বৃহস্পতিবার | ০৫ নভেম্বর ২০২৬

হোক অন্ধকারে আলোর বিজয়, প্রদীপ জ্বালাই চলো

 হোক অন্ধকারে আলোর বিজয়, প্রদীপ জ্বালাই চলো

১৪ বছরের বনবাস কাটিয়ে যেদিন প্রভু রামচন্দ্র অযোধ্যার মাটিতে পা রাখেন, সেই দিন অযোধ্যার প্রতিটি পরিবার তাদের বাড়ি মাটির প্রদীপে আলোকিত করে। যা গোটা অযোধ্যা শহরকে আলোয় আলোয় ভরিয়ে দেয়। সেই শুরু, আজও অযোধ্যাবাসী শুধু নয়, সারা ভারতবর্ষ শ্রী রামচন্দ্রকে স্বাগত জানানোর জন্য এবং অন্ধকারকে দূর করার জন্য প্রদীপের আলোয় ভরিয়ে তোলে এ ভুবনকে। ইতিহাস থেকে আধুনিক শিল্পে সেই মলিনতা মোচনকারী প্রদীপের শিখার আহ্বানে ড. রুপক কর্মকার।

আমরা একটু প্রাচীন হই, মিশে যাই সভ্যতার ইতিহাসে। যেখানে আমাদের আত্মার শিকড় রয়েছে, তাকে জানি সভ্যতার যাত্রাপথে। অনন্ত এক শিকড় আমাদের, যেই শিকড় কত না কথা বলে, কিন্তু সেই কথা আমরা যেন শুনেও শুনি না, দেখেও দেখি না, শুধু আড়ালে রেখে দিই মনের সুপ্ত বাসনাগুলির মতো। তবে এই সুপ্ত বাসনাগুলি যদি একটু সামনে আনি তবে বোধ হয় বহু মানুষের জীবনে হাসির কারণ হতে পারে। অবশ্যই সেই কারণ শিল্প, সমৃদ্ধি আর সংস্কৃতির। যে সংস্কৃতি আমাদের পরিচিতি দেয়, আমাদের ইতিহাস সম্বন্ধে অবগত করে। সেই সংস্কৃতিকে যদি আমরা জনসমক্ষে তুলে আনতে পারি তবে তা কেমন হয়!
ফিরে যাই ৫০০০ বছরেরও বেশি প্রাচীন সভ্যতায়। যেখানে আলোর উৎসের সূচনা হয়েছিল। মানবসভ্যতা ধীরে ধীরে নিজের আত্মপ্রকাশ করেছিল। উপনিষদের আজ্ঞায় কয়েকটি লাইন বেশ সুদৃঢ়ভাবে চরিতার্থ করে আমাদের জীবনের গভীর আদর্শকে অর্থাৎ ‘অসতো মা সদ্গময়/তমসো মা জ্যোতির্গময়/মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়/ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ’।
দীপাবলি অর্থাৎ ‘প্রদীপের সমষ্টি’। জৈন মতে ৫২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মহাবীর দীপাবলির দিনেই মোক্ষ বা নির্বাণ লাভ করেছিলেন। ১৬১৯ খ্রিস্টাব্দে শিখদের ষষ্ঠ গুরু হর গোবিন্দ ও ৫২ জন রাজপুত্র দীপাবলির দিন মুক্তি পেয়েছিলেন বলে শিখরাও এই উৎসব পালন করে। আর্য সমাজ এই দিনে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর মৃত্যুদিবস পালন করে। এই দিনটি ‘শারদীয়া নব শস্যেষ্টি’ হিসেবে পরিচিত। তবে হিন্দুদের কাছে এই দীপাবলির পবিত্র রাত শ্রী রামচন্দ্রের প্রত্যাবর্তন আর অশুভ শক্তির বিনাশের অন্যতম আলোকিত রাত হিসেবে পরিচিত। ১৪ বছরের বনবাস কাটিয়ে যেদিন প্রভু রামচন্দ্র অযোধ্যার মাটিতে পা রাখেন, সেই দিন অযোধ্যার প্রতিটি পরিবার তাদের বাড়ি মাটির প্রদীপে আলোকিত করে। যা গোটা অযোধ্যা শহরকে আলোয় আলোয় ভরিয়ে দেয়। সেই শুরু, আজও অযোধ্যাবাসী শুধু নয়, সারা ভারতবর্ষ শ্রী রামচন্দ্রকে স্বাগত জানানোর জন্য এবং অন্ধকারকে দূর করার জন্য প্রদীপের আলোয় ভরিয়ে তোলে এ ভুবনকে।
প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজে সিন্ধু সভ্যতা (যেমন ধোলাভিরা ও হরপ্পা) এবং বৈদিক যুগে মাটির বা টেরাকোটার প্রদীপ ব্যবহারের প্রাচীন প্রমাণ পাওয়া গেছে। স্কন্ধপুরাণ থেকে পদ্মপুরাণ বা রামায়ণ, মহাভারত নানান গ্রন্থে আলোর উৎস হিসেবে প্রদীপের কথা উল্লেখ আছে। যে শিল্প সাধারণ মাটির আকার ছিল যা পরবর্তীকালে ব্রোঞ্জ যুগ পেরিয়ে ধাতব (সোনা, রুপা, পিতল) এবং নানান নান্দনিক শিল্পকর্মের রূপ নিয়েছে এবং ধর্মের রাস্তা প্রশস্ত করেছে, সেই উপাদান শুধু অতীতে নয়, ভবিষ্যতেও আলোকিত করবে সমাজকে। শ্রীকৃষ্ণের হাতে নরকাসুর বধ কিংবা সমুদ্র মন্থনের সময় লক্ষ্মীর আবির্ভাব এসব পৌরাণিক ঘটনার সঙ্গে ও অশুভ শক্তি ও অন্ধকার নাশ করতে মাটির প্রদীপ জ্বালানোর রীতি আজও অমলিন। আসলে যে লোকসংস্কৃতি বা ধর্মানুষ্ঠান প্রদীপের আলো ছাড়া অসম্পূর্ণ, তা যেন আজ নিজেরাই অন্ধকারে।
আলোর রোশনাই এতটাই উজ্জ্বল যে প্রদীপের তলার অন্ধকারটা যেন আরও বেশি করে চোখে পড়ে। বৈদ্যুতিক আলো, এলইডি বা রঙিন লাইটের বাজারে প্রদীপের চাহিদাকে অনেকটাই যেন নিম্নমুখী করে রেখেছে। কিন্তু এই মাটির কারুকার্যের উপর কত শিল্পীর টিকে থাকার লড়াই জারি হয়েছে। কেউ শুধু সামান্য উপার্জনের আশায়, কেউ শুধু পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকারের সূত্রে এই পেশাটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। পাঁচতারা হোটেল, রিসোর্ট, কর্পোরেট অফিসে মূর্তি শিল্প ও শোপিসের চাহিদা থাকলেও মধ্যবিত্ত মানুষদের কাছে চাহিদা কিন্তু নেই বললেই চলে। লোকাল ফর ভোকালের কথা যখন আমরা নতুন ভারত গঠনের জন্য বলছি তখন আমরাই এর থেকে বিমুখ।
কত মৃৎশিল্পীদের পরিবার শুধু আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে তাদের পরিবারের ভরণপোষণের জন্য। সরকার নানান প্রয়াস করে চলেছে নানান হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র শিল্পীদের বাঁচানোর জন্য কিন্তু সেই প্রয়াস তখনই সফল হবে যখন আমরা তাতে সহযোগিতা করব। এই দীপাবলির রোশনাইতেই আমরা সেই সব মৃৎশিল্পীদের পাশে থাকি যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে ধর্ম ও ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে। আমাদের চাহিদাই হোক তাদের সেই পরিশ্রমের পুরস্কার। প্রদীপের আলোয় আলোকিত হোক এ ভুবন, প্রতিটি ঘরে ঘরে জ্বলুক পরিশ্রমের আলো।
হাসি ফুটুক সেই সমস্ত পরিবারে যেই সমস্ত পরিবার সারা বছর এই শিল্পীসত্তাকে নিয়েই বেঁচে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *