লুচির সঙ্গে ভাজা আর হরেক মিষ্টির ভোগ দেওয়া হয় ঠনঠনিয়ার সিদ্ধেশ্বরী মা’কে
সন্দীপ বসু- একসময়ে কলকাতার একেবারে মধ্যভাগ চত্বর ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা। ডাকাতের উপদ্রবে অতিষ্ঠ ছিলেন গ্রামবাসীরা। মন্দিরের ঘণ্টার ‘ঠন ঠন’ শব্দেই সতর্ক হতেন সকলে। এরপর গঙ্গা দিয়ে বয়ে গিয়েছে বহু জল। সময়ের ফেরে ‘ঠনঠনে’ বা ঠনঠনিয়া চত্বরের সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি কলকাতার বিখ্যাত ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি নামে পরিচিত হয়।
জনশ্রুতি, এখানের মা অত্যন্ত জাগ্রত। মনে ভক্তিভরে কিছু চাইলে, মা কাউকে খালি হাতে ফেরান না। আজও রীতি মেনে এই মন্দিরে প্রত্যেক অমাবস্যায় দেওয়া হয় পাঁঠাবলি। মাকে ভোগে নিবেদন করা হয় মাছ।
সুতানুটি মহাশ্মশানে হোগলা পাতায় মোড়া এক মন্দির। আজও দেবী যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, সেই বেদী বা পঞ্চমুণ্ডি আসন-সহ মায়ের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন উদয় নারায়ণ ব্রহ্মচারী নামক এক সাধক। সেই মৃন্ময়ী মূর্তিই আজও পূজিত হয় সেখানে।
উদয় নারায়ণ ব্রহ্মচারীর একমাত্র শিষ্য ছিলেন শংকর ঘোষ। পরবর্তীতে সেই শংকর সিদ্ধিলাভ করলে, তাঁকে এই মন্দির দেখভালের দায়িত্ব দেন উদয় নারায়ণ ব্রহ্মচারী। এমনটাই জানান, এই মন্দিরের বর্তমান সেবায়েত পলাশ ঘোষ। তিনি জানান, বংশপরম্পরায় পুজো হয়ে আসছে এই মন্দিরে। প্রত্যেক দিন আরতির সময় ‘জয় মা, জয় মা’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা মন্দির চত্বর।
অনেকেই বলেন, এই সময়টা তাঁদের কাছে খুবই আনন্দের। একটা আলাদা ‘এনার্জি’ অনুভব করা যায়। যা অবশ্যই পজিটিভ ‘এনার্জি’। মন্দিরের এক পুরোহিত বলেন, ‘আরতির সময় সকলে মা-কে ডাকেন। এর ফলে তাঁরা অনুভব করতে পারেন, মা আমাদের মধ্যে চলে এসেছেন।’ এছাড়াও পুরোহিত বলেন, যখন যাঁর দরকার হয়, সে মা-কে ভক্তিভরে ডাকেন।
দেবীর ভোগে প্রতিদিন তাঁকে আমিষ পদ দেওয়া হয়। যাতে থাকে মাছ। তবে ব্যতিক্রম কালীপুজোর রাত। এছাড়াও ফলহারিণী অমাবস্যার রাতে মা-কে কেবল পরিবেশন করা হয় নিরামিষ ভোগ। কালীপুজোর রাতে মা-কে পরিবেশন করা হয় লুচি-আলুভাজা-পটলভাজা। এছাড়াও পরিবেশন করা হয় দরবেশ-লেডিকেনি-লাড্ডু-গজা-সহ আরও অনেক কিছু।
তবে প্রতিদিনই উত্তর কলকাতার এই ‘জাগ্রত কালীমন্দিরে’ ভক্তরা আসেন, পুজো দেন। মানত করে মায়ের কাছে নিজের অভাব-অভিযোগের কথা জানান। অনেকেই বলেন, মা কোনও দিনই খালি হাতে তাঁদের ফেরান না। মন থেকে কিছু চাইলে, দেবী অবশ্যই তা দেন। কলেজ স্ট্রিট মোড় থেকে শ্যামবাজার যাওয়ার রাস্তা ধরে কিছুটা এগোলেই আজও মন্দিরের সেই ঘণ্টার শব্দ পাওয়া যায়। কলকাতার সঙ্গে কালীর যে সম্পর্ক, তা আসলে বহু পুরোনো। ছড়িয়ে রয়েছে কত অপরিচিত গল্পকথা এবং ইতিহাস। বাইরে থেকে সেই মন্দির দেখলে বোঝা দায়, এই মন্দির কত জাগ্রত।