ধৃতি-মান
শুভাশিস চৌধুরী
পর্ব-২
মানস ধৃতির অলিখিত আদেশে, হাফলং স্টেশনে নামার ব্যাপারে এবার যদি একটুও ভাবার সময় নেয়, তবে যে ওর কপালে দুঃখ আছে,সে তার জানা।কাজেই চুপচাপ সম্মতি দেওয়াই ভদ্দরলোকের কাজ।এটাই করল।ধৃতির ইঙ্গিতপূর্ণ নির্দেশমত, উপর থেকে ট্রলি-স্যুটকেসটা নামিয়ে, মানস ওর পেছন পেছন নেমে পড়ল প্ল্যাটফর্মে।
মানস এবার ধৃতিকে বলল,’আরে!কী হচ্ছে?আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।এখানে আমি কোনোদিন আসি নি,কিচ্ছু চিনি না’।
‘নাম জানিনে গ্রাম জানিনে অদ্ভুতের এক শেষ’ হাসতে হাসতে মানসকে ট্রলি ধরিয়ে ছুট্টে প্ল্যাটফর্মের বাইরে এল ধৃতি। যাত্রীর আশায় দাঁড়িয়ে থাকা অনেকগুলো কার্টিয়ার,ওরা স্থানীয় ভাষায় যা কার্টিজার হয়ে গেছে তারই মধ্যে, একটার ড্রাইভারের সঙ্গে কী সব কথাবার্তা বলে নিল ও।মানস ছুটতে ছুটতে যখন ধৃতির কাছে এল,তখন আর কথা বলার সুযোগ নেই।সোজা উঠে বসতে হল সিটে।ওরা দুজন।পেছনের সিটে বসেই ধৃতি গুগল ঘাঁটতে শুরু করল।মানস জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল বাইরের দৃশ্যপট।
এই মাত্র ধৃতির দিকে তাকিয়ে দেখে, কপালে সিঁদুরও নেই।তবে কি!ও এখনো!সে সব কথা এখানে বলা বড় মুশকিল।এর চাইতে গাড়ি থেকে নেমে না হয় জেনে নেওয়া যাবে।গাড়ির ভেতর মানসের কাছে এসে, একই দিকে দুজন তাকিয়ে আকাশটাকে দেখছে। পাহাড়ের উপর হুমড়ি খেয়ে মেঘের পড়ার দৃশ্য । একটু আগে পর্যন্ত বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায়, সূর্যের আলো খুব কষ্টে উঠে আসার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না।কিরণ ছড়িয়ে পড়ছে পাহাড় চুড়োয়।মেঘ বিছিয়ে দিয়েছে চাদর।দুজনের কাছে এ যেন সেই কলেজ লাইফে এসকার্সানে গিয়ে দেখা কাঞ্চনজঙ্ঘা।আলো কীকরে মেঘের উপর চড়ে বসতে হয় সে জানে তপন-কিরণ।এই অপরূপ রূপ দেখার অনুভবে ধৃতি-মান এক।কবিতা-গল্প-নাটক-গানের অনুভবে ওরা এক।ছবি দেখার অনুভবে ওরা এক।চেহারায় এবং আসলে ডিমাসা ড্রাইভার হলেও ভালো বাংলা জানে প্রদীপ। সামনের লুকিং গ্লাসে ওদের এই দৃশ্যে মগ্ন হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল, ‘এ হল,বরাইল উপত্যকা’।পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে উঠতে এক জায়গায় প্রদীপ গাড়ি থামিয়ে ওদের বলল, ‘নিন,এবার আপনারা ছবি তুলে নিতে পারেন’।নামল দুজন।ধৃতি মোবাইলে ছবি তুলল।মানস শুধু দেখল।ধৃতি বলল-
কী রে তোর মোবাইল?
আনি নি।
আবার ভুলেছিস?
না।
তবে?
ইচ্ছে ক’রে।
বেশ করেছিস।নইলে দুজনের কথাই হ’ত না।
ড্রাইভার তাড়া দিল,উঠে পড়ুন ,নয়তো পরে হোটেলে বা লজে জায়গা পাবেন না।যদিও আমার আরও এক দুটোর সাথে যোগাযোগ আছে,তবুও অনেকেই এসছে তো!তাই বলছি।
ড্রাইভার ওদের প্রথমে নিয়ে গেল “আই লাভ ডিমহাসা” ভিউ পয়েন্টে।প্রদীপ বলল,এটাই হাফলং এর টপ ভিউ পয়েন্ট।এখান থেকে আপনারা প্রায় পুরো হাফলং দেখতে পাবেন।সেখানে যে লজ রয়েছে,তা দেখে ধৃতির খুব পছন্দ হল।আর দৃশ্যপট?ধৃতির মনে হল এখান থেকে গোটা পৃথিবীটাই তাদের আসনতলে।এই পাহাড়ের চুড়োয় আবার একটা কালী-মন্দির।এতক্ষনে মানসের মুখ খুলল,দ্যাখ ধৃতি, লোকের কান্ড!এখানেও বেটিকে ছাড়ান দেয় নি। ধৃতি ফিক করে হাসল।প্রদীপ বলল,এই লজে আপনারা থাকতে পারতেন,যদি আগে বলতেন।ধৃতি বলল,এখানেই থাকব।ড্রাইভার বলল,গিয়ে দেখুন।আমার ক্ষমতায় কুলোবে না।ধৃতি বলল,একটু অপেক্ষা করুন,আমি দেখছি।মানস জানে ধৃতির দৌড়।ভেতরে রিসিপসানে গিয়ে ওদের কেয়ারটেকারকে যখন বলল,ওরা দুজনই গবেষণার কাজে এসেছেন,এবং নিজের আই কার্ড দেখালো,তখন ওদের জন্য একটা ব্যবস্থা হয়ে গেল।একটা ডবল বেডেড রুম খালি ছিল।পরিচয় দিতে হল না,সারনেইম দুজনের এক দেখে ওরা ধরে নিল স্বামী-স্ত্রী।কেয়ারটেকার জানাল,’আজ- কালকের জন্য একটা রুমই খালি আছে’পরশুতে আবার বুকিং আছে।ধৃতি বলল,’ও কে।আমাদের একটা রুমেই চলবে’। ফিরে এসে ড্রাইভারকে বলল,আমরা একটু ফ্রেশ হয়ে নিই,তুমি চারটের মধ্যে চলে এসো।প্রদীপ বুঝে নিল,এদের থাকার জন্য লজে যত ভিড়ই থাকুক,আমার চিন্তা করতে হবে না।ওর নিজের জানা লজগুলোতে অবশ্য জায়গা পেতে অসুবিধে হবে না,তবে ওগুলো একটু সস্তা।প্রদীপ আসলে ট্যুর কনডাক্টর।ওর নিজের একটা গাড়ি আর এখানে একটা হোম স্টে বানিয়ে রেখেছে।ওটাতে যদিও আজ জায়গা নেই।অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেই এই ব্যবসাতে ওর এখন বছর পাঁচেক হল।এটাই জীবীকা।যাক্ প্রদীপ এখন ওদের পথ প্রদর্শক, সঙ্গী হয়ে গেল।তবে কত দিনের জন্য সে জানে না।দুদিন তো বলল, দেখা যাক।আপাতত ঘন্টা দুয়েক প্রদীপ নিজের কাজ গুছানোর সময় পেয়ে গেল।মানস ধৃতির ট্রলিব্যাগ নিয়ে চলল সেই ঘরে।
হাফলং এর টপ ভিউতে এই লজের দোতলায় যে ঘরটা ওদের জন্য বরাদ্দ হল,সেখানে ঢুকেই ওরা দুজনে একসাথে জানলার বাইরে তাকিয়ে বলল ‘একী’!
মানস বলল,এ তো স্বর্গের কাছাকাছি।
ধৃতি সুর তুলে নিল, “এ কী এ সুন্দর শোভা–“
মানসকে জড়িয়ে ধরতে যেতেই,মানস নিজেকে সরিয়ে নিল,’আগে যা,ফ্রেশ হয়ে আয়’।আসলে এই হল মানস।সব সময় এই ব্যাপারে নিজেকে গুটিয়ে রাখে,অথচ রূপ দেখলে মনে হয় ও পারফেক্ট লেডি কিলার।আর ধৃতিকে দেখলে কেউ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বাজে কথা বা শালীনতা ডিঙোনোর সাহসই দেখাতে পারবে না।এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য।অথচ এই বিপরীত মেরুর দুজন শুধু একান্তে নিজেরা জানে দুজনকে।
ধৃতি বলল,তুই ফ্রেস হয়ে কী পরবি?তোর তো দেখছি সঙ্গে কোনো জামাকাপড়ই নেই।কিচ্ছু ছাড়া বেরিয়ে পড়লি?এমন কি মোবাইলটাও নেই,এই মান্!তুই সত্যি করে বল তো,তুই কি বাড়ি থেকে পালিয়েছিস?
ধুর পাগলী!পালাব কেন?নিরুদ্দেশে পা বাড়িয়েছি।যা তুই ফ্রেশ হয়ে আয়,আমাকে বাথরুমে যেতে হবে।গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে সেই দিনগুলোর মত।বলছি তো,তুই এলে তারপর যাব,ততক্ষনে এই পাগলা টুকরো মেঘগুলোর সাথে কথা বলি।দেখ জানলা দিয়ে কাঁচটা না থাকলে তো ঘরেই ঢুকে পড়ত।
ধৃতি ট্রলি থেকে কী সব নিয়ে, চট করে ঢুকে গেল বাথরুমে। মানসের তর সইল না,খুলে দিল কাঁচের জানালা। হালকা ইলশে গুঁড়ির সাথে এক পশলা মেঘ মুহূর্তেই ঢুকে ভিজিয়ে দিল মানসকে। ‘ধৃতি’! বলে চেঁচাতেই বাথরুম থেকে দরজা একটু ফাঁক করে একবার ভেজা মানসকে দেখে,ভেতর থেকে লজের বাথরুমে রাখা ধবধবে সাদা একটা তোয়ালে, মানসের দিকে ছুঁড়ে দিল।’নে ভোঁদাই মুছে চেঞ্জ করে নে,আমি আসছি।’
একটু পরে ধৃতি বাথরুম থেকে যখন বেরিয়ে এলো,মানস বেসুরো গলায় “বেঁধো না, ফুলমালা ডোরে কানু প্রেম–।দেখলো কীভাবে মেঘ পাহাড়ে কানাকানি কথা কয়।একটু আগে ছেড়ে আসা নিউ হাফলং স্টেশনটাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন সেজেগুজে কোল পেতে বসে আছে ওদের জন্য।সেই কলকাতার দমদম বা ধৃতির বালি স্টেশনের মতো হৈ হৈ, রৈ রৈ, নেই।শান্ত-ধীর-স্থির-শুভ্র সুন্দর।না ফুলের সমারোহ নেই।গাছ গাছালির দোল মনকে আন্দোলিত করে।ওরা দুজন তাকিয়ে রইল এক দৃষ্টিতে।
নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে একটা প্রশ্ন মানসই প্রথম ধৃতিকে করল,ধৃতি তুই সুখী?
ধৃতি বলল,আজ তো ভীষণ খুশি,”জীবন আমার চলছে যেমন তেমনি ভাবে / সহজ কঠিন দ্বন্দ্বে ছন্দে চলে যাবে”। সুর তুলতেই কলিংবেল বাজল। লাঞ্চ নিয়ে এল। পুতুলের মতো আঁকা চোখ-মুখের সাথে ফুল সাদা শার্টের সাথে কালো স্কার্ট। ধবধবে ফর্সা সরু পা দুটো পর্যন্ত তাকিয়ে দেখতেই হল মেয়েটিকে। খাওয়া সযত্নে টেবিলে রেখে যেতেই,সেই সুরের রেশ নিয়ে ধৃতি অতীতের মতো দুজনের খাবার সাজিয়ে নিল।ধৃতি শুধু বলল,’এই দুটো দিন অতীত খুঁড়ে বেদনা না জাগালেই নয়’? কত কথা!কত ক্ষণ! কত দিন, মাস, বছরের পর বছরের কথা জমে আছে আমাদের মাঝে।এই সব নিয়ে কাঁটাছেঁড়া করতে বসলে এই সুন্দর মুহূর্তগুলোই আঁছড়ে পড়ে মরবে, এই হাফলংয়ের মাটিতে।তাই কি তুই চাস?মানস বলল,’রাইট’। একদম না।তা হলে তোর গুনগুন চলুক।খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে জানলা দিয়ে মেঘ রৌদ্রের খেলা দেখে চলেছে দুজনে।খাওয়া শেষ হতেই, ধৃতির মোবাইলে প্রদীপের রিঙ বেজে উঠল। ‘সুহানা সফর য়্যা মৌসম্ হে হাসিন–নীচে প্রদীপ হাজির।মানসকে প্রদীপের রিংটোনটা শোনাল ধৃতি।দরজা বন্ধ করে বেরুলো।ঘর থেকে বেরুতেই মানস ধৃতির দিকে তাকিয়ে শব্দ করে নয়, গুনগুন সুরে বলল,’আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চল সখা,আমি যে পথ চিনি না—‘
এবারে কোন থলে নয়,শুধু ধৃতির একটা ছোট্ট ব্যাগ আর মোবাইল, মানস শুধু মানিব্যাগট সঙ্গে নিয়ে প্রদীপের সওয়ারী হল।