মঙ্গলবার | ০৩ নভেম্বর ২০২৬

‘রিভেঞ্জ ট্যুরিজম’: অর্থনীতির সহায়ক ও ভবিষ্যৎ

 ‘রিভেঞ্জ ট্যুরিজম’: অর্থনীতির সহায়ক ও ভবিষ্যৎ

ড. রুপক কর্মকার

আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবন তারপর প্রযুক্তির একঘেয়েমির সাঁড়াশি আক্রমণের কারণে মানুষ খুব দ্রুত মানসিক অবসাদের জালে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে। তবে এই কর্মব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে বা বলা ভালো, সাময়িক মুক্তি পেতে ভ্রমণ এখন সেরা ওষুধ হিসেবে কাজ করছে। আরও একটা বিষয়, বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘ফোমো’ (ফিয়ার অব মিসিং আউট) বা ‘পিছিয়ে পড়ার ভয়’, যা মানুষকে ঘর থেকে বের হতে উদ্বুদ্ধ করছে।
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলি এই ‘ফোমো’-কে আরও বেশি উত্তেজক করে দিচ্ছে। ‘আমেরিকান এক্সপ্রেস’-এর একটি প্রতিবেদন বলছে, বর্তমান প্রজন্মের, বিশেষ করে মিলেনিয়াল ও জেন-জি-দের চিন্তাভাবনায় বড় বদল এসেছে, তারা দামি বাড়ি-গাড়ি জমানোর চেয়ে নতুন কোনও জায়গা দেখা, ভিন্ন সংস্কৃতি ও খাবারের অভিজ্ঞতা অর্জন করাকে জীবনের অন্যতম এক বড় সার্থকতা মনে করছে। বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির বিধিনিষেধ কেটে যাওয়ার পর থেকে পর্যটনশিল্পে এক ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। যাকে বিশেষজ্ঞরা ‘রিভেঞ্জ ট্যুরিজম’ বা দীর্ঘ সময় ঘরে থাকার পর বিপুল উৎসাহে ঘুরতে যাওয়ার প্রবণতা হিসাবে দেখছে।
যদিও বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটনের সঠিক অবদান কতটা, তা পরিমাপ করা কঠিন, কিন্তু ওয়ার্ল্ড ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল বা ‘ডব্লুটিসিসি’-এর মতে, ২০২৫ সালে ভ্রমণ ও পর্যটন বিশ্ব অর্থনীতিতে রেকর্ড ১১.৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অবদান রেখেছে, যা বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ। যে সকল সরকার তাদের পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন করতে চায়, পর্যটন তাদের জন্য বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে আসে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, আমদানি থেকে কর সংগ্রহ, এমন বেশ কিছু উপায়ে সরকারের কোষাগারে অর্থ নিয়ে আসতে সক্ষম।
‘ডব্লুটিসিসি’-এর মতে, ২০২৫ সাল নাগাদ ভ্রমণ ও পর্যটন খাতে ৩৫৬ মিলিয়ন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেছে। যা বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের প্রায় ১১ শতাংশ এবং বিশ্বজুড়ে সৃষ্ট প্রতি তিনটি নতুন চাকরির মধ্যে একটির উৎস হল এই খাত। জাতিসংঘের পর্যটন বিভাগ বলছে, ২০২৩ সালে বিশ্বের মোট পণ্য ও সেবা রপ্তানির ৬ শতাংশ এবং সেবা বাণিজ্যের ২৩ শতাংশই ছিল পর্যটন খাতের। পর্যটন বিভাগের নানান সাফল্য একটু বিস্তারিত না বললেই নয়।

বৈদেশিক মুদ্রা আয়
ভারত সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য ১৬ মার্চ ২০২৬ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতে আন্তর্জাতিক পর্যটক আগমন (আইটিএ) ২০.৫৭ মিলিয়ন (অস্থায়ী) পৌঁছেছে, যা ২০১৯ সালের প্রাক্‌-মহামারি সংখ্যার ১৭.৯১ মিলিয়নের তুলনায় বেশি। ২০২৪ সালের এই বৃদ্ধি ২০১৯ সালের তুলনায় ১৪.৮২ শতাংশেরও বেশি।
সুতরাং, ওপরের তথ্য বলছে, বিগত কয়েক বছরে কী পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে এই পর্যটন খাত। ২০২১ সালে যে আয় ছিল ৬৩,৯৭৮ কোটি টাকা, ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ২,৭৬,৮৩১ কোটি টাকা। অভিবাসন ব্যুরো থেকে প্রাপ্ত একটি তথ্য, যা ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ভারতে বিদেশি পর্যটকদের আগমনের পরিসংখ্যান দেয়, তা হল, ২০২০ সালে ভারতে বিদেশি পর্যটকদের আগমনের সংখ্যাটা ছিল ২৭,৪৪,৭৬৬।
পরের বছর অর্থাৎ করোনার বছরে সংখ্যাটা কমে দাঁড়ায় ১৫,২৭,১১৪। কিন্তু ঠিক তার পরের বছর অর্থাৎ ২০২২ সালে তা বেড়ে হয় ৬৪,৩৭,৪৬৭। আর ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে পর্যটকদের সংখ্যা যথাক্রমে ছিল ৯৫,২০,৯২৮ এবং ৯৯,৫১,৭২২ জন।

জিডিপির ওপর প্রভাব
বিগত কয়েক বছরের পর্যটন খাতের জিডিপির তথ্য বেশ কিছু সদর্থক ইঙ্গিত দিচ্ছে। আর্থিক বছর ২০১৯-২০ সালে ভারতের জাতীয় আয় পর্যটন খাতে এসেছিল ১০,৪০,৯৮,৯৯৫ লক্ষ টাকা। ঠিক পরের বছর করোনার মহামারির কারণে তা কমে গিয়ে দাঁড়ায় ২,৯৬,১৭,০০২ লক্ষ টাকা। কিন্তু পরের বছর সেই লোকসান কাটিয়ে জিডিপি দাঁড়ায় ৪,১০,৯৮,৩৭৩ লক্ষ টাকা। সাময়িক দৃষ্টিতে কম হলেও তখনও গোটা বিশ্ব করোনার আতঙ্ক থেকে রেহাই পায়নি। সেই মহামারির রেশ কাটতেই ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে পর্যটনে জিডিপি থেকে আয় গিয়ে দাঁড়াল ১৩,৬৮,৩৩,৬১০ লক্ষ টাকায়। সেই বৃদ্ধি অব্যাহত রেখে ২০২৩-২৪ সাল পর্যন্ত প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ হয় ১৫,৭৩,৭২,৯৮৮ লক্ষ টাকা।
অর্থাৎ, শেষ পাঁচটি বছরে জিডিপিতে পর্যটনের শতকরা ভাগ যথাক্রমে ছিল ৫.২, ১.৫, ১.৭, ৫.১ এবং ৫.২ শতাংশ। মাঝে করোনা সময়কালে পর্যটনের করুণ দশা সব জায়গায় প্রযোজ্য হয়েছিল।

কর্মসংস্থানের সৃষ্টি
পর্যটন মানুষ, স্থান ও সংস্কৃতির মধ্যে যোগাযোগ শুধু বাড়ায় না, বরং স্থানীয় ও জাতীয় স্তরে মানুষের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে।
জীবিকা বর্তমান সময়ে যা বহুল চর্চিত বিষয়, সেই কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে পর্যটন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সালে পিআইবি-র একটি তথ্য বলছে, ২০১৯-২০ সালে যেখানে ৬.৪ কোটি কর্মসংস্থান ছিল পর্যটন বিভাগে, সেখানে ২০২৩-২৪ সালে কর্মসংস্থানের সংখ্যাটা বেড়ে হয়েছে ৮.৪৬ কোটি।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন:
বর্তমান সময়ে মানুষের ভ্রমণের ধরন বদলাচ্ছে। এক সময় যেখানে একটি মানচিত্র বা গাইড ম্যাপই যথেষ্ট ছিল, তবে বর্তমান সময়ে ডিজিটাল ব্যবস্থা পর্যটনকে আমূল বদলে দিয়েছে।
আর এই ডিজিটাল পরিবর্তনে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) বাড়তি উদ্যোগ নিয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে পর্যটকদের কাছে ভারত-সহ বিভিন্ন দেশের পর্যটনকেন্দ্রে পরিচিতি ও ভ্রমণের অভিজ্ঞতার ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে ভারতবর্ষে ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেটেড ডেটাবেজ অব হসপিটাল ইন্ডাস্ট্রি-র মাধ্যমে পর্যটন পরিষেবা প্রদানকারীদের নথিভুক্তি, স্বীকৃতি ও শ্রেণিবিন্যাসের জন্য একটি অভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কাজ করছে।
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেটেড ডেটাবেজ অব হসপিটাল ইন্ডাস্ট্রিতে অন্তর্ভুক্তি রয়েছে ৬৩,৭৪০টি থাকার ব্যবস্থা, ৫৪টি কনভেনশন সেন্টার, ২১৫টি খাদ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ১,৪৫০টি অনলাইন ট্রাভেল অ্যাগ্রিগেটর, ১৫,৫৩১টি পর্যটন পরিষেবা প্রদানকারী (পিআইবি সূত্র অনুসারে)। এছাড়াও ‘প্রসাদ’ এবং ‘স্বদেশ দর্শন’-এর মতো সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে ধর্মীয় পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে পরিকাঠামো ও পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিষেবা উন্নয়নে সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে
রিভেঞ্জ ট্যুরিজম
ভারতের বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক পরিবেশ, বিশেষ করে জাতীয় উদ্যান, জলাভূমি, ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, হিমালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ মানুষকে প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার এক অনন্ত সুযোগ দেয়। পর্যটনের পরিধি এখন প্রচলিত পর্যটনকেন্দ্রের বাইরেও বাড়ছে। হোমস্টে, গ্রামীণ জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতা, স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প, এছাড়াও স্থানীয় মানুষের নানান নতুন নতুন কর্মকাণ্ড চাক্ষুষ করার জন্য পর্যটকেরা উৎসুক।
গ্রামীণ পর্যটনের এই উন্নতিকল্পে পর্যটন মন্ত্রক প্রধানমন্ত্রী জনজাতীয় উন্নত গ্রাম অভিযান বা ‘পিএমজুগা’-র অধীনে আদিবাসী-অধিষ্ঠিত এলাকায় হোমস্টে উন্নয়নের জন্য ১,০০০টি হোমস্টে উন্নয়ন বা তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। এই খাতে প্রতিটি পরিবারের জন্য দুটি নতুন ঘর নির্মাণের জন্য পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত এবং প্রতিটি পরিবারের বিদ্যমান ঘর সংস্কারের জন্য তিন লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা প্রদান করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তবে এখানে একটা বিষয় না বললেই নয়, ভারতের গ্রামীণ পর্যটনের মান বিশ্বমঞ্চেও প্রশংসিত হয়েছে। ২০২১ সালে তেলেঙ্গানার পোচামপল্লী এবং ২০২৩ সালে গুজরাটের ধোরড গ্রাম ‘ইউনাইটেড নেশন্স ওয়ার্ল্ড ট্যুর অর্গানাইজেশন’-এর পক্ষ থেকে বিশ্বের সেরা পর্যটন গ্রামের মর্যাদা পেয়েছে। তবে এই রিভেঞ্জ ট্যুরিজমের ফলে যে শুধু পর্যটন অর্থনৈতিক খাতে গতি আসবে, তা কিন্তু নয়, রিভেঞ্জ ট্যুরিজম অনেক সময় ওভার ট্যুরিজম বা অতিরিক্ত পর্যটনের সৃষ্টি হয়।
বেশ কিছু ক্ষেত্রে এর জন্য বেশ ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে।

স্থানীয় জীবনযাত্রার পরিবর্তন
গন্তব্যস্থলগুলিতে অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের ফলে ভাড়া বৃদ্ধি, শব্দদূষণ, যানজট, স্থানীয় খুচরা ব্যবসার পরিবর্তন ইত্যাদি লক্ষ্য করা যায়। অতিরিক্ত পর্যটন দুর্বল ব্যবস্থাপনার অন্যতম কারণ, যার ফলে স্থানীয়রা বহুলাংশে এর ভুক্তভোগী।

অবকাঠামোর ওপর চাপ
অফবিট বা দুর্গম পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে অতিরিক্ত পর্যটক যাওয়ার ফলে সেখানকার পরিকাঠামো ভেঙে পড়ে। পর্যাপ্ত পানীয় জল, বিদ্যুৎ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। জীববৈচিত্র্যে এর ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
ক্ষয়ক্ষতি বা ঋণাত্মক প্রভাব বাদ দিয়েও বলা যেতে পারে, পর্যটকদের খরচ করা অর্থ কেবল হোটেল বা রেস্তোরাঁয় সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং স্থানীয় হস্তশিল্প, পরিবহন ও অন্যান্য ছোট ব্যবসাও ছড়িয়ে পড়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় যে অঞ্চলগুলি পর্যটনধসের কবলে পড়ে ভেঙে পড়েছিল, তা আজ রিভেঞ্জ ট্যুরিজমের দয়ায় বেশ ফুলে-ফেঁপে উঠছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *