ক্ষমতায় বিজেপি, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষায় পশ্চিমবঙ্গ!!
পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার ক্ষমতায় ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার।তাঁদের পশ্চিমবঙ্গে। এই ক্ষমতায় আসার জন্য মানুষের অনেকগুলি প্রত্যাশা কাজ করেছে। এইগুলি কতটা পূরণ হবে কি হবে না তার ওপর নির্ভর করছে নতুন সরকার বাঙলার জন্য কতটা ভালো হবে কি খারাপ হবে। মানুষের সাধারণ প্রত্যাশা ছিল, প্রশাসন হবে দুর্নীতিমুক্ত। তৃণমূলের আমলে গ্রাম থেকে শহর, গলি থেকে রাজপথ সর্বত্র তোলাবাজের যন্ত্রণায় মানুষ জর্জরিত হয়ে গিয়েছিলেন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নেতারা বিরোধীপক্ষে থাকাকালে বলেই থাকেন, দুর্নীতিমুক্ত রাজ্য বা রাষ্ট্র দরকার। কথাটার কোনো মানে ভারতে তো নেই, দক্ষিণ এশিয়ায়ই কেউ কোনদিন খুঁজে পান নি। এই কথাটাকে নির্বাচনে ইস্যু করতে পারাই হচ্ছে সাফল্য, যা বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ সালে করতে পেরেছে। এটি ২০১৪ সালে আন্না হাজারেকে সামনে রেখে করেছিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ, যার সুফল সে দিন পেয়েছিল বিজেপি।
২০১৪ সালের পর থেকে দেশে বিজেপির জয়জয়কার। বিজেপি যে রাজ্যগুলো শাসন করছে, সেখানে বিভিন্ন স্তরে প্রভৃত দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সেখানে পরিস্থিতি সামাল দিতে বিজেপি তাদের প্রধান তুরুপের তাস হিসাবে হিন্দুত্বের হাওয়া তুলে তুলে দুর্নীতির ইস্যু মোটামুটি চাপা দিতে পারে। এই সুযোগ আবার বিজেপির বাইরের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলের নেই। তাও পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আশায় বুক বেধে আছেন তোলাবাজি বন্ধ হবে। স্পষ্টতই বাঙলার মানুষের চাহিদা পূরণে রাজ্যের নতুন সরকারের সামনে রয়েছে একাধিক চ্যালেঞ্জও। আবার অনেকগুলি চ্যালেঞ্জ আসতে পারে অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকে। যেমন ক্ষমতায় এসেই বিজেপি গরুসহ গবাদিপশুর জন্মসনদ দেখে তাদের বয়স নির্ধারণের ওপর জোর দিয়েছে। বলেছে, অপ্রাপ্তবয়স্ক গরু কাটা যাবে না। বিজেপির মনে হয়েছিল চেনা পথেই তারা বাজিমাত করে নেবে, রেগে যাবে মুসলমান সমাজ, বিশেষত ঈদ-উল আজহার আগে। কিন্তু ঘটনাটা ঘটল অন্য রকম।
মুসলমানরা একেবারে চুপ করে গেলেন। বরং প্রতিবাদ এল হিন্দুদের তরফে। হিন্দুদের গো পালক সেই অংশ, যারা এত দিন বিজেপিকে সমর্থন করেছেন। গো-পালক ঘোষ সম্প্রদায় গরু পালন করে, বড় করে, দুধ বিক্রি করে তারা যেমন আয় করেন, তেমনি ছেলে গরুগুলি কিংবা দুধ দিতে অযোগ্য বুড়ো গাভীগুলি বিক্রি করে থাকেন। বলা যায় গরু বিক্রি এইসব পরিবারের বড় রোজগার। বাংলায় গরুর ক্রেতা মুসলমানরা, বিশেষত কোরবানির আগে। একাধিক হিন্দু গো-পালক ব্যবসায়ী বলেছেন, তাদের ওপর আক্রমণের আশঙ্কায় মুসলমানরা গরু কিনতে ভয় পাচ্ছেন। ভারতের আর কোথাও বিজেপি এ ধরনের সমস্যায় পড়েছে বলে জানা যায় না, যেখানে হিন্দুরা গরু বিক্রি করতে চাইছেন এবং মুসলমানরা কিনতে অস্বীকার করছেন। আগামীদিনেও এই রকম নানা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে বিজেপি সরকার ও দলকে।
এর কারণ হল পশ্চিমবঙ্গের সমাজ ব্যবস্থা দেশের যে কোনও প্রান্তের, অঞ্চলের চেয়ে আলাদা। উত্তর ভারতের মতো গভীরভাবে মেরুকৃত নয় এখানকার গ্রামীণ সমাজ। হয়তো ভবিষ্যতে উত্তর ভারতের মতই বানিয়ে নেবে বিজেপি, কিন্তু এখনো হয়নি। এই অঞ্চলে একদিকে যেমন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পরস্পর বিরোধিতার ইতিহাস আছে, তেমনই আবার মিলেমিশে থাকার একটা দীর্ঘ ইতিহাস আছে, যার বয়স হতে পারে দেড় হাজার বছর। এই ইতিহাসের কারণেই পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু গো গোয়ালা প্রশ্ন করছেন, মুসলমানরা গরু না কিনলে তারা বাঁচবেন কী করে? এই সংস্কৃতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে বাংলার সমাজকে উত্তর ভারতের মতো করে গড়ে নেওয়া খুব সহজ কাজ হবে এমন ভাবা যায় না। এটা বিজেপির জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। এটি একটি আভ্যন্তরীণ বিষয়।
আবার সীমান্তবর্তী রাজ্য হিসাবে বিদেশ মন্ত্রকের বিভিন্ন কাজকর্ম ও অবস্থানের সঙ্গে রাজ্যকে নিজ অবস্থান ও কথাবার্তায় সাজুয্য রাখতে হয়। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের অনেক আগে থেকে একটা ন্যারেটিভতৈরি হয়েছিল। সে হল বাংলাদেশ থেকে প্রচুর (লক্ষ লক্ষ) মুসলমান, রোহিঙ্গা ভারতে প্রবেশ করেছে। ভোটের ফলাফলের পরেও কিন্তু এই ন্যারেটিভ দুর্বল করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে না, বরং একে শক্তিশালী করা হচ্ছে। এই দাবির কোনো পক্ষে পরিসংখ্যানগত ভিত্তি এখনো নেই, বিদেশ মন্ত্রণালয়ের দাবি ছাড়া। মন্ত্রকের দাবি, দুই হাজারের বেশি মানুষকে তারা ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করছে। অতীতে প্রতিপক্ষ তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘মুসলমান তোষণের’ অভিযোগ তুলে বিজেপি। তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে রাজনৈতিক স্বার্থে অনুপ্রবেশের বিষয়টিকে জিইয়ে রাখা হয়। এখন তৃণমূল কংগ্রেস নেই। এই অবস্থাতেও অনুপ্রবেশের ইস্যু পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি আরও জোরালোভাবে সামনে আনলে এটি বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ তৈরি করতে পারে, সেই দায় রাজ্যকেই নিতে হবে দিল্লির মন্ত্রকের তরফে।