ধৃতি-মান
শুভাশিস চৌধুরী
পর্ব-৬
পানিমুর থেকে বেরিয়ে ঘন্টাখানেকের রাস্তা উম্রাংসু। মাঝখানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে একটা ওষুধের দোকানে গেল মানস।ধৃতি গাড়িতে বসে রইল।ফার্মাসির ছেলেটির কথা মতো, একটা ব্যাথা কমানোর স্প্রে, পেইন কিলার আর ক্র্যাপ ব্যান্ডেজ কিনে, কিছুক্ষনের মধ্যে গাড়িতে উঠল মানস।
চলন্ত গাড়িতেই মানসের কোলে পা তুলে দিল ধৃতি।বাঁ পায়ের দিকে গোড়ালির উপর কাপড়টা তুলে ব্যাথার ওষুধটা স্প্রে করে দিল।প্রথমে একটু জ্বালা করল বটে, তবে কোনো শব্দ না করে শুধু দাঁত মুখ খিঁচে, চোখ বন্ধ করে রাখল। মানস শুধু একটু হাত বুলিয়ে দিল।এভাবে গাড়ি একটু ধীরে চালানোয় প্রায় ঘন্টা দেড়েক সময় ধৃতি আধো ঘুমে,শরীর ছেড়ে নিশ্চিন্তে পা টা মানসের কোলে সঁপে দিল। পৌঁছে গেল উম্রাংসু।সব গাড়ি গিয়ে দাঁড়ালো মটরস্ট্যান্ডে।সামনে পাশাপাশি দুটো হোটেল,এখানেই খেতে পারে ওরা।এ ছাড়া ইচ্ছে করলে যে আরও সামনে পোলো গ্রাউন্ডের কাছে গিয়ে, লাঞ্চ নিতে পারে সে কথাও বলল প্রদীপ।
ধৃতির পায়ের ব্যথাটা বেশ সেড়ে গেছে ওই স্প্রেতে।দুটো পেইন কিলার সঙ্গে রইল।বাড়াবাড়ি হলে রাতে খাওয়ার পর খেতে বলেছে।প্রদীপের ইচ্ছেটাকে মান্যতা দিয়ে এখানে নেমে খাওয়া নিয়ে যে অভিজ্ঞতা হল। সে কথা ওরা প্রদীপকে বার বার শোনালো।
ওরা দুজনেই নিরামিষ থালি বলায়, মাত্র একশো কুড়ি টাকা করে দুটো ডিস সাজিয়ে এনে দিল।সেখানেও মিষ্টি মিষ্টি জাপানী পুতুলের মতো দুই কিশোরী থালি সামনে এনে দিল। ভাতের চারদিকে বাটা,শাক, ডাল, সব্জি সব মিলিয়ে ছোট্ট ছোট্ট ন’টা করে বাটিতে সাজানো।দেখে এবং খেয়ে ওরা মহানন্দে বেরিয়ে এল।
এখানে মূলত পোলো খেলার জন্য বিশাল মাঠ থাকলেও, তার গা ঘেঁষেই রয়েছে বিস্তির্ণ এই হ্রদ উম্রাংসু।কোপিলির ধারাকে বাঁধে বেঁধে বিদ্যুতের আলো আর ব্যবহারের জন্য তাকে এমন করে সাজিয়েছে মানুষ।এ কথা এই বেলা মনে পড়ে না,দেখে যেহেতু পর- পাড় দেখা যায় না তাই সমুদ্র বলেই মন হয়।যেন প্রদীপের কথাই ঠিক।সমুদ্রই বটে, নেই শুধু সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ। বিস্তির্ণ সেই নীল জলরাশি যেন আকাশকে ডেকে নিয়ে এসেছে মাটির কাছাকাছি।
গাড়ি থামল জলরাশির একটু দূরে বিস্তির্ণ ঘাস আর চোরকাঁটায় ঢাকা মাঠে।ধৃতি গাড়ি থেকে নেমে মানসকে নিয়ে চলল,তার সামনে।কোনো কথা নয়।শুধুই পায়ে পায়ে এগিয়ে যাওয়া। সামনে গিয়ে দেখে কী উচ্ছাসে ছেলে মেয়েরা স্পিড বোটে চলে যাচ্ছে দূর দিগন্তের পানে।কেউ বা ফিরে আসছে বিপুল গতিতে। তার ঢেউ এসে ছাপিয়ে এসে ভিজিয়ে দিতে চাইছে ওদেরকেও। কেউ বা দলবেঁধে যাচ্ছে নৌকো ক’রে।একটু দূরে দাঁড়িয়ে একটা সবুজ ঘাসে ঢাকা দ্বীপ।হাঁটু জল পেরিয়ে বেশ অনেকেই যাচ্ছে সেখানে।ধৃতি-মান যেন সেই পুরীর সমুদ্রবেলায় চলে গেল।পায়ের জুতো পাড়ে খুলে, দুজনে গিয়ে উঠল সেই উঁচু সবুজ ঢিবিতে। আশ্চর্য! ধৃতি যে গানটা এখন গুনগুন করছে সেটারই মনে মনে সুর ভাজছে মানসের অনুচ্চারিত ঠোঁটে।
কত দিন পর শুনছি ধৃতি,শোনা।শুনুক অন্যলোকে।পাশের দুটো বাঙালী পরিবারের লোক।পোশাকে কথাবার্তায় মনে হয়,রুচিশীল পরিবারের লোক।যেন আগ্রহে তাকিয়ে আছে ধৃতির দিকে।ধৃতি গান ধরল এলোমেলো।যেভাবে ওর মন চাইছে-
“–সব গগন উদ্বেলিয়া– মগন করি অতীত অনাগত
আলোকে-উজ্জ্বল জীবনে-চঞ্চল একি আনন্দ-তরঙ্গ”
পাশে থাকা পরিবারের দুজন, মনে হয় কলেজ পড়া মেয়ে, সুরে ধরল।
“বিপুল তরঙ্গ রে, বিপুল তরঙ্গ রে”।
পাশ থেকে গেয়ে ওঠা মেয়ে দুটি বলেই ফেলল,আন্টি সবটা গান গাইবে না?ধৃতি বলল,বাকি কথাগুলো যে এই দৃশ্যের সঙ্গে আমার মনে লাগছে না,তাই এইটুকুই গাইলাম। ওরা বলল, এ আমাদের এক নতুন প্রাপ্তি হল।দারুণ গাইলে।খুব ভালো। মানস বলল,ভালো জিনিস কম হওয়াই ভালো,না গো কাকু!ওরা মাথা নেড়ে বুঝে না বুঝে সাঁই দিয়ে বলল,একদম।মুহুর্তেকে হেসে উঠল সবাই। । আরও বেশ কিছুক্ষন ওভাবেই দিগন্তবিস্তৃত নীল জলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল ওরা।
মানস হঠাৎ বলে উঠল
“–জল শুধু জল,
দেখে দেখে
চিত্ত মোর হয়েছে বিকল”। ধৃতি বলল,চল এবার ওদিকটাতে যাই,বুঝতে পারছি আর কিছুক্ষন এখানে থাকলে, তোকে দেবতা গ্রাস করে নেবে।ফেরার পথে সেই সবাই,ওদের দিকে তাকিয়ে রইল।হয়তো ভাবলো ওরা এই সময়ের সঙ্গে বেমানান বা রোমান্টিক দুটো কাল্পনিক চরিত্র।
এরপর বিকেল গড়িয়ে অনেকটা নিশ্চুপ দুজন।হাত ধরাধরি করে উম্রাংসুর ধার ধরে হাঁটল।বাতাসে ধৃতির আঁচল বার বার এসে ঢেকে দিচ্ছিল মানসের মুখ।লম্বা চুল সামলাতে পারছিল না ধৃতি।কিন্তু বাঁধে নি নিজের গরজে।মানস একবার সে কথা বলতেই বলল,হৃদয় আমার কেশে বেশে করছে মাতামাতি,তুই বুঝতে পারছিস না?কাল আমাকে ফিরে যেতে হবে, আমার বে-জীবনে।তখন এই কেশে মাখা উম্রাংসুর হাওয়া, এই পায়ে তোর পরশ, এই সময়ের গান,কথা, এগুলো নিয়েই বাকি জীবন চালিয়ে নেব মনের আনন্দে।অনেকটা সময় কাটালো এভাবে।উম্রাংসু দেখল ওদের দুজনকে।একসময় ইশারাতে উম্রাংসুই যেন বলল,যাও ফিরে আপন ভুবনে,সাঙ্গ হল এবারের দেখা।একই ভাবনায় কথা না বলেও দুজন-দুজনের দিকে তাকিয়ে যেন এই উম্রাংসুর কথাই ওরা বলল,যা শুনতে পায় না আর কেউ।
কথা শেষ হতে মানসের নজর গেল দূরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রদীপের দিকে।সে হাতের ইশারায় বলছে, সব গাড়ি বেরিয়ে যাবে।আমাদেরও ফিরতে হবে এবার।ধৃতিকে ঘুরিয়ে দেখালো প্রদীপের ইশারা।ফিরে এল গাড়িতে, ফেরার পথ ধরতে।
ফেরার পথে আবার প্রদীপ দেখালো, তুলারাম কেইভ। সুরঙ্গপথ যেমন হওয়া উচিৎ,সেরকমই।না,এই বর্ষায় সে রকম কিছু দেখতে পেলাম না।মানসের কথা শুনে প্রদীপ বলল,তবে এই গুহার ঐতিহাসিক মর্যাদা আছে।
কী রককম? বলল,স্বাধীনতা সংগ্রামী তুলারাম সেনাপতির লড়াইয়ের ইতিহাসকে মনে রাখতে তাঁর নামে,এই গুহার নামকরণ করা হয়েছিল বলেই জানি।এইটাই শুনে আসছি।
কিছুটা দূর গিয়ে,ধৃতি আর যেতে চাইল না। ওরা ফিরে এল। এগিয়ে চলল গাড়ি।
পাহাড়ি পথের মাঝে নীচ দিয়ে বয়ে যাওয়া লাংলাই নদী দেখাল,যে কথা যাওয়ার সময় বলে নি প্রদীপ। আঁধো অন্ধকারে গাড়ির কাঁচ তুলে একবার দেখে নিল শীর্ণ নদীটিকে।আসলে এই দুটো নদী,গেঙ্গী আর লাংলাই হাফলংয়ের মানুষের চাষবাসের সম্পদ,প্রদীপের কথা শুনে মনে হল।কী জানি হবে হয়তো,মানসেরও ভাবনাতে এল।কিন্তু ফেরার পথ একটু কম হলেও সারা দিনের জার্ণির পর এই ভাঙা চোরা রাস্তা বড় দীর্ঘ মনে হচ্ছে।তবে প্রদীপ বলল,আরেকটা রাস্তা ছিল হাই ওয়ে দিয়ে, কিন্তু ওতে যেতে আসতে অনেকটা সময় লাগে।তাই এই রাস্তাটাই সবাই বেছে নেয়।এবার ধৃতি একেবারে চুপ।গাড়ির ভেতরে মানসের বুকে মাথা রেখে দিল।মানস বুঝল,অঝোরে কাঁদছে ধৃতি।আওয়াজ নেই কিন্তু অন্ধকারে ভিজে যাচ্ছে মানসের শার্ট। বুঝতে পারছে মানস,এ তো সময় চলে যাওয়ার বেদনা।আওয়াজ করে কিছু বলতেও পারছে না বেচারী,পাছে ড্রাইভার কিছু ভাবে।
রাত আটটা নাগাদ প্রদীপ আবার ওদের এনে নামাল সেই লজে,যেখানে প্রথম উঠেছিল। যাওয়ার সময় প্রদীপ বলে গেল,সকালে কিন্তু সাতটা পনেরো ট্রেন।যদিও সময়ের ঠিক থাকে না।যদি ভুলে,ট্রেন ঠিক টাইমে এসে যায়!তাই আমি সময়মত এসে যাব।হাসি মুখে বেরিয়ে গেল সে।