বৃহস্পতিবার | ০৮ অক্টোবর ২০২৬

৪০ বছরের পরম্পরায় ভেঙে নেতাজীর পুজোয় শিল্পীবদল

 ৪০ বছরের পরম্পরায় ভেঙে নেতাজীর পুজোয় শিল্পীবদল

সন্দীপ বসু- বাগবাজার সর্বজনীনের পুজো কলকাতার সবচেয়ে পুরোনো সর্বজনীন দুর্গাপুজোগুলির মধ্যে একটি। ১৯১৯ সালে বাগবাজারের বাসিন্দারা প্রথম এই পুজোর আয়োজন করেছিলেন। প্রথমবার পুজো হয়েছিল নেবুবাগান লেন ও বাগবাজার স্ট্রিটের সংযোগস্থলে সরকার হাউসে। সেই সময় এই পুজোর নাম ছিল ‘নেবুবাগান বারোয়ারি দুর্গাপূজা’। তারপর তিন বছর সরকার হাউসেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল পুজো।
১৯২৪ সালে পুজো সরে আসে বাগবাজার স্ট্রিট ও পশুপতি বসু লেনের সংযোগস্থলে। তার পরের বছর পুজো হয় কাঁটাপুকুরে। ১৯২৬ সালে সমাজকর্মী নগেন্দ্রনাথ ঘোষাল ও আরও কয়েক জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ভার নেন এই পুজোর। তাঁদের প্রচেষ্টায় সুষ্ঠুভাবে পুজো করার জন্য গড়ে ওঠে একটি সংগঠন। ১৯২৭ সালে পুজো হয় বাগবাজার কালীমন্দিরে। ১৯২৯ সালে প্রথম এই পুজো উপলক্ষ্যে মেলা বসে।
১৯৩০ সালে কলকাতা পৌরসংস্থার অল্ডারম্যান দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হন। এই সময় থেকেই পুজোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে স্বদেশী আন্দোলনের ধ্যানধারণা। পুজোর নাম বদলে হয় ‘বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসব ও মেলা’। যে দুর্গানগর মাঠে এখন মেলা বসে, সেটি আসলে ছিল কলকাতা পুরসভার রাস্তা-সারাই বিভাগের মেটাল-ইয়ার্ড। দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতার তৎকালীন মেয়র নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে অনুরোধ করেন এখানে মেলা আয়োজনের অনুমতি দেওয়ার জন্য। সুভাষচন্দ্র অনুমতি দেন। সেই সঙ্গে দেন পাঁচশো টাকা চাঁদাও। সেই থেকে এইখানেই চলে আসছে বাগবাজার সর্বজনীনের পুজো।
১৯৩৮ ও ১৯৩৯ সালে সুভাষচন্দ্র প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন বাগবাজার সর্বজনীনের পুজোর সঙ্গে। এই দুই বছর তিনিই ছিলেন পুজো কমিটির সভাপতি। সুভাষচন্দ্র ছাড়াও সন্তোষ কুমার বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, হরিশঙ্কর পাল প্রমুখ ব্যক্তিবর্গও এই পুজোর সঙ্গে অতোপ্রতোভাবে জড়িত ছিলেন একটা সময়ে।
মহাষ্টমীর সকালে বীরাষ্টমী উৎসব ও বিজয়া দশমীর সকালে সিঁদুর খেলা এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অনুশীলন সমিতির সদস্য বিপ্লবী পুলিন বিহারী দাস এই পুজোর বীরাষ্টমী উৎসবের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন।
বাগবাজার সর্বজনীনের বৈশিষ্ট্য হল দুর্গাপুজোর সাবেকিয়ানা ধরে রাখা। এখানে থিমপুজো হয় না। এমনকি বিগত দশকের পর দশক ধরে প্রতিমাও তৈরি হচ্ছে একই ধাঁচে। একচালা আকর্ণনয়না দেবীমূর্তি। থিমের হুজুগে মাথা না গলিয়েও শুধুমাত্র ঐতিহ্য আর সাবেকিয়ানাকে সম্বল করেই যে বছরের পর বছর কলকাতার গর্ব এই পুজো। আর বিগত চার দশক পরে প্রথমবার এই পুজোয় শিল্পী বদল হল। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে উত্তর কলকাতার সাবেকি এই পুজোর প্রতিমার চক্ষুদান করতেন শিল্পী খোকা পাল। মঙ্গলবার দেবীর চক্ষুদান হয়ে গেল। শিল্পী ইন্দ্রনাথ পাল এই প্রথমবার দেবীর চক্ষুদান করলেন। শিল্পী বদলেও ১০৮ বছরের এই প্রাচীন পুজোর গরিমা অটুট থাকবে বলেই পুজো উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে কুমোরটুলির শিল্পী জীতেন পাল সর্বজনীনের প্রথম প্রতিমা তৈরি করেছিলেন। তাঁর পর প্রতিমা গড়ার ব্যাটন উঠে যায় জীতেনের ছেলে নারায়ণচন্দ্র পালের হাতে। তারপর বংশপরম্পরায় চিরায়ত প্রথা মেনে দীর্ঘ ৪ দশক ধরে দক্ষ তুলির টানে দুর্গার চক্ষুদান করে আসছিলেন শিল্পী খোকা পাল। কিন্তু এবার সেই চক্ষুদানের শিল্পী বদল হল। এ বছর শিল্পী ইন্দ্রনাথ পাল প্রতিমার চোখ আঁকলেন।
বঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে এর কী কোনও যোগ আছে? সে নিয়ে অবশ্য পুজো উদ্যোক্তা থেকে শিল্পী সবার মুখে কুলুপ। তবে বর্তমান শিল্পী ইন্দ্রজিৎ জানিয়েছেন আগের শিল্পী খোকা পাল বার্ধক্যজনিত কারণে অসুস্থ। তাই এবার প্রতিমার চক্ষুদান করতে পারলেন না। আর এ নিয়ে খোকার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁর পরিবারের সদস্যরা চাইলেন না আশি-ঊর্ধ্ব শিল্পীকে নিয়ে বিতর্ক বাড়ুক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *