শনিবার | ৩০ মে ২০২৬

রহস্য, অরণ্য আর গুপ্তধনের রোমাঞ্চে জমজমাট ‘সপ্তডিঙার গুপ্তধন’

 রহস্য, অরণ্য আর গুপ্তধনের রোমাঞ্চে জমজমাট ‘সপ্তডিঙার গুপ্তধন’

রহস্যের গন্ধ, সুন্দরবনের অন্ধকার অরণ্য আর একের পর এক ধাঁধা— এই তিনের মিশেলে তৈরি সপ্তডিঙার গুপ্তধন এক নিখাদ অ্যাডভেঞ্চার অভিজ্ঞতা। ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ছবিটি শুধু গুপ্তধনের খোঁজ নয়, বরং দর্শককে টেনে নিয়ে যায় টানটান উত্তেজনা আর অজানার রোমাঞ্চে।
ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সপ্তডিঙার গুপ্তধন’ বাংলা ছবির জনপ্রিয় গুপ্তধন-সন্ধানী ধারাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল। সাহিত্য হোক বা সিনেমা— ট্রেজার হান্টের গল্পের আকর্ষণ চিরকালীন। রহস্য, বিপদ, ধাঁধা, বিশ্বাসঘাতকতা আর এক নির্ভীক বুদ্ধিমান অভিযাত্রীর উপস্থিতি দর্শককে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত টানটান উত্তেজনায় বেঁধে রাখে। এই ছবিও সেই পরিচিত ছক মেনেই এগোয়, তবে তার উপস্থাপনা ও আবহ নির্মাণে রয়েছে আলাদা মাত্রা।
শৈশবে দেখা বহু গোয়েন্দা ও গুপ্তধন নির্ভর গল্পের স্মৃতিকে উসকে দিয়েছে এই সিনেমা। গল্পের প্রতি এক বিশেষ টান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত এই সিনেমা। ‘সপ্তডিঙার গুপ্তধন’ দর্শককে নিয়ে যায় রহস্যময় অতীতের এক অরণ্যময় অভিযানে। তবে এই ছবির গুপ্তধন নিছক অলীক নয়; বরং তা মানুষের নাগালের মধ্যে এসে দাঁড়ায়। সেই গুপ্তধনের শেষ পরিণতি কী, কার হাতে তা পৌঁছয় এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়— সেই উত্তর পেতে হলে ছবিটি দেখতে হবে।
ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগের তিনটি ছবি— ‘গুপ্তধনের সন্ধানে’, ‘দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন’ এবং ‘কর্ণসুবর্ণের গুপ্তধন’–এর মতো এই ছবির কেন্দ্রেও রয়েছে অক্সফোর্ড-ফেরত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সুবর্ণ সেন ওরফে সোনাদা। চরিত্রটিতে আবারও অনবদ্য আবির চট্টোপাধ্যায়। তার সংযত অভিনয় ও ব্যক্তিত্ব চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। যোগ্য সঙ্গত দিয়েছেন আবিরলাল চরিত্রে অর্জুন চক্রবর্তী এবং ঝিনুকের ভূমিকায় ইশা সাহা। অর্জুনের স্বতঃস্ফূর্ততা ও ইশার আধুনিক উপস্থিতি ছবিতে বাড়তি প্রাণ জুগিয়েছে।
ছবির অন্যতম শক্তি এর ধাঁধা নির্মাণ। একের পর এক রহস্য দর্শককে ক্রমাগত সতর্ক রাখে। বিরতি পর্যন্ত গল্প ধীরে ধীরে এগোলেও, দ্বিতীয়ার্ধে গতি ও চাপ হঠাৎ বেড়ে যায়। ফলে দর্শকের মনোযোগ এক মুহূর্তের জন্যও এদিক-ওদিক হওয়ার সুযোগ নেই। এই ছবির সাফল্য এখানেই যে, এটি দর্শককে শক্ত করে চেয়ারে বসিয়ে রাখতে সক্ষম।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য রজতাভ দত্ত ও কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। রজতাভের ভয়ঙ্কর হাসি ও বহুরূপী উপস্থিতি ছবির ভিলেন চরিত্রকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। অন্যদিকে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় ছবির শেষ পর্বে এমন এক তীব্রতা নিয়ে হাজির হন, যা গোটা ছবির আবেগকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
তবে ছবির আসল নায়ক যেন সুন্দরবনের গভীর অরণ্য। সেই রহস্যময় প্রকৃতিকে ক্যামেরায় অসাধারণভাবে ধরেছেন চিত্রগ্রাহক সৌমিক হালদার। তার ক্যামেরা শুধু দৃশ্য ধারণ করেনি, বরং এক অশান্ত, আদিম এবং বিপজ্জনক প্রকৃতিকে জীবন্ত করে তুলেছে। এই আবহকে আরও জোড়ালো করেছে ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তর আবহসঙ্গীত। ছবির উত্তেজনা ও রোমাঞ্চ অনেকটাই তার সুরের উপর নির্ভরশীল।
সব মিলিয়ে ‘সপ্তডিঙার গুপ্তধন’ নিখাদ পারিবারিক বিনোদনের ছবি। শিশুদের নিয়ে দেখলে ছবির রহস্যভ্রমণ আরও উপভোগ্য হয়ে ওঠে। প্রেম, হাসি বা হালকা মুহূর্তের চেয়ে এখানে বেশি জায়গা নিয়েছে টানটান উত্তেজনা ও অভিযান। দুই ঘণ্টার জন্য দর্শককে সম্পূর্ণ অন্য এক জগতে নিয়ে যেতে সক্ষম এই ছবি।
আনন্দিতা সরকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *