বেগম রোকেয়া একশো উনিশ
সৌম্য ঘোষ
(প্রথম পর্ব)
বাংলাদেশের নারী শিক্ষা ও মানুষ হিসেবে
নারীকে প্রতিষ্ঠা করে একটি অগ্রগামী, আধুনিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বিপ্লবী পথপ্রদর্শক বেগম রোকেয়া। তিনি একাগ্রতার সঙ্গে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে দুই বাংলার পিছিয়ে থাকা নারীদের শিক্ষা ও সামাজিক স্বীকৃতি অর্জনের সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে, অনুপ্রাণিত করে মানুষ হিসেবে নারীর সম্মান ও ক্ষমতায়নের ভিত সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। শিক্ষাব্রতী রোকেয়ার বৈজ্ঞানিক কল্প উপন্যাস ‘সুলতানাজ ড্রিম’ ইউনেস্কোর স্বীকৃতি অর্জন করে যা বিশ্বজুড়ে নারীর অগ্রযাত্রার একটি মাইলফলক। রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দে জন্ম নেওয়া কলকাতায় বেড়ে ওঠা এবং নারী শিক্ষায় বৈপ্লবিক নেতৃত্বদানকারী মহীয়সী নারী উপন্যাস সুলতানের স্বপ্ন মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটোরে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ওয়ার্ল্ড কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওয়ার্ড কমিটির ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করে ইউনেস্কোর ‘মেমোরিয়াল অফ দা ওয়ার্ল্ড রেজিস্টারে’ এশিয়া ও মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য অন্তর্ভুক্ত হয়। যা বিশ্বজুড়ে নারীর ক্ষমতায়নের অনন্য স্বীকৃতি। রোকেয়ার ‘সুলতানাজ ড্রিম’ বা ‘সুলতানার স্বপ্ন’ ১৯০৫ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় মাদ্রাজ ভিত্তিক ইংরেজি সাময়িকী ‘দ্য ইন্ডিয়ান্ লেডিজ’ ম্যাগাজিনে। নারী মুক্তির কথা বলে ‘সুলতানার স্বপ্ন’। ১৯০৮ সালে ‘সুলতানাজ ড্রিম’ বই আকারে প্রকাশিত হয়। শতবর্ষ পরেও যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রমাণ করে রোকেয়ার অমরত্ব। এশিয়া প্রশান্ত অঞ্চলে অনন্য রচনা হিসেবে স্বীকৃতি ও অমরত্ব দিয়েছে নারীর সংগ্রাম ও নারীর অবদানকে। যা রোকেয়ার অবদান। স্পেনে ‘সুলতানাজ ড্রিম’ চলচ্চিত্র নির্মিত হয়ে প্রমাণ করেছে দেশে দেশে রোকেয়া চর্চার বিস্তৃতি। শিক্ষাদান থেকে নারী সমাজকে পিছিয়ে থাকতে বাধ্য করা হতো যে সমাজে, সেই সমাজের অবরোধবাসিনী নারীদের রান্নাঘরের অর্গল থেকে বের করে লেডি কেরানি থেকে জজ ব্যারিস্টার এমনকি এভারেস্ট বা মঙ্গল গ্রহ জয় করতে আজও যেন ছুটিয়ে চলেছেন রোকেয়া। তাঁর হাত ধরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অধিকার আদায়ের সংগ্রামে একনিষ্ঠ আজকের নারী।
বিদ্যাসাগর ও রোকেয়া বিষয়ে নিবেদিত প্রাণ গবেষক প্রাণতোষ বন্দোপাধ্যায়, বহরমপুর গার্লস কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপিকা সাধনা সেনগুপ্ত মজুমদার মনীষী রেজাউল করিমের কাছে জেনেছেন কবি নজরুলের শাশুড়ি গিরিবালা দেবী কবির সঙ্গে কন্যার বিবাহ দিতে আগ্রহী হলেও, কন্যা প্রমিলা দেবী ধর্ম পরিবর্তনে প্রবল আপত্তি জানান। শিক্ষাব্রতী রোকেয়া প্রতিষ্ঠিত আঞ্জুমান খাওয়াতীনে ইসলামী নেত্রী মাসুদা রহমান রেজাউল করিমের বড় ভাই মইনুদ্দিনকে পৌরাণ্য কাজীর দায়িত্ব অর্পণ করেন সমস্যা সমাধান করবার জন্য তিনি কেশব সেন প্রবর্তিত গ্রাম্য ভিডিও অনুষ্ঠানে নজরুলের বিবাহ সম্পন্ন করেন যে বিবাহে রোকেয়ার অবদান ছিল বিরাট। নারী সমাজ যেকোনো সমাজের প্রাণ। নারীর কল্যাণে এগিয়ে গেলে সেই সমাজ এগিয়ে যাবেই। যা রোকেয়া ও তাঁর পূর্বসূরী বিদ্যাসাগরের স্বপ্ন। সমাজের পিছিয়ে থাকা নারী ও সর্বজনের আর্থিক স্বাবলম্বন তাদের মূল লক্ষ্য ছিল। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে যা আরও শক্তপোক্ত করেছে।
রক্ষণশীল পরিবারের কন্যা সন্তান রোকেয়া প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েও, কতটা মেধাবী ও দূরদর্শী এক বিপ্লবী ছিলেন তাঁর সাহিত্য ও পাণ্ডিত্যে বিশ্বজয় তাঁকে নিঃসন্দেহে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দূরদর্শী সাহিত্যিকের মুকুট যেমন পড়িয়েছে তেমনি তার অন্তর শিক্ষাকেও প্রতিষ্ঠা করেছে। নারী শিক্ষার সেতু গড়ে এক বাংলার মানুষ সমৃদ্ধ করেছেন এপার ওপার দুই বাংলাকে। অথচ চিরপ্রণম্য রোকেয়াকে সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানোর অংশ হিসেবে তার অবমাননা করা হয়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট- এর সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে তার ছবিতে কালিমা লেপন করে বাংলাদেশের ঢাকা ইউনিভার্সিটির এক মূর্খ ছাত্রী।
বেগম রোকেয়া অপরূপা সুন্দরী ছিলেন। রোকেয়ার শিক্ষা লাভ ও মূল্যবোধ গঠনে বড় দুই ভাই বোন বেশ প্রভাবিত করেন। বড় দু’ ভাই সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের ছাত্র ছিলেন। বড় বোন করিমুন্নেসা বিদ্যোৎসাহী ছিলেন। তবে লেখাপড়া এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন দায়িত্বশীল জীবনসঙ্গী উচ্চশিক্ষিত, সচেতন ব্যক্তিত্ব, সাখাওয়াত হোসেনের কাছে। শিশু বয়সে মায়ের সঙ্গে কলকাতায় বসবাসের সময় তিনি লেখাপড়ার যে সামান্য সুযোগ পান তা সমাজ ও আত্মীয়-স্বজনের সমালোচনায় বেশি দূর এগোতে পারেনি। ভাই-বোনদের সমর্থন ও সহযোগিতায় তিনি অল্প বয়সেই আরবি, ফারসি, উর্দু ও বাংলা আয়ত্ত করেছিলেন। কিন্তু, বিহারের ভাগলপুরে সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বিয়ের পর তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। বেগম রোকেয়া কিছুটা উর্দু জানতেন, উর্দুভাষী স্বামীর সহায়তায় তা আরো প্রসার লাভ করে। ইংরেজিতেও দক্ষতা অর্জন করেন তিনি। ভালো ইংরেজি রচনা করতেন। কিন্তু শিকড় মাতৃভাষা বাংলা ভাষা। বাংলাতেই তিনি লেখালেখি শুরু করলেন। সাহিত্য চর্চার সূত্রপাতও স্বামীর অনুপ্রেরণায়। তাঁর সাহিত্য জীবন শুরু হয় ১৯০২ সালে ‘পিপাসা’ নামে একটা বাংলা গদ্য রচনার মধ্যে দিয়ে। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে ছিল প্রবন্ধ সংকলন ‘মতিচুর’ এবং বৈজ্ঞানিক কল্প কাহিনী ‘সুলতানার স্বপ্ন’। তাঁর সুলতানা স্বপ্ন-কে বিশ্বের নারীবাদী সাহিত্যের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে ধরা হয়।