শিবের কোলে উমা, দেবী দশভুজা নন
মণ্ডল বাড়িতে ২১৮ বছরের হরগৌরী পুজো
সন্দীপ বসু- দশ হাতে অস্ত্র নিয়ে দশভুজা দুর্গাই আমাদের চেনা। যেখানে মা দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করছেন নিজের বাহন সিংহকে নিয়ে। কিন্তু এক অন্য ধরনের দুর্গাপুজো হয় ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের অন্তর্গত ইছাপুরের ঐতিহ্যবাহী মণ্ডল বাড়িতে।
এখানে মা দশভুজা রূপে পূজিত হন না। বাড়ির মেয়ে-জামাই হর, গৌরী রূপেই শিবের কোলে মা দুর্গা বিরাজমান। একচালার কাঠামোয় দেবী পার্বতীর ডান পাশে আসীন দেবাদিদেব মহাদেব। তাঁদের দু’পাশে লক্ষ্মী ও সরস্বতী এবং নীচে বিরাজমান কার্তিক ও গণেশ।
ইছাপুরের ঐতিহ্যবাহী মণ্ডল বাড়ির ২১৮ বছরের পুরোনো পুজোয় হরগৌরীকে দেওয়া হয় না কোনও অন্ন বা আমিষ ভোগ। আর বিসর্জনেও রয়েছে বিশেষ রীতি। ইছাপুর-নবাবগঞ্জের মণ্ডল বাড়ির দুই ছেলে শ্রীধর ও বংশীধর পুজোর প্রচলন করেছিলেন। প্রথমে এই পুজো ঘটে হলেও পরবর্তীতে শ্রীধর, বংশীধর দুই ভাই মিলেই দেবীর হরগৌরী রূপে পুজো করার স্বপ্নাদেশ পান। আর তারপর থেকেই যুগ যুগ ধরে এই মণ্ডল বাড়িতে দেবীর শান্তরূপকে বৈষ্ণব মতে বাড়ির মেয়ে হিসেবে পুজো করা হয়ে থাকে। প্রতিবছর মৃৎশিল্পীকে বাড়িতে এনে মূর্তি তৈরি করানো হয়। যার মাপ থেকে রূপ যুগ যুগ ধরে একই হয়ে আসছে।
বছর-বছর মণ্ডল বাড়িতে ধুমধাম করে যে সমস্ত পুজো হয়, তার খরচ পূর্বপুরুষ শ্রীধর ও বংশীধর রেখে গিয়েছেন।
বৈষ্ণব মতে সমস্ত পুজো হয় বলে এখানে নেই বলিপ্রথা, নেই তেমনভাবে অন্নপ্রসাদের চল। মহালয়ার পরদিন থেকেই নিয়মমাফিক শুরু হয়ে যায় মণ্ডল বাড়ির দুর্গাপুজো। সেদিন থেকেই মাকে লুচি, মিষ্টি, নানারকম ফল-প্রসাদ, তরকারি, ভাজাভুজি নিবেদন করা হয়। এমনকী পুজোর ওই ক’টা দিন মাকে যে মিষ্টি নিবেদন করা হয়, সেগুলি বাড়িতেই ময়রা ডেকে বানানো হয়। দশমীর দিন বিসর্জনেও থাকে বৈচিত্র্য।
মণ্ডল বাড়ির দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি শুরু হয় মহালয়া থেকে। দেবীপক্ষের সূচনায়, মহালয়ার পরের দিন শুক্লা প্রতিপদ তিথিতে বাড়ির পূর্বদিকের ঘরের বেদিতে প্রতিষ্ঠা করা হয় দুর্গা ঘট ও লক্ষ্মী ঘট। নিয়মিত পুজোর জন্য দুর্গামণ্ডপে নিয়ে আসা হয় নারায়ণ শিলাকে।
মহালয়ার দিন পুরোহিত এসে প্রাথমিক সমস্ত ব্যবস্থা করে দেন। এরপর প্রতিদিন নিয়ম মেনে চলে নিত্যপুজো, যা মহাষষ্ঠীর সকাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। অন্যদিকে, রথযাত্রার দিন থেকে শুরু হয়ে যায় একচালার প্রতিমা তৈরির কাজ।