গল্প : অধিকার
মৌসুমী ভট্টাচার্য্য
তিনবাড়ির কাজ শেষ করে বেলা প্রায় বারোটা নাগাদ বাড়ি ফিরে ধপাস করে চৌকাঠে বসে পড়ে মায়া। আঁচল দিয়ে মুখ, ঘাড় মুছল। গরমের দিনে এত ঘাম হয়, জলতেষ্টা পেতে থাকে। কাজের চাপে জলও খাওয়া হয় না। একটি বাড়িতেও এক কাপ চা-ও দেয় না। খিদেয় চোখে অন্ধকার দেখছে। প্রস্রাব শুকিয়ে নালীতে প্রচণ্ড জ্বালা করছে। এখন রান্না করতে হবে নিজেদের। কোন সকালে বেরিয়েছিল! তখনো এরা ওঠেনি। জোর করে মেয়েটাকে তুলেছিল। গরিবের সংসারে জন্ম! এই বারো বছরেই কত কাজ করতে হয় মেয়েটাকে। ডাগরটি হয়ে উঠছে। ছেলে বড়, মাধ্যমিক দেবে। কত চাহিদা উঠতি বয়সি ছেলে মেয়ের! কিছুই মেটাতে পারে না। বখেই কি যাচ্ছে ছেলেটা! স্বামী গোপাল কোনো কাজে টিকে থাকে না। হঠাৎ সে কীর্তনীয়া দলের সঙ্গে ভিড়ে কোথায় কোথায় চলে যায়! সংসার কী করে চলবে, এসব ভাবেও না। তাই তো তাকে কাজ ধরতে হয়েছে।
উঠোনের অপর প্রান্তে দেওর থাকে পরিবার নিয়ে। কী সুন্দর গুছিয়ে চলে! জা-কে তো কাজ করতে হয় না। দু’টি মেয়েকে পড়াশোনা শেখাচ্ছে। সম্পূর্ণ বিপরীত মায়ার সংসার থেকে। মায়া ঠিকে কাজ করে বলে জা তাকে তাচ্ছিল্য করে। ভালো করে কথা বলে না। দাওয়ায় বসে মায়া দেখছে, জা লক্ষ্মী উঠোনে নাইলনের দড়িতে কাপড় মেলে দিচ্ছে। এত কাপড়চোপড় ধুয়েছে লক্ষ্মী যে মায়াদের জন্য আর জায়গা নেই। মনে মনে লক্ষ্মীকে গাল পেড়ে, জ্বলন্ত দৃষ্টি ছুড়ে ঘরে ঢুকে ঢকঢক করে জল খেল। কোমরে হাত দিয়ে রান্নাঘরের চারপাশে চোখ বোলাল। বেতের চুপড়িতে কয়েকটি পোকা খাওয়া সরু বেগুন আর কয়েকটি আলু পড়ে আছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বটি নিয়ে বসে গেল। চাল ধুয়ে গ্যাসের উনানের একটাতে ভাত, আরেকটিতে মুসুর ডাল চাপিয়ে, তরকারি কাটতে লাগল। মুসুর ডালের যা দাম হয়েছে, ক’দিন খাওয়া যাবে, এ ভাবার বিষয়। আর ব্যাটাকে দেখো, কেমন ধর্মের ষাঁড় হয়ে ঘুরে বেড়ায়। অথচ সব কাজই ভালো জানে। বাগানের কাজ, সেলাইয়ের, ইস্ত্রি। কিন্তু কোনোটাতেই টেকে না। তবুও রিনি দিদিমণির জন্য গ্যাসের চুলা, চাপাকল এসব করতে পেরেছিল। নইলে উনুন দিয়ে রান্না করা, উফফ! আর জ্বালানি! কেনার সাধ্য আছে! এইটুকুনি তো ভিটে, তাতে দু’ ভাইয়ের ঘর, মাঝে উঠোন বাদে জায়গা কোথায় যে গাছ লাগাবে? যে ক’টি ছিল, দেওরের ঘর তুলতে কাটা পড়েছিল।
মায়ার কষ্ট দেখে রিনি দিদিমণি টাকা দিয়েছিল কল বসানোর ও গ্যাস আনার। মাসে একশ কি পঞ্চাশ টাকা কাটতেন ওর মাইনে থেকে। সকালে গেলেই হতো। আগে চা বিস্কুট খেয়ে, এনার্জি নিয়ে কাজ শুরু করত। স্বাধীনভাবে রান্না সেরে, ঘরের বাকি কাজ সারলে রিনি জোর করে ভাত খাইয়ে দিতেন। ছেলেমেয়ের জন্য বাটি দিয়ে তরকারি, মাছ বা ডাল দিতেন। ওরা খেয়ে স্কুলে যেত। কত কত শাড়ি, ব্লাউজ দিতেন! ইস! কাজটি ছেড়ে যে কী ভুল হয়েছে, হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। মাঝে মধ্যে ছেলেটাকে পড়ানো, এসব তো ফাউ ছিলই। বোকার মতো রাগ করে ছেড়ে এখন আপশোশ হচ্ছে। কথায় বলে ‘দুধ দেয় গরুর লাথি সয়’। রিনির রাগ বেশি, সয়ে নিলে সব ঠিকই ছিল। কেন যে সেদিন মায়ার ধৈর্যচ্যুতি ঘটল, রুক্ষ স্বরে চোপা করল। রিনি দিদিমণির শরীর ভালো ছিল না। অনেকদিন ধরেই গাইনি সমস্যায় কষ্ট পাচ্ছিলেন, অতিরিক্ত স্রাবে রক্তাল্পতা, লো প্রেসার থাকত। সেদিনও এমনি ছিল। রিনি স্কুল থেকে ফিরে শুয়েছিলেন। অপেক্ষায় ছিলেন কখন মায়া গিয়ে এক কাপ চা দেবে, একটু গরম জল! সেদিন বিকেলেই মায়ার এক সই এসে ওকে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিল। রাত হয়ে যাওয়াতে আর সেদিন যাওয়া হয়নি মায়ার। দু’বেলাই যায় সে। পরদিন সকালে গেলে রিনি রাগ করে বলে, “তোমার কাণ্ডজ্ঞান কবে হবে মায়া? সকালে দেখে গেছ যে আমার শরীর খারাপ! স্কুলে যেতেও পারিনি। তোমার এখনই বেড়াতে হবে? একটু মায়াও কি হয় না!” মায়া ঘাড় গোঁজ করে বাসন ধুচ্ছিল। রিনির কথা কানে নিচ্ছিল না, জানে, রিনি এমন গজগজ করে শান্ত হয়ে যাবে। ওকে ছাড়া রিনি চোখে অন্ধকার দেখে।
এভাবেই চলছিল বেশ। পুরো সংসারই মায়ার হাতে। রিনির অসুস্থতা তাকে মায়ার ওপর আরও মুখাপেক্ষী করে তুলেছিল। কিন্তু চলল না বেশিদিন। রিনিও খিটখিটে হচ্ছিল, মায়ারও একটু করে মুখ খুলছিল। এর মধ্যে পাড়ার এক মহিলা, ঘোষ গিন্নি, বেশি টাকার লোভ দেখিয়ে টোপ ফেলল। রিনির সঙ্গে বেশি সখ্য ছিল না মহিলাটির। ব্যস! মায়া লোভে পড়ল। টাকার তো আছেই প্রয়োজন। রিনিকে না জানিয়েই ওই মহিলার বাড়ির কাজটি করছিল। রিনির কাজে সময়মতো আসতে না পারা, কামাই করা বেড়ে গেল। একদিন এ নিয়ে উত্তপ্ত কথা, মায়াও তর্ক করল। যে কথা কখনো মুখে আনেনি, এবার এসে গেল। উস্কানি তো ছিলই ঘোষগিন্নির। ফলস্বরূপ এবার রিনি অত্যন্ত রাগ করল আর মায়াকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিল। সেই থেকে আজ চার মাস হতে চলল, মায়া পস্তাচ্ছে। ছুঁতো খুঁজছে আবার ঢোকার। এখন যে মহিলাটি রিনির কাজ করে, তাকে ভীষণ হিংসে হয়। রিনির বাড়ির ওই রাজ্যপাটে আর কেউ রাজত্ব করবে, এ যে অসহ্য! ‘ঢলানী মাগী’, রাস্তায় দেখলে গাল দেয় মায়া। এমনভাবে দেয় যেন শোনে শিখা নামের মহিলাটি। শিখার আঁটোসাটো শরীরে রিনির দেওয়া ফুল ফুল গার্ডেনের শাড়ি, ভিমলের শাড়ি দেখে বুকটা জ্বলে যায়। এই শাড়িগুলো তা তারই পাওয়ার ছিল। আর রিনি দিদিমণির যা স্বভাব! সব কিছু ছড়ানো থাকে, টাকাপয়সা, কানের দুল, আংটি। কারও যদি হাতটান স্বভাব থাকে তো হয়ে গেল। রিনি সবাইকে বিশ্বাস করে! এই শিখা না জানি টুকটাক কত কিছু সরাচ্ছে! ‘আমার মতো গুছিয়ে রাখবে শিখা!’, মনে মনে গজরায় মায়া।
ঘোষ গিন্নির আসল চেহারা দু’দিন পরেই বেরিয়েছে! সবকিছু ছোট কাঠের মিটসেফে তালা বন্ধ করে রাখে। চাবি খুলে মেপে ভাঁড়ার বের করে দেয়। চা সেদিন একটু কষটে হয়ে গিয়েছিল, আরেকটু দুধ দরকার। তা আবার চাওয়াতে কী বিরক্তি ঘোষ গিন্নির! হাত দিয়ে তো কিছু গলে না, দেওয়া-থোওয়া কী বস্তু, গায়ে দেয় না খায়! ফেলে দেবে, তবুও দেবে না। রোজ পূজোয় যে বাতাসা বা নুকুলদানা দেয় ঠাকুরকে, জমিয়ে রাখে এক কৌটোতে। কাজের মহিলাদের চায়ের সঙ্গে দেবে, একমুঠো মুড়ি বা শক্ত চিড়ের সঙ্গে। এসব চিবিয়ে খাওয়ার সময় হয় না, খালি পেটেই সুড়ুৎ করে হাতল ভাঙা মোটা কাপ থেকে গিলে ফেলে চা নামের তরলটুকু। নিজেদের চা করার পর চা পাতা ফেলে দেয় না, সসপ্যানে গরম জল দিয়ে রাখে, ব্যবহৃত চাপাতার উপরে। সেটাই একটু দুধ আর চিনি দিয়ে ফুটিয়ে দেয়। মায়ার ইচ্ছে করে ঘোষগিন্নির সামনে ‘থু’ করে ফেলে দেয়। রিনির বাড়ির চা মনে করে, চোখ জ্বালা করে ওঠে। কী হারিয়েছে, বোঝে। সাধে কি আর অশিক্ষিত বলে তাদের! নিজের ভালোও বোঝে না তারা বুদ্ধির দোষে।
এই তো ক’দিন আগে সন্ধ্যায়, ঘোষগিন্নি মোমো বানালেন। এরকম দেখতে পিঠে পৌষসংক্রান্তিতে তারা বানায়, চালের গুঁড়ো দিয়ে। মোমো একটু অন্যরকম হবে খেতে। তা দিল তাকে একটাও? পুরো ঘোষ পরিবার ডাইনিং স্পেসে বসে খাচ্ছিল। ‘ইয়াম্মি’, বলে বলে তারিয়ে তারিয়ে ওদের ছেলে দুটো খাচ্ছিল। ঘোষগিন্নি মধুমাখা কণ্ঠে বলেন, “তোমাদের এসব খেয়ে অভ্যেস নেই। তাই দিলাম না”। মায়ার মনে পড়ে রিনির কথা। কত খাবার বানাত মায়াকে নিয়ে। মায়ার ছেলে-মেয়ে, স্বামীর জন্যে দিয়ে দিত সবসময়। দীর্ঘশ্বাস গোপন করে সে বাড়ির পথে পা বাড়িয়েছিল। কতদিন যে ছেলেমেয়ে দুটো ভালো-মন্দ কিছু খায়নি! ওরা প্রায়ই এখন প্রকাশ করছে যে এটা মায়ার বোকামি হয়েছে। শুধু কি খাওয়া? পড়াশোনার বিষয়ে কত সাহায্য পেত তারা রিনির কাছে!
সেদিন বিকেলে তাদের প্রাত্যহিক আড্ডাতে খবরটি শুনে মায়া বিচলিত হয়ে পড়ল। তারা দ্বিতীয় শিডিউলের কাজ সেরে সন্ধ্যার প্রাক্কালে এই কালভার্টে বসে আড্ডা দেয়। মনিব গিন্নিদের একটু নিন্দেমন্দ করে মন হালকা করে। এখানে শুনল রিনির অসুস্থতার কথা। জরায়ু কেটে বাদ দিতে হয়েছে, প্রচুর রক্ত লেগেছে। খুব কষ্ট করে রক্ত জোগাড় করা হয়েছে, বিরল গ্রুপ রিনির। খবরটি শুনে মায়ার মাথা ঘুরে গেল। টাল সামলে দু’হাত দিয়ে মাথা ধরে বসে পড়ে কালভার্টে। ইচ্ছে করছে, তখনই ছুটে যায়, রিনির কাছে। ‘হে ঠাকুর, দিদিরে ভালো কইরা দাও’, মনে মনে মা মনসার কাছে মানত করল।
রাতে ভালো ঘুম হয়নি, বারবার রিনির চেহারা, রিনির কথা মনে হচ্ছিল। রাত পোহালেই রিনির বাড়ির দিকে রওনা হয়। না, আজ অন্য কাজে যাবে না। রিনির দরজায় বেল বাজাল। রিনির কিশোর ছেলে দরজা খুলল। ‘দাদা কোথায়?’ বলতে বলতে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায় মায়া। কী অবস্থা ঘরের! শিখা এখনো আসেনি। রিনির স্বামী সৌরেন অনভ্যস্ত হাতে চা করতে চেষ্টা করছে। মায়াকে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে লাজুক হাসি হাসে সৌরেন। ‘দাদাবাবু সরেন, আমি করুম’, মায়া এগিয়ে কাজ শুরু করে। সৌরেনকে বেশ রিল্যাক্সড দেখায়, মৃদু হেসে কিচেন ছাড়ে, ওদিকে তাকিয়ে মমতায় মনটা ভরে যায় মায়ার। ‘আহা রে, তাইনের কি কাম করনের অভ্যেস আছে!’
চায়ের কাপ নিয়ে ড্রয়িংরুমে এসে সৌরেনকে দিল, নিজের কাপও নিয়ে মেঝেতে বসল। রিনির অবস্থা জিজ্ঞেস করে জানল। একটু ইতস্তত করে বলে, “দাদাবাবু, এখন থিকা আমিই করুম কাম। আপনে একটু কইয়েন শিখারে”। অনুমতি না, ঘোষণা করল। বিস্মিত সৌরেনকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কোমরে আঁচল গুঁজে হাতে ঝাঁটা নিল মায়া। মন দিয়ে ঝুল ঝাড়তে লাগল মায়া, একটু চাপা অস্বস্তি হচ্ছে। রিনি একটু বকবে, আর শিখা সহজে ছাড়বে না কাজ। এ নিয়ে একটু অশান্তি হবে, ভালোভাবেই হবে। মায়া আক্রমণ প্রতিহত করার অস্ত্র শানায় মনে মনে। কোন কথার কী জবাব দেবে! এবার আর ভুল করবে না। অধিকারের জন্য লড়াই-এ পিছ পা হবে না আর।