সোমবার | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ধৃতি-মান

 ধৃতি-মান

শুভাশিস চৌধুরী

পর্ব-৪

ধৃতি ঘরে ঢুকে মানসকে বসিয়ে রেখে, বাথরুমে গেল। কিছুক্ষনের মধ্যেই সুগন্ধী স্নান সেরে নাইটি প’রে অন্য রূপে বেরিয়ে এল।মানস হাঁ করে তাকিয়ে রইল।এই ধৃতিকে মানস ছুঁতে চায় না, শুধু সামনে বসিয়ে দেখতে চায় আজও।কলিং বেলের আওয়াজে নাইটির উপর হাউস কোট চাপিয়ে ধৃতি জাপানী পুতুলের মতো মেয়েটিকে ঘরে ডেকে নিল।মেয়েটি সামনে রাখা টেবিলে খাবারের প্যাকেটের সঙ্গে ডিস, চামচ, জল সব একসাথে রাখল।এমন সুন্দর করে এতগুলো জিনিস এনে টেবিলে বিছিয়ে দিল,অথচ তাতে কোনো শব্দ হল না।এ যেন একটা আলাদা আর্ট।সব রেখে হাসি মুখে মেয়েটি বেরিয়ে গেল।ধৃতি দরজা বন্ধ করে দিল।

একটু পরে দেখে মানস সদ্য কিনে আনা পাজামা-পাঞ্জাবী পরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল। একপলক অরুণকান্তি মানসের দিকে তাকিয়ে, সেই ভার্সিটির জীবনে ফিরে গেল।হঠাৎ ভাবল, দরজা বন্ধ করেছি তো? তাই পলকে ফিরে দরজার কাছে গিয়ে দেখে নিল।সব ঠিকঠাক।ফিরে দেখে, মানস কোনো কথা না ব’লে, ডিসের উপর প্যাকেটে রাখা পাপড় থেকে একটা তুলে খেতে শুরু করে দিয়েছে।ধৃতি শাসনের সুরে বলল,হাত ধুয়েছিস? মানস টেবিলের উপর ধৃতির রাখা, হ্যান্ড স্যানিটাইজার দেখিয়ে বলল ‘এই যে’! কাছে এসে মানসের হাত থেকে একটু পাপড় নিয়ে মুখে দিল।খেতে খেতে জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখে দূরে দূরে আলো জ্বলছে।

কী রে এখন খাবি না?

ধৃতি জানলার দিকে মুখ করেই বলে,খাবার কি পালিয়ে যাচ্ছে?

তা নয়,তবে শেষে খিদে না পালিয়ে যায়।

ফিরে তাকালো ধৃতি।এবার ওর দৃষ্টি যেন পাল্টে গেল।

কী রে অমন করে তাকিয়ে আছিস যে?

আচ্ছা মান্!তুই কি ওই মহিলার মূর্তিটা দেখলি?

তিনটি মহিলার মূর্তিই তো দেখলাম,রাজমাতা,রাজকন্যা আর শেষে জয়া।

আজও ওদের দুজনের ভাবনার এক অদ্ভুত মিল।

তুই কোনটার কথা বলছিস?ওই যে প্লাজার সামনের মোড়টায় তো?দেখব না কেন?সে তো তুই ও দেখলি,সার্কিট হাউস যাওয়ার আগে প্রদীপ গাড়ি দাঁড় করাল।উনি তো নেতাজীর আদর্শে দেশের জন্য লড়েছিলেন বৃটিশের বিরুদ্ধে।ডিমাসাদের হয়েই তো তাঁর লড়াই।

এত বকিস কেন?আর কিছু লেখা পড়লি না?

হ্যাঁ নামটা তো পড়লাম,বাংলায় বললে,সেঙ্গিয়াজিক জয়া থৌসেন। তাঁর কথা বলছিস তো?

হ্যাঁ।

দেখ, কী সম্মানের সঙ্গে ধারণ করে রেখেছে ডিমাহাসাওয়ের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ। স্কুল পাঠ্য ইতিহাসে কিন্তু এদের নাম নেই।

ধৃতির চোখ ছল ছল।আপন মনে বলেই চলেছে, সব নাম কি আর সাড়া দেশের ইতিহাস বইয়ে থাকবে? তবুও তাঁকে আমার মনে রাখতে হবে।তবে শুনেছি এখানকার কলেজে স্তরে ইতিহাসে তাঁর বীরত্বের কাহিনী পড়ানো হয়।

তুই হঠাৎ উনাকে নিয়ে পড়লি কেন রে?

ওই যে পিতৃ-মাতৃহীন!

তাতে তোর কী,আর তাছাড়া উনি কিন্তু পিতৃ-মাতৃহীন ছিলেন না।উনার মা বাবা ছিলেন।কিন্তু জন্মের কিছু দিন পর দুজনই মারা গেলেন , তাই কাকা-কাকীর কাছে বেড়ে উঠলেন।সবটাই তো ফলকের নীচে লেখা আছে।

তবুও আত্মজন তো কেউ ছিলেন?

তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু তাঁর উনিশ বছরের সংগ্রামের ইতিহাস ছেড়ে জন্ম নিয়ে পড়লি কেন?

আড়ালে চোখ মুছে নিল ধৃতি।আয় খেয়ে নিয়ে তারপর বাকি কথা শুরু করি।

এটা ঠিক।তবে তোর কথাটা কিন্তু হাফ হল।

সে কথাটাই তো মান্ তোকে বলতে-

বল।

না এই রাতে কোনো মন খারাপের কথা তোকে শোনাব না।

দেখ ধৃতি!তোর সঙ্গে কথায় আমি কখনো জিততে পারি নি,তাই তো হেরোর দলেই আছি।

‘সব কথা বলা হল বাকি রয়ে গেল শুধু বলিতে-‘

‘যে কথা মনের কথা–‘আহ্! বেসুরো গাইছিস তো।

আচ্ছা দে দে।খেয়ে নিয়ে সুর লাগাই।

মনে পড়ে ধৃতি সেই রাত্তিরের কথা,সবার একসঙ্গে এক বাসে পুরী যাওয়া।সেই রৈ রৈ এর এডুকেশানাল ট্যুর।চৈতির গান,

শম্ভুর নাচ,

স্যারের ভুরি নিয়ে হাঁটু জলে সাঁতার কাটা–

সকালে, রাত্তিরে দল বেঁধে হোটেলে খাওয়া!

ঘোষাল স্যার ছিলেন বলেই না!

আর ভাব! সেই সমুদ্রস্নানে,চন্দ্রাবলীকে তুই যদি জাপ্টে তুলে না আনতি,তবে তো ও প্রভুর ভোগেই যেত সে দিন।

এইখানেই তো বুদ্ধির সঙ্গে শরীরের জোড়।

আমি যদি বলি,সেদিন তোকে দেখেই ওর জলে নামার লোভ হয়েছিল?

সে কেমন করে?

আমি আর স্নিগ্ধা তো দেখছিলাম,তোকে দেখেই ও ছুট লাগাল।শরীরের কোনো বাঁধন নেই! কী জামা কাপড়ের ছিড়ি,যেন সব বিলিয়ে দিতে চায়।

তোর মনে মনে এত কিছু কাজ করছিল?

করবে না কেন?আমি তো ওর মতো ঢলানী না।ছেলে দেখলেই হামলে পড়া,কী সাংঘাতিক।

তবে তুই আমাকে চিৎকার ক’রে ওকে তুলতে বললি কেন সেদিন?

সে তো আমাদের দায়িত্ব।কিছু একটা হয়ে গেলে তার দায় তো সবার উপর পড়তো বল?

যাক্!অনেক কিছু ভেবেছিলি। তবে শুধু তুলে আনাই নয়,জল থেকে তুলে এনে ওর পেটে চাপ দিয়ে বুকের পাশে চেপে যে পরিমান জল বার করলাম,সে মনে আছে?

তুই যে এতটা বদ না,শরীর খুবলে খাবি না,সে আমার বিশ্বাস আছে।তাই তখন সব দেখেও রাগ করি নি।কারণ আজও মনে আছে,সারারাত বাসে চেপে দুজনে এক সিটে বসে গেলাম,অথচ তোর কোনো বেগরবাই নেই।এই বন্ধুত্বের ভরসাতেই তো তোকে আমি-

বল্ থামলি কেন?

সেই ভরসাতেই তো আজ রাতেও একঘরে তোর সাথে থাকার ভরসা পাই।কী রে আজ রাতটায় সেই ভরসা পাব না ?

তুই না চাইলে কোনোদিন তোর হাতটুকু ছুঁয়েছি?

খাওয়া শেষ হল।ডবল বেডের রুম হলেও দুটো বেড আছে। কাজেই আলাদা হয়ে বিছানায় যাবে,এই স্থির হল।

ধৃতি বলল,তোর সঙ্গে আমার ভার্সিটি ছাড়ার পর কোনো যোগাযোগ কেন হল না?

সে তো তোর ইচ্ছেতেই।

তুই তো মেনে নিলি আমার কথা।মাত্র একবার ফোনে বললাম,তুই আমাকে আর ফোন করলে আমার বিপদ হবে।তারপর আর করলি না!

ফোন স্যুইচ অফ।

আমি কী তোর বিপদ বাড়াতে পারি বল?

তাই বলে, দেখা করতেও গেলি না? সামনাসামনি হলে, কথাটুকু তো বলতে পারতাম।

আমি যাব না তোর খবর নিতে?ভাবতে পারলি?

জে ডি স্যারের আন্ডারে তোর কাজ চলছে,তাই স্যারকে তোর কথা জিজ্ঞেস করতেই বলল,কিছু একটা হয়েছে মেয়েটার! ও কি কাজটা করবে না? ফোনেও পাচ্ছি না,কত দিন হয়ে গেল।একবার ওর বাড়িতে গিয়ে আয় তো।

একদিন গেলাম।বালি স্টেশনে নামতেই তোর কাকার সঙ্গে দেখা।তোর কথা জিজ্ঞেস করতেই বললেন,তোরা লখনৌতে গেছিস।

এরপর হস্টেলে এসে স্যারকে বললাম।

আচ্ছা,তুই একবারও ভাবলি না!আমার কী হবে?আমি কী করে তোকে ছাড়া—একটানা মানস বলে গেল।

আমি জানি তোর ঘর-বাড়ি, মা-বাবা,বোন, আত্মজন সব আছে,কিন্তু সবার মাঝে থেকেও আমি যে একলা,সে কী করে বোঝাই তোকে?

বুকের ভেতর ধৃতির আর্তনাদ যেন শুতে পেল মানস।কোথায় যেন আবার শুনতে পেল ধৃতির একলা বেলার গান ‘–অশ্রু ভরা বেদনা দিকে দিকে জাগে–‘

আজও ধৃতি চাইল না বলে,হাতদুটো ধরতে গিয়েও আটকে গেল মানস।

ধৃতি বলল,আর একটা রাত তো আমরা থাকতেই পারি এই হাফলং ডিমাহাসাও শহরে । কাল না হয় পথে পথে রেখে যাব আমাদের অ-মিলনের কথা। প্রদীপ বলল না,কাল সারাদিন আমাদের নিয়ে ঘুরবে। যা এখন তোর বিছানায়।

দুজন আলাদা আলাদা বিছানায় লজ থেকে দেয়া চাদরের নীচে গেল। ঘুম আসছে না,ওর নিজেরও।ওর আপন-কথা শোনার লোক তো আর কেউ নেই।

ধৃতি শুয়ে শুয়ে কথা বলছে ঠিকই কিন্তু কী যেন বলতে না পারার যন্ত্রণা ওকে কষ্ট দিচ্ছে।ও বুঝতে পারছে ধৃতি একা শুলেও ওর ঘুম আসছে না।

তোর কী ঘুম আসবে ধৃতি?আজ না হয় তোর কপালে হাতটুকু রাখি,যেমন তোর ইচ্ছেতে রেখেছি বিগত বসন্তে। আয় তবে।

মানস ওর কপালে হাত রাখল,চুলে বিলি কেটে দিল যেন পরম মমতায়। এত বছর পর যেন দুই বয়সোত্তীর্ণ যুবক-যুবতী যৌনগন্ধহীন মমতাভরা রাত কাটাল এক সাথে।ডিমাহাসাও সাক্ষী রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *