বুধবার | ০৪ নভেম্বর ২০২৬

কেওড়াতলা মহাশ্মশানে শবদেহের দাহের সঙ্গে চলে কালীপুজোর মন্ত্রোচ্চারণ

 কেওড়াতলা মহাশ্মশানে শবদেহের দাহের সঙ্গে চলে কালীপুজোর মন্ত্রোচ্চারণ

সন্দীপ বসু- কালীর অন্যান্য রূপের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হল শ্মশানকালী। বিভিন্ন শ্মশানঘাটে কালীর যে রূপটির পুজো করা হয়, তা ‘শ্মশানকালী’ নামে পরিচিত। বাংলার প্রায় সব শ্মশানেই শ্মশানকালীর পুজো হয়। কলকাতার বুকে কেওড়াতলা মহাশ্মশানের কালীপুজোয় শবদেহের দাহ যতক্ষণ না হচ্ছে, ততক্ষণ দেবীকে ভোগ নিবেদন করা হয় না। এই শ্মশানের আগুন কখনও নেভে না, তাই কলকাতার কেওড়াতলা এবং নিমতলা শ্মশান মহাশ্মশানের তকমা পেয়েছে।
আলোর উৎসব দীপাবলি, কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক অন্ধকার দিকের কথাও। দশমহাবিদ্যার প্রথম মহাবিদ্যা হল কালী। দেবী কালীর পদতলে শবের মতো শুয়ে থাকেন শ্মশানবাসী মহাদেব। ধ্যানমন্ত্রে দেবীর রূপ চতুর্ভুজা, এলোকেশী। এ ছাড়াও দেবীর নানা রূপ বর্তমান। রক্ষা কালী, শ্যামা কালী, দক্ষিণা কালী, ডাকাত কালী, শ্মশান কালী—এমন নানা রূপেই পূজিত হন দেবী।
১৮৭০ সাল থেকে চলে আসছে এই পুজো। এ বছর কেওড়াতলা মহাশ্মশানের পুজো পা দেবে ১৫৬ বছরে। শোনা যায়, স্থানীয় এক কাপালিক দুই ব্রাহ্মণের সহায়তায় এই পুজো শুরু করেছিলেন। পুজো শুরু হয়েছিল দু’হাত সম্পন্না এক জিহ্বাহীন কালী দিয়েই। সেই ধারাই আজও অব্যাহত। একদিকে শ্মশানকালী পুজো হবে আর অপরদিকে চলবে শবদেহের দাহ। কেওড়াতলা মহাশ্মশানে এই পুজো করেন ডোমেরা।
এই পুজোর প্রধান পুরোহিত অরুণ ঠাকুর জানালেন, ‘শ্মশান কালীমায়ের পুজো হয় বীরাচার তন্ত্রমতে। এই শ্মশান কালীর পুজোর একটা নিজস্বতা রয়েছে। এখানে যেমন বীরাচার তন্ত্রমতে পুজো করা হয়, তেমনই এই পুজোয় বিশেষ কিছু ক্রিয়া করা হয়, যা জনসমক্ষে প্রকাশ করা নিষেধ।’ অরুণ ঠাকুরকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়, কেন শ্মশান কালীমায়ের জিভ অন্যান্য কালীমূর্তির মতো বাইরে বেরিয়ে নেই? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, ‘পুরাণ মতে মা অসুরকুল নিধন করে, শ্মশানে এসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন এবং সুরা ও মাংস পান করছিলেন। জীবকুল এসে তখন মায়ের আশীর্বাদ নিচ্ছিল। সেই সময় মায়ের যে রূপ ছিল, শান্ত, স্নিগ্ধ, এখানে দেবী শ্মশান কালীমাতা সেই রূপেই পূজিত হন। আর সেই সময় যেহেতু মা খাচ্ছিলেন, তাই তাঁর জিভ বাইরে বেরিয়ে থাকে না।’ তাছাড়াও মা এখানে দ্বিভুজা। মা এখানে মূলত কল্যাণময় রূপে পূজিত হন বলে দাবি পুরোহিতের।
পুজোর নির্দিষ্ট সময়ে একটি মৃতদেহ দাহ করার জন্য এনে রাখা হয়। এমন রেওয়াজ রয়েছে দেশের অন্য প্রান্তের শ্মশানেও। জানা যায়, শ্মশানে শবদেহ না আসা পর্যন্ত দেবীর ভোগ নিবেদন করা হয় না।
একদিকে শবদাহ চলছে এবং অন্যদিকে পুজোর মন্ত্র উচ্চারিত হচ্ছে। এই আবহে একটি ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয় মহাশ্মশানে। গা-ছমছমে আবহে অমাবস্যার নিশীথে পুজো হয় কেওড়াতলা মহাশ্মশানের শ্মশান কালীর।
জানা যায়, শ্মশান কালীমায়ের পুজো শেষ হলেই, পুজোর ঘট শ্মশানের ঘাটেই বিসর্জন দেওয়া হয়। কথিত আছে, যখন শ্মশান মায়ের পুজো শুরু হয়, তখন কোনও না কোনও শব আসে কাঠের শ্মশানে পোড়ানোর জন্য। একদিকে শব পোড়ানো শুরু হয়, আর অন্যদিকে শুরু হয় মায়ের পুজো। এখানে প্রতিবছর ২২ থেকে ২৫টা ছাগবলি হয়। পুজো কমিটির তরফ থেকে দুটো ছাগবলি দেওয়া হয়। আর বাদবাকি মানুষের মনস্কামনা পূরণ হলে তাঁরা শ্মশান মায়ের সামনে ছাগবলি দেন। কথিত আছে, শ্মশান মা জাগ্রত এবং সকলের মনস্কামনা পূর্ণ করেন। এখানে যে ছাগবলি হয়, সেই বলির মাংসই রান্না করে মাকে নিবেদন করা হয়।
তাছাড়াও প্রায় ৬০০ কিলো চাল-ডালের ভোগ হয় এখানে। পুজো শেষে যা জনগণের মধ্যে বিতরণ করা হয়। বলা হয়, এই পুজো হরিজনদের। চলতি কথায় আমরা যাকে বলি ডোম। ডোম এবং তাঁদের পরিবার এই পুজোর সমস্ত আয়োজন করে থাকেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *