শুক্রবার | ১০ জুলাই ২০২৬

হরমুজে ফের উত্তেজনা, তেল-গ্যাসের জোগান নিয়ে বাড়ছে দুশ্চিন্তা! মোদী সরকারের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

 হরমুজে ফের উত্তেজনা, তেল-গ্যাসের জোগান নিয়ে বাড়ছে দুশ্চিন্তা! মোদী সরকারের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

অনলাইন ডেস্ক, কলকাতা: পশ্চিম এশিয়ায় আবারও যুদ্ধের আবহ ঘনিয়ে আসায় ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগেই আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম অনেকটাই নেমে এসেছিল। তাতে স্বস্তি পেয়েছিল নয়াদিল্লি। কিন্তু পরিস্থিতি আবার অস্থির হয়ে ওঠায় অপরিশোধিত তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে। ফলে মোদী সরকারের সামনে আবারও তেল আমদানি, গ্যাসের জোগান এবং মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমেরিকা-ইরানের সংঘাতের পর সাময়িক যুদ্ধবিরতি এবং আলোচনার পরিবেশ তৈরি হলেও সেই সমঝোতা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন, আগের বোঝাপড়া কার্যত শেষ হয়ে গেছে। যদিও স্থায়ী শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি, তবুও তিনি আলোচনাকে “সময় নষ্ট” বলেও মন্তব্য করেছেন। এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালী এলাকায় জ্বালানিবাহী জাহাজকে ঘিরে নতুন উত্তেজনার খবর সামনে এসেছে। পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের ঘটনাও আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে অপরিশোধিত তেলের দামে। সংঘাতের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। পরে উত্তেজনা কমায় তা আবার ৭০ ডলারের আশেপাশে নেমে আসে। কিন্তু সাম্প্রতিক অস্থিরতার জেরে দাম আবার ৮০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়। পরে কিছুটা কমলেও বাজারে অস্থিরতা এখনও কাটেনি।
ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশ তার মোট তেলের চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বছরে প্রায় ১৮০ থেকে ২০০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করতে হয়। ব্যারেলপ্রতি মাত্র ১ ডলার দাম বাড়লেও বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২০০ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। আর তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে চলতি হিসাবের ঘাটতি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির উপরও তার উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ে।
পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের এক শীর্ষকর্তা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও সরকার তড়িঘড়ি পেট্রল-ডিজেলের দাম কমায়নি। কারণ পরিস্থিতি অত্যন্ত অনিশ্চিত। যুদ্ধের সময় বেশি দামে কেনা তেল এখনও শোধন করে বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে সাময়িক দাম কমলেও তার পুরো সুবিধা অবিলম্বে খুচরো বাজারে দেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে আপাতত অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ নিয়ে বড় কোনও সংকট নেই বলেই দাবি সরকারি সূত্রের। গত কয়েক বছরে ভারত পশ্চিম এশিয়ার উপর নির্ভরতা কিছুটা কমিয়ে রাশিয়া, আমেরিকা, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে তেল আমদানি বাড়িয়েছে। বর্তমানে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশ পশ্চিম এশিয়া থেকে আসে।
কিন্তু উদ্বেগের জায়গা অন্যত্র। ভারতের এলপিজি আমদানির প্রায় ৯০ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৬০ শতাংশ এখনও পশ্চিম এশিয়ার উপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে ইরাক, কুয়েত ও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা জ্বালানির বড় অংশই হরমুজ প্রণালী দিয়ে ভারতে পৌঁছায়। এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে দীর্ঘদিন অশান্তি চললে জাহাজ চলাচলে বিলম্ব, পরিবহণ ও বিমার খরচ বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। পাশাপাশি বিকল্প দেশ থেকে তেল সংগ্রহের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাও বেড়ে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষক সংস্থা কেপলারের মতেও বর্তমানে ভারতের জন্য তেলের তাৎক্ষণিক সংকট নেই। তবে হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এলপিজি ও এলএনজি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে শুধু জ্বালানির দামই নয়, পরিবহণ ব্যয়, শিল্প উৎপাদন এবং মূল্যস্ফীতির উপরও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি আগামী কয়েক সপ্তাহে কোন দিকে যায়, তার উপরই নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের ভবিষ্যৎ। আর সেই কারণেই পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে ভারত সরকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *