শনিবার | ৩০ মে ২০২৬

ভোট, ভিটেমাটি ও পরিযায়ী জীবনের দীর্ঘশ্বাস!!

 ভোট, ভিটেমাটি ও পরিযায়ী জীবনের দীর্ঘশ্বাস!!

গণতন্ত্রের মহোৎসব দেশের দুয়ারে যখনই কড়া নাড়ে, তখনই ভারতের রেলস্টেশন, ট্রেনের কামরা কিংবা বাসস্ট্যান্ডের উপচে পড়া ভিড়ে এক চেনা দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে। গত এপ্রিল মাসে পশ্চিমবঙ্গের নিজ ভূমে ভোট দিতে ফেরা পরিযায়ী শ্রমিকদের সেই চেনা ঠাসাঠাসি ভিড়ের ছবি যখন সমাজমাধ্যমে ঘুরপাক খাচ্ছিল, তখন গুরুগ্রামের এক নাগরিক সমাজমাধ্যমে মন্তব্য করেছিলেন, ‘গুরুগ্রাম পশ্চিমবঙ্গে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি কামনা করে, কারণ আমরা আমাদের পরিচারিকাদের নিরাপদ ও দ্রুত প্রত্যাবর্তন চাই’- আপাতদৃষ্টিতে মৃদু কৌতুক বলে মনে হলেও, তা আসলে একবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় শ্রমবাজারের নগ্ন ও নির্মম বাস্তবকে আদিম নগ্নতায় প্রকাশ করে দেয়। এই হালকা রসিকতার অন্তরালে লুকিয়ে থাকে এক সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা, যা শ্রমিককে মানুষ হিসেবে নয়, কেবল নিজের প্রয়োজন মেটানোর এক যান্ত্রিক উপকরণ হিসেবেই দেখতে অভ্যস্ত।

যে প্রান্তিক মানুষগুলি দূরান্তের শহরে দশ-বারো জন মিলে এক-এক কামরায় পশুর মতো দিন কাটান, প্রতিটি পাই-পয়সা বাঁচিয়ে দেশের বাড়িতে পাঠান সন্তানের শিক্ষা কিংবা বৃদ্ধ পিতা-মাতার চিকিৎসার জন্য, তাদের কাছে বারবার পরিচয় প্রমাণ করতে বা ভোটার তালিকায় নাম টিকিয়ে রাখতে কাজের জায়গা ছেড়ে বাংলায় ছুটে যাওয়া নিছক প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা ছিল না। তা ছিল এক সরাসরি আর্থিক বিপর্যয়। দিনমজুরির খাতা থেকে নাম কাটা যাওয়া, কাজ হারানোর আশঙ্কা আর নতুন ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ার এই যে দীর্ঘশ্বাস, তার খবর এ দেশের বিলাসী মধ্যবিত্ত সমাজ কোনও দিন রাখেনি। এই মানুষগুলি যখন রেললাইনে কাটা পড়েন বা ভিনরাজ্যে হিংস্র আক্রমণের শিকার হন, কেবল তখনই তারা সংবাদমাধ্যমের কৃপায় ক্ষণিকের জন্য ‘দৃশ্যমান’ হন। বাকি সময়টা তারা দেশের সুবৃহৎ অর্থনৈতিক যন্ত্র সচল রাখার এক অদৃশ্য ‘লুব্রিক্যান্ট’ মাত্র- যন্ত্রকে সচল রাখাই যাদের নিয়তি, কিন্তু মূল কাঠামোয় যাদের কোনও স্থান নেই।

এই চরম সংকটের রাজনৈতিক দায় নিয়ে চাপানউতোর অবশ্যম্ভাবী। পশ্চিমবঙ্গ থেকে কেন এই বিপুল জনস্রোত সস্তা শ্রমের বাজারে ভিনরাজ্যে বিকিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে, সেই সমস্যাটিকে কেবল একটি রাজ্যের সীমানায় বন্দি রাখলে এর জাতীয় ব্যাপ্তিটি আড়াল হয়ে যায়। বিগত এক দশকে কেন জাতীয় স্তরে কর্মসংস্থানের গতি এমন মন্থর, কেন দেশের আশি শতাংশের বেশি শ্রমিক আজও কোনও সামাজিক সুরক্ষা ছাড়া অসংগঠিত ক্ষেত্রের অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত, এবং কেনই বা ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে শিল্প বিনিয়োগ সম্পূর্ণ স্থবির- এই মৌলিক প্রশ্নগুলির কাঠগড়ায় কেন্দ্রীয় নীতিকেও দাঁড় করানো প্রয়োজন।

পুঁজি ও সম্পদের অবাধ চলাচলকে যে মুক্তবাজার অর্থনীতি ‘স্বাভাবিক’ বলে বরণ করে নেয়, সেই একই বাজার শ্রমিকের অবাধ চলাচলকে মেনে নিতে এতখানি কুণ্ঠিত ও সন্দিহান কেন? আমেরিকা বা ইউরোপের পুঁজিবাদী কেন্দ্রীভবনের তত্ত্ব আওড়ে ভারতের আঞ্চলিক বৈষম্যকে জাস্টিফাই করা চলে না। কারণ, এখানে কেবল অর্থনৈতিক শোষণ নয়, যুক্ত হয়েছে সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও। কেবল বাংলা ভাষায় কথা বলার অপরাধে ভিনরাজ্যে বাঙালি শ্রমিকের উপর চড়াও হওয়া বা তাদের পিটিয়ে মারার ঘটনা আজ আর বিচ্ছিন্ন নয়। অথচ, রাষ্ট্র এ ক্ষেত্রেও এক আশ্চর্য ও রহস্যময় নীরবতা পালন করে চলেছে। আমরা কি তবে সত্যিই এক দেশের মানুষ, নাকি সস্তা শ্রমের প্রয়োজনে পরিযায়ী শ্রমিককে ডেকে এনে স্বার্থ ফুরোলেই ‘বহিরাগত’ বলে আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলার এক দ্বিচারী সমাজ?

জাতিরাষ্ট্র যদি কেবল একটি শুষ্ক প্রশাসনিক মানচিত্র না হয়ে এক যৌথ সামাজিক কল্পনা হয়, তবে সেই কল্পনায় পরিযায়ী শ্রমিকের স্থান কোথায়? প্রশ্ন এখানেই, কে কাকে ভোট দিল, কোন দল ক্ষমতায় বসল- সেই নির্বাচনি পাটিগণিতের আড়ালে এই মানুষগুলির বুনিয়াদি নাগরিক অধিকার কত দিন সুরক্ষিত থাকবে? বারবার লাইনে দাঁড়িয়ে, রাষ্ট্রের দরজায়
নিজের পরিচয় ও আনুগত্যের প্রমাণ দিয়েও পরিযায়ী শ্রমিকেরাকি এই স্বাধীন ভারতের পূর্ণ মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক হয়ে উঠতে পারলেন? নাকি শাসনযন্ত্রের নীতিহীনতা আর সমাজের ঔদাসীন্যের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে তারা চিরকাল প্রয়োজনের সময়ে ডেকে নেওয়া, আর অপ্রয়োজনের সময়ে ভুলে যাওয়া এক ‘ছায়ামানুষ’ হিসেবেই থেকে যাবেন? ক্ষমতার অলিন্দে এই প্রশ্ন আজ প্রতিধ্বনিত হওয়া প্রয়োজন, কারণ শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষা করতে না পারলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের অহংকার এক মস্ত বড় ফাঁকিবাজিতে পরিণত হয়। পরিযায়ী শ্রমিকদের এই যে আত্মপরিচয় ও নাগরিক মর্যাদা রক্ষার মরণপণ লড়াই, তা তো আসলে এক মরণান্তিক যন্ত্রণারই খতিয়ান, তাই না!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *