শনিবার | ৩০ মে ২০২৬

ভবিষ্যতের স্বপ্ন রেখে চলে গেলেন অনীক

 ভবিষ্যতের স্বপ্ন রেখে চলে গেলেন অনীক

সুদর্শনা চক্রবর্তী

স্বকীয়, আধুনিক, নাগরিক। সম্ভবত মানুষ হিসাবে যেরকম ছিলেন চলচ্চিত্র ভাবনাতে তাঁরই স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি দেখা যেত। আর কী আশ্চর্য সমাপতন! ২ মে আর ২৭ মে। মে মাসের খর প্রকৃতি যেমন দিয়েছে, তেমনি ফিরিয়েও নিল। যাঁকে নিজের সিনেমা নিয়ে চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে অনেকাংশেই অনুসরণ করেছেন, যাঁকে নিয়ে তৈরি সিনেমা এনে দিয়েছিল ভূয়সী প্রশংসা, তাঁর জন্মদিনের মাসেই চলে গেলেন তাঁর অনুরাগী পরিচালক। চলচ্চিত্র পরিচালক অনীক দত্ত-র আকস্মিক মৃত্যু বাংলা সিনেমার আপামর দর্শক, তাঁর সিনেমার গুণগ্রাহীদের স্তম্ভিত করে দিয়েছে। পরিচালক জীবনে সিনেমা বানিয়েছিন সাতটি। কিন্তু তাঁর সিনেমার গুণগ্রাহী, তাঁর অনুরাগী ছিলেন অসংখ্য। সমসাময়িক অনেক পরিচালকের থেকেই ভাবনা ও নির্মাণে অনেক বেশি অনীক আধুনিক ও প্রগতিশীল চর্চাকারী ছিলেন।
অনিক দত্ত সেই মুষ্টিমেয় বাংলা চলচ্চিত্র পরিচালকদের মধ্যে একজন যিনি তাঁর পরিচালিত প্রথম সিনেমাতেই আকাশছোঁয়া সাফল্য পেয়েছিলেন এবং সেই সিনেমা ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ মৌলিক কাহিনী, চিত্রনাট্য, নির্মাণ, চরিত্র নির্বাচন এবং অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ, সঙ্গীত – এই সবকিছুর মিশেলে একটি সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক সিনেমাকে কীভাবে বাণিজ্যসফল করে তোলা যায় তা বিজ্ঞাপন জগতের লম্বা অভিজ্ঞতায় সম্মৃদ্ধ অনীক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। এবং মনে রাখতে হবে ২০১২ সালে যখন তাঁর প্রথম সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে সেই সময় তথাকথিত মূল্ধারার সিনেমা এবং একটু অন্য পথে হাঁটতে চাওয়া সিনেমা তৈরি হয়ে মুক্তি পেয়েছে। সেই তালিকায় সৃজিত মুখার্জি, অঞ্জন দত্ত, শিবপ্রসাদ-নন্দিতা, রাজ চক্রবর্তী, প্রমুখের সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল।
এবং তার মধ্যেই সকলের ধারণার বাইরে গিয়ে অনীক দত্ত সম্পূর্ণ অন্য রকমের গল্প ও চরিত্রায়ণ নিয়ে এমন একটি সিনেমা বানিয়ে হাজির করে ফেললেন যা ‘কাল্ট’ হয়ে গেছে। এবং বলতেই হয় তাঁর সেই সিনেমার অভিনেতারা তাঁদের জীবনের অন্যতম সেরা অভিনয় উপহার দিয়েছিলেন। প্রথম সিনেমা-ই বুঝিয়ে দিয়েছিল, তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন শুধু নন, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি অন্যদের থেকে আলাদা। বুদ্ধিদীপ্ত স্যাটায়ার এবং বুদ্ধি ও হাস্যরস মেশানো সংলাপ ও কাহিনীই তাঁর জোরের জায়গা থেকে গেছে। বরাবর জোরের জায়গা রয়ে গেছিল। এবং অভিনেতাদের মধ্যে কাদের কোন চরিত্রে মনোনীত করলে তাঁরা তাঁদের সবচেয়ে ভালো পারফরম্যান্স দিতে পারবেন সেই নিয়েও পরিচালক হিসাবে ছিল তাঁর জহুরির চোখ।
স্বস্তিকা মুখার্জি, খরাজ মুখার্জি, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, শ্রীলেখা মিত্র, রজতাভ দত্ত সহ আরো অন্যান্য অভিনেতারা যেভাবে তাঁর বিভিন্ন সিনেমায় নিজেদের উজাড় করে দিয়েছেন, এমনকি ছোট ছোট চরিত্রাভিনেতারা চরিত্র নির্মাণের কারণেও তাঁদের অভিনয় গুণে স্মরণীয় হয়ে রয়ে গেছেন। এই গুণটি সম্ভবত তিনি পেয়েছিলেন তাঁর আইকন ‘সত্যজিৎ রায়’-এর অনুরাগী ও অনুগামী হয়ে। নিজের সিনেমার ভাষাটি ভিন্ন হলেও অনীক দত্ত আজীবন সত্যজিৎ রায়কে অনুসরণ করেছেন। অমন নিপুণ গল্প বলাকেই তিনি সিনেমার জন্য আদর্শ মনে করতেন। এবং শুরু থেকে শেষ সিনেমা পর্যন্ত তিনি এইভাবেই গল্প বলতে চেয়েছেন। এবং কখনোই নিজের আশেপাশের সমাজ, রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাননি, এবং সেইসঙ্গে তিনি কখনো রহস্য, কখনো স্যাটায়ার-এর রূপকে হাজির করেছেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর শেষের দু’টি সিনেমা নিয়ে যথেষ্ঠ সমালোচনাও হয়েছে পরিচালনা ও কাহিনী নিয়ে। কিন্তু নিজের সিনেমা বিশ্বাস থেকে দূরে সরেননি। ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ সিনেমায় মধ্যবিত্ত সমাজের উচ্চাশা আর তা ঘিরে তৈরি হওয়া নীতি-পুলিশি ঘিরে তাঁর একটা দৃষ্টিভঙ্গি দারুণভাবে উপস্থাপিত করতে পেরেছিলেন।
সত্যজিৎ রায়ের প্রতি তিনি নিজের শ্রদ্ধা জানিয়ে ছিলেন ‘অপরাজিত’ সিনেমার মধ্যে দিয়ে। জীতু কমল-এর নির্বাচন নিয়ে অনেকের মনে দ্বিধা থাকলেও, তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে,ভালোবেসে ও নিজের আইকন-কে সিনেমার বিষয় করে তুলতে চাইলে কতটা অধ্যবসায় থাকলে দর্শকপ্রিয় সিনেমা তৈরি করা যায়, তা তিনি এই সিনেমাটির মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন। এক প্রকার রোগশয্যা থেকে পরিচালনা করা শেষ সিনেমা ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’ পরিচালনা করেছিলেন। এই নাম দিয়েই সম্ভবত শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে দিলেন সত্যজিৎ অনুরাগী অনীক।
অনীক দত্ত আসলে সিনেমা যতটা বানাতে চেয়েছিলেন, তার চেয়েও বেশি বোধহয় সিনেমাকে নিজের সময়ের, নিজের সমাজের প্রতিচ্ছবি হিসাবে দেখতে ও দেখাতে চেয়েছিলেন। বিজ্ঞাপন যদি তাঁর দক্ষতা ও পেশাদারি সাফল্যের দলিল হয়ে থাকে, তাহলে, সিনেমার মধ্যে দিয়ে তিনি যেন নিজের অপর এক সত্তাকে সামনে আনতে চেয়েছিলেন। সিনেমাকে নিজের জীবনের আর শিল্প চেতনার শুধু নয়, নিজের নাগরিক চেতনার প্রকাশ হিসাবেও দেখাতে চেয়েছিলেন। সেই কারণেই তাঁর সিনেমা সংখ্যা মাত্র ৭ হলেও, প্রায় প্রতিটি সিনেমাতেই তিনি স্বকীয় ভাবনা ও তার যথাযথ প্রকাশের চেষ্টা দেখতে পাওয়া যায়। ভাবনা ও নির্মাণের সঙ্গে কোনো সমঝোতা করেননি। বরুণবাবুর বন্ধুরা-র মতো সূক্ষ্ম ভাবাবেগের সিনেমা-ও করেছেন এবং তা বাণিজ্যিকভাবে সফল না হলেও হাতে গোনা সমালোচক ও দর্শকদের মধ্যে যথেষ্ট সাড়া ফেলতে পেরেছিল। খুব কম সংখ্যক সিনেমা তৈরি করলেও অনীক দত্তর সিনেমার জন্য অপেক্ষা থাকত দর্শকদের। যে অপেক্ষা আর ফুরবে না কোনোদিনই।
ঠিক কী কারণে অনীক দত্ত-র সিনেমা দর্শকদের ভাল লেগেছিল বা কেন তাঁর অকালপ্রয়াণ অনেক দর্শকের মধ্যেই এক ধরনের শূন্যতা তৈরি করল, তা নিয়ে বহু বিশ্লেষণই হয়তো করা যায়। তবে সবচেয়ে বেশি যা আকর্ষণীয় ছিল তা তাঁর বুদ্ধিদীপ্ততা এবং চারপাশের অতি সাধারণ, দৈনন্দিন অথচ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলিকে এমন এক চোখ দিয়ে দেখা ও দেখানো যার সঙ্গে দর্শকেরা এক ধরনের একাত্মতা অনুভব করার পাশাপাশি অস্বস্তিতেও পড়তে বাধ্য হতেন। তিনি একজন সংবেদনশীল পরিচালক ছিলেন। যে কারণে প্রচলিত অর্থে তাঁর ‘হাসির সংলাপ’ শুধুই হাসির হতো না, তাঁর সঙ্গে মিশে থাকা বুদ্ধিমত্তা ও স্যাটায়ার হাসির রেশ ধরে রেখেই দর্শকদের নিজেদের সমাজ, অবস্থান, অস্তিত্ব নিয়েও ভাবাতে বাধ্য করত।
এই পরিচালকের নিজস্ব শিক্ষা, বেড়ে ওঠা, সিনেমা তৈরির আগে বিজ্ঞাপন জগতে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা – এই সবই তাঁকে একজন এমন পরিচালক করে তুলেছিল, যেখানে তিনি দর্শকদের বুদ্ধিবৃত্তি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করতেন না বা গতে বাঁধা ফর্মুলা সিনেমা তৈরি করেই কেবলমাত্র দর্শকদের মন জয় করা যায় এমনটাও ভাবতেন না। শিল্পমাধ্যম হিসাবে সিনেমার ক্ষমতার উপরেই আস্থা রাখতে চেয়েছিলেন তিনি। সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার না হলেও, এই মাধ্যমটি যে সমাজের বহুস্তরীয় প্রতিচ্ছবি হতে পারে তা তিনি নিজের কাজের মাধ্যমেই তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। এবং সিনেমায় পারিবারিক কাহিনী বা রোজকার চেনা জীবনের বাইরে এক অলীক তৈরি করা পৃথিবীর গল্প বলতে চাননি তিনি। যখন থ্রিলারের মোড়কে তৈরি করেছেন ‘মেঘনাদ বধ রহস্য’ তখন রাজনৈতিক বক্তব্য তুলে ধরতে দ্বিধা করেননি। আবার তাঁর শেষ সিনেমাতে যখন গোয়েন্দা গল্পের মোড়কে শিকড় খোঁজার গল্প বলছেন তখন সত্যজিৎ ও ফেলুদা প্রিয় পরিচালক সেখানে বুদ্ধি ও আবেগের মিশেলও ঘটাতে চেয়েছেন। অনীক দত্ত-র পরিচালনার অন্যতম মূল বৈশিষ্ট্য ছিল সপ্রতিভতা এবং তা আরোপিত নয় এবং বানানো নয়। যে কারণে তাঁর পরিচালনার সাতটি সিনেমার মধ্যে অন্তত তিন থেকে চারটি সিনেমাকে নিশ্চিত সুনির্মিত বলা যায়।
যে সিনেমাটি নানা জটিলতায় মুক্তি পায়নি, সেই ‘ভবিষ্যতের ভূত’ সিনেমাটিরও বিশেষভাবে আলোচিত, বিতর্কিত আর কে বলতে পারে হয়তো বা ‘কাল্ট’ হয়ে ওঠারও সম্ভাবনা ছিল। সত্যিই যদি আগামী দিনে এই সিনেমা দেখার সুযোগ দর্শকদের হয়, তাহলে যে ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে পরিচালক অনীক দত্ত এই সিনেমা তৈরি করেছিলেন তা দর্শকপ্রিয় হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে কি না, তা সহজেই বোঝা যেতে পারে এবং বাংলা সিনেমার দর্শক রাজনৈতিক ভাবে কতটা পরিণত তাও। সিনেমার তৈরির ক্ষেত্রে নানাবিধ কারণেই হয়তো অনীক তাঁর কাঙ্খিত সাফল্য থেকে দূরে থাকছিলেন বিগত কয়েক বছর বা ঠিক যে সিনেমা যেভাবে বানাতে চাইছিলেন, তা সম্ভব হচ্ছিল না। তবুও, সিনেমাতেই বুঁদ হয়ে থাকা একজন শিক্ষিত পরিচালকের হয়তো বা ইচ্ছে ছিল নিজের সিনেমাটুকুই বানিয়ে যাওয়া। কে বলতে পারে!
অসময়ে চলে গেলেন অনীক। হয়তো ইচ্ছে, স্বপ্ন অসমাপ্ত রেখেই। চলে যাওয়ার পর একজন শিল্পীর শারীরিক, মানসিক অবস্থা নিয়ে সুরতহাল করা শিল্পী ও শিল্পের অবমাননা। তাই অনীক তাঁর অতীতের ঋজু ও ব্যতিক্রমী শিল্পচর্চা, সিনেমা নির্মাণ নিয়ে ভবিষ্যতের হৃদয়ে রয়ে যাবেন, এটুকু আশাই না হয় থাক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *