পুস্তক পর্যালোচনা : শম্ভু রক্ষিত ক্রোড়পত্র : বিন্দু
ধৃতিরূপা দাস
শম্ভূমিকা! চমৎকার শব্দ গড়লেন সম্পাদক সাম্য রাইয়ান। প্রায় চার বছরের শ্রমলব্ধ ‘বিন্দু’র কাজ— ‘শম্ভু রক্ষিত : পাঠ ও বিবেচনা’। সংকলনটিতে লিখছেন কালীকৃষ্ণ গুহ, অসীমকুমার বসু, দীপঙ্কর সেন, যশোধরা রায়চৌধুরী, সব্যসাচী মজুমদার, শ্যামল রক্ষিত, সুবীর সরকার, ধীমান ব্রহ্মচারী, তৌফিকুল ইসলাম চৌধুরী, সুব্রত ঘোষ, চন্দন দাস, বেবী সাউ, শিবাশিস দত্ত, সুনীল মাজি, নিতাই জানা, বুদ্ধদেব বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্তোষ মুখোপাধ্যায়, সুশান্ত বর্মণ, ফেরদৌস লিপি, মহুয়া বৈদ্য, আশুতোষ বিশ্বাস প্রমুখ। এ গ্রন্থে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কিছু স্মৃতি গদ্যে উঠে এসেছে ‘শম্ভুযাত্রা’— কলমে সৈয়দ কওসর জামাল, গৌতম বসু, জ্যোতির্ময় দত্ত, মৃদুল দাশগুপ্ত, সেলিম মল্লিক, বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, রতন দাস, অঞ্জলি রক্ষিত, সন্দীপ দত্ত, দীপক রায়— নামগুলি পড়ে অভিজ্ঞ পাঠক মাত্রেই বুঝবেন কেন ‘বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য’ বলা হল। তাছাড়াও এই বিশেষণ ব্যবহার করার অপর কারণ হল— সচেতনভাবে শম্ভু রক্ষিতের জীবনযাপনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছি আলোচক হিসেবে। সম্পাদক নিজেও তাঁর শম্ভূমিকাতে কবির ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে অনেকটা অংশ জুড়ে কথা বলেছেন। আসলে, শেষ পর্যন্ত কবির ব্যক্তিজীবনকে তাঁর কবিতার পরিসরের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলা উচিত কিনা, সে তর্কে না গিয়েও বলাই যায় যে কবির ব্যক্তিজীবনের একটা প্রবল দাপট থাকে তাঁর কবিতা জুড়ে। কবি-সত্তা ঠিক কীভাবে কোন বাস্তবিকতায় থেকেছেন, খেয়েছেন, প্রেমে পড়েছেন, কোনো দলীয় রাজনীতিতে জড়িয়েছেন ইত্যাদির কিছু খুঁটিনাটি অবশ্যই তাঁর লেখা কবিতার গায়ে লেগে থাকে। ফলে কবিতাকে গবেষকের চোখে সম্পূর্ণরূপে আবিষ্কার করার ক্ষেত্রে কবির ব্যক্তিজীবনের একটা ভূমিকা থেকেই যায়। আবার কখনো কখনো পাঠক কবির যাপনেই বেশি আকৃষ্ট হন— কেননা মানুষ স্বভাবত যাযাবর, একজন্মেই সে বহু জন্মের স্বাদ চায়, অপর করে দেখতে চায় নিজেকে, বা বলা ভালো, অপর হয়ে নিজের প্রেমে চায় শ্রীচৈতন্য-সমাধি। উপরন্তু শম্ভু রক্ষিতের ক্ষেত্রে তাঁর জীবনের চড়াই-উতরাইগুলো সাধারণ পাঠককে অবশ্যই অন্য মাত্রায় রোমাঞ্চিত করবে। হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শম্ভু রক্ষিত এমার্জেন্সির সময়ে লেখক এবং সম্পাদক হিসেবে জেলবন্দী হয়েছিলেন। আমরা জানি, রাষ্ট্রযন্ত্র কবিকে অবশ্যই মেনে নেয় না, কেননা তিনি রাষ্ট্রের কড়া সমালোচক— ফলে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সকলের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একজন কবির প্রত্যক্ষ ভূমিকা আছে। শম্ভু রক্ষিতের মতো কবির ব্যক্তিজীবনই এর প্রমাণ।
“দেখুন, জেল খুব ভালো জায়গা। এই জেলখানাতে খুব সহজে যাওয়া যায় না। আপনার টাকাপয়সা থাকলে আপনি পৃথিবী ভ্রমণ করতে পারবেন, কিন্তু আপনি ইচ্ছে মতো জেলখানায় যেতে পারবেন না। আমার তো জেলখানা খুব ভালো লেগেছে। আমার মনে হয় প্রত্যেক কবি যদি একবার করে জেলখানায় ঘুরে আসতে পারতেন, তো খুব ভালো হত।”
— শম্ভু রক্ষিত
‘বিন্দু’র সম্পাদক যথার্থই এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যে ছয় ও সাতের দশকের কবিদের মধ্যে কেবল অন্যরকম কবিতা নয়, অন্যরকম যাপনেরও কথা ভেবেছিলেন শম্ভু রক্ষিত।
শম্ভু রক্ষিতের কবিতার পাশাপাশি এই গ্রন্থে আলোচিত হয়েছে শম্ভু রক্ষিতের গল্প-প্রবন্ধ-নিবন্ধ-ইশতেহার। তবে লক্ষণীয় যে ভূমিকাটিতে যেন তাঁর কবিতাযাপনকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন সম্পাদক—
“এ জগত কবিনির্মিত, যার মহারাজা তিনি নিজেই; একাকী সিংহাসনে বসে লিখেন নিজের কবিতাখানি। যেখানে বাস্তব এবং কল্পনা নতুন আকার পায়।”
“আজীবন এক নির্বাসিত কবিতাযাপন করেছেন এই কবি। স্পর্ধার সঙ্গে মিশেছিল তাঁর কাব্যভাবনার নিমগ্ন অভিযাত্রা।”
“কফি হাউসের চেয়ারে পা তুলে বসতেন একমাত্র মহাপৃথিবীর কবি শম্ভু রক্ষিত।”
“জীবন ও গণিতের অক্ষর ও চিহ্নমণ্ডলীকে পরপর স্থাপন করে তিনি যে মহাজাগতিক কবিতাবলয় নির্মাণ করেন…”
“শম্ভু রক্ষিতের অধিকাংশ কবিতাই ‘আমি’ উত্তমপুরুষে লেখা। এই ‘আমি’ কখনও বর্ণনাতীত এক পুরুষ, যে ত্রিকালজ্ঞ, ইতিহাসবিদ, ভাষাতাত্ত্বিক, সন্ন্যাসপ্রতীপ, আবার কখনও চাষাভুষোর বেশে সজ্জিত এক ব্যক্তি, যিনি মহামানব, দেবতা, যক্ষ, গন্ধর্ব অথবা স্বয়ং ঈশ্বরও হতে পারেন, কিন্তু অনুমান করি তিনি আমাদের পরিচিত কোনও সাধারণ মানুষ না।”
“আজীবন এক নির্বাসিত কবিতাযাপন করেছেন এই কবি। স্পর্ধার সঙ্গে মিশেছিল তাঁর কাব্যভাবনার নিমগ্ন অভিযাত্রা।”
পংক্তি পর পংক্তি এমন উচ্চারণ রয়েছে এ গ্রন্থের ভূমিকায়। স্পষ্ট অনুমান করা যায় যে সংকলনটি একজন কবিকেই নানাভাবে আবিষ্কার করতে চাইছে। এমনকি যেসব উদ্ধৃতি সাম্য কথাপ্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন, সেখানেও শম্ভু রক্ষিতের কবিতাই বিষয়। যেমন শঙ্খ ঘোষের একটি উক্তি—
“তার কবিতা সমকালের পাঠকরা সেভাবে অনুধাবন করতে না পারলেও আগামী দিনের পাঠকরা সঠিক মূল্যায়ন করবে।”
যেমন সুনীল মাজির লেখার একটি অংশ—
“এই অক্ষররাই বিবেকানন্দ, কবির বাবা, সোনার দাসী তথা কবির সহধর্মিনী— যার শরীরে কবির বেদনা মাখানো গন্ধ থাকে। এই অক্ষররাই কবির প্রেম, হৃদিকথা, সম্মোহন, চিন্তন, মড়িঘর এবং জিদ বা সংকল্পের মতো অনেক ইত্যাদি প্রভৃতি।”
বলতে চাইছি যে এইভাবে লিটিল ম্যাগাজিনের ক্রোড়পত্রগুলো আসলে নিছক একেকটা সংকলন নয়, বরং এগুলো বাংলাভাষার পাঠককে নীরবে পথপ্রদর্শন করে, সম্পাদনা করে বাংলা সাহিত্যের পাঠযাত্রা। অবশ্যই এ পথপ্রদর্শন পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। তবে সেখানেও লিটল ম্যাগাজিন গণতান্ত্রিকভাবে নির্ভুল হতে পারে, কেননা সে উদারভাবে লেখা গ্রহণে সক্ষম যে কোনও ব্যক্তি লেখকের কাছ থেকে, এবং সেই লেখাগুলোর অভিমুখটিকেই হুবহু বজায় রাখতে পারেন সম্পাদক। এটাও লিটল ম্যাগাজিনেই সম্ভব যে ক্রোড়পত্রের বিষয়টি শুধু ঠিক করে সামর্থ্য মতো কয়েকজন লেখককে তাঁদের ইচ্ছে মতো কিছু কথা লিখতে বলা। পাঠকের ও লেখকের মাঝে এমনই একটা ফিনফিনে, প্রায় অলক্ষ্য সুতো হয়ে থেকে যায় বাংলা লিটল ম্যাগাজিন। ‘বিন্দু’র মতো কাগজের ধারাবাহিক কাজগুলো সেই সূত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকবে নিশ্চয়ই।
শম্ভু রক্ষিত কেবল সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে নন, ব্যক্তিগত যাপনেও কবিই ছিলেন। যাপনের সঙ্গে লেখার এমন সংলগ্ন প্রকাশ— পাঠকের মৌলিক সত্তাটিকে স্পর্শ করতে পারে অনায়াসে। সেই মেলবন্ধনটুকুর জন্য এ গ্রন্থের সম্পাদক সাম্য রাইয়ান, প্রকাশক মাহাদী আনাম (ঘাসফুল প্রকাশনা) এবং অবশ্যই যাঁদের ঋণ স্বীকার করেছেন সম্পাদক— আমরা সকলের কাছে পাঠক হিসেবে কৃতজ্ঞ।