শুক্রবার | ১৬ অক্টোবর ২০২৬

সাড়ে চারশো বছর আগে শুরু, আজও একই ধারায় ব্যবত্তারবাটিতে দুর্গাপুজো

 সাড়ে চারশো বছর আগে শুরু, আজও একই ধারায় ব্যবত্তারবাটিতে দুর্গাপুজো

সন্দীপ বসু- এক ব্রাহ্মণপত্নী মহাষ্টমীর অঞ্জলি দিতে গিয়ে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। সেদিন অঞ্জলি দেওয়ার অনুমতি পাননি। মনের দুঃখে তাঁর ছেলে নিজের বাড়িতেই পুজোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি আর কেউ নন, তাম্রলিপ্ত রাজ্যের রাজার ব্যবস্থাপক সার্থকরাম। এক মায়ের চোখের জলের অপমানের বদলা হিসেবে সেই পুজো প্রায় সাড়ে চারশো বছর ধরে নন্দকুমার ব্লকে ব্যবত্তারবাটির দুর্গাপুজো হিসেবে পরিচিত।
সময় বদলালেও এখানকার পুজোর রীতি ও ধারা অটুট রয়েছে। নিষ্ঠা, ভক্তি, আন্তরিকতা বজায় রেখেই এখানকার পুজো হয়ে আসছে। কথিত আছে, এই পরিবারকে কেন্দ্র করেই নন্দকুমার ব্লকের ওই এলাকার নামকরণ হয় ব্যবত্তারহাট। এখন ব্যবত্তারহাট পূর্ব ও পশ্চিম নামে দু’টি গ্রাম পঞ্চায়েত রয়েছে। এখানকার পুজোর বেশ কিছু নিয়ম সাড়ে চারশো বছরেও অক্ষুণ্ণ।
যেমন, জন্মাষ্টমীর পরের দিন নন্দ উৎসবের সময় বাড়ির ঠাকুরদালান থেকে কিছুটা দূর থেকে প্রতিমার মাটি আনা হয়। এই মাটি দিয়েই একচালার প্রতিমা তৈরি হয়। ঠাকুরদালানের পিছনে রয়েছে পরিবারের কুলদেবতা গোকুলচাঁদ জিউর মন্দির। সেখানে রাধাকৃষ্ণের নিত্যপুজো হয়। বৈষ্ণবমতে দেবীর আরাধনা হওয়ার কারণে এখানে বলি হয় না। ভোগেরও নানা বৈচিত্র্য রয়েছে। মহাষষ্ঠীতে এক মন ছয় সের, মহাসপ্তমীতে এক মন সাত সের, মহাষ্টমীতে আট মন আট সের এবং মহানবমীতে নয় মন নয় সের চালের নৈবেদ্য তৈরি হয়। সঙ্গে থাকে ভাত, পোলাও, খিচুড়ি, কলার ছেঁচকি, আলু-পটলের তরকারি, কুমড়োর তরকারি, পায়েস, চাটনি, নারকেল নাড়ু সহ আরও বহু পদ।
পরিবারের পূর্বপুরুষরা সংগীতে দক্ষ ছিলেন। সেই ঐতিহ্য আজও ধরে রাখা হয়েছে। দুর্গাপুজোর কয়েক দিন গানবাজনার আসরে মুখরিত থাকে। দেবী আরাধনার পাশাপাশি শিল্প ও সংগীতচর্চার এক অসাধারণ মিলনক্ষেত্র তৈরি করে। জানা গিয়েছে, পুজোর প্রতিষ্ঠাতা তথা তাম্রলিপ্ত রাজ্যের রাজার ব্যবস্থাপক সার্থকরামের পদবি ছিল ঘোষাল। পরবর্তীকালে উত্তরসূরিদের একাংশ ভট্টাচার্য এবং অপর অংশ চক্রবর্তী পদবি ধারণ করে। ব্যবত্তারহাট গ্রাম পঞ্চায়েতের নাড়াদাঁড়ি ও হরিহরপুর গ্রামজুড়ে মোট ৩৬টি শরিক রয়েছে। তাম্রলিপ্ত রাজপরিবারের দেওয়া অগাধ সম্পত্তি রয়েছে। পুজোর সময় চক্রবর্তী ও ভট্টাচার্য পরিবারের সদস্যরা দেশ-বিদেশ থেকে বাড়ি ফিরে আসেন। পুজো ঘিরে মিলন উৎসব শুরু হয়। আশপাশের এলাকা থেকে প্রচুর মানুষজন এই পুজোয় শামিল হন। প্রায় সাড়ে চারশো বছরের পুজোর ঐতিহ্য বজায় রেখেছেন সার্থকরামের উত্তরসূরিরা।
ওই পরিবারের অন্যতম সদস্য সন্দীপ চক্রবর্তী বললেন, ‘বরাবর আমাদের সাবেকি প্রতিমা তৈরি হয়। চাকচিক্য নয়, ভক্তি আর নিষ্ঠাভরে পুজো হয়। আজও সমস্ত পরিবার এবং এলাকার মানুষজন মিলে এই পুজোয় খুব আনন্দে শামিল হই। সংগীতের আসরে সবাই মেতে উঠি। এটাই আমাদের পুজোর প্রাণ। প্রায় চারশো বছরের পুরনো এই দুর্গাপুজো আজও বহন করে চলেছে বাংলার সংস্কৃতি, পারিবারিক ঐক্য আর আবেগের উত্তরাধিকার।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *