বৃহস্পতিবার | ২৩ এপ্রিল ২০২৬

অর্থনীতির অশনি সংকেত!!

 অর্থনীতির অশনি সংকেত!!

পৃথিবীর এক প্রান্তে যুদ্ধ শুরু হলে তার অভিঘাত যে হাজার মাইল দূরের সাধারণ মানুষের জীবনে এসে পৌঁছায়-এই সত্য নতুন নয়। কিন্তু পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক অস্থিরতা সেই বাস্তবতাকেই আবারও নির্মমভাবে সামনে এনে দিয়েছে। যুদ্ধ, যুদ্ধবিরতি, আবার সংঘাতের ইঙ্গিত- এই অনিশ্চয়তার দোলাচলে আজ কার্যত আটকে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ুকেন্দ্র। আর সেই স্নায়ুর টানাপোড়েন সরাসরি অনুভব করছে ভারত।

প্রথম বড় ধাক্কা আসে যখন হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হয়। এই সরু সমুদ্রপথ দিয়েই বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ হয়। ফলে এখানে অচলাবস্থা মানেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়া। ভারতের মতো একটি আমদানি নির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি বিপজ্জনক সংকেত। দেশের মোট তেল চাহিদার সিংহভাগই বিদেশ থেকে আসে, যার একটি বড় অংশ পশ্চিম এশিয়ার উপর নির্ভরশীল। ফলে তেলের দাম বাড়া মানেই পরিবহণ খরচ বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি।

যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় কিছুটা স্বস্তি মিলেছিল বটে, কিন্তু তা ছিল ক্ষণস্থায়ী। ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টানাপোড়েন যে শেষ হয়নি, তা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। এই অস্থিরতার মধ্যেই দেশের আর্থিক নীতিনির্ধারকরাও সতর্ক। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা মঙ্গলবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বক্তৃতায় বলেছেন মূল্যবৃদ্ধি আরও বাড়বে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, এই মুহূর্তে ভারতের অবস্থান “ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ”- অর্থাৎ পরিস্থিতি কোন্ দিকে মোড় নেয়, তার উপরই নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণ।

এই সংকটের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো এর বহুমাত্রিক প্রভাব। একদিকে জ্বালানি আমদানির খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে রপ্তানি বাণিজ্যও চাপে পড়ছে। পশ্চিম এশিয়া ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার-বাসমতি চাল, চা, গয়না, বস্ত্র থেকে শুরু করে নানা পণ্যের বড় বাজার। সংঘাত বাড়লে সেই বাজার সংকুচিত হবে, ফলে দেশের বৈদেশিক আয়ে ধাক্কা লাগবে। অর্থনীতির এই দ্বিমুখী আঘাত দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধির গতিকেই শ্লথ করে দিতে পারে।

তবে আরও গভীর একটি প্রভাব লুকিয়ে আছে প্রবাসী ভারতীয়দের আয়ের মধ্যে। উপসাগরীয় দেশগুলিতে কর্মরত লক্ষ লক্ষ ভারতীয় প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠান, যা গ্রামীণ ও শহুরে অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ভরকেন্দ্র। যুদ্ধের আবহে যদি সেই দেশগুলির অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের বহু পরিবারের দৈনন্দিন জীবনে- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভোগব্যয়- সব ক্ষেত্রেই।

আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো সরবরাহ শৃঙ্খলের ভাঙন।আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আজ এক জটিল নেটওয়ার্কের উপর দাঁড়িয়ে। কোথাও একটি বড় ধাক্কা লাগলেই তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে শুধু জ্বালানি নয়, সার, ওষুধের কাঁচামাল, এমনকী খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও সরবরাহে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর ফল হবে মূল্যবৃদ্ধি এবং উৎপাদন হ্রাস- দুটোই অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অনিশ্চয়তা। অর্থনীতি শুধু সংখ্যার খেলা নয়; এটি বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে। বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীলতা চান, বাজার চায় পূর্বাভাসযোগ্যতা। কিন্তু যুদ্ধের আবহে সেই বিশ্বাসই সবচেয়ে বেশি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। ফলে নতুন বিনিয়োগে ভাটা পড়ে, শিল্পক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিলম্বিত হয় এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক গতি মন্থর হয়ে যায়।

তবে সংকটের মধ্যেই সুযোগ খোঁজার প্রয়োজন রয়েছে। জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্য করা, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন শক্তিশালী করা- এই পদক্ষেপগুলি দীর্ঘমেয়াদে ভারতের ঝুঁকি কমাতে পারে। একইসঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি, যাতে মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত সাধারণ মানুষের উপর কম পড়ে। অর্থনীতি কখনও শূন্যে ভাসে না; তা নির্ভর করে ভূ-রাজনীতির উপর, মানুষের উপর এবং বিশ্বাসের উপর। পশ্চিম এশিয়ার এই অস্থিরতা সেই তিন স্তম্ভকেই নাড়িয়ে দিচ্ছে। ভারতের সামনে তাই এখন বড় প্রশ্ন- এই বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার ঢেউ সামলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হবে তো?

পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা তাই আর কেবল একটি দূরবর্তী ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা নয়; এটি ভারতের ঘরে ঘরে প্রভাব ফেলতে পারে এমন এক বাস্তবতা। সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা কেউ ঝড়ের নিশ্চিত করে বলতে পারে না। তবে সতর্কবার্তা স্পষ্ট পূর্বাভাস মিলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *