সোমবার | ০৩ আগস্ট ২০২৬

নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়িনী নার্গিসকে ইরানে সাত বছরের কারাদণ্ড

 নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়িনী নার্গিসকে ইরানে সাত বছরের কারাদণ্ড

সৌম্য ঘোষ
সাত বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলেন ২০২৩ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী নার্গিস মোহম্মদী। নার্গিস-কে এই শাস্তি দিল ইরানের জাতীয় আদালত। নার্গিসের আইনজীবী তার সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এই খবর জানিয়েছেন। নার্গিসের আইনজীবী মোস্তাফা নিলি মেহেদী জানিয়েছেন— একাধিক অভিযোগে তাকে এই শাস্তি দিয়েছে ইরান সরকার। তবে নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ীর শাস্তি বিষয়ে মুখ খোলেনি ইরানি প্রশাসন। মহিলাদের উপর যথেষ্ট অত্যাচার, নিপীড়নের প্রতিবাদে ফেব্রুয়ারির শুরুতেই জেলের ভেতরেই ইরান সরকারের বিরুদ্ধে অনশনে বসেছেন নার্গিস । জুন মাসের ২৭ তারিখে নার্গিসের আইনজীবী নিলি মেহেদী জানিয়েছেন ষড়যন্ত্র ও ষড়যন্ত্রমূলক কাজে যুক্ত থাকার অপরাধে ছয় বছরের কারাদণ্ড এবং সরকারের বিরুদ্ধে ভুয়ো খবর ছড়ানোর অপরাধে আরও এক বছরের কারাবাসের সাজা শোনানো হয়েছে নার্গিসকে। নার্গিসের বিদেশ ভ্রমণের উপরেও দু’বছরের নিষেধাজ্ঞা (অর্থাৎ যাতে বিদেশে পালিয়ে না যেতে পারেন কোনওভাবে জামিন নিয়ে) জারি করা হয়েছে। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে তার পাসপোর্টও।
৫৩ বছর বয়সি নার্গিস ছাত্রাবস্থা থেকেই ইরান প্রশাসনের কুনজরে রয়েছেন তার প্রতিবাদী চরিত্র ও ভূমিকার জন্যে। অভিযোগ, এই সমাজকর্মীকে নানা অছিলায় একাধিক বার হেনস্থার শিকার বানিয়েছে ইরানি প্রশাসন। এ পর্যন্ত মোট ১৭ বার গ্রেফতার হয়েছেন তিনি। গত দুই দশকের অধিকাংশ সময়টাই জেলেই কাটিয়েছেন তিনি। কিন্তু তারপরেও ইরানের মৌলবাদী প্রশাসন তার আন্দোলন দমাতে পারেনি। দমাতে পারেনি তার প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর। মানব অধিকারের লড়াইয়ে কারাগারে থেকেও সোচ্চার ছিলেন নার্গিস। একাধিকবার নিজের প্রতিবাদ জানাতে জেলের মধ্যেই বসেছেন ধর্নাতেও।
২০২৫ এর ডিসেম্বরে ইরানের পুলিশ ফের একবার গ্রেপ্তার করে নার্গিসকে। এই নোবেল জয়ী সমাজকর্মীর সংস্থা ‘নার্গিস ফাউন্ডেশন’-এর দাবি, প্রয়াত আইনজীবী খসরু আল কোরদি-কে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন নার্গিস। সমাধিক্ষেত্র থেকেই নার্গিসকে গ্রেফতার করে ইরানি পুলিশ। শুধু গ্রেফতারই নয়, সে সময় তাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয় এবং তার পোশাকও ছিঁড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। আরও অভিযোগ উঠেছে, নার্গিসকে নিগ্রহ করা হচ্ছে দেখে, সেই সময় প্রতিবাদ করে বাধা দিতে এসে পুলিশের মারধোরে গুরুতর আহত হন খশরুকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসা গণ্যমান্য অতিথিদের অনেকেই। এই খবর সামনে আসতেই নিন্দার সরব হয় গোটা পৃথিবী। এমনকি, ইরানের বন্ধু কয়েকটি দেশও ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ করে। ইরানের মহিলাদের উপর অত্যাচারের প্রতিবাদ এবং মানবাধিকারের বিরুদ্ধে নার্গিসের লড়াই দীর্ঘ কয়েক দশক ধরেই সারা পৃথিবী জানে। মানব অধিকার রক্ষায় নার্গিসের অবদানের কথা মাথায় রেখে, দীর্ঘ সংগ্রামকে কুর্নিশ জানাতে, ২০২৩ সালে নার্গিস মোহাম্মদীকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। নার্গিস তখন কারাবন্দি। ২০২৫ সালে চিকিৎসার জন্য প্যারোলে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৫ দিন না পার হতেই, তারই মাঝে ফের গ্রেপ্তার হন নার্গিস। আর তারপর এই বিচারের নামে প্রহসনে তাকে দেওয়া হল দীর্ঘ কারাবাসের সাজা।
নার্গিসের জন্ম ১৯৭২ সালের ২১শে এপ্রিল। জন্মগতভাবে তিনি পার্সি। ইরানের জনঝজন প্রদেশে তার জন্ম। বাবার নাম ইসমাইল আল-জাইদি মোহাম্মদী। ১৯৯৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশদ্রোহিতা, সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, নাশকতা, সরকারের বিরুদ্ধে প্ররোচনা ছড়ানো, গণ অভূত্থানের চেষ্টা, বিদেশি শত্রু দেশের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি, ইত্যাদি অভিযোগে মোট ১৭ বার গ্রেফতার ও একত্রিশ বার কারাবাসের দণ্ড এবং বেশ কয়েক দফায় মোট ১৪৪ ঘা বেত্রাঘাত ভোগ করতে, পেতে হয়েছে তাকে। তবুও এই নির্ভীক সমাজকর্মী, নারী পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী লড়াকু নারীকে দমানো যায়নি। তিনি ‘হোয়াইট টর্চার: ইন্টারভিউ অফ ইরানিয়ান ওম্যান প্রিজনার’ নামের একটি বই লিখে মৌলবাদী ইরানি প্রশাসনের আরও চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন। এই বইটিতে নিজের জেল বাসের নানা সময় নানা জেলে থাকা মহিলা বন্দিদের সাক্ষাৎকার নেন নার্গিস। ইরানের জেল একজন মহিলার কাছে কতটা নরক তুল্য, সেখানে তাদের উপর কত ধরনের দমন-পীড়ন, নির্যাতন, অকথ্য অত্যাচার চালানো হয় সেসব কথাই খুব খোলামেলা স্পষ্ট বিস্তারিতভাবে লেখা হয়েছিল ওই বইটিতে। বলাই বাহুল্য, বইটি প্রকাশিত হবার পরই ইরানি প্রশাসন সেটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু ততদিনে বইটির বেশ কিছু কপি ইরানের বাইরে পাচার হয়ে গেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পৌঁছে গেছে। এবং সেই বইগুলোই রিপ্রিন্ট হয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল। গোটা বিশ্ব জানতে পেরেছিল ইরানের জেলে মহিলা বন্দিনীদের সঙ্গে কী রকম অকথ্য ব্যবহার করা হয়, কীভাবে তাদের উপর অমানবিক দমন পীড়ন অত্যাচার চালানো হয়, তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়। সারা পৃথিবী প্রতিবাদে সরব হয়ে উঠেছিল সেইসব ঘটনা জেনে। ইরান সরকারের মুখ পড়েছিল ভালোভাবেই।
সুতরাং এরকম এক দূর্বিনীত মহিলাকে কি জেলের বাইরে ছেড়ে রাখা যায়? আর তাকে বাগ মানাতে চেয়ে প্রকাশ্যে বেত্রাঘাতের চেয়ে কম কোনও শাস্তি কি দেওয়া যায়? তবুও বাগ মানানো যায়নি অদম্য এই সমাজকর্মীকে। নারীর অধিকারের জন্য, নারীর বিরুদ্ধে অত্যাচার দমন পীড়নের বিপক্ষে লড়াই করতে গিয়ে জীবনের অনেকটাই কেটেছে জেলের অন্ধকার কুঠুরিতে। নোবেল পুরস্কার নিতে যেতে দেওয়া হয়নি মূল অনুষ্ঠানে। এখনও দেশের বাইরে যাবার পথ বন্ধ। পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করেছে সরকার। তবু তার কোনও খেদ বা ক্ষোভ নেই। ‘ইরানের নারীদের জন্য আমার এই লড়াই জারি থাকবে আমৃত্যু’ ফুটন্ত গলায় বলেন নার্গিস। একুশ শতকের প্রতিবাদী নারীর জ্বলন্ত উদাহরণ, এক প্রতীক, নারী আন্দোলনের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *