শনিবার | ১০ অক্টোবর ২০২৬

৪১৭ বছরের পরম্পরাকে আজও অক্ষুণ্ণ রেখেই পুজো হয় সাবর্ণদের বাড়িতে

 ৪১৭ বছরের পরম্পরাকে আজও অক্ষুণ্ণ রেখেই পুজো হয় সাবর্ণদের বাড়িতে

সন্দীপ বসু- সালটা ১৬১০, মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমল। সেই সময় লক্ষ্মীকান্ত রায় চৌধুরীর হাত ধরে সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপুজো শুরু। যা আজ কলকাতার আদি দুর্গাপুজো হিসাবে পরিচিত। সেই পুজো আজও চালু আটটি বাড়িতে। বড়িশায় রয়েছে সাজের আটচালা বাড়ি, বড়বাড়ি, মেজবাড়ি, মাঝেরবাড়ি, বেনাকিবাড়ি ও কালীকিঙ্কর ভবন। আর উত্তর কলকাতায় বিরাটি ও নিমতা-পাঠানপুর বাড়ি। সাবর্ণ পরিবারের সর্বত্রই বিদ্যাপতি রচিত দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী মেনে পুজো হয়।
এই তিথি অনুযায়ী পুজো হলে; জন্মাষ্টমীতে কাঠামো পুজো, কৃষ্ণানবমীতে বোধন বসে, মহালয়ার পরদিন পঞ্চঘট স্থাপন এবং পঞ্চমীতে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের আরাধনা দিয়ে শুরু হয় মূল পর্ব। এই পুজোর প্রতিমাতেও রয়েছে বিশেষত্ব। দেবীর গায়ের রং শিউলি ফুলের বোঁটার মতো স্বর্ণবর্ণা। চোখ পানপাতার মতো টানা। গণেশের রং লাল, অসুরের সবুজ।
একচালার মধ্যেই ত্রিচালা আকারের চালচিত্র, যাকে বলে মঠচৌরি চালা। এর মাঝে সপরিবার দুর্গা, একপাশে রামচন্দ্র ও অন্যপাশে মহাদেব। তাঁদেরও নিত্যপুজো হয়। চালচিত্রে আঁকা থাকে
দশমহাবিদ্যা ও রাধাকৃষ্ণের লীলা। দেবী পরেন লাল বেনারসি ও বংশের ঐতিহ্যবাহী সোনার গয়না। ভোগের রীতিও ব্যতিক্রমী। আটটি বাড়ির সাতটিতেই দেবীকে আমিষ ভোগ দেওয়া হয়। শুধু নিমতা-পাঠানপুরে নিরামিষ। সন্ধিপুজোয় বাড়ির সদ্যস্নাতা মহিলারা ভিজে কাপড়ে, মুখে কাপড় বেঁধে রান্না করেন, শোল বা ল্যাটা মাছ পুড়িয়ে মাখন মিশিয়ে নিবেদন করা হয় দেবীকে। বড়বাড়ির সবচেয়ে রহস্যময় রীতি হল, সপ্তমীর অর্ধরাত্রি বিহিত পুজো, যেখানে দেবী পূজিতা হন চামুণ্ডা রূপে। এ ছাড়া অষ্টমী ও নবমীতে ১৮০টি মাটির খুরিতে মাষকলাই, ঘি ও দই দিয়ে মাষভক্তবলি দেওয়া হয় অপদেবতা ও উপদেবতাদের তুষ্ট করতে। পশুবলি বহু আগেই বন্ধ, এখন প্রতীকী আখ ও চালকুমড়ো বলি হয়। নবমীতে বিরাটির বাড়িতে কুমারীপুজো ও ধুনো পোড়ায় অংশ নেন পরিবারের সদস্যরা। দশমীতে কনকাঞ্জলি দিয়ে দেবীকে বিদায়।
সাবর্ণ পরিবার পরিষদের সম্পাদক দেবর্ষি রায় চৌধুরী জানিয়েছেন, তাঁদের বাড়িতে দশমীতে মাকে ভোগ দেওয়া হয় পান্তা ভাত, ইলিশ মাছ, কচু শাক ও চালতার চাটনি। বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে এই রীতি। সাবর্ণদের কিছু বাড়িতে বিসর্জন হয় গঙ্গায়। বাদবাকি বাড়িগুলিতে বাড়ির পুকুরেই বিসর্জন পর্ব সম্পন্ন হয়। বিভিন্ন মিষ্টান্ন দিয়ে দশমী পালন হয় এখানে। ঘট বিসর্জনের পর বাড়ির প্রত্যেক সদস্যের হাতে পুরোহিত পরিয়ে দেন অপরাজিতার লতা। ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় পারিবারিক পত্রিকা ‘সাবর্ণ বার্তা’ প্রকাশও এই পরিবারের অন্যতম অঙ্গ হয়ে উঠেছে সম্প্রতি। এভাবেই আজও অটুট চার শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী পুজো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *