সাক্ষাৎকার : ‘আমি অনুষ্ঠানে গানের মাঝে বেশি সময় নষ্ট করতে পছন্দ করি না, এটা শ্রোতা পছন্দ করেন না’
এই সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী সৌমেন চক্রবর্তী। রবীন্দ্রনাথ, আধুনিক বাংলা গান, শিল্পীর নিজের গান নিয়ে আলাপচারিতায় বাসব মৈত্র। আজ শেষপর্ব।
১) ক্রম অনুসারে সাজতে বললে(গায়ক হিসেবে) কীভাবে সাজাবেন? কবীর সুমন, নচিকেতা, শ্রীকান্ত আচার্য, শিলাজিৎ, মনোময়, অঞ্জন, রাঘব, রূপম ইসলাম।
উঃ শ্রীকান্ত আচার্য, কবীর সুমন, নচিকেতা, রাঘব চট্টোপাধ্যায়, মনোময় ভট্টাচার্য, রূপম ইসলাম, অঞ্জন দত্ত, শিলাজিৎ।
২) সম্প্রতি প্রয়াত হলেন আশা ভোঁসলে। আশা ভোঁসলের গানের যে বৈচিত্র্য তা ভারতীয় বিনোদন জগতে বিরল। আপনার মূল্যায়নে এই বৈচিত্র্যের রহস্য কী? যা আজ পর্যন্ত কোনো মহিলা সঙ্গীত শিল্পীর নেই?
উঃ প্রথমেই আশাজীর চরণে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই। ওঁর সম্বন্ধে আমার কিছু বলাটাই ধৃষ্টতা।উনি ঈশ্বরদত্ত প্রতিভা। ওঁর কণ্ঠের বৈচিত্র্য ঈশ্বরের দান। কোনো শিক্ষা বা রেওয়াজ এ জিনিস তৈরি করতে পারেনা। তবে এটা অবশ্যই, যে শিক্ষা ও রেওয়াজ-প্রতিভার ক্ষমতা ও নমনীয়তাকে সম্পৃক্ত করে। গুরু ছাড়া সঙ্গীত অসম্পূর্ণ। আরেকটা বিষয়— ওঁর বৈচিত্র্যর রহস্য হচ্ছে প্রতিটি কাজের গভীরে প্রবেশ ও নমনীয় হওয়া। ওঁর সঙ্গীতের সঙ্গে বোঝাপড়া- সুরকারের চাওয়াকে গুরুত্ব দেওয়া- গীতিকারের কথার প্রতি আবেগ- সিনেমার ক্ষেত্রে দৃশ্যায়নের গুরুত্ব— এ সবই ওঁকে মহিমান্বিত করেছে এবং অবিশংবিদিত সঙ্গীতের রানিতে ভূষিত করেছে এবং অবশ্যই সঙ্গীতের সাধনা ও রেওয়াজ।।
৩) আপনি নিজেও সুরকার।মান্না দে, রাহুল দেব বর্মন এরা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে যে ভাবে ব্যবহার করেছেন তাদের গানে, তা বহু মাইলফলক তৈরি করেছে।এখনকার সুরকাররা সেই মাইল ফলক তৈরিতে ব্যর্থ।কী বলবেন?
উঃ আসলে সঙ্গীতের সুরারোপের ক্ষেত্রে ইচ্ছা করলেই তো শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ব্যবহার করা যায় না। যিনি করবেন তাকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জ্ঞান সমৃদ্ধ হতে হবে। রাগের ব্যবহার- কোন রাগগুলি একক ভাবে বা একাধিক ভাবেই একটি গানে ব্যবহার করা যাবে (মিশ্র), কথা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার— এইগুলি জানা প্রচণ্ড দরকার। কিংবদন্তি মান্না দে-রাহুল দেব বর্মন-নৌশাদ-ও পি নায়ার-মহঃ রফি এঁদের সঙ্গীত জ্ঞান ছিল সমুদ্রের মতন। রাগের সঙ্গে অন্য সুরের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন— ছন্দের প্রকরণ ঘটিয়েছেন, সুরের ভাঙা গড়ায় মেতে ছিলেন।। প্রত্যেকেই আত্মমগ্ন শিল্পী।। এখনকার বেশিরভাগ সুরকারের এই সাঙ্গীতিক ব্যাপ্তির বড়ই অভাব। সঠিক শিক্ষা লাভ না করলে সুরকে নতুন ডাইমেনশন দেওয়া কখনো সম্ভব নয়।। তাই এখন আর সেই পর্যায়ের গান খুব বেশি পাওয়া যায়না।। খুব অল্প সংখ্যক বিদগ্ধ সুরকার আছেন যারা শাস্ত্রীয় সুরের মাধ্যমে ফিল্মি বা বেসিক গানে মাইলফলক সৃষ্টিতে সক্ষম হন।
৪) নিজের নতুন গান তৈরিতে আপনি কতটা নিষ্ঠাবান?
উঃ নিজের গান সৃষ্টির ক্ষেত্রে আমার খুব একটা আগ্রহ বা নিষ্ঠা নেই। আমার চিরকাল মনে হয়েছে এবং এখনও মনে হয় সুরকার সঙ্গীতের ক্ষেত্রে সবসময়ই একটা এলিট ক্লাস। সবার পক্ষে দক্ষ সুরকার হওয়া সম্ভব নয়।।
৫) সুরকার দেবজ্যোতি মিশ্র বাংলা গানের চলনকে কীভাবে বদলে দিয়েছেন বলে মনে করেন?
উঃ সুরকার দেবজ্যোতি মিশ্র কমবয়সে দীর্ঘদিন সলিল চৌধুরীর মতো কিংবদন্তির সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। তাই স্বাভাবিক ভাবেই ওঁর মধ্যে সলিল বাবুর ক্রিয়েশনের একটা বিরাট প্রভাব আছে। তাই দেবজ্যোতি মিশ্র তার সৃষ্টির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে সহজেই পৌঁছতে পেরেছে বলেই মনে হয়। দেবজ্যোতি মিশ্র নিজেই একজন ভার্সেটাইল শিল্পী।
৬) ঘণ্টা দেড়েকের প্রোগ্রামে কীভাবে সাজান অনুষ্ঠান? নিজের গান,এই সময়ের গান,বা স্বর্ণযুগের গান কীরকম সংখ্যায় থাকে?
উঃ রবীন্দ্রসঙ্গীত, নিজের গান, স্বর্ণযুগের গান। ঘণ্টা দেড়েকের অনুষ্ঠানে আনুমানিক ১৬-১৭টি গান গাইতে হয়। (আমি গানের মাঝে বেশি সময় নষ্ট করতে পছন্দ করি না। এটা দর্শক পছন্দ করেন না।) রবীন্দ্রসঙ্গীত ৪টি, নিজের গান ১টি, বাকি ১২টি গান স্বর্ণযুগের। কখনো তার মধ্যেই স্বর্ণযুগের হিন্দি গানও থাকে। পরিবেশ ও পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে।।
৭) সাম্প্রতিক বাংলা এবং বলিউডের গান মিলিয়ে, সিনেমারও হতে পারে, এরকম আপনার পছন্দের ৪টি গানের কথা বলুন।
উঃ ক) আমার সারাটা দিন মেঘলা আকাশ, বৃষ্টি….তোমাকে দিলাম।
খ) লুট গয়ে…হাঁ লুট গয়ে। ম্যায় তেরী মোহাব্বত মেঁ।
গ) চাঁদ কেন আসে না আমার ঘরে…
ঘ) যদি বন্ধু হও…যদি বাড়াও হাত।
৮) র্যাপিড ফায়ার—
মান্না না হেমন্ত? — হেমন্ত
এ আর রহমান না রাহুলদেব বর্মন? — রাহুলদেব বর্মন
প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় না নির্মলা মিশ্র? — নির্মলা মিশ্র
আরতি মুখার্জী না হৈমন্তী শুক্লা? — হৈমন্তী শুক্লা
দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় না সাগর সেন? — দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়
এই সবগুলোই আমার ব্যক্তিগত পছন্দ। ওঁরা সবাই গ্রেট। সকলকেই আমার প্রণাম জানাই।