মঙ্গলবার | ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রয়ে গেল পর্দার মিঠু, আর বাংলা সিনেমার স্মৃতিতে তাঁর সেই স্বতন্ত্র উপস্থিতি

 রয়ে গেল পর্দার মিঠু, আর বাংলা সিনেমার স্মৃতিতে তাঁর সেই স্বতন্ত্র উপস্থিতি

সন্দীপ বসু

মুম্বাই: বাংলা ছবির এক পরিচিত মুখ, যাঁর উপস্থিতি একসময় পর্দায় আলাদা করে চোখে পড়ত, সেই অভিনেত্রী চলে গেলেন নীরবে। বর্ষীয়ান অভিনেত্রী মিঠু মুখোপাধ্যায় রবিবার রাতে মুম্বাইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। গত এক বছর ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন অভিনেত্রী। দীর্ঘদিন ধরেই মুম্বাইয়ে বসবাস করছিলেন তিনি। দক্ষিণ কলকাতার নিজের বাড়িটিও বিক্রি করে দিয়েছিলেন অনেক আগেই। গত এক বছর মুম্বাইয়েই চলছিল তাঁর চিকিৎসা। শেষ পর্যন্ত আর ফেরানো গেল না তাঁকে।

সত্তরের দশকের গোড়ায় বাংলা ছবিতে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন মিঠু। খুব দীর্ঘ ছিল না তাঁর অভিনয় জীবন। কিন্তু সময়ের দৈর্ঘ্যের চেয়ে তাঁর রেখে যাওয়া চরিত্রের ছাপ ছিল অনেক গভীর। মিষ্টি মুখ, স্বচ্ছন্দ অভিনয় এবং চরিত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে বদলে নেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে দ্রুতই দর্শকের পরিচিত মুখ করে তুলেছিল। বাংলা ছবির পাশাপাশি হিন্দি এবং ওড়িয়া ছবিতেও কাজ করেছিলেন তিনি। প্রায় দুই দশকের মধ্যে সীমাবদ্ধ তাঁর চলচ্চিত্রজীবন শেষ হলেও, সেই সময়ের বেশ কিছু ছবি আজও বাংলা সিনেমার দর্শকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। মিঠুর জন্ম ১৯ জুন ১৯৫৫ সালে কলকাতায়।

চিত্ত বসুর ‘শেষ পর্ব’ দিয়েই বড়পর্দায় তাঁর যাত্রা শুরু। প্রথম ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন সমিত ভঞ্জ। অভিষেকের পর অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে যাননি মিঠু। সেই সুযোগ এল দীনেন গুপ্তের ‘মর্জিনা আবদুল্লা’য়। আলিবাবার কাহিনির মর্জিনা চরিত্রে তাঁর অভিনয়ই তাঁকে ঘরে ঘরে পরিচিত করে দেয়। ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন দেবরাজ রায়। ‘মর্জিনা আবদুল্লা’ থেকেই মিঠু হয়ে উঠেছিলেন বাংলা ছবির এক জনপ্রিয় তরুণ মুখ। বিভিন্ন ফিল্ম-আর্কাইভেও ছবিটিকে তাঁর অভিনয় জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর পর আসে ‘নিশিকন্যা’। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে তৈরি এই ছবিতে মিঠুর বিপরীতে ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর অভিনয়ের পরিধি বাড়তে থাকল। ১৯৭৪ সালে অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘মৌচাক’ তাঁকে পৌঁছে দেয় আরও বড় দর্শকগোষ্ঠীর কাছে। নীপা চরিত্রে মিঠু এবং সিতেশের ভূমিকায় রঞ্জিত মল্লিকের জুটি বাংলা ছবির দর্শকের মনে জায়গা করে নেয়। ছবিতে তাঁদের পাশাপাশি ছিলেন উত্তমকুমার, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, অনুপকুমার, চিন্ময় রায় এবং রবি ঘোষের মতো শিল্পীরাও। ‘মৌচাক’-এর জনপ্রিয়তা মিঠুর অভিনয় জীবনের অন্যতম বড় মাইলফলক হয়ে থাকে।

‘মৌচাক’-এর পর রঞ্জিত মল্লিকের সঙ্গে ফের জুটি বাঁধেন ‘স্বয়ংসিদ্ধা’য়। ১৯৭৫ সালের এই ছবিতে একেবারে অন্য ধরনের চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে। ছবিতে তাঁর চরিত্রের মধ্য দিয়ে শুধু নায়িকার উপস্থিতিই নয়, অভিনয়েরও যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। বেঙ্গল ফিল্ম আর্কাইভের তথ্যেও ‘স্বয়ংসিদ্ধা’র গুরুত্বপূর্ণ অভিনেতাদের তালিকায় মিঠু ও রঞ্জিত মল্লিকের নাম রয়েছে।

এর আগে ‘কবি’ ছবিতেও দেবরাজ রায়ের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন মিঠু। পরের বছর ‘চাঁদের কাছাকাছি’ এবং ‘হোটেল স্নো ফক্স’-এর মতো ছবিতে তাঁকে দেখা যায়। ‘হোটেল স্নো ফক্স’-এ উত্তমকুমারের সঙ্গেও অভিনয় করেছিলেন তিনি। সেই সময় বাংলা ছবির অন্যতম বড় তারকাদের সঙ্গে একের পর এক কাজ করে নিজের জায়গা তৈরি করে নিচ্ছিলেন মিঠু। বেঙ্গল ফিল্ম আর্কাইভেও ‘হোটেল স্নো ফক্স’-এর অভিনয়শিল্পীদের তালিকায় উত্তমকুমার ও মিঠু মুখোপাধ্যায়ের নাম রয়েছে।

বাংলা ছবির পাশাপাশি এই সময়েই হিন্দি ছবিতেও পা রাখেন তিনি। ১৯৭৬ সালে দুলাল গুহ পরিচালিত ‘খান দোস্ত’ ছিল তাঁর হিন্দি ছবিতে আত্মপ্রকাশ। শত্রুঘ্ন সিন্‌হার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন মিঠু। ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন রাজ কাপুরও। এরপর বাসু চট্টোপাধ্যায়ের একাধিক ছবিতে কাজ করেন তিনি। ‘সফেদ ঝুট’, ‘দিল্লাগি’ এবং ‘দো লড়কে দোনো কড়কে’তে দেখা যায় তাঁকে। ‘দিল্লাগি’তে আবারও শত্রুঘ্ন সিন্‌হার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন মিঠু। হিন্দি ছবিতে তাঁর কাজের তালিকায় বাসু চট্টোপাধ্যায়ের এই ছবিগুলির উল্লেখ একাধিক চলচ্চিত্র-আর্কাইভেও পাওয়া যায়।

বাংলা ছবিতেও তখন তাঁর ব্যস্ততা কমেনি। ১৯৭৭ সালের ‘প্রতিমা’য় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মিঠু। দ্বিতীয় স্ত্রীর ভূমিকায় ছিলেন সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়। অনিল চট্টোপাধ্যায়, ছায়া দেবী, অনুপকুমার, রবি ঘোষ-সহ একাধিক পরিচিত শিল্পীও ছিলেন ছবিতে। ‘প্রতিমা’র অভিনয়শিল্পীদের তালিকাতেও মিঠু, সৌমিত্র এবং সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়ের নাম রয়েছে।

তবে মিঠু মুখোপাধ্যায়ের অভিনয়জীবন শুধুই জনপ্রিয় বাংলা ছবি বা নায়িকার চরিত্রে আটকে ছিল না। সময়ের সঙ্গে তিনি পারিবারিক ছবি, সামাজিক গল্প এবং ভিন্ন ধরনের চরিত্রেও নিজেকে মেলে ধরেছিলেন। ‘ফাদার’ ছবিতে তাঁর অভিনীত চরিত্রটি ছিল একেবারেই অন্য রকম। ওড়িয়া ছবিতেও কাজ করেন তিনি। দীনেন গুপ্ত পরিচালিত ‘জ্বাইন পুয়া’ ছিল তাঁর সেই পর্বের উল্লেখযোগ্য কাজ, যা ‘মৌচাক’-এর ওড়িয়া সংস্করণ হিসেবেও পরিচিত।

বাংলা ও হিন্দি ছবির পাশাপাশি তাঁর অভিনয় জীবনে আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাজ আসে। ‘ভাগ্যচক্র’, ‘সন্ধি’, ‘বন্ধন’, ‘ফাদার’, ‘দুজনে’ এবং ‘প্রার্থনা’র মতো ছবিতেও অভিনয় করেন তিনি। ১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি ধীরে ধীরে পর্দা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। তারপর বেশ কয়েক বছরের বিরতি।

এরপর ১৯৯০ সালে চন্দ্র বরাটের ‘আশ্রিতা’ দিয়ে আবার বড়পর্দায় ফেরেন মিঠু। ছবিতে তাঁর সঙ্গে ছিলেন কানওয়ালজিৎ সিং। প্রতিভা বসুর কাহিনি অবলম্বনে তৈরি এই ছবিটি তাঁর অভিনয়জীবনের শেষ ছবি হয়ে থাকে। বেঙ্গল ফিল্ম আর্কাইভের তথ্য অনুযায়ী, ‘আশ্রিতা’ মুক্তি পায় ১৯৯০ সালের অক্টোবরে এবং ছবির চিত্রনাট্যের সঙ্গেও মিঠু যুক্ত ছিলেন।

তারপর আর ক্যামেরার সামনে ফেরেননি তিনি। অভিনয়ের জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে মুম্বাইয়ে অনেকটা আড়ালেই জীবন কাটিয়েছেন। ২০২৫ সালে ‘আশ্রিতা’র পরিচালক চন্দ্র বরাটের মৃত্যুর খবর প্রকাশের সময়ও তাঁর পরিচালিত ওই ছবির সঙ্গে মিঠু মুখোপাধ্যায়ের নাম নতুন করে সামনে এসেছিল।

প্রায় দুই দশকেরও কম সময়ের অভিনয় জীবনে মিঠু কাজ করেছেন উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, রঞ্জিত মল্লিক, দেবরাজ রায়, শত্রুঘ্ন সিন্‌হা, রাজ কাপুর, বিনোদ মেহরা, নবীন নিশ্চল, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, অনুপকুমার, মহুয়া রায়চৌধুরী-সহ বাংলা ও হিন্দি ছবির বহু পরিচিত শিল্পীর সঙ্গে। তাঁর ছবির তালিকা হয়তো খুব দীর্ঘ নয়, কিন্তু যে সময়টুকু তিনি পর্দায় ছিলেন, তার মধ্যে একাধিক স্মরণীয় চরিত্র দর্শকদের দিয়ে গিয়েছেন।

তারপর অনেকটা সময় কেটে গিয়েছে। পর্দা বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, বাংলা ছবির ভাষাও বদলেছে। মিঠু মুখোপাধ্যায় সেই বদলে যাওয়া সময়ের সঙ্গে আর সামনে থেকে হাঁটেননি। কিন্তু ‘মর্জিনা আবদুল্লা’র মর্জিনা, ‘মৌচাক’-এর নীপা কিংবা ‘স্বয়ংসিদ্ধা’র চরিত্র আজও পুরোনো বাংলা ছবির দর্শকের স্মৃতিতে জীবন্ত। অভিনেত্রী বহু আগেই আলো থেকে সরে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর অভিনয়ের কিছু মুহূর্ত আলো নিভতে দেয়নি। এবার সেই মানুষটিও চলে গেলেন। থেকে গেল শুধু পর্দার মিঠু, আর বাংলা সিনেমার স্মৃতিতে তাঁর সেই স্বতন্ত্র উপস্থিতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *