টানা কয়েক মাসের প্রচেষ্টায় ধাতুর দুর্গা তৈরি করলেন শিল্পী
সন্দীপ বসু- বাড়ির বিভিন্ন ফেলে দেওয়া বৈদ্যুতিক সামগ্রী, লোহা কিংবা কাঠের জিনিস কাজে লাগিয়েও মা দুর্গার মূর্তি গড়ার অসম্ভবকে সম্ভব করলেন পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার শ্যামনগরের এক শিল্পী। দুর্গাপুজোর সমস্ত প্রস্তুতির মাঝে সেই অসাধ্য সাধন করেছেন শিল্পী নারায়ণ রায়। তিনি মাটির পরিবর্তে ফেলে দেওয়া বিভিন্ন যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি করে ফেলেছেন দেবী দুর্গা।
রবীন্দ্র ভারতী থেকে ডিপ্লোমা কোর্স করেছেন নারায়ণবাবু। তারপর ১৯৯০ সাল থেকে ছবি আঁকছেন তিনি। বর্তমানে নিজের বাড়িতেই রয়েছে তাঁর অঙ্কন স্কুল। সেখানে বিভিন্ন কাজের মাঝে নতুন কিছু করার ভালোবাসার টানে বছর দশেক ধরে তিনি বাড়ির ফেলে দেওয়া সমস্ত জিনিস দিয়ে নানা ধরনের শিল্পকর্ম করে আসছেন। এবার দীর্ঘ ছয় মাসের প্রচেষ্টায় শিল্পী তৈরি করেছেন ধাতুর দুর্গামূর্তিটি।
নারায়ণ ‘দৈনিক সংবাদ’-কে বললেন, ‘আমি ছবি আঁকি। তবে হঠাৎ করেই আমার মনে হল, ছবি সবাই আঁকে এবার ক্রিয়েটিভ কিছু করতে হবে। নতুন কিছু করার তাগিদ থেকে ফেলে দেওয়া সামগ্রী দিয়েই শিল্পকর্ম তৈরি করার চিন্তাভাবনা শুরু করি। আর ফেলে দেওয়া জিনিসগুলি নতুন রূপে মানুষের কাছে তুলে ধরার পর অনেক প্রশংসাও পেয়েছি। যদিও প্রথমদিকে আমি কোনও শিল্পকর্ম শুরু করার সময় সেটাকে খাতায় আঁকার পর কী দিয়ে সেটা তৈরি করব ভাবতাম। তারপর খুঁজে খুঁজে বার করে আনতাম ফেলে দেওয়া জিনিস। সেখান থেকেই শুরু। এরপর এবার দুর্গাপুজো উপলক্ষে দেবীর অবয়বমূর্তি তৈরি করেছি।’
নেশাকে পেশায় পরিণত করেছেন শিল্পী। তাঁর এই শিল্পকর্ম তিনি আগামী প্রজন্মকে যেমন শিখিয়ে যাচ্ছেন, তেমন আগামীতে ফেলে দেওয়া সামগ্রী দিয়ে তৈরি তাঁর শিল্পকর্ম আরও বড় আকারে দর্শকদের সামনে আনতে চান তিনি। আর সেই কারণে তিনি বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শনীতে অংশ নেন। এমনকী, বিভিন্ন মেলাতেও তিনি তাঁর শিল্পকর্ম ও সৃষ্টি দর্শকদের কাছে তুলে ধরেন।
যদিও শিল্পীর এই যাত্রা সবসময় মসৃণ ছিল না। কারণ ফেলে দেওয়া সামগ্রী জোগাড় করা অনেকটাই কঠিন। কোনও গাড়ি সারাইয়ের দোকান থেকে খুঁজে খুঁজে আনতে হয় ফেলে দেওয়া যন্ত্রাংশ। আবার কখনও কারও বাড়িতে বা কোনও জায়গায় কিছু পড়ে থাকতে দেখলে, যেগুলো আবার ব্যবহার করা যাবে তাঁর শিল্পকর্মের জন্য, সেগুলোকে তিনি সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন। আর তাঁর এই কাজের জন্য তাঁকে বহুবার হাসির খোরাক পর্যন্ত হতে হয়েছে। কিন্তু তবুও নারায়ণবাবু থেমে থাকেননি। গত দশ বছর ধরে নিজের শিল্পকর্ম সৃষ্টির ক্ষেত্রে ফেলে দেওয়া সামগ্রীকে আবার নতুন করে ব্যবহার করে চলেছেন তিনি।
আগামীতে এই শিল্পকর্ম নিয়ে কী চিন্তাভাবনা রয়েছে, সেই সম্পর্কে শিল্পী বললেন, ‘বর্তমানে আমি যাদের আঁকা শেখাই, সেই ছাত্র-ছাত্রীরাও আমার এই কাজে আকৃষ্ট হচ্ছে। তারাও এই কাজটা করতে শুরু করেছে। আমি তাদের ফেলে দেওয়া জিনিস দিয়ে নতুন শিল্পকর্ম সৃষ্টি করা শেখাচ্ছি।’
তবে এখানেই থেমে না থেকে তিনি আগামীতে আরও নতুন নতুন কাজ করতে চান। বিশেষ করে ফেলে দেওয়া সামগ্রীকে কীভাবে নতুন করে নতুন রূপ দিয়ে ব্যবহারের উপযোগী করা যায়, তার জন্য নতুন লে-আউট করে তার ওপর কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এই শিল্পী। এখন শুধু দেবী দুর্গাকে বানালেও আগামী দিনে এই ফেলে যাওয়া সামগ্রীতেই সপরিবারে উমাকে বানানোর ইচ্ছা রয়েছে নারায়ণের।