বুধবার | ০৩ জুন ২০২৬

সুমন কল্যাণপুরের প্রয়াণে ভারতীয় সঙ্গীতজগৎ হারাল এক অসামান্য শিল্পীকে

 সুমন কল্যাণপুরের প্রয়াণে ভারতীয় সঙ্গীতজগৎ হারাল এক অসামান্য শিল্পীকে

ভারতীয় সঙ্গীতজগতের এক স্বর্ণযুগের অবসান। প্রবীণ প্লেব্যাক শিল্পী সুমন কল্যাণপুরের কণ্ঠের সঙ্গে কিংবদন্তি শিল্পী প্রয়াত লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠের তুলনা হলেও, নিজের স্বতন্ত্র গায়কির জোরেই তিনি তৈরি করেছিলেন আলাদা পরিচয়। প্রয়াত এই শিল্পীর স্মৃতিচারণায় আনন্দিতা সরকার

জনপ্রিয় প্লেব্যাক ও আধুনিক গানের শিল্পী সুমন কল্যাণপুর। সঙ্গীত জগতের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটল সম্প্রতি। হিন্দি ও বাংলা— দুই ভাষাতেই অসংখ্য জনপ্রিয় গানের মাধ্যমে কয়েক দশক ধরে শ্রোতাদের মন জয় করেছিলেন সুমন কল্যাণপুর। পঞ্চাশের দশক থেকে সত্তরের দশক পর্যন্ত বলিউডে একের পর এক স্মরণীয় গান উপহার দেন তিনি। ‘বাত এক রাত কি’, ‘দিল এক মন্দির’, ‘দিল হি তো হ্যায়’, ‘জাহান আরা’, ‘নূরজাহান’ ও ‘পাকিজা’-র মতো জনপ্রিয় ছবিতে তাঁর কণ্ঠ বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছিল। বাংলা গানের জগতেও ছিল তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। ‘মনে করো আমি নেই, বসন্ত এসে গেছে’, ‘আমার স্বপ্ন দেখার দুটি নয়ন’ কিংবা ‘তোরা হাত ধর প্রতিজ্ঞা কর’-এর মতো গান আজও শ্রোতাদের আবেগ স্পর্শ করে। তাঁর মধুর, স্বচ্ছ কণ্ঠস্বর বাংলা আধুনিক গানের ভাণ্ডারে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে।
১৯৩৭ সালের ২৮ জানুয়ারি অবিভক্ত বাংলার ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন সুমন হেমাদি, যিনি পরবর্তীকালে সুমন কল্যাণপুর নামে পরিচিত হন। পরিবারটি মূলত কর্ণাটকের উদুপি জেলার সারস্বত ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের হলেও বাবার চাকরির সূত্রে তাঁদের বসবাস ছিল ঢাকায়। পরবর্তীকালে পরিবার নিয়ে তৎকালীন বম্বেতে চলে আসেন তিনি। বিভিন্ন সূত্র মারফত জানা যায়, শৈশবে গান নয়, বরং ছবি আঁকা, সেলাই এবং বাগান পরিচর্যাতেই বেশি আগ্রহ ছিল প্রথিতযশা এই সঙ্গীত শিল্পীর। সেই আগ্রহ থেকেই ভর্তি হয়েছিলেন মুম্বইয়ের বিখ্যাত স্যার জে. জে. স্কুল অব আর্টসে। তবে পরবর্তীকালে সঙ্গীতই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের মূল সুর। শোনা যায়, এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হন প্রখ্যাত মারাঠি সঙ্গীত পরিচালক কেশবরাও ভোলে। তিনিই সুমনের প্রতিভা চিনে নিয়ে তাঁকে সঙ্গীতচর্চার পথে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেন। তাঁর তত্ত্বাবধানেই শুরু হয় প্রয়াত এই শিল্পীর সঙ্গীতশিক্ষা।
পঞ্চাশের দশকে আকাশবাণীতে প্রথম গান গাওয়ার সুযোগ পান সুমন। মারাঠি চলচ্চিত্র ‘শুকরচি চাঁদনি’-তে গান করেন। পরের বছর ‘মঙ্গু’ ছবির মাধ্যমে হিন্দি চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ। এরপর শঙ্কর-জয়কিষণ, মদন মোহন, রোশন, শচীন দেব বর্মণ, নৌশাদ, ও. পি. নায়ার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো কিংবদন্তি সঙ্গীত পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেন তিনি। মহম্মদ রফির সঙ্গে তাঁর প্রায় ১৪০টি যুগলবন্দি গান বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। ‘আজকাল তেরে মেরে প্যায়ার কে চর্চে’ এবং ‘না না করতে প্যায়ার’ আজও শ্রোতাদের কাছে সমান জনপ্রিয়।
সুমন কল্যাণপুরের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে কিংবদন্তি শিল্পী লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠের আশ্চর্য মিল খুঁজে পেতেন শ্রোতারা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি কখনও সচেতনভাবে কাউকে অনুকরণ করেননি। নিজের স্বতন্ত্র গায়কী নিয়েই তিনি এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। তাঁর কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্য এবং গায়কীর সৌন্দর্য তাঁকে ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে এক আলাদা মর্যাদা এনে দিয়েছে। প্লেব্যাক গানের পাশাপাশি ধ্রুপদী সঙ্গীতেও ছিল তাঁর অনায়াস বিচরণ ছিল। মহারাষ্ট্র সরকার তাঁকে ‘লতা মঙ্গেশকর পুরস্কার’-এ সম্মানিত করে। ২০২৩ সালে ভারত সরকার দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘পদ্মভূষণ’ প্রদান করে তাঁর দীর্ঘ সঙ্গীত জীবনের স্বীকৃতি দেয়।
মুম্বইয়ের লোখান্ডওয়ালায় নিজের বাসভবনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন এই প্রবীণ শিল্পী। তাঁর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ সঙ্গীতমহল। সুমন কল্যাণপুরের প্রয়াণে ভারতীয় সঙ্গীতজগৎ হারাল এক অসামান্য শিল্পীকে। কিন্তু শিল্পীর মৃত্যু হলেও তাঁর গান থেকে যায়। বাংলা কিংবা হিন্দি— যে ভাষাতেই হোক, তাঁর কণ্ঠের আবেগ, মাধুর্য ও সুরের আবেদন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *