শুক্রবার | ২১ আগস্ট ২০২৬

ধৃতি-মান

 ধৃতি-মান

শুভাশিস চৌধুরী

পর্ব-১

এই পথে মানস আগে কখনো যায় নি।এভাবে বাড়ি থেকে না বলে ক’য়ে, হঠাৎ বেপাত্তা হওয়ার কথা যে মাথায় আসে নি,তা ঠিক নয়।যতবারই ভেবেছে,মা বাবার পিছু টান, আর নিজের পরিচিতির কথা ভেবেই, এই ধরণের উটকো সিদ্ধান্ত নেয় নি মানস। এলাকায় ভালো ছেলে,ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়।এই পরিচয়,ছোট্ট এই শহরে একজন বছর পঁয়তিরিশের যুবকের জন্য যথেষ্ঠ।কাল রাতে মায়ের সাথে একটি বারও কথা বলতে ইচ্ছেই হয় নি মানসের।আসলে ওর বিয়ে নিয়ে পরিবারের লোক কোনো না কোনোভাবে বিরক্ত করবেই।এ নিয়ে যতবার বাড়িতে বলছে, ‘আমাকে একটু ভাবতে দাও’ কিন্তু মা শোনে কই।বাবা অবশ্য চুপ চাপ।কিন্তু মায়ের চাপের কাছে তো সবসময় ঠিক থাকতে পারে না।তাই মাঝে মধ্যে বলে ফেলে। কাল রাতের বাড়াবাড়িটা মানসকে এই পালানোর সিদ্ধান্ত নিতে যেন বাধ্য করেছে।

বিবাহিত জীবনের স্বপ্নটা মানস যেভাবে দেখেছে, দেখতে চায়, সে তো তার মা-বাবার তিরিশ বছরের দাম্পত্য জীবনের সঙ্গে মেলাতে পারে না। ছেলে মেয়ে নিয়ে সংসারে মাঝে মাঝেই এই ঝুট ঝামেলা,ও ভাবতে পারে না।।মায়ের এবং বাবার বাড়ির লোকেরা এইসব ব্যাপারে বোঝাতে চেষ্টা করে,তাই সে পালিয়ে বেড়ায়। একটাই বোন, বিয়ে হয়ে গেছে ওরই বন্ধুর দাদার সাথে।পরিচিত হলেও সামাজিকভাবেই বিয়ে।দুজনেই নেট ক্লিয়ার করে কলেজে পড়াচ্ছে।দুজনই উত্তর ত্রিপুরার একটা কলেজে পড়ায়।

মানস যাদবপুর থেকে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে মাষ্টার্স শেষ করে এখনও গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত। ইউ জি সি নেট ক্লিয়ার করে এই দূর্মূল্যের বাজারেও ইউনিভার্সিটিতে আপাতত ফিক্সড পে তে পড়ানোর কাজটা পেয়েই গেল। আগরতলা থেকে টুয়েলভের পর যাদবপুরে প্রায় দশ বছর কাটিয়েছে মানস।ছুটিতে বাড়িতে আসে মাস্টার্সের পর থেকে।তখন যদিও ওর গবেষনার কাজ চলছিল।এর আগে হস্টেল জীবনের বাইরে ওর ছুটি ছাটা সবই কাটতো,🌹🌹 কলকাতার দমদম স্টেশন থেকে নাগেরবাজারের পথে ছাতাকল এলাকায় মামার বাড়িতে।
মাষ্টার্সের পর থেকেই কয়েক দিনের ছুটিতে যখনই আগরতলা নিজের বাড়িতে আসত,তখন থেকেই একলা বাড়িতে নিজের ঘরে থাকত, বই আর ল্যাপটপে মুখ গুঁজে।মাঝে মধ্যে উত্তর বা দক্ষিন জেলার বিভিন্ন জায়গায় যেত,ওই সব এলাকার মানুষের কৃষ্টি সংস্কৃতি নিয়ে জানার জন্য।মানসের বাবা,রিটায়ার্ড সরকারী আধিকারিক, সে সব এলাকায় হোটেল বা সার্কিট হাউসে দু এক দিনের থাকার ব্যবস্থা করে দিত।এই সব ওর গবেষণার কাজেই। বই ওর বন্ধু বটে কিন্তু তাই বলে অন্য কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখবে না,কথা বলবে না!আত্মীয় স্বজনদের সাথে যোগাযোগ রাখবে না,এমনটা ছিল না মানস।
আজ সকাল থেকেই ঘরে নেই মানস। সে কী! ফোন তো ঘরে,তবে!ফোন না নিয়ে,তবে কি সকালে হাঁটতে গেল? সে অবশ্য মাঝে সাঝে ইচ্ছে হলে যায়। ফিরে আসে সাতটা সাড়ে সাতটার মধ্যেই।এই দৃশ্য প্রথম দেখে,মানসের মা। মানসকে বাড়িতে দেখা যাচ্ছে না বলতেই বাবার সোজা উত্তর,’এসে যাবে।হাঁটতে গেছে হয়তো।সব কিছুতেই তোমার বেশি বেশি।যাও তো নিজের কাজে’।

পরিচিত বইয়ের ঝোলা কাঁধে স্টেশনে ঢুকে একটা প্ল্যাটফর্ম টিকিট কেটে, মানস ট্রেনে চাপল। মানসের দাড়ি-আর চশমার ফাঁকে প্রখরতার ছাপ স্পষ্ট।কোন্ ট্রেন সে দেখল না।জেনারেল কম্পার্টমেন্টে না,একটা রিজার্ভ কামড়ায় উঠে জানলার ধারেই বসল।টি.টি.এলে, বলে কয়ে কনফার্ম করিয়ে নিতে পারবে, এতে ওর বিশ্বাস আছে।ইংরেজ চলে গেছে সেই কবে,তবু মিষ্টি করে ইংরেজিতে কথা বললে টি.টি. একটু মর্যাদার সঙ্গে আড়ালে কিছু নিয়ে,ঠিক বসিয়ে দেয়। অনেক রিজার্ভ সিট যে খালি থাকে, তার রানিং স্ট্যাটাস একমাত্র টি.টি.র কাছেই থাকে।সে অভিজ্ঞতা ওর আছে।আর যাই হোক টিকিট তো আছে। ধৃতির সঙ্গে থাকতে থাকতে এই বদ খেলাগুলো ওর করায়ত্ব করতে বেগ পেতে হয় নি।কাজেই ভোরের আলোর সাথে সাথে গাছ-নদী-মাঠ-পাহাড় একে একে ছেড়ে যেত লাগল মানস।
কী এক আনন্দে! মন গাইছে “আজ যেমন করে গাইছে আকাশ,তেমনি করে গাও গো”।এই সব গান ধৃতির শিরায় শিরায় বয়। ধৃতি ওর মনে নয়, মাথার চুল থেকে পায়ের নখের সঙ্গে গাঁথা।সে কথা বলা যায় না।শোণিতে বয়। গানের সুর ভাঁজতে ভাঁজতে হঠাৎ চোখে পড়ল, যে স্টেশনটা ও ছেড়ে গেল নাম তার বদরপুর।প্রচুর লোক উঠছে ধাক্কাধাক্কি করে।না, মানসের আর কোনো চিন্তা নেই,পকেটে বেশ কিছু টাকা না থকলেও এটিএম আছে।তাতে ওর স্কলারশিপের টাকা মোটামুটি মন্দ নেই। যেখানে ট্রেন থামুক ওর অসুবিধায় পড়তে হবে না।ট্রেন এর পরের স্টেশনে থামতেই বেশ কিছু যাত্রী উঠল,যাদের চোখমুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে,এদের ভাষা বা পোশাক-আশাক ঠিক বাঙালিদের মতো নয়।তবে ওরা কোন প্রদেশের?ওরা কেউ মণিপুরী,কেউ বা আসামিজ, আবার কিছু বাঙালি আছে। তবে কথার সুরে বুঝতে অসুবিধে নেই, ওরা কাছাড় বা শিলচরের মানুষ।মানস একবার শুধু দেখে, আবার জানালায় চোখ রাখল। যাত্রীদের সব কথা শুনে এটাই ওর আন্দাজ হল।স্টেশনের নাম দেখল সুকৃতিপুর।

নতুন পথে যেতে সে জায়গা বা স্টেশনের নাম জানতে চাওয়াটা, মানসের একটা নেশা।এই নেশা কলেজের সেকেন্ড ইয়ার থেকে গেঁথে দিয়েছে ধৃতি।ধৃতিকে ছাড়া ও এক কদমও চলতে পারত না।ও ধৃতির গায়ে লেপ্টে থাকা পোষা বেড়ালের মতো। এক সময় ইউনিভার্সিটিতে ওদের নাম হয়ে গেল ধৃত-মান।নিজের সঙ্গে নিজেকে নিয়ে দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেল হিলারা,বিহারা দুটো স্টেশন।এর মধ্যেই একজন দুজন করে অন্য কম্পার্টমেন্ট থেকে ওর বগিতে এসে বসছে। মানসের সেই পুরাতন খেলায় টি .টি. র সঙ্গে জিতে ওর কনফার্ম সিটে শুধু বসেই নি,বেশ দুবার বিনি পয়সায় কফিও খেয়ে নিয়েছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস এবারে ওর পথের সঙ্গী। ওর উল্টো দিকের সিটটা খালি।

চন্দ্রনাথপুর আসতেই টি.টি.র পেছনে মেয়েটি কে?ও তো নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ও কি এদিকেই আসছে?হ্যাঁ।এদিকেই তো।পরনে ঢাকাই শাড়ি, চোখে চশমা কাঁধে চিরকালীন কাপড়ের ঝোলা আর ওর থেকে ভারি একটা ট্রলি নিয়ে এল।টি.টি.ই ওর সেই ট্রলি ওপরের বাঙ্কারে তুলে দিল।’বহুত দিক্কত হুয়া আপকো,কভি ভি ইতনা দের মৎ কিজিয়ে ম্যাম।ফিরবি সিট আপকো মিল তো গায়া’। টি.টি.র কথার উত্তরে,’থ্যাঙ্ক ইউ’বলে, প্রায় ঘেমে নেয়ে মেয়েটি বসল,ওর উল্টো দিকের খালি সিটেই।না এতক্ষণ মানসের দিকে তাকানোর কোনো চেষ্টাও করে নি।বসল।ঝোলা থেকে জলের বোতল বের করল।খেল।এবার ঝোলা থেকে “দেশ”বের করল। মুখ ঢেকে গেল ‘দেশে’। মানস বই এর ফাঁকে আড় চোখে সব দেখেই জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল। বাকি সময় মানিকে মুখ ঢেকে রাখছিল।পড়ছিল বহুবার পড়া “জননী”।ঝোলা আর বই সঙ্গী মানস আজও খালি হাতে নয়।

এক সময়ে মানস ছাড়া কোনো ছেলে বন্ধুর সাথে ওর কথা বলা ছিল অলিখিত বারণ। সেটাও ঠিক করেছিল ধৃতি।একদিন ওদের ক্লাসেরই সুরমা লাইব্রেরিতে যাওয়ার পথে মানসের হাত ধরে যাচ্ছিল ব’লে,কানে কানে কথা বলার ছলে,মানসের কান কামড়ে দিয়েছিল।শেষে নিজেরই ব্যাগে থাকা ওয়াসপ্রুফ বেন্ডেড লাগিয়ে দিয়েছিল।কানের সেই দাগ বেশ কিছু দিন মাথার চুল আঁচড়ে ঢেকে রাখত মানস।আর সবাই যখন সেকথা জেনে গেছিল,কী রগরটাই না হয়েছিল।
মানস কিছুতেই মেলাতে পারছে না,ধৃতি এই পথে কেন?ও কি তাহলে ভুল গাড়িতে উঠে পড়েছে? না।এ হবে কেমন ক’রে?তবে মানস ছাড়া ও একা ঘুরে বেড়িয়েছে পুরুলিয়ার বিভিন্ন গাঁ গেরাম।সে তো সেই গবেষণার কাজেই,প্রথম দিক।তখন মানস বেছে নিয়েছিল নিজের রাজ্যটাকে।যদিও পুরুলিয়াতেও ওর যেতে হতো মাঝে মধ্যে।কেননা দুই অঞ্চলের প্রচলিত উপকথার তুলনামুলক আলোচনা ছিল ওর গবেষনার বিষয়।মানস পুরুলিয়াতে ওর সাথে যেতে পারবে এই ভেবেই বিষয়টা নিয়েছিল।সেও ধৃতির জোড়াজুড়িতেই।ধৃতি অন্ধকারকে ভীষন ভয় পেত।ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন যতবারই ওরা দল বেঁধে সিনেমা,নাটক কিম্বা গানের অনুষ্ঠান দেখতে গেছে,হলে আলো নিভলেই ধৃতি মানসের হাত এমন চেপে ধরে থাকত যে, সে হল থেকে বেড়িয়ে বেশ কয়েকবার নিজের হাত ঝেরে, বশে আনত।সে নিয়েও সবাই হাসাহাসি করত।তা ধৃতি পাত্তাই দিত না।সেই সব কথা কি ধৃতির মনে আছে?মাত্র তো কয়েক বছর আগের কথা!
পরবর্তী স্টেশন ‘দামছড়া’ পেরিয়ে যেতেই পাহাড়ি পথে হঠাৎ একটা সুরঙ্গে ঢুকে গেল ট্রেন।একটা ঝাঁকুনিতে মানসের হাত থেকে বইটা পড়ে গেল।ধৃতির ‘দেশ’ সরে গেল।সকাল দশটাতেই রাতের অন্ধকার নেমে এল।কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধৃতি এক ঝটকায় মানসের হাতটা টেনে চেপে ধরে ফেলল।বান্দরখাল স্টেশনে অন্ধকার কাটতেই দুজনে মুখোমুখি ধৃতি-মান।
এতটা আশা করে নি,ওরা কেউ।এও কি সম্ভব?আজ কত বছর ফোনে পর্যন্ত কোনো যোগাযোগ নেই!কিন্তু এই আঁধারে মানসের হাত যেভাবে চোখ বন্ধ করে চেপে ধরেছে, সে তো ধৃতি ছাড়া আর কারো হাত হতেই পারে না।সুরঙ্গ পেরোতেই ধৃতি চোখ খুলে নিস্পলক তাকিয়ে রইল মানসের দিকে।পাশে বসা সবাই যে ওদের দেখছে তাতে ওদের ভ্রুক্ষেপ নেয়। সম্বিত ফিরল, মানসের কথায়।
কী রে! এখনো তোর আঁধারের ভয় গেল না?
না রে!এ কি আর যাবার?তুই আছিস আমার সাথে, এই ভাবনাটা তো নিয়ে যেতে পারবি না বল?আশেপাশে তাকিয়ে ধৃতির হাতটা ছাড়িয়ে দিল মানস।
সেই এত বছর আগে ফিরে গিয়ে, ধৃতি বলল,’হতচ্ছাড়া,মর্কট,পাজি তুই?এ পথে কোথায়’?
‘স্বভাব যায় না ম’লে,সেই তো তুই আমারই রয়ে গেলি।জা- নি- না।উচ্ছাসের সঙ্গে উত্তর দেয় মানস।তুই?

ধৃতি বলে,আসাম ইউনিভার্সিটিতে একটা সেমিনার ছিল,ফেরার পথে ইচ্ছে হচ্ছে একটু পথে দেরি করি।
মানসকে কিছু বলতে দেয় না ধৃতি।যেন ওকে পেয়েছে এটাই ওর প্রাপ্তি।সেই পুরোনো ইশারা।সেই হেঁয়ালি।

দেখতে দেখতে তিনটে স্টেশন ভয়ে ভয়ে পেরুলো ধৃতি কেন না,এর মধ্যে বেশ কয়েকবার সুরঙ্গে ঢুকেছে রেল।আর সেই ভয়ানক অন্ধকারে শক্ত করে মানসের হাত চেপে রাখা।জাটিংগা লামপুর স্টেশন দেখে, সেই পাখির কথা মনে পড়তেই বলল,”মান্ নামবি?চল্ জাটিংগায় নেমে পড়ি।সেই যে পাখিদের সুইসাইড স্কোয়াড-আমরা তো কতবার আসতে চেয়েছিলাম,আজ যখন এসেই গেছি,চল নামি’।চট করে দাঁড়িয়ে নামতেই যাচ্ছিল ধৃতি।মানস চারিদিকের লোকজনকে দেখছে আর ভাবছে,এই পাগলকে সে কী বলবে?ও জানে,বেড়ানো-পাগল ধৃতি একবার যদি স্থির করে,তবে ওকে নড়ানো মুশকিল।মানস বলল,’আরে আরে দাঁড়া, কী করছিস?এখানে এটা দাঁড়াচ্ছে না তো, পড়বি। পড়ে ভেঙে-চুরে মরবি।
একটু বস’। বলতে বলতেই এসে গেল দীর্ঘ একটা সুরঙ্গ পথ,পাশের সিটের বয়স্ক ভদ্রলোক বলছিল,’ম্যাডাম!এটা কিন্তু তেরো কিলোমিটার।এটা শেষে হতে অনেকটা সময় লাগবে।তবে এরপর নিউ হাফলং।অনেকটা সময় দাঁড়াবে মনে হয়’। এই সুরঙ্গের অন্ধকারে ধৃতি, মানসের কানে কানে বলল,চল না দুজনে নেমে পড়ি আরবার!
ট্রেন থামল নিউ হাফলং স্টেশনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *