মঙ্গলবার | ১৪ এপ্রিল ২০২৬

অণু গল্প : রহস্যময়ী পিয়ালী

 অণু গল্প : রহস্যময়ী পিয়ালী

সুদীপ পাল
রাত দুটোর সময় পিয়ালী আমায় ফোন করল। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলাম। মোবাইল ডিসপ্লেতে ছবিসহ পিয়ালীর নাম দেখে ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসলাম। এর কারণ, আমার পাঁচ বছরের মোবাইল জীবনে কোনো যুবতী রাতদুপুরে ফোন করেনি। তাই কিছুটা আতঙ্কিত, কিছুটা পুলকিত।
পিয়ালী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। শিশুদের মতো না-থামা কান্না। থামছেই না। আমি থামাতে চেষ্টা করলাম। যতবার বললাম, ‘কেঁদো না-কেঁদো না’, ততবার সে বলল, ‘কাঁদতে দাও প্লিজ-কাঁদতে দাও’।
আমি পিয়ালীকে ভালোবাসতাম। পিয়ালীও যে আমার প্রতি দুর্বল ছিল না, তা কিন্তু নয়। তবুও সম্ভ্রান্ত পরিবারের উঁচু বেড়া ডিঙিয়ে আমার কাছে আসা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। দারিদ্র্যের কারণে আমারও তার কাছে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তবুও আমরা কিছুদিন ভালোবাসার রশি ধরে টানাটানি করলাম।
কান্না থামিয়ে পিয়ালী আমায় বলল, ‘আমার জন্য পাত্র ঠিক করা হয়েছে। আমি কি সম্মতি দেব?’ আমি কোনোরকম ইতস্তত না করে বললাম, ‘সম্মতি দাও’। পিয়ালী ফোন-লাইন কেটে দিল।
সেই রাতে বিশ্বাস করুন, আমার কোনো দুঃখবোধ হল না। বরং মনে একধরনের চাপা আনন্দ হল। কিছুটা গৌরববোধও হল। আমার গৌরববোধ করার কারণটি ছিল—পিয়ালী তাহলে আমায় ভালোবাসে। সে আমার সঙ্গেই ঘর বাঁধতে চাইছে। তাই বিয়ের বিষয়ে আমার মতামত জানতে চাইছে। আমার জন্য কাঁদছে।
কিছুদিনের মধ্যেই পিয়ালীর অন্যত্র বিয়ে হয়ে গেল। ছেলেও নাকি সম্ভ্রান্ত ঘরের। রাজপুত্রের মতো চেহারা। সম্ভ্রান্ত সম্ভ্রান্তের সঙ্গে মিলে গেল বলে আমার মনে কি দুঃখবোধ ছিল না? ছিল অবশ্যই। তবে তার চেয়েও দুঃখ হল এটা জেনে যে, তাদের বিয়েটা ছিল প্রেমের। রাজপুত্রের সঙ্গে পিয়ালীর এক বছরের প্রেম ছিল। এটা সে আমার কাছে গোপন করেছিল।
তাহলে সেই রাতে পিয়ালী ফোন করে কেঁদেছিল কেন? এই জিজ্ঞাসার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করলাম। সে ছলনাময়ী—এটা ভাবতে পারলে এই জিজ্ঞাসার উত্তর এখনই পেয়ে যেতাম। কিন্তু এটা ভাবা বড় কষ্টকর। বন্ধুদের কাছে বিষয়টা বলে ফেললাম। বন্ধুরা সব অগভীর মনের। কেউ লজিক খাটিয়ে কিছু বলতে পারল না। উপরন্তু তারা বিষয়টা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করল।
প্রায় দু’বছর পর হঠাৎ একদিন পিয়ালীর সঙ্গে দেখা। সুভাষ পার্কে। তার স্বাস্থ্য ফুলে গেছে। কোলে একটা ফুটফুটে বাচ্চা। আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম, ‘কেমন আছ পিয়ালী?’ পিয়ালী প্রথমে চমকাল। পরে হাসিমুখে বলল, ‘ভালো আছি অপুদা, তুমি কেমন আছ?’ আমি উত্তর দিতেই সে তার স্বামীর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিল। তার স্বামীটি আসলেই রাজপুত্রের মতো দেখতে। এর মধ্যে তার রাজপুত্র স্বামীটি জল কেনার জন্য পাশের একটি দোকানে গেল। আমি সুযোগ পেয়ে গেলাম। গত দু’বছর ধরে আমার মনে দিবানিশি যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছিল, তা বলে দিলাম, ‘ওই রাতে তুমি কেঁদেছিলে কেন পিয়ালী?’ দেখলাম পিয়ালী কিছুই মনে করতে পারল না। সে পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘কোন রাতের কথা বলছ অপুদা?’ আমার সামনে দিয়ে তখন একটি বাসগাড়ি যাচ্ছিল। আমার ইচ্ছে করছিল বাসের নিচে ঝাঁপ মারি। আমি তাকে আবারও বললাম, ‘ওই যে রাত দুটোর সময় ফোন করে কেঁদেছিলে?’
পিয়ালীর মনে পড়ল। এবং হাসিমুখে বলল, ‘আমি নিজের ক্যারিয়ারটা ঠিকঠাক করতে চাইছিলাম অপুদা। কিন্তু আমার বর সুবিমল চাইছিল বিয়েটা তাড়াতাড়ি সেরে নিতে। বাবাকে নিয়ে সে বিয়ের দিনক্ষণও ঠিক করে ফেলেছিল। ওই নিয়ে সেই রাতে সুবিমলের সঙ্গে আমার প্রচুর ঝগড়া হল। তুমি তো জানো, আমি ক্যারিয়ার নিয়ে খুব সচেতন ছিলাম। তাছাড়া বাবা-মা পরিবারকে ছেড়ে যেতেও খুব কষ্ট হচ্ছিল।’
একবার মনে হলো জিজ্ঞেস করি, আমার জন্য সেদিন কোনো কষ্ট হয়নি পিয়ালী? প্রশ্নটা মুখে এনেও গিলে ফেললাম। ভাবলাম, সব রহস্যের, সব জিজ্ঞাসার সমাধানের দরকার কী? কিছু রহস্য রহস্যই থাকুক।
আমি রাস্তায় নেমে পড়লাম। আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। একদল দৃপ্ত নারী প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন নিয়ে মিছিল করে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি তাদের দিকে মুখ করে বললাম, ‘নারী, তুমি বেঁচে থাকো—হাজার রহস্য নিয়ে বেঁচে থাকো’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *