ধৃতি-মান
শুভাশিস চৌধুরী
পর্ব-৩
হাফলং পাহাড়ের গায়ে গায়ে ওরা কিছুক্ষনের মধ্যেই চলে এলো যেখানে ,সে তো এক বিস্তীর্ণ সবুজের সমারোহ!এখানে পাহাড়ের ঘাসে ঢাকা শরীর দিয়ে বানানো হয়েছে,ঢেউ খেলানো মাঠ।একটু দূরে দাঁড়িয়ে থেকে পাহাড় যেন পাহাড়া দিচ্ছে নিজের মাঠকে।এখানেও সেই মেঘ পাহাড়ের আকাশকে ছুঁয়ে থাকার চেষ্টা।প্রদীপ এখানে ওদের নামিয়ে দিয়ে গাড়ি পার্ক করল। দুজনে নির্বাক।সামনে সাজানো পার্কের বেঞ্চে বসল।দৃশ্যপট যখন নিজেই কথা বলে,সে কথা শুনতে হয় দর্শককে।ধৃতি-মান সেই দর্শক।বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎ দেখলে দুটো ঘুঘুর মতো পাখি উড়ে এসে, একসাথে মাঠে চড়ে বেড়াতে লাগল। ধৃতি বলল,এরা নিশ্চয় একটি গাঁয়েই থাকে।মানস বলল,নিশ্চিত করে বলতে পারছি না,তবে রকম দেখে তো,তাই মনে হয়।তুই আমার কথায় একটা না একটা খুঁত ধরবিই।কেন রে? হ্যাঁ তে হ্যাঁ মেলাতে পারিস না?ধৃতির ক্ষেপে যাওয়া দেখে হাতটা টেনে নিল মানস।প্রদীপ গাড়ি লক করে হয়তো একটু অন্য কাজ সেরে, এসে দাঁড়াল ওদের সামনে।মানস ওকে জায়গার নাম জিজ্ঞেস করতেই বলল,এ হল আমাদের মিনি পহেল গাঁও। আপনারা বসুন,আমি গাড়িতে আছি,বলে চলে গেল।মানস বলল,ধৃতি দেখ তাকিয়ে! একেই বোধ হয় বলে ‘আকাশ-মাটিতে কানাকানি’।ধৃতি উত্তর দিল না।গভীর ভাবনায় ,সেই আগের মতোই যেন নিজের মুদ্রা দোষে সঙ্গে থেকেও একা হয়ে গেল।কী রে কি হল?কোনো কথা বলছিস না যে!আমি কিছু বলছি তোকে । না।কিছু বলার নেই।মানুষ কতটা নিষ্ঠুর হলে এমন সুন্দর প্রকৃতিতেও মানুষ মানুষকে খুন করতে পারে বল?ধৃতি এত সুন্দর দৃশ্যপটের মধ্যে হঠাৎ এক নিষ্ঠুর রূপের কথা ভেবে মানসকে ইশারায় বলল,’চল্’।এই যে প্রতি মুহূর্তে ধৃতিকে সে অনুভবে ছুঁয়ে দেখে,এটা জানে ধৃতি।মানস একটুও দেরি না করেই ধৃতিকে নিয়ে চলল, প্রদীপের গাড়ির কাছে।
‘এবার আমরা কোথায় যাব প্রদীপ’?জাটিংগা।
এতক্ষন তো জাটিংগাতেই ছিলাম।
হ্যাঁ,এটা জাটিংগাই,তবে সেই পাখির জায়গাটা নয়।
চল।
ওখানে কিন্তু এখন জাটিংগা পাখির দেখা পাবেন না,সে আসতে হবে অক্টোবরে।
ঠিক আছে তবুও একবার দেখি।সেই জায়গাটা একবার দেখে তো আসি।
গাড়ি পাহাড়ের গায়ে গায়ে তুলিতে পথ এঁকে চলে,ওরা দুজনে শব্দে শব্দে বলে চলে-
সব পাখি ঘরে আসে
-সব নদী
ফুরায় এ জীবনের
সব লেনদেন
থাকে শুধু অন্ধকার
মুখোমুখি বসিবার
হাসতে হাসতে দুজনে একসাথে বলে ওঠে ‘ধৃতি-মান রায়’।
প্রদীপ ওদের কবিতা শোনে আর হয়তো মনে মনে বলে, এদের মাথা ফাতা ঠিক আছে তো?একটু পরে বলে,যান এই সেই জায়গা।গাড়ি যেখানে থামল,তার থেকে একটু উপরে উঠে ওরা দেখতে পেল অনেক লোক দাঁড়িয়ে দেখছে এই জায়গাটা।
ধৃতি হঠাৎ বলে ওঠে, আচ্ছা মান্ তোর কি মনে হয় পাখিগুলো একসময় নাগাদের পাখি শিকারের প্রতিবাদ করে এই আত্মহত্যা শুরু করেছিল?
কী যে তোর ভাবনা,আমি বুঝতে পারি না,আজও।
আমার তো মনে হয়,ওদের মতো অবলাকে পেলেই, যখন তাদের খুবলে খেতে ইচ্ছে করে,এর প্রতিবাদ এটা।
আবার এক কথা বলছিস?
মৃত্যুর পর তাদের এই শরীর নিয়ে কি হবে,সেটা দেখতে না চাওয়ার ইচ্ছে থেকেই হয়তো, অবলা পাখিদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত এটা।
ধৃতি!তুই বরং লিটারেচার ছেড়ে এটা নিয়ে কাজ করতে পারিস।
হেঁয়ালী নয় মান্ ,একসময় এই গ্রামেই সারা বছর টিয়া, ময়নার সাথে জাটিংগা উড়ে বেড়াতো।একবার ভাব,তখন কী সুন্দর লাগত!তখন তো মানুষ এদেরকে আলাদা করে ভাবে নি।আজ ওদের আত্মহননের দৃশ্য দেখতে মানুষ ছুটে আসে।কী নিষ্ঠুর মানুষ বল্!এখনো নাকি অক্টোবরের শেষে কোনো এক অমাবস্যায় ওরা আসে দলবেঁধে,আত্মহত্যা করতে।
চল্,এখান থেকে।শেষে তুই আবার না–কথাটা শেষ করতে দেয় নি ধৃতিকে,হঠাৎ এত লোকের মাঝে হাত শক্ত করে টেনে নেয় মানস।বলে, আমার এই দৃশ্য দেখার কোনো দরকার নেই।
এমনিতেই নিয়ত মানুষের ধ্বংসলীলা দেখে আমি ক্লান্ত।এখন আর এই পাখি আসবে না জেনেও সেই আত্মহত্যাকারী পাখিদের দেখতে আবার আসতে হবে বলে,মানুষের কী ইচ্ছে!ধৃতি রাগে ক্ষোভে মানসের দিকে তাকায়।মানস শুধু বলে কুল্।একসময় আমাদেরও এই ইচ্ছে ছিল,তোর মনে পড়ে?আজ ভাবনার আকাশ ব্যাপ্ত হয়েছে বলে,তোর-আমার ভাবনা পাল্টেছে। বলতে বলতে দেখছে, পর্যটকদের মধ্যে অনেকে বিফল মনোরথে ফিরে যাচ্ছে। সবার সাথে ওরাও ফিরে আসে শহরে।
এই জুন মাসে সন্ধ্যা হতে হতে অনেকটাই সময় পাওয়া যায়,এটাই বেশ।তবে ঘন ঘোর বরষার ভয় তো আছেই।
এবার সেখান থেকে গাড়ি ওদের নিয়ে নামিয়ে দিল একটা লেকের সামনে।হাফলং লেক।আশ্চর্য! শহরের উপর এত বড় লেক,ভাবতেই অবাক লাগে।শহরকে ঘিরে সুন্দর সাজানো এই লেকে ছেলে-মেয়েগুলোকে বোটিং করতে দেখে ধৃতি বলল,জানিস মান্ আমার না খুব লোভ হচ্ছে।চড়বি?
চড়।
টিকিট কেটে নিল মানস।
বেশ কিছুক্ষন বোটে ওদের চড়তে দেখে, বেশ কয়েকটা ছেলে মেয়ে নিয়ে বেড়াতে আসা লোকজনও উঠে পড়ল বোটে।ধৃতি বলল,বুঝলি মান্,এভাবেই নিজেদের দিয়ে মানুষের মধ্যে প্রাণের সঞ্চার করতে হয়।যতদিন,যতটুকু সময় থাকব,ততক্ষন আনন্দে বাঁচব।যদি কাল চোখ বুজি।
মানস ধৃতির মুখে হাত চাপা দিল।
হাত সরিয়ে ধৃতি হাসল।
ছেলেমানুষী আর গেল না।
বাজে কথা বলিস কেন?
ঠিক আছে।এই সময়,এই ছুঁয়ে থাকা,এই জলে পাহাড়ে হুটোপুটি ক্ষনেকের হলেও,এইগুলোই তো চিমটি কেটে জানান দেয়
কী?
“তুমি আছো,
আমি আছি।”
ঝিলের উপরে একটা ঝুলন্ত ব্রিজের উপর ওরা যখন হাত ধরাধরি করে ধৃতির গানের সঙ্গে হাঁটছে,এ দৃশ্য অপিরিচিত ট্যুরিস্টদের কাছেও একটা প্রাপ্তি হয়ে রইল।
প্রদীপের ইচ্ছে থাকলেও হাফলং শহরের পরিচিত চার্চ কিম্বা দেবীমন্দির কোনোটাতেই যেতে ওদের মন চাইল না।কিছুক্ষনের জন্য দাঁড়িয়ে দুজনে দেখল রানি মা গাইদিনলিউ এর মূর্তি,এরপর দেখল ডিমাসা রাজকুমারী দিশ্রুর মূর্তি। শুধু ইতিহাসের নয়,এরা নারী শক্তির সংগ্রামের কথা কয়। প্রদীপ ওদের নিয়ে গেল সার্কিট হাউসের ভিউ পয়েন্টে।সেখান থেকেও পাহাড় আর মেঘের সাথে কথা বলল,বেশ কিছুক্ষন।তবে সন্ধ্যা হয়ে আসাতে একটা জারুলের শোভা, খানিক ম্লান হয়ে আসছিল। এতক্ষন পর হঠাৎ ফুল দেখে ধৃতির চিরকালীন উল্লাসের সেই মুখ আবার ধরা দিল, মানসের কাছে।এখান থেকেও দেখা গেল সেই রেল স্টেশন,যেখানে ওরা কাল নেমেছিল। সেই ক্ষেপা ধৃতির ইচ্ছে হচ্ছিল,এক লাফে ওই স্টেশনে পৌঁছতে।কথাটা বলতেই মানস যেখানে ওরা দাঁড়িয়েছে,তার একদিক জুড়ে লোহার রেলিং এর ব্যারিকেডটাকে দেখিয়ে দিল।আস্তে ধীরে সন্ধ্যা নেমে আসছে।পাহাড়ের গায়ে গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা,লজ,হোম স্টে,অফিসঘর কিম্বা আবাসনগুলোতে আলো জ্বলে উঠতেই ওরা যেন অন্য ভুবনে চলে এল।
ওরা দুজন শুধু অন্ধকারে মুখোমুখি, আর সামনে পেছনে আলোকমালা। সব রাত কী আর শরীর ছুঁয়ে দেখার? কিছু রাত তো এমনই শুধু মুখোমুখি বসেও নিজের সাথে নিজের কথা বলার।আবার যেন সেই অমোঘ ক্ষন ফিরে পেল ওরা দুজন।হঠাৎ মানসের কথায় চটকা ভাঙল।ডাকল প্রদীপকে।ডিনার কোথায় করব?প্রদীপ বলল,সে আমি নিয়ে যাচ্ছি।চলুন, না কি আর কিছুক্ষন বসবেন?ধৃতি এবার এগিয়ে এসে বলল,আর না,এবার একটু কফি না খেলে আর পারছি না।ভাই প্রদীপ,তুমি আমাদের কাছে-পিঠে কোথাও নিয়ে চল,যেখানে একটু কফি খেতে পারব।প্রদীপ মাথা নেড়ে ওদের গাড়িতে তুলে নিল।শহরের পথেই হঠাৎ একটা মল দেখে, গাড়ি থামাল ধৃতি।টেনে নামিয়ে নিল মানসকে।প্রদীপ যদিও বলল,এখানে কফি পাবেন না,এ তো শুধু জামা কাপড়ের দোকান।
আর কোনো কথা নয়, হিড়হিড় করে মানসকে নিয়ে ঢুকে গেল মলে।কী করে যে একটা জামা কাপড়ে তুই বেরুলি সেটা দেখেই আমার গা বমি করছিল।অপদার্থ একটা।মানসকে ধৃতির বকা শুনে, ধৃতি যে জেনে বুঝেই নেমেছে, সেটা প্রদীপ বুঝল।
জামা কাপড়ের একটা ব্যাগ নিয়ে আবার গাড়িতে উঠল। পাহাড়ের ঢালু পথে একটু নেমে,সুন্দর সাজানো একটা ঘরের সামনে গাড়ি পার্ক করল। ইংরেজিতে লেখা ‘সংখো রেসটুরেন্ট’।বলল,আপনারা নীচে অর্ডার দিয়ে ছাতে উঠে ইচ্ছে করলে হাফলং ভিউ দেখতে পারেন।
ভেতরে ঢুকে রেস্তোরার ছেলে-মেয়েগুলোকে দেখে মনে হল,ওরা যেন চাইনিজ কোনো রেস্তোরায় ঢুকেছে।যদিও সবাই কথা বলছে,হিন্দি আর বাংলা মিশিয়ে।কফি আর চিকেন পকোরা অর্ডার দিয়ে হোটেল বয়দের দেখানো পথে ছাদে উঠে, আলো-আঁধারি ডিমা-হাসাও দেখলো দুজনে কুজনে।
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতে পা বাড়ালো রাত।ওরা গাড়িতে চেপে উঠে এল,আই লাভ ডিমাহাসাও-এর সেই লজে।প্রদীপ ওদের নামিয়ে দিয়ে পরের দিন সকাল আটটায় তৈরি থাকতে বলে চলে গেল নিজের পথে।
ঘরে ঢুকে মানস প্রায় দৌড়ে ওয়াসরুমে গেল।নতুন জামাকাপড়ের ব্যাগটা ছুড়ে বিছানায় ফেলল।ধৃতির হাসি আর ধরে না।শুধু বলল, জামাটা সামলে।উত্তর দিল না মানস।একে একে দুজন দুজনের আড়ালে আবডালে পোশাক বদলে রাতে নিজেদের জীবনের কথা আরবার বলার জন্য মনে মনে তৈরি হল।কলিং বেল বাজল। ডিনার নিয়ে এল কি?