সিটি অফ জয়কে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছে তৃণমূল, তারাতলার বিপর্যয়ে পূর্বতন সরকার ও প্রাক্তন মেয়রকে নিশানা মুখ্যমন্ত্রীর
কলকাতা, ২৫ জুন- তারাতলার গুদাম বিপর্যয়ে পূর্বতন তৃণমূল সরকার এবং কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বিধানসভার অন্দরে বিষ্ফোরক বিবৃতি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার রাতে পুরসভার তরফে এই কান্ড নিয়ে প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্টের রেশ টেনে বৃহস্পতিবার বিধানসভায় বিবৃতি দিয়েছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই গাফিলতির নেপথ্যে যারা রয়েছেন তাদের কাউকে রেয়াত করা হবে না।
বুধবার আচমকাই তারাতলায় একটি নির্মীয়মান গুদাম ভেঙে পড়ে। ভেতরে আটকে বহু শ্রমিক। অনেককে উদ্ধার করা হলেও বুধবার রাত পর্যন্ত পাঁচজন প্রাণ হারিয়েছেন বলেই জানানো হয়। এদিন পর্যন্ত সেই সংখ্যাটা বেড়ে হয়েছে ১১। তারাতলার ধ্বংসস্তূপ থেকে বৃহস্পতিবার সকালে এক জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তিনি লোহার বিমের নীচে আটকে ছিলেন প্রায় সাড়ে ১৮ ঘণ্টা। তবে তার আঘাত তেমন গুরুতর নয়। উদ্ধারের পর তাকে এসএসকেএম হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সেখানেই তিনি চিকিৎসাধীন। এখনও ধ্বংসস্তূপের নীচে কয়েক জন আটকে আছেন বলে মনে করা হচ্ছে। তবে তারা কী অবস্থায় আছেন, স্পষ্ট নয়। ভিতর থেকে আর কোনও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
আর সেই তারাতলার ঘটনা নিয়েই আজ বিধানসভায় প্রথম পর্বের অধিবেশনে বিবৃতি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। নিজের বক্তৃতায় তারাতলার এই ঘটনায় গভীর শোকপ্রকাশ করেন তিনি। মৃতদের পরিবারপিছু আর্থিক ক্ষতিপূরণের ঘোষণার পাশাপাশি পূর্বতন তৃণমূল সরকারকে তীব্র কটাক্ষ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। পূর্বতন মেয়র ফিরহাদকে যেমন আক্রমণ শানান তেমনই এক কালীচরণের নামও শোনা যায় তার মন্তব্যে। সেই সূত্র ধরেই তারাতলা বিপর্যয়েও জড়িয়ে গিয়েছে ‘কালীঘাট তৃণমূলে’র সেকেন্ড ইন কম্যান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কলকাতা পুরসভায় কালী না-বললে কোনও প্ল্যান (পাশ) হয় না। কালীকে তুললে সব বেরিয়ে যাবে। সবাই জানে, কালীকে নিয়োগ করেছে ক্যামাক স্ট্রিট।’ কালীর পরিচয় নিয়ে যদিও কোনও মন্তব্য করেননি মুখ্যমন্ত্রী। আর মুখ্যমন্ত্রীর এ হেন মন্তব্যের পরেই কালীকে নিয়ে শুরু হয়েছে জল্পনা। প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের ওএসডি পদে যিনি ছিলেন তার নাম কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। আর মুখ্যমন্ত্রীর মুখে কালীচরণের নাম আসার পরেই প্রাক্তন মেয়রের ওএসডিকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে।
জানা গিয়েছে, ২০০৩ সালে ওয়েস্ট বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে দ্বিতীয় হন কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। যোগ দেন ভূমি রাজস্ব দপ্তরে। এরপর ২০০৬ সালে ওয়েস্ট বেঙ্গল পুলিশ সার্ভিস পরীক্ষায় বসেন। তাতে প্রথম হয়ে ২০০৮ সালে রাজ্য পুলিশে যোগ দেন। কিন্তু প্রশিক্ষণের সময় তা ছেড়ে দেন বিশেষ কারণে। ওই বছরই ফের ভূমি রাজস্ব দপ্তরে ফিরে যান তিনি। সূত্রের খবর, ২০১০ সাল থেকে পুরসভায় কাজ শুরু কালীচরণের। সেই সময় মেয়র পারিষদ ছিলেন ফিরহাদ। কালীচরণ ছিলেন ফিরহাদের আপ্ত সহায়ক। ২০১৮ সালে কলকাতা পুরনিগমের মেয়র হন ফিরহাদ হাকিম। শোনা যায়, ক্যামাক স্ট্রিটের নির্দেশেই সেই সময় ফিরহাদ হাকিম কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিজের ওএসডি পদে নিয়ে আসেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই কালীচরণের দাপটও বেড়েছে।
কলকাতার মেয়রের পাশাপাশি রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রীর দায়িত্বেও ছিলেন ফিরহাদ। মন্ত্রী সামলাতে গিয়ে পুর নিগমে বেশি সময় দিতে পারতেন না তিনি। সেইসময়ে তার অত্যন্ত আস্থাভাজন বলে পরিচিত এই কালীচরণ অনেকটা দায়িত্ব সামলাতেন। এবার তারাতলার ঘটনার পরেই এমনই এক কালীচরণের নাম উঠে এল মুখ্যমন্ত্রীর বক্তৃতায়। তারাতলার ভেঙে পড়া গুদামের নকশা ত্রুটিপূর্ণ ছিল বলে বুধবারই অভিযোগ করেছিলেন শুভেন্দু। বৃহস্পতিবার বিধানসভায় সেই নকশায় মেয়র ফিরহাদ হাকিমের সইও দেখিয়েছেন তিনি। চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি কলকাতা পুরসভা নকশাটি পাশ করেছিল। আর এই সূত্রেই কালীর প্রসঙ্গ টেনেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তার আরও অভিযোগ, ‘এই কালী বাইপাসের পাশে আপনাদের তৃণমূল ভবন বানাচ্ছে ২০০ কোটি টাকা দিয়ে। এখান (পুরসভা) থেকে টাকা তুলে ওখানে পাঠায়। আমরা সব জানি, সব বের করেছি।’ বুধবারই প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম দাবি করেছিলেন যে, ওই গুদামটি কে বানাচ্ছিল বা তার নকশা কেমন ছিল, সেই নিয়ে তার বিন্দুমাত্র কোনও ‘আইডিয়া নেই’। পাল্টা এদিন সেই ফিরহাদকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। দুর্ঘটনার পর পুলিশি অ্যাকশনের খতিয়ান তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন যে, এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত মোট ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃতদের তালিকায় রয়েছে – গুলজার হোসেন (আজগরের সুপারভাইজার), কমল সামন্ত (আয়রন স্ট্রাকচার ফেব্রিকেটর), শম্ভুনাথ বেহেরা (বন্দর কর্তৃপক্ষের থেকে জমি লিজ নেওয়া মূল মালিক), দিবাকর ভাণ্ডারী (‘লেবার সাপ্লায়ার’), আব্দুল হামিদ (কলকাতা পুরসভা বা কেএমসি থেকে প্ল্যান পাস করানোর মূল দালাল বা ‘ব্রোকার’)। হুঁশিয়ারির সুরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘যারা ভাবছেন সব দায় এড়াব, তাদের জানিয়ে রাখি কাউকে ছাড়া হবে না।’ তার সাফ কথা, ‘সিটি অফ জয়কে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করে রেখেছে তৃণমূল কংগ্রেস। এটা ওদেরই পাপের ফল।’