বুধবার | ২২ এপ্রিল ২০২৬

মুখ্যমন্ত্রী তদন্ত চলাকালীন ঢুকে পড়লে গণতন্ত্র বিপদের মুখে পড়ে, আইপ্যাক মামলায় পর্যবেক্ষণ শীর্ষ আদালতের

 মুখ্যমন্ত্রী তদন্ত চলাকালীন ঢুকে পড়লে গণতন্ত্র বিপদের মুখে পড়ে, আইপ্যাক মামলায় পর্যবেক্ষণ শীর্ষ আদালতের

নয়াদিল্লি, ২২ এপ্রিল – প্রথম দফার ভোট গ্রহণের আগের দিনে আইপ্যাক মামলায় শীর্ষ আদালতের ভর্ৎসনার মুখে পড়ল বাংলার তৃণমূল সরকার। ইডির তল্লাশির সময়ে হঠাৎ করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিত হয়ে যাওয়ার তীব্র সমালোচনা করল আদালত। বুধবার শীর্ষ আদালতে সেই মামলার শুনানির সময়ে বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র ও বিচারপতি এন. ভি. আঞ্জারিয়ার বেঞ্চ স্পষ্টভাবে বলেন, কোনও মুখ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রী যদি ব্যক্তিগতভাবে কোনও কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তে গিয়ে হাজির হন বা সেখানে বাধা সৃষ্টি করেন, তবে সেটিকে সাংবিধানিক অর্থে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত বলা যায় না। আদালতের এ হেন মন্তব্যে রাজ্য সরকারের অস্বস্তি কিছুটা হলেও বাড়ল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।

            ঘটনাটি ঘটে গত ৮ জানুয়ারী। সেদিন কলকাতায় আই-প্যাক-এর দফতরে এবং তার কো-ফাউন্ডার প্রতীক জৈনের বাসভবনে তল্লাশি চালায় ইডি। অভিযোগ ওঠে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্য পুলিশের শীর্ষ কর্তারা সেই সময়ে সেখানে পৌঁছে ইডি-র কাজে বাধা দেন এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস সরিয়ে ফেলেন। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সিবিআই তদন্তের আবেদন জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় ইডি। আজকের শুনানির সময়ে বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র বলেন, ‘কোনও মন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী যদি তদন্ত চলাকালীন হঠাৎ ঢুকে পড়েন, তাতে গণতন্ত্রই বিপদের মুখে পড়ে, তারপরও যদি বলা হয় এটি মূলত কেন্দ্র-রাজ্যের বিরোধ—তা কীভাবে সম্ভব?’

            অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নথিপত্রও মুখ্যমন্ত্রী নিয়ে গেছেন আদালতে জানান সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। রাজ্যের আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী সওয়াল করেন, ‘সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য। ইডি অফিসারেরা যদি অফিসার হিসাবে ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যবহার করেন, তা হলে সরকার নিজেই নিজের বিরুদ্ধে এই ধারা ব্যবহার করছে। এর ফলে ওই অনুচ্ছেদের আসল উদ্দেশ্য নষ্ট হবে। নাগরিকদের জন্য এই অধিকার দুর্বল হয়ে যাবে।’ মেনকা আরও বলেন, ‘কেন্দ্র এবং রাজ্যের বিরোধ হলে  ১৩১ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যবহার করতে হবে। ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ নয়। তা ছাড়া এই মামলায় বড় সাংবিধানিক প্রশ্ন রয়েছে, তাই সাংবিধানিক বেঞ্চে যাওয়া দরকার।’ মেনকা আরও বলেন, ‘এখানে কেন্দ্র যা করতে চাইছে, তা হল প্রতিষ্ঠিত ধারণাটাকেই বদলে দেওয়া। এটা শুধু আমাদের প্রায় ৭৫ বছরের সাংবিধানিক আইনগত বোঝাপড়ার বিরোধী নয়, বরং সারা বিশ্বে স্বীকৃত নীতিরও বিরুদ্ধে, বিশেষ করে সেই সব দেশে, যেখানে ঔপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। নাগরিকদের সব সময় রাষ্ট্রের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখা জরুরি। সেই কারণেই ব্যক্তির মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে।’

তা শুনে বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র বলেন, ‘এখানে রাষ্ট্রের কোন অধিকার জড়িত? এটা তো কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে কোনও বিরোধ নয়। কেন ১৩১ অনুচ্ছেদের কথা তুলছেন? এটি আসলে একজন ব্যক্তির কীর্তি, যিনি ঘটনাচক্রে একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। এতে পুরো ব্যবস্থা এবং গণতন্ত্রই প্রশ্নের মুখে পড়ছে। আপনারা বলছেন, যদি এটি গ্রহণযোগ্য হয়, তবে তা ৩২ অনুচ্ছেদের অধীনে নয়, শুধুমাত্র ১৩২ অনুচ্ছেদের অধীনেই হওয়া উচিত। যদি কোনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী চলমান তদন্তের মাঝে এসে বলেন যে, কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বিরোধ, তা হলে কি সেটা মেনে নেওয়া যায়?’ বিচারপতির প্রশ্ন, ‘এই মামলা গ্রহণ করা হবে কি না, আমরা সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারি? এর জন্য পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চে মামলা পাঠানোর কী প্রয়োজনীয়তা রয়েছে?’ বিচারপতি মিশ্র বলেন, ‘আপনারা অনেক আইনি নীতি নিয়ে যুক্তি দিতে পারেন। কিন্তু আমরা বাস্তব পরিস্থিতি থেকেও চোখ সরাতে পারি না, যা রাজ্যে ঘটেছে। আগামী কাল এটা সংবাদে প্রকাশিত হবে, তার পরে আপনারাই বলবেন আদালত এই ধরনের মন্তব্য করেছে।’

আদালতের মন্তব্য, ‘এটা কোনও রাম বনাম শ্যামের সাধারণ মামলা নয়। এটা একেবারে ব্যতিক্রমী মামলা। আমরা সব সময় বলি, সংবিধান একটি জীবন্ত নথি। প্রতিটি নতুন পরিস্থিতি আদালতের সামনে নতুন প্রশ্ন তুলে ধরে এবং আদালতকে সেই প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে হয়। সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা আদালতকে মাথায় রাখতে হয়।’ বৃহস্পতিবার ফের এই মামলার শুনানি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *