিক দিতাম আর কল্পনা করতাম রেলগাড়ি মেঝে ছাড়িয়ে পরেশনাথ মন্দিরের চূড়ো দিয়ে আকাশে উঠে যাচ্ছে৷ পরেশনাথ তখন বাড়ির কাছে থাকতেন৷ তাঁর মন্দিরের জৈনস্থাপত্য আমার কল্পনার হাত পা গজিয়ে ছাড়ল৷ ডাল মেলে সে এক মস্ত কল্পনাগাছ ৷ ফলে রেলগাড়ি কেনার কয়েকমাসের মধ্যে মাকে প্রশ্ন :
-মা তোমার দুদুর ওই ক্যাডবেরি টিপটা কি দুধের কল? তাহলে চাবি দাও৷ ঘুরিয়ে দুধ বের করি৷ তারপর সুজির পায়েস৷ আমি রেলগাড়ির চাবি ঘুরোতে পারি মা!
চড় এবং দৃশ্য শেষ ৷
ক্রমশই দুধের খিদের সঙ্গে দুধ দিয়ে বানানো নানারকম খাবার খাওয়ার ইচ্ছে বাড়ল৷ ঠাকুরদা আগেই নতুন পাড়ার গোয়ালাবাড়ি থেকে দুধ আনাবার ব্যবস্থা করেছিলেন৷ মলটোভা গুলে পিসিরা সেই দুধকে খয়েরি ও পিঙ্ক বর্ণের মাখামাখি
কোনো তৃতীয় বর্ণে পৌঁছেও দিত৷ কিন্তু আমাকে ধোঁকা দেওয়া গেল না ৷ আমি সে দুধের দিকে গোল
চোখে তাকিয়ে বললাম –
এটা দুধ৷ দুধের খাবার কই! গুঁড়ো গুঁড়ো সেগুলো (সুজি) ভেজে দিলে না তো! খালি দুধের সাদা নষ্ট করে দাও তোমরা! আমি এবার যেখানকার কল থেকে দুধ আসে ওখানে গিয়েই গুঁড়ো মিশিয়ে সুজি খেয়ে আসব৷
ঘিয়ে সুজি ভেজে তাতে পর্যাপ্ত দুধ আর চিনি দিয়ে দুধের পায়েস ছিল আমাদের বাড়ির সিগনেচার ডিস৷ কী প্রিয় যে ছিল এটা৷ চামচ নাড়িয়ে খেতাম৷ শেষের দিকে বাটিতে একটু পড়ে থাকত৷ ঠাণ্ডা হয়ে সেটা সামান্য জমাট হতো৷ এদিক ওদিক তাকিয়ে পাঁচ আঙুলে তুলে খেতাম৷ এক আঙুলে একটু উঠত৷ সহ্য হতো না এই একটু করে খাওয়া৷ সবার মেরে একা খাওয়ার অভ্যেস বোধহয় প্রিয় খাদ্য থেকে শুরু হয়৷ আমারও হয়েছিল৷ তবে আমার সঙ্গে আরো একজন সুজির পায়েস খেত৷ আমার প্রিয় বন্ধু রামকৃষ্ণ৷ কখনো কখনো বন্ধুরটাও খেয়ে নিতাম৷ আমার উৎপাতে পায়েস আর প্রসাদ হতো না কিছুতেই৷ আমার হ্যাংলামো দেখে ছবির রামকৃষ্ণ হাসত৷ তাই দেখে আমি তাকে যা তা বলতাম৷ সুজির পায়েস দখলের ঝগড়ায় ঠাকুর জীবন্ত হতেন তাঁর বান্ধবীর দুই চোখে৷

এক শীতের সন্ধেতে নতুন পাড়ার গোয়ালাবাড়িতে আমার প্রথম পা৷ ইজেরের এক পকেটে চিনি আর এক পকেটে বিশ্বনাথ মুদির পাটালি৷ গরুর কল থেকে দুধ বেরনো মাত্তর দুটোকে মিশিয়ে খেয়ে ফেলব৷ আঁধার গোয়ালের এক পাশে কুপি জ্বলছে৷
মোটা মোটা হাতে গোয়ালা গরুর পেটের তলা দিয়ে কী টানছে! আছছা ওখানে তাহলে কল! চাবিটা তো আমায় দিয়ে দিলেই পারে! নিজের মতো নিয়ে নেব৷ গোয়ালা কি জানেনা আমি চাবি ঘুরিয়ে ট্রেন চালাই!
গোয়ালার বাহু ফুলছে আর নামছে! ইস! কব্জিতে কত্ত ঘাম! আঙুল কী মোটা! গরুর কল কি জোরে জোরে টানছে! অদ্ভুত একটা আওয়াজ উঠছিল!
হাঁফের আওয়াজ! কার! যে টানছে তার নাকি যে দিচ্ছে তার! নাকি এ হাঁফ জীবের যৌথ নেওয়া দেওয়ার শ্বাস! আমার চামড়া তিরতির করে যে! পটল মেয়ের মাথায় দুষ্ট পিশাচ জাগছিল৷
বার কর বার কর!
আরো বার কর!
সব দুধ নিয়ে ওটাকে ছিবড়ে করে দে!
বাতাসে লতপত করুক গরুকল।
দুধের সঙ্গে সঙ্গমধ্বনির যৎসামান্য সম্পর্কটুকু বোঝার শুরু হয়তো সে সন্ধে!

দুগ্ধ পান আর সঙ্গম!
মানব তুই সংখ্যায় বাড়
হু হু করে বাড়
মহীরুহের মতো পুষ্ট হ!
যারা দোহন করে তাদের পিষে মার৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *