সিনেমার প্রতি আজীবনের ভালোবাসার কথা জানালেন পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়
আনন্দিতা সরকার
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয়ের মাধ্যমে বাংলা সিনেমাকে সমৃদ্ধ করেছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। এবার শিল্পজগতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পেলেন পদ্মশ্রী সম্মান। সম্মান গ্রহণের পর অভিনেতার কথায় উঠে এল সিনেমার প্রতি তার গভীর ভালোবাসা, পরিবারের অভিনয়-ঐতিহ্য এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদের বার্তা।
অভিনয় জীবনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বাংলা সিনেমার দর্শকদের কাছে ‘বুম্বাদা’ শুধুই একজন অভিনেতা নন, তিনি এক আবেগের নাম। প্রায় ৪০০-এরও বেশি ছবিতে অভিনয় করে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে। ‘মনের মানুষ’, ‘চোখের বালি’, ‘অটোগ্রাফ’, ‘জাতিস্মর’-এর মতো ভিন্নধর্মী ও প্রশংসিত ছবিতে তার অভিনয় আজও দর্শকদের মনে বিশেষ জায়গা করে রয়েছে। বাণিজ্যিক ছবি থেকে সমান্তরাল সিনেমা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজের অভিনয় দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি।
শিল্পক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পদ্মশ্রী সম্মান পেলেন অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। এই বিশেষ দিনে বাঙালি শিল্পীর তৈরি সুতোর কাজ করা পাঞ্জাবিতে সেজে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন প্রসেনজিৎ। সম্মান গ্রহণের পর এক সাক্ষাৎকারে নিজের অনুভূতির কথা প্রকাশ করতে গিয়ে অভিনেতা জানিয়েছেন, পদ্মশ্রী সম্মানে সম্মানিত হয়ে তিনি ভীষণ খুশি। একজন অভিনেতা হিসেবে ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করেছেন। এই দীর্ঘ কেরিয়ারে তার সফলতার জন্য তিনি আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন ভারত সরকারকে, দর্শক এবং দেশের মানুষদের।
সিনেমাকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় বলেই মনে করেন অভিনেতা। তার কথায়, সিনেমা এমন একটা জিনিস, যা থেকে যায়। তিনি বিগত ৪০ বছর ধরে এই মাধ্যমের সঙ্গে জড়িত। তার বাবা বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়-এর কথা উল্লেখ করে জানিয়েছেন, তিনি বাংলা ও হিন্দি— দুই চলচ্চিত্র জগতেই নিজের পরিচিতি তৈরি করেছিলেন। প্রসেনজিতের কথায়, তাদের পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম অভিনয় ও বিনোদনের জগতের সঙ্গে যুক্ত। মানুষকে বিনোদন দেওয়ার জন্যই তারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। আবেগঘন কণ্ঠে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, অভিনয় ছাড়া তিনি আর কিছুই করতে পারেননি।
ভারতীয় সিনেমার বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ নিয়েও আশাবাদী প্রসেনজিৎ। তার মতে, ভারতীয় চলচ্চিত্র এখন এক নতুন সময়ের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। প্রযুক্তি, গল্প বলার ধরন, অভিনয় এবং নির্মাণ— সব ক্ষেত্রেই এসেছে বদল। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও সহযোগিতাও চলচ্চিত্র জগতকে আরো শক্তিশালী করছে বলে মনে করেন তিনি। বিশেষ করে স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন অভিনেতা।
তিনি আরও বলেন, খুব শীঘ্রই ভারতীয় সিনেমা আন্তর্জাতিক স্তরে আরো বড় জায়গা করে নেবে। ভবিষ্যতে ভারতীয় সিনেমাও বিশ্বদরবারে আরও শক্তিশালী পরিচয় তৈরি করবে বলে তার বিশ্বাস। তবে এই প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দেন, ভারতীয় সিনেমা মানেই শুধুমাত্র হিন্দি চলচ্চিত্র নয়। বাংলা, মারাঠি, পাঞ্জাবি-সহ বিভিন্ন ভাষার সিনেমায় অসাধারণ কাজ হচ্ছে এবং বিপুল প্রতিভা ছড়িয়ে রয়েছে দেশের নানা প্রান্তে। তার মতে, এই সমস্ত প্রতিভাকে একসঙ্গে তুলে ধরতে পারলে ভারতীয় সিনেমা আরও সমৃদ্ধ হবে।
আগামী প্রজন্মের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশাবাদী তিনি। তার মতে, ভবিষ্যতে বিভিন্ন ভাষার শিল্পীরা একে অপরের ভাষার ছবিতে আরও বেশি কাজ করবেন। এর ফলে শুধু শিল্পীদের সুযোগই বাড়বে না, ভারতীয় সিনেমাও হয়ে উঠবে আরও বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ।
দীর্ঘ অভিনয় জীবনে অসংখ্য জনপ্রিয় চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। এবার পদ্মশ্রী সম্মানে সম্মানিত হয়ে তার সেই সাফল্যের মুকুটে যুক্ত হল আরও এক গর্বের পালক।