গল্প : শ্রীকুমার দত্ত
বাসন্তীপুজোর ভোরে
পাড়ার মন্টুর চায়ের দোকান ওঁদের বিকেলের আড্ডার ঠেক। ওঁরা বলতে তীর্থঙ্করবাবু, শ্যামলবাবু, সঞ্জয়বাবু আর রাজেনবাবু। সবাই সেবানিবৃত্ত। চা-শিঙারার সঙ্গে চলে নানাবিধ বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক। আবার কখনো বা স্মৃতিরোমন্থন। সেদিন আড্ডার সময়ে গোমড়া মুখে এসে উপস্থিত পাড়ারই শ্যামলবাবুর পাশের বাড়ির অর্ণব। এসে বিরক্ত মুখে এক কাপ চা নিয়ে বেঞ্চের এক কোণে বসে পড়ল। ব্যাপারটা শ্যামলবাবুর চোখ এড়াল না— ‘কী হে অর্ণব, মুড অফ নাকি? এনি প্রব্লেম?’ ‘আর বলবেন না কাকা, ছেলেটা স্কুলে কী দুষ্টামি করেছে, প্রিন্সিপাল ডেকে নিয়ে আমাকে যা-তা বলে দিল’— অর্ণব অভিমানভরা স্বরে বলল। এবার সঞ্জয়বাবু বললেন— ‘আরে ছাড়ো তো, ওই বয়সে বাচ্চারা দুষ্টামি করবে না তো কখন করবে?’ তার কথার খেই ধরে রাজেনবাবু বললেন— ‘কৈশোর আর দুষ্টামি বোধহয় সমার্থক। তবে আমাদের সময় দুষ্টামিগুলো ছিল নির্মল, নিষ্পাপ আর তাৎক্ষণিক। যেমন পাড়ার অমুক কাকার বাড়ির আম-কাঁঠাল, হাঁড়ি ফুটো করে খেজুরের রস, কোজাগরী রাতে তমুক জ্যাঠার বাড়ির মুরগি চুরি করে খাওয়া। মুরগি চুরি করার জন্য খাঁচায় কাঁচা পেঁয়াজ থেঁতলে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। এতে নাকি মুরগি আর কক-কক করে না আর নিঃশব্দে অপকর্মটি সারা যায়। তাছাড়া বাড়িতে পড়াতে আসা মাস্টারমশাইয়ের সাইকেলের চেন ফেলে দেওয়া বা বেশি ক্ষোভ থাকলে চাকার হাওয়া ছেড়ে দেওয়া, ইত্যাদি। ধরা পড়ে গেলে যে পশ্চাৎদেশে কয়েক ঘা অনিবার্য, সেই ভয়কে জয় করাই ছিল মোক্ষম চ্যালেঞ্জ। তাই সেই ধরা পড়া থেকে বাঁচতে নানা ফন্দিও আঁটতে হতো। কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই বড়দের মগজাস্ত্রের কাছে হেরে যেত সেইসব ফন্দি-ফিকির।’ একটু থেমে একটা সিগারেট ধরিয়ে রাজেনবাবু বলতে শুরু করলেন— ‘আবার কোনো কোনো সময় দুষ্টামির পরিণতি যে দুর্ঘটনায় পর্যবসিত হতে পারে, সেই বিষয়ে উদাসীনতার একটি ঘটনা শোনাই আজ’, বলে রাজেনবাবু আবার বলতে শুরু করলেন।
আমার বাল্যবন্ধু তথা সহপাঠী প্রদীপ। ওদের বাজেমালের পাইকারি ব্যবসা ছিল। বিশাল একান্নবর্তী পরিবার। বাড়িখানাও ছিল বিশাল। বাঁধানো ঘাটসহ পুকুর, দুধেল গরু ভরা গোয়াল, পুজোর পাকা নাটমন্দির। বাড়ির প্রতিটি মানুষ ছিলেন নিরহংকারী, মিষ্টভাষী ও অমায়িক। তবে পুরুষেরা বেশ মার্জিত ও গুরুগম্ভীর। আর মহিলারা অর্ধশিক্ষিত হলেও মমতাময়ী। তাঁরা প্রত্যেকেই গৃহস্থালির কাজ আর জনা পাঁচেক করে বাচ্চা-কাচ্চার দেখভাল করতে ব্যস্ত থাকতেন। বাবা-জ্যাঠা ও পিসির পরিবার, তার উপর দোকানের কর্মচারী-গোমস্তা— সব মিলিয়ে প্রায় ত্রিশজনের পাত পড়ত প্রতি বেলা। মধ্যাহ্নভোজনের সময় ওদের বাড়িতে উপস্থিত থাকলে প্রদীপের মা আমাকেও না খাইয়ে ছাড়তেন না। দারোগা বাড়ির ছেলে হওয়ার সুবাদে ওদের বাড়িতে আমার একটা আলাদা সমাদর ছিল। আসলে আমার দাদামশাই ছিলেন যাকে বলে ‘আংরেজ কে জামানে কি থানেদার’।
ওদের বাড়িতে ফি-বছর বাসন্তীপুজো হতো। পালবাড়ির এই বাসন্তীপুজোর সময় সারা পাড়ার লোক আনন্দে মেতে উঠত। তখনকার দিনে পাড়া-প্রতিবেশীরা একে অপরের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিতে জানতেন। আর আমরা সমবয়সিদের তো কথাই নেই। আমার গায়ে অবশ্য পুজোর হাওয়া লেগে যেত এক মাস আগে থেকেই। প্রায় রোজই অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতাম মৃৎশিল্পীদের খড়ের পুতুলগুলো থেকে মাটির প্রলেপ লাগিয়ে নিপুণ হাতে মৃন্ময়ী মায়ের অভয়দায়িনী রূপদানের কলার দিকে। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত সকালে পুষ্পাঞ্জলি, দুপুরে ভোগপ্রসাদ, সন্ধ্যারতি আর ধুনুচি নাচ সেরে রাতে বাড়ি ফেরা। তবে সবথেকে দুঃসাহসিক ও বেশি মজার ছিল ভোরবেলায় পাড়া-বেপাড়ার লোকেদের বাড়ি থেকে পুজোর জন্য ফুল চুরি করা। তখন আমি ক্লাস ফাইভের ছাত্র। যথারীতি সপ্তমীর কাকডাকা ভোরে পাড়ার বন্ধুরা তিনটে দলে বিভক্ত হয়ে চললাম ফুলচুরি অভিযানে। আমাদের দলে আমি, প্রদীপ আর ঝন্টু। ডানপিটে হিসেবে ঝন্টুর পাড়ায় একটা সুখ্যাতি(?) ছিল। পাশের পাড়ার ঘোষদের বাড়ি আমাদের টার্গেট। ওই বাড়ির বাগানে প্রচুর ফুল। থোকা থোকা স্থলপদ্ম, গন্ধরাজ, নানা রঙের জবা। কিন্তু ঘোষমশাই বড্ড রাগী, ধরতে পারলে প্রথমে উত্তম-মাধ্যম, তারপর আবার বাড়িতে নালিশ নিশ্চিত। ঝন্টু সীমানার বাঁশের বেড়া ডিঙিয়ে ঢুকে কাঠের গেট খুলে দিলে আমি আর প্রদীপ ঢুকলাম। প্রদীপ ফিসফিসিয়ে বলল— ‘ভাই, তুই দরজার দিকে লক্ষ রাখবি। দরজা খোলার শব্দ পেলেই সিগন্যাল দিবি।’ এই বলে ওরা দু’জন ফুলবাগানে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমার মাথায় দুশ্চিন্তা— যদি ঘোষমশাই টের পেয়ে যান তবে সর্বনাশ! চোখে পড়ল ঘরের পাশে মাটিতে শোয়ানো একটা বাঁশের মই। সেটা তুলে নিয়ে আমি ঘরের দরজায় ঠেকিয়ে দিলাম, যাতে কেউ দরজা খুলে বেরিয়ে আসতে না পারে। ভাবলামই না যে দরজার কপাট ভেতরের দিকে খুলতে পারে। নিশ্চিন্ত হয়ে সবাই মিলে ঝপাঝপ ফুল তুলতে লাগলাম। ওদিকে ঘোষমশাই কিছু একটা টের পেয়ে যেই না দরজা খুলেছেন, সেই মই তার গলায় বরমাল্য হয়ে ঝুলে পড়ল। ‘ও বা-বা-রে-এ-এ, মেরে ফেলল রে!’ ঘটনার আকস্মিকতায় মজুমদার মশাইয়ের গগনভেদী চিৎকার। আর আমরা ফুল, ফুলের সাজি ফেলে একছুটে যে যার মতো পগার পার।
ঘটনাটা এখানেই শেষ হল না। সকালের আলো ফুটতেই ঘোষমশাই আমাদের বাড়ি এলেন নালিশ নিয়ে। আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। পাড়ার কোথাও কিছু ঝুট-ঝামেলা হলেই মুরুব্বি হিসেবে লোকেরা দাদামশাইয়ের কাছে আসতেন। আমি দরজার পেছনে লুকিয়ে তার কথা শুনছিলাম। তখন লক্ষ করলাম উনার কপালের মাঝখানে একটা প্রমাণ সাইজের আলু গজিয়েছে। দাদামশাই সব কিছু শুনে বললেন— ‘আপনি কি কাউকে চিনতে পেরেছিলেন?’ ‘না, চিনব কী করে? একে তো ভালো করে আলো ফোটেনি, তার উপর মইটা এসে এমন জোরে কপালে লাগল যে আমি চোখে সর্ষে ফুল দেখলাম।’ কথাটা শুনে আমি একটু স্বস্তি পেলাম। এবার দাদামশাই বললেন— ‘তবে তো মুশকিল, এখন কাউকে জিজ্ঞাসা করলে কি আর স্বীকার করবে?’ ‘তবে একটা ফুলের সাজি ফেলে গেছে বদমাশগুলো। আমার মনে হয় ওই পালবাড়ির পুজোর জন্যই আমার বাড়ির ফুল চুরি করতে এসেছিল’— ঘোষমশাই বললেন। পুলিশমনস্ক দাদামশাই যেন সূত্র খুঁজে পেলেন— ‘বাহ, বেশ! আপনি ওই সাজিটা নিয়ে বিকেলবেলা আসুন। কিছু একটা সমাধান হবে।’
যথারীতি বিকেলবেলা আমাদের বাড়ির পাকা বারান্দায় বিচারসভা বসল। পাড়ার সব ছেলেরা হাজির। কারও কারও বাড়ির গার্জেনরাও। তার মধ্যে আবশ্যিকরূপে ঝন্টুর বাবা রমেশকাকা। আমার তখন ভয়ে হাত-পা যেন পেটের ভেতর সেঁধিয়ে গেছে। কিন্তু কেউ স্বীকার করল না। তখন দাদামশাই ফুলের সাজিটা দেখিয়ে প্রশ্ন করলেন— ‘এটা কার?’ কারও মুখে রা নেই। হঠাৎ রমেশকাকা উঠে ঝন্টুর চুলের মুঠি ধরে পিঠে লাগিয়ে দিলেন কয়েক ঘা। তারপর লজ্জিত হয়ে বললেন— ‘এটা আমাদের কর্তৃক।’ দাদামশাই বললেন— ‘যাক, ঘোষবাবু, আপনার আসামি ধরা পড়ে গেছে। কিন্তু পুজোর জন্য ফুল চুরিকে ঠিক চুরি বলা যায় না। ক্ষমা করে দিন, বাচ্চা মানুষ।’ ‘কিন্তু কর্তা, মই দিয়ে আমার কপালে যে আলু গজিয়ে দিল?’ ঘোষমশাই ক্ষোভের সঙ্গে বললেন। রমেশকাকা আবার দুম দুম করে দু’ঘা লাগিয়ে দিলেন ঝন্টুর পিঠে। কিন্তু ঝন্টু বারবার বলতে লাগল— ‘আমরা শুধু ফুল তুলতে গিয়েছিলাম, মইয়ের কথা আমরা জানি না।’ দাদামশাই গম্ভীরস্বরে বললেন— ‘তা দেখুন, হয়তো আপনার বাড়িতে আসল চোর এসেছিল, আর মইটা ওরাই লাগিয়েছিল। কিন্তু বাচ্চারা ফুল তুলতে যাওয়াতে সুবিধে করতে না পেরে পালিয়েছে।’ কথাটা মনমতো না হলেও ঘোষমশাই আর ব্যাপারটাকে বাড়ালেন না। দাদামশাই বোধহয় ব্যাপারটা কিছু আঁচ করতে পেরেছিলেন, যেটা পরে তার স্বগতোক্তি থেকে বুঝেছিলাম— ‘এমন দুষ্টামি কখনো করতে নেই, যাতে কারও বিপদ হতে পারে।’ সেদিন ঝন্টু নিজে মার খেয়েও আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। অবশ্য তার বিনিময়ে মাশুল বাবদ সে আমার থেকে আদায় করে নিয়েছিল লজেন্স আর আইসক্রিম।
খানিক থেমে আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে রাজেনবাবু আবার বললেন— ‘আমাদের ছোটবেলায় দুষ্টামি ছিল, কিন্তু বন্ধুত্বটাও ছিল বড়ই আন্তরিক।’