গল্প : স্মৃতির দোকানের শহর
সৌম্য ঘোষ
সে এক শহর ছিল, স্মৃতির শহর। অদ্ভুত শহর। সেখানে অদ্ভুতভাবে মানুষেরা মিলেমিশে থাকত। তরঙ্গহীন, নিরুপদ্রব জীবন ছিল সে শহরের, এবং মানুষদের। আচমকাই একদিন সেই শান্ত শহরে ঝড় উঠল। ছড়িয়ে পড়ল এক মারাত্মক এপিডেমিক। কোভিডের থেকেও দশগুণ বেশি মারাত্মক। প্রাণঘাতী নয়, এই ভাইরাস আক্রমণ করে মানুষের মস্তিষ্ককে। আগে এই শহরের মানুষেরা হাসিখুশিভাবে মিলেমিশে থাকত। বন্দর শহরের অর্থনীতি ছিল বন্দরকেন্দ্রিক। বেশিরভাগ মানুষের রুটি-রুজি ছিল বন্দরকে ঘিরে। অল্পেই সন্তুষ্ট ছিল এই শহরের মানুষ। কিন্তু এক দারুণ দহন-গ্রীষ্ম সময়ে শহরে হানা দিল এক অদ্ভুত এপিডেমিক। শহরের প্রবীণেরা ক্রমশ ধীরে ধীরে সবকিছু ভুলে যেতে লাগলেন। তাদের মস্তিষ্কের স্মৃতিকোষ থেকে মুছে যেতে লাগল বর্তমান, এমনকি সাম্প্রতিক অতীতও। সবকিছু ভুলে যেতে লাগলেন তারা। কিন্তু আশ্চর্যভাবে, তাদের স্মৃতিতে থেকে যেতে লাগল—অবোধ বালক বয়স, সুদূর শৈশবের স্মৃতি। সমস্ত বেশি বয়স্ক মানুষেরই একই অবস্থা হতে থাকল। ধীরে ধীরে শহরের প্রবীণ-প্রবীণারা এক একজন করে এই আজব ভাইরাল এপিডেমিকে আক্রান্ত হতে থাকলেন। বহু চিকিৎসা করেও কোনো লাভ হল না। শহরের নামী-দামি, বিখ্যাত ডাক্তারেরাও অসুখের চিকিৎসা করা তো দূরের কথা, অসুখের উৎস খুঁজেই বার করতে পারলেন না। সুতরাং এই রোগের কোনো প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন আবিষ্কার করার-বানানোর উপায়ই রইল না। দিনে দিনেই সেই ভয়ঙ্কর অসুখের থাবা বয়স্ক মানুষদের ওপর তীব্র, মারাত্মকভাবে পড়তে লাগল। ক্রমশ রোগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলোর মধ্যেও নানারকম ভয়াবহ জটিলতা দেখা দিতে লাগল। এই দুর্বোধ্য অসুখের কাছে লজ্জাজনকভাবে হেরে গিয়ে চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীরা এই মহামারির নাম দিলেন “এপিডেমিক স্মৃতি”। যদিও এই অদ্ভুত অসুখে মানুষ যেহেতু মরত না, তাই মহামারি নাম দেওয়াটা হয়তো বাড়াবাড়িই হচ্ছিল। ঐ অসুখটির প্রধান এবং একটিমাত্র উপসর্গ ছিল প্রবীণ-বয়স্ক, বিশেষ করে ষাট-সত্তর ঊর্ধ্ববয়সী প্রবীণেরা ধীরে ধীরে বর্তমান বা সাম্প্রতিক অতীত ভুলে গিয়ে একেবারে শৈশবের মতো আচরণ করতে শুরু করেছিলেন। বুড়োরা যেমন দল বেঁধে ফুটবল খেলতে নেমে পড়ল। ঘুড়ি ওড়ানোর চেষ্টা করতে মাঠেঘাটে দৌড়াদৌড়ি শুরু করলেন। প্রবীণারা সবাই পুতুল খেলতে, রান্নাবাটি খেলতে বসলেন। কখনও বা সবাই মিলে ফ্রক পরে, চুলে লাল-নীল-সবুজ রিবন বেঁধে মাঠে নেমে লুকোচুরি, কাবাডি, দাড়িয়াবান্ধা, চু-কিতকিত খেলার চেষ্টা করতে লাগলেন। স্বাভাবিকভাবেই শারীরিক সামর্থ্যে প্রবীণ-প্রবীণারা কিছুই করারই, খেলারই সক্ষমতা মিলত না। মেয়েরা তখন হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসত। আর ছেলেরা না খেলতে সক্ষম হওয়ার রাগে ফুঁসতে-ফুঁসতে একে অন্যের দোষ খুঁজত। ক্রমে তর্কবিতর্ক থেকে হাতাহাতির পর্যায়ে পৌঁছে যেত ঘটনা। এটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে উঠল। বাড়ির লোকজন, আত্মীয়স্বজনেরা যদি ওদের ইচ্ছে-চাওয়াতে বাধা দিত, তাহলেই হাত-পা ছুঁড়ে কান্নাকাটি শুরু করত আট-দশ বছরের বাচ্চাদের মতো। ব্যাপারটা দিনে দিনে সামাজিক দিক দিয়েও জটিলতর হয়ে উঠতে লাগল। এক বয়স্ক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা যদি কোনো আট-দশ বছরের শিশুর মতো আচরণ, খেলাধুলা করতে যায়, খুব স্বাভাবিকভাবেই তাদের শরীর তাতে সায় দেবে না। তারা অসুস্থ হয়ে পড়তে লাগল। পরিবারগুলোর কাছেও তাদের প্রিয় মানুষগুলো কেমন যেন অচেনা, দূরের মানুষ হয়ে উঠতে লাগল। তাদের কাছে হঠাৎই অতি চেনাজানা মানুষগুলোর ব্যবহারই কেমন অপরিচিত হয়ে উঠছিল। নিরুপদ্রব, শান্ত জীবনযাপনে অভ্যস্ত শহরটাতে “এপিডেমিক স্মৃতি” যেন এক সুনামি হয়ে দেখা দিল।
ঠিক এমনই একটা সময়ে শহরের এক বড় রাস্তার চারমাথা মোড়ে হঠাৎই দেখা দিল এক অদ্ভুত দোকান গজিয়ে উঠেছে। দোকানটার নামটাই আজবগজব, মাথা ঘুরিয়ে-চমকে দেওয়া—”স্মৃতির দোকান”। বড় করে দোকানের নামের সাইনবোর্ডের নিচেই লেখা—”এখানে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির বদলে নতুন স্মৃতি পাওয়া যায়।” সবাই তো সাইনবোর্ড দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল। শহরের মানুষেরা দোকানটি সম্পর্কে সচেতন, আগ্রহী হয়ে উঠতে লাগল। অতি উৎসাহী কেউ কেউ দোকানে গিয়ে খোঁজখবরও নিয়ে এলো। খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারা গেল, এখানে কেউ চাইলে তার নিজের মনোরম স্মৃতি বিনিময় করে তাদের পরিবারের কোনো স্মৃতি-হারানো প্রিয়জনের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি ফেরত নিয়ে যেতে পারে।
এই শহরেই থাকত মন্দার, তার বৃদ্ধা মা অপরূপাদেবী, স্ত্রী বেদাঙ্গী, আর ছয় বছরের মেয়ে লুসি। মন্দার একটু চাপা ধরনের আত্মভোলা মানুষ ছিল। বন্দরের এক জাহাজে মাল তোলা ও খালাস করার কোম্পানিতে সুপারভাইজারের চাকরি করত সে। অফিস থেকে ফিরেই বাইরের ঘরে বসে খবরের কাগজ, পত্রিকা বা নানারকমের বইপত্র পড়ত। কখনো বা টেলিভিশনে পছন্দের কোনো সিনেমা বা খেলা দেখত। মন্দারের মা অপরূপা দেবী যখন “এপিডেমিক স্মৃতি” রোগে হঠাৎ করে আক্রান্ত হলেন, তখন মন্দার ও তার স্ত্রী বেদাঙ্গী প্রচণ্ড চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। অপরূপা সকালে উঠেই স্কুলে যাওয়ার জন্য বায়না, জেদ শুরু করতেন। বারণ করা, বোঝানোর চেষ্টা করা হলেই বায়না আরও বেড়ে তীব্র আকার ধারণ করত। হাত-পা ছুঁড়ে, চিৎকার করে কান্নাকাটি শুরু করতেন। বিকেল থেকে সন্ধে পুতুল খেলে, রান্নাবাটি খেলে কাটাতেন। সন্ধে হলেই নাতনির বইপত্র নিয়ে মনোযোগ সহকারে পড়তে বসতেন। পুত্রবধুকে জোরাজুরি করতেন তাকে পড়ানোর জন্য। নিজের ছেলেকে তিনি ‘ভাই’ বলে ডাকতে শুরু করলেন। পুত্রবধুকে ‘পাড়ার মেয়ে’ ভাবতেন। নাতনি লুসিকে দেখলেই মাঝেমাঝেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতেন, চিৎকার করতে থাকতেন—”ও আমার জায়গা দখল করতে কেন এসেছে? সরাও, ওকে সরিয়ে নিয়ে যাও।” মন্দার অস্থির, পাগল-পাগল হয়ে উঠতে লাগল মায়ের উদ্ভট ব্যবহারে। সারা শহরের ঘরে ঘরে, প্রায় প্রতিটি পরিবারে এই একই অশান্তি শুরু হয়েছিল, টেলিভিশনের মেগা সিরিয়ালের মতো যা ক্রমে লম্বা, দীর্ঘায়িত হয়েই চলেছিল কোনো সমাধানসূত্র ছাড়াই। কোনো ওষুধ, কোনো চিকিৎসাতেই প্রবীণ মানুষদের এই অদ্ভুত এপিডেমিকের উপশম হচ্ছিল না। অনেকেই প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে। ডাক্তারেরা প্রথমদিকে কয়েকজনকে চিকিৎসা করার চেষ্টা করে পুরোপুরি ব্যর্থ হওয়ার পরই স্পষ্ট বলে দিলেন—এই অসুখের চিকিৎসা করা বা একে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তাদের নেই। কারণ এই ভাইরাসটিকে সনাক্তই করতে পারছেন না তারা। চিকিৎসাশাস্ত্রেও মানুষকে কৈশোরে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে এরকম অসম্ভব, অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ভাইরাসের উল্লেখ কোথাও নেই। চিকিৎসাবিদ্যা এরকম আজব ভাইরাস এবং তার থেকে ছড়িয়ে পড়া এরকম অসুখের কথা আজ পর্যন্ত কোনোদিন শোনেনি। তবুও মন্দার মরিয়া চেষ্টা হিসেবে মাকে চিকিৎসা করাতে এক দূর ভিন রাজ্যে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ পরীক্ষানিরীক্ষার পরেও সেখানকার ডাক্তারেরাও কোনো আশার আলো দেখাতে পারেননি। অত্যন্ত আধুনিক, উন্নত মানের চিকিৎসা পদ্ধতিও হার মেনেছে এই অদ্ভুত অসুখের কাছে। বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল সেই ভিন রাজ্য থেকে। নিজের শহরে ফিরে এসেই মন্দার আর দেরি করেনি। এসে হাজির হয়েছিল “স্মৃতির দোকান”-এ। দোকানদারকে খুলে বলেছিল তার মায়ের অসুখের ব্যাপারটা। দোকানদার মনোযোগ দিয়ে পুরো ঘটনাটা শুনে কিছুক্ষণ গভীরভাবে কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন—
“হুম-ম, আপনার মায়ের সব স্মৃতি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব, যদি আপনি বিনিময়ে আপনার জীবনের কিছু উজ্জ্বল মুহূর্তের স্মৃতিগুলো আমাকে দিয়ে দিতে রাজি থাকেন।”
মন্দার নীরবে কিছুক্ষণ দোকানদারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর মাথায় তখন খেলে চলেছিল নানারকমের কাটাকুটি খেলা। তারপর একসময় সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। দোকানদারের দিকে তাকিয়ে বলল—”আমার কোন কোন স্মৃতি আপনাকে দিতে হবে?” দোকানদার স্মিত হেসে বললেন—”আপনার স্ত্রী আর মেয়ের সঙ্গে কাটানো সমস্ত ভালোবাসার আর হৃদয়স্পর্শী মুহূর্তগুলো আমাকে দিয়ে দিতে হবে। যেমন, প্রথমবার হাসপাতালে মেয়ের মুখ দেখা, মেয়ের মুখে প্রথম ‘বাবা’ ডাক শোনা, মেয়ের সঙ্গে খেলা, তাকে আদর করার নানা মুহূর্ত। অথবা ধরুন, প্রেমিকাকে প্রথম চুম্বন করার রোমান্টিক মুহূর্তের স্মৃতি, আপনার ফুলশয্যার মধুরতম স্মৃতিটি—এইসব কিছু দিয়ে দিতে হবে। বলুন, পারবেন?” একটু থেমে তিনি আবার বললেন—”ওরা ভুলে যাবে সব। কিন্তু আপনার সব মনে থাকবে।”
মন্দার সবকিছু শুনে চরম দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এসব স্মৃতি চলে গেলে তার আর থাকবেটা কী? মেয়ের, স্ত্রীর মন থেকে এসব স্মৃতি মুছে গেলে তার বেঁচে থাকার অর্থ কী থাকবে?
বাড়ি ফিরে সারারাত ঘুমোতে পারল না মন্দার। অনেক ভাবনাচিন্তা, মনের সঙ্গে যুদ্ধ করার পর সে মন শক্ত করল। কাউকে কিছু না জানিয়েই সিদ্ধান্ত নিল। পরের দিন অফিস ফেরত সে “স্মৃতির দোকান”-এ হাজির হয়ে দোকানদারকে বলল—মেয়ে আর স্ত্রীর স্মৃতির বিনিময়ে মায়ের স্মৃতি ফেরাতে রাজি। দোকানদার কথাটা শুনে খুব খুশি হলেন। সত্যি কথা বলতে কী, গত সন্ধ্যায় মন্দারের সঙ্গে কথা বলে তার মনে সামান্যতম আশা জাগেনি যে ভদ্রলোক তার সম্ভাব্য ক্রেতা হতে পারেন। দোকানদারও ভাবেননি এত সহজে, এত তাড়াতাড়ি সে রাজি হয়ে যাবে। সামান্য হেসে, খুশির গলায় তিনি বললেন—”বেশ, বেশ, আসুন, ভেতরে আসুন।” দোকানদার ওকে নিয়ে গিয়ে একটা গদিযুক্ত চেয়ারে বসালেন। সেখানে বসতে বসতে মন্দার ভাবে—মায়ের স্মৃতি ফিরে এলেই সব আবার আগের মতোই হয়ে যাবে, সব ঠিক হয়ে যাবে। এক অলীক দৃঢ় বিশ্বাস জন্ম নেয় তার মনে। দোকানদার ওর দু’কানে দুটো বড় বড় ইয়ারপ্লাগ আটকে দেন। পাশের একটা মনিটরের সুইচ অন করতেই সেটায় আলো জ্বলে উঠল, নানারকমের রেখাচিত্র ফুটে উঠতে লাগল। তার কানে আসতে লাগল মৃদু একটা সাঁই-সাঁই, অনেকটা বাতাস বয়ে যাওয়ার মতো শব্দ। কতক্ষণ এভাবে কেটেছিল মন্দার জানে না। হঠাৎই ‘ফট’ করে একটা শব্দের সঙ্গে মন্দার চোখ খুলল। সে কি ঘুমিয়ে পড়েছিল? দোকানদার কান থেকে প্লাগদুটো খুলে নিয়ে বললেন—”যান, বাড়ি যান, এবার সব ঠিক হয়ে যাবে।”
দোকান থেকে বের হয়ে যাওয়ার আগে ও নিছক কৌতূহলবশত দোকানদারকে প্রশ্ন করে—”আচ্ছা, এইসব স্মৃতিগুলো সংগ্রহ করে আপনি কী করবেন?” দোকানদার ওর দিকে ফিরে তাকান। হাসেন—”এইসব স্মৃতিগুলোকে আমরা মেমোরি মডুলেটর ডিভাইসে আপলোড করে রাখি। তারপর, কোনো স্মৃতি লোপ হওয়া মানুষের পরিবারের চাহিদামতো, উপযুক্ত মূল্যে সেই রোগীর মস্তিষ্কে সেটা ফিড করে দিই। অনেকেই আছেন যারা আমার মতো স্মৃতি-ব্যবসায়ীদের কাছে স্মৃতি বিক্রি করেন চড়া দামে। আবার আপনার মতো যারা ‘স্মৃতি এপিডেমিক’-এর শিকার হওয়া আপনজনের জন্য প্রিয়জনের স্মৃতি ফিরিয়ে দিতে নিজের মূল্যবান স্মৃতি বিনিময় করেন, তাদের স্মৃতিগুলো পেয়ে কোনো স্মৃতি-হারানো রোগের শিকার হওয়া মানুষ স্মৃতি ফিরে পান। আপনার স্মৃতিগুলোই তখন হবে তার নিজের জীবনের স্মৃতি। সেই ‘ফিড’ করা অন্য মানুষের স্মৃতিগুলোকেই সে নিজের অতীত স্মৃতি ভাবতে শুরু করবে, মানবে।”
বাড়ি ফেরার পথে এক তীব্র বিষণ্ণতা তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। তার জীবনের মধুরতম, প্রিয়তর স্মৃতিগুলো অন্য কোনো অচেনা মানুষের প্রিয় স্মৃতি হয়ে উঠবে—ভাবতেই একটা মন খারাপের ঢেউ বারবার আছড়ে পড়ছিল তার হৃদয়তটে। অবশ্য তার মাঝেই একটা স্বান্ত্বনা কিছুটা উপশম মাখিয়ে দিচ্ছিল তার ব্যথাতুর-জর্জর বিষণ্ণতায়—মা এবার সুস্থ হয়ে উঠবে। আবার আগের মতো হয়ে উঠবে।
পরদিন সকালে সত্যিই মন্দারের মা আবার আগের মতো হয়ে উঠলেন। পুরোনো দিনের মতো আজ সকালেও মন্দারের ঘুম ভাঙল পুজোর ঘরে মায়ের ঘণ্টাধ্বনিতে। পুজো শেষ করে মন্দারের ঘরের সামনে দিয়ে যেতে যেতে বিছানায় আধশোয়া ছেলের দিকে তাকিয়ে তিনি হাসলেন—”চা খাবি তো? আনছি।” মন্দার একমুঠো পুরোনো দিনের গন্ধ নাকে এসে আছড়ে পড়ার অনুভূতি বোধ করল—বহু মাস পর।
কিন্তু ওর অবাক লাগল অন্য একটি ঘটনায়। ঘুম ভাঙার পর একবারও বেদাঙ্গীকে এই ঘরে আসতে দেখেনি। অথচ, অন্যদিন বেশ কয়েকবার ঘরে ঢুঁ মেরে দেখে যায়। স্বামীর ঘুম ভেঙেছে দেখলে প্রাতরাশের আয়োজন শুরু করে। মন্দার ভারী প্রাতরাশ করে অফিস যায়। লুসিও প্রতিদিন স্কুলে বের হওয়ার আগে বাবাকে একটা হামি দিয়ে যায়। আধো ঘুম, আধো জাগরণে প্রতি সকালে সেই ভালোবাসা, আদরমাখা স্পর্শকে তীব্রভাবে অনুভব করে সে। আজ তার ব্যতিক্রম ঘটল।
ঐ ঘটনার পর কেটে গেছে বেশ কয়েক মাস—প্রায় এক বছরের কাছাকাছি। “স্মৃতির দোকান” বন্ধ হয়ে গেছে। স্মৃতিঘাতক মহামারীর প্রকোপ কাটিয়ে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে শহর ও তার মানুষজন। প্রবীণ-প্রবীণারা আবার ফিরে গেছেন তাদের নিজ নিজ বার্ধক্যের গণ্ডিতে।
শুধু ছন্দপতন ঘটে গেছে মন্দারের জীবনে। সেই স্মৃতি বিনিময়ের দিনের পর থেকেই বেদাঙ্গী আর লুসির সঙ্গে তার সম্পর্কের বাঁধনটা কেমন যেন আলগা হয়ে গেছে। কোথাও যেন একটা তার ছিঁড়ে গেছে। মন্দার বোঝে—এটাই তার ভবিতব্য। স্মৃতি বিনিময়ের ফলে ওদের দু’জনের মন থেকেই মন্দারের বিষয়ে মধুর ও ভালোবাসার স্মৃতিগুলো অনেক ফিকে হয়ে গেছে। তাই ওরা দু’জনেই ওর প্রতি সেই পুরোনো ভালোবাসা, টান, আত্মীয়তা অনুভব করে না আর—স্বামী ও বাবা হিসেবে। শুধুমাত্র মা-ই একমাত্র আবার আগের মতো আছে। মন্দারের জীবনে এক আকাশভরা দুঃখ, বিষণ্ণতায় এই একটিই স্বান্ত্বনার দ্বীপ—সুখের একমাত্র প্রলেপ, আনন্দের স্পর্শানুভূতি।
মায়ের সঙ্গে সে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গল্প করে, কথা বলে, সময় কাটায়। মায়ের সঙ্গে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে উপভোগ করে নিতে চায় সে।
এক রবিবারের সকালে বন্ধুদের আড্ডা থেকে ফিরে বাড়িময় পাঁঠার মাংস রান্নার মো-মো গন্ধ পায়। ব্যাপারটায় অবাক হয়। পাঁঠার মাংস সে খায় না। লুসিও চিকেনই পছন্দ করে। মাটন দু’-এক টুকরোর বেশি খায় না। আর বেদাঙ্গী তো পুরোপুরি ভেগান। অপরূপা দেবীও বহুদিন হল মাছ, মাংস খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। সেই কারণেই পাঁঠার মাংস তাদের বাড়িতে প্রায় আসেই না।
অবাকভাবে রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়—”মা, মাটন রান্না করছ? কেউ আসবে নাকি আজ?”
অপরূপা দেবী ঘাড় ঘুরিয়ে তাকান, হাসেন—”না রে ছোটন, আজকে তোর প্রিয় রান্না মাটন রেজালা বানাতে বললাম। বহুদিন নিজের হাতে তোকে পাঁঠার মাংস রান্না করে খাওয়ানো হয় না। তাই দাশুয়াকে দিয়ে মাটন আনালাম।”
দাশুয়া ওদের ছাদবাগানের মালি।
মন্দারের সারা শরীরে তীব্র একটা বিদ্যুৎঝলক বয়ে যায়। রান্নাঘরের দরজা থেকে ছিটকে সরে আসে। ওর চারপাশে সবকিছু ঘূর্ণির মতো বনবন করে ঘুরতে থাকে। দেওয়ালটাকে আঁকড়ে ধরে ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ে সে।
ছোটন— তার পরের ভাই মন্থন। চার বছর আগে বাইক দুর্ঘটনায় মৃত।
মা বড় ছেলেকে এই কয়েক মাস তাহলে মৃত ছোট ছেলে ভেবে এসেছে? ভাবছে?
স্মৃতি বিনিময়ের পর তাহলে কোনোভাবে মায়ের স্মৃতি থেকে মুছে গেছে সে? তার জায়গা নিয়েছে তার অকালমৃত ছোট ভাই?
এতকিছুর পর তার জীবনের নিট যোগফল তাহলে শূন্যই?