শনিবার | ৩০ মে ২০২৬

সাক্ষাৎকার : ‘সভ্যতা কখনো প্রযুক্তির কারণে ধ্বংস হয় না; ধ্বংস হয় যখন মানুষ প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার নৈতিক শক্তি হারিয়ে ফেলে’

 সাক্ষাৎকার : ‘সভ্যতা কখনো প্রযুক্তির কারণে ধ্বংস হয় না; ধ্বংস হয় যখন মানুষ প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার নৈতিক শক্তি হারিয়ে ফেলে’

দীপ্র ভট্টাচার্য। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল রূপান্তরের ভবিষ্যৎ দিক নির্দেশনা নির্ধারণের অন্যতম মুখ্য চিন্তক। আগামী দিনে এআই নতুন বিশ্বের কতটা বন্ধু হয়ে উঠবে বা উঠবে না— এরকমই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীপ্র ভট্টাচার্যের সঙ্গে আলাপচারিতায় বাসব মৈত্র

১। আপনি একজন অভিজ্ঞ প্রযুক্তিবিদ, গবেষক, লেখক ও কলামিস্ট। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিষয়ে প্রযুক্তির পাশাপাশি এআই এক্সপার্ট আপনি। এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আধুনিক সভ্যতা, সংস্কৃতিকে আগামীতে কীভাবে গ্রাস করতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
“গ্রাস” শব্দটি এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এআই সভ্যতাকে ধ্বংস করবে—এমন সরলীকৃত ধারণা যেমন ভুল, তেমনই এটাকে সম্পূর্ণ নিরীহ প্রযুক্তি ভাবাও বিপজ্জনক। ইতিহাস বলছে, যে প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে গভীরভাবে বদলেছে—মুদ্রণযন্ত্র, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট—প্রথমে তাকে ভয় করা হয়েছে, পরে সেই প্রযুক্তিই সভ্যতার কাঠামো পাল্টে দিয়েছে। এআই-ও সেই রকমই একটি শক্তি, তবে এর প্রভাব অনেক দ্রুত এবং অনেক বেশি ব্যক্তিগত। আমরা আজ এমন এক যুগে ঢুকেছি, যেখানে মানুষ শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করছে না, প্রযুক্তি মানুষের চিন্তাভাবনা, রুচি, সিদ্ধান্ত, এমনকি আবেগও প্রভাবিত করছে। আপনি কী গান শুনবেন, কোন খবর পড়বেন, কাকে ভালোবাসবেন, কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের দিকে ঝুঁকবেন—এসবের পিছনে অ্যালগরিদমিক সুপারিশ কাজ করছে। অর্থাৎ, এআই ধীরে ধীরে “মানুষের পছন্দ”কে “ডেটা-চালিত আচরণে” রূপান্তর করছে। সবচেয়ে বড় বিপদ আমি দেখি সাংস্কৃতিক সমরূপীকরণে। আগে সাহিত্য, সিনেমা, সংগীত—সবকিছুর মধ্যে ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ছিল। এখন এআই সেই বৈচিত্র্যকে বিশ্লেষণ করে এমন কনটেন্ট তৈরি করছে, যা “সবচেয়ে বেশি মানুষ পছন্দ করবে”। ফলত, গভীরতা বা পরীক্ষাধর্মী শিল্প ধীরে ধীরে কমে গিয়ে “অ্যালগরিদমিক জনপ্রিয়তা” বাড়তে পারে। একসময় হয়তো আমরা বুঝতেই পারব না, কোন গানটি মানুষের হৃদয়ের যন্ত্রণা থেকে জন্মেছে আর কোনটি কেবল ডেটা প্যাটার্ন থেকে তৈরি। তবে বিপরীত দিকও আছে। এআই এমন বহু মানুষকে সৃষ্টিশীল হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে, যাদের কাছে আগে সেই অবকাঠামো ছিল না। একজন গ্রামের ছাত্র আজ এআই ব্যবহার করে বিশ্বমানের গবেষণা পড়তে পারছে, একজন স্বল্প বাজেটের চলচ্চিত্র নির্মাতা এআই দিয়ে ভিজ্যুয়াল তৈরি করতে পারছেন। অর্থাৎ, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণও ঘটছে। এআই অনেক পুরোনো কাঠামো ভেঙে দেবে, কিন্তু নতুন সভ্যতার ভাষাও তৈরি করবে। আসল প্রশ্ন হলো—এই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে? কয়েকটি কর্পোরেশন, নাকি সাধারণ মানুষ? যদি এআই কেবল মুনাফা ও নজরদারির হাতিয়ার হয়, তাহলে এটি মানবিক স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কিন্তু যদি নৈতিকতা, শিক্ষা, স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে এআই এগোয়, তাহলে এটি মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় সহায়ক প্রযুক্তিও হতে পারে। সভ্যতা কখনো প্রযুক্তির কারণে ধ্বংস হয় না; ধ্বংস হয় যখন মানুষ প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার নৈতিক শক্তি হারিয়ে ফেলে।
২। আপনি একটি নিবন্ধে লিখছেন হাকাদোতে-এর গবেষকরা ‘The Day a Computer Writes a Novel’ নামে একটি উপন্যাস তৈরি করেন। যা হোশি শিনিচি সাহিত্য পুরস্কারের প্রথম রাউন্ড পার করে। যদিও শেষপর্যন্ত তা পুরস্কার জেতেনি। এতে কি নিশ্চিত ভাবে বলা যায়, আগামীতে এআই শেষ রাউন্ডে জিতবে না?
না, একেবারেই বলা যায় না। বরং আমি বলব, এই ঘটনাটি ছিল ভবিষ্যতের একটি “প্রাথমিক সংকেত”। আমরা এখন যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে এআই কেবল ভাষা অনুকরণ করছে না— পাঠকের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়াও বিশ্লেষণ করতে পারছে। সাহিত্য পুরস্কার কেবল ভাষার সৌন্দর্যের জন্য দেওয়া হয় না; সেখানে থাকে মানবিক অভিজ্ঞতার গভীরতা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট, এবং এক ধরনের “অন্তর্জাগতিক সত্য”। বহুদিন পর্যন্ত মনে করা হতো, এই জায়গায় এআই পৌঁছতে পারবে না। কিন্তু সমস্যা হলো—এআই নিজে অনুভব না করলেও, মানুষের লক্ষ-কোটি অনুভূতির ডেটা বিশ্লেষণ করে এমন এক ভাষা তৈরি করতে পারে, যা পাঠকের কাছে আবেগময় বলে মনে হয়। আজকের Generative AI ইতিমধ্যেই সিনেমার স্ক্রিপ্ট, কবিতা, সংগীত, বিজ্ঞাপনী গল্প লিখছে। আগামী দশ বছরে এমন উপন্যাস আসতে পারে, যার লেখক এআই—এবং পাঠক জানবেও না। তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। “ভালো লেখা” এবং “মহৎ সাহিত্য” এক জিনিস নয়। একটি এআই হয়তো নিখুঁত প্লট তৈরি করতে পারবে, কিন্তু মহৎ সাহিত্য অনেক সময় অসম্পূর্ণতা, নীরবতা, ব্যক্তিগত যন্ত্রণা ও সামাজিক বিদ্রোহ থেকে জন্ম নেয়। রবীন্দ্রনাথের “শেষের কবিতা” বা দস্তয়েভস্কির লেখাকে শুধু ভাষাগত কাঠামো দিয়ে বিচার করা যায় না। কিন্তু এটাও সত্যি, ভবিষ্যতের সাহিত্য হয়তো “মানুষ বনাম এআই” হবে না; বরং “মানুষ + এআই” সহযোগিতার সাহিত্য হবে। যেমন একজন পরিচালক ক্যামেরা ব্যবহার করেন, তেমনি একজন লেখক এআই-কে ব্যবহার করতে পারেন চরিত্র নির্মাণ, গবেষণা বা ভাষার বিকল্প খুঁজতে। একটি বাস্তব উদাহরণ বলি। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক কিছু প্রকাশনা সংস্থা পরীক্ষামূলকভাবে এআই-সহায়তায় লেখা ছোটগল্প blind review-তে পাঠিয়েছে। বিচারকদের বড় অংশ বুঝতেই পারেননি কোন লেখা আংশিকভাবে এআই-জেনারেটেড। এর মানে, এআই এখন সাহিত্যিক গুণমানের দরজায় কড়া নাড়ছে। সুতরাং, আগামীতে এআই কোনো বড় সাহিত্য পুরস্কার জিতবে না—এমন ভবিষ্যদ্বাণী করা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। বরং প্রশ্ন হবে—সেই সাহিত্য আমাদের মানুষ হিসেবে আরও গভীর করবে, নাকি শুধু দক্ষ অনুকরণ হয়ে থাকবে?
৩। এআই সাহিত্য শিল্পকে কতটা বৈচিত্র্যের সন্ধান দিতে পারে? যেখানে সারা বিশ্বে এআই-এর ব্যবহার ঊর্ধ্বমুখী?
এআই সাহিত্য ও শিল্পকে একই সঙ্গে অভূতপূর্ব বৈচিত্র্য এবং ভয়াবহ একঘেয়েমি—দুই দিকেই নিয়ে যেতে পারে। বিষয়টি নির্ভর করছে আমরা প্রযুক্তিটিকে কীভাবে ব্যবহার করছি তার উপর। ইতিবাচক দিকটি আগে বলি। আগে শিল্পচর্চা অনেকটাই নির্ভর করত অর্থনৈতিক সামর্থ্য, ভৌগোলিক সুযোগ ও ভাষাগত সীমাবদ্ধতার উপর। আজ একজন বাংলা ভাষার তরুণ কবি এআই-এর সাহায্যে নিজের কবিতাকে জাপানি বা স্প্যানিশে অনুবাদ করে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পারছেন। একজন লোকসংগীত শিল্পী এআই দিয়ে হারিয়ে যাওয়া বাদ্যযন্ত্রের সাউন্ড পুনর্গঠন করতে পারছেন। অর্থাৎ, এআই স্থানীয় সংস্কৃতিকে গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যেতে পারে। এআই-এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এটি বিচ্ছিন্ন জ্ঞানকে সংযোগ ঘটাতে পারে। ধরুন, একজন শিল্পী বাউল সংগীত ও আফ্রিকান রিদম মিলিয়ে নতুন এক গান তৈরি করতে চান। আগে এটি করতে বিশাল গবেষণা ও রিসোর্স লাগত। এখন এআই সেই চেষ্টাকে দ্রুততর করছে। কিন্তু অন্য দিকটাও গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ এআই মডেল প্রশিক্ষিত হচ্ছে ইন্টারনেটে সবচেয়ে বেশি উপস্থিত কনটেন্ট দিয়ে। ফলে জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে মানদণ্ড হয়ে উঠছে। এতে ছোট ভাষা, প্রান্তিক সংস্কৃতি বা বিকল্প শিল্পচর্চা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। কারণ অ্যালগরিদম সবসময় সংখ্যাগরিষ্ঠ প্যাটার্নকে বেশি গুরুত্ব দেয়। আমি একে বলি “ডিজিটাল ম্যাকডোনাল্ডাইজেশন অফ কালচার”—যেখানে সবকিছু দ্রুত, আকর্ষণীয়, কিন্তু অনেক সময় গভীরতাহীন হয়ে পড়ে। একটি বাস্তব উদাহরণ দিই। এখন অনেক মিউজিক প্ল্যাটফর্মে এআই এমন গান তৈরি করছে, যা জনপ্রিয় শিল্পীদের স্টাইল অনুকরণ করে। প্রথমে শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু ধীরে ধীরে শ্রোতা একই ধরনের আবেগ, একই ধরনের বিট, একই ধরনের কণ্ঠস্বর শুনতে শুনতে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য হারাতে পারে। তবে আমি আশাবাদী একটি জায়গায়—মানুষের মৌলিক কৌতূহল কখনও পুরোপুরি মরে না। এআই হয়তো নতুন দরজা খুলবে, কিন্তু সেই দরজার ভেতর দিয়ে কোন শিল্প প্রবেশ করবে, তা শেষ পর্যন্ত মানুষই নির্ধারণ করবে।
৪। চিকিৎসা ক্ষেত্রে, সামরিক ক্ষেত্রে এআই কতদূর বদল আনতে পারে?
চিকিৎসা ও সামরিক—এই দুই ক্ষেত্রেই এআই বিপ্লব ঘটাতে পারে। তবে একটি জীবন বাঁচানোর প্রযুক্তি, অন্যদিকে একই প্রযুক্তি জীবন ধ্বংসের অস্ত্রও হতে পারে। এটাই এআই-এর দ্বৈত চরিত্র। চিকিৎসা ক্ষেত্রে এআই-এর সম্ভাবনা সত্যিই বিস্ময়কর। বর্তমানে এআই এমন কিছু রোগ খুব প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে পারছে, যা অনেক সময় অভিজ্ঞ চিকিৎসকরাও প্রথম ধাপে ধরতে পারেন না। বিশেষ করে cancer imaging, retinal scan, cardiac anomaly detection-এর ক্ষেত্রে এআই অসাধারণ দক্ষতা দেখাচ্ছে। ধরুন, গ্রামের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই। সেখানে একটি এআই-ভিত্তিক diagnostic system রোগীর এক্স-রে বা রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঝুঁকি জানিয়ে দিতে পারে। এতে স্বাস্থ্যসেবার গণতন্ত্রীকরণ হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোভিড সময় আমরা দেখেছি, ড্রাগ ডিসকভারি থেকে শুরু করে infection modelling—সবখানেই এআই ব্যবহৃত হয়েছে। ভবিষ্যতে personalised medicine অর্থাৎ “প্রত্যেক মানুষের জিনগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আলাদা চিকিৎসা”—এআই-এর মাধ্যমে বাস্তব হতে পারে। কিন্তু সামরিক ক্ষেত্রে চিত্রটি অনেক বেশি জটিল ও উদ্বেগজনক। Autonomous weapon system বা AI-driven drone ইতিমধ্যেই যুদ্ধের চরিত্র বদলে দিচ্ছে। আগে যুদ্ধ মানে ছিল মানুষের মুখোমুখি সংঘর্ষ; এখন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে অ্যালগরিদম। একটি এআই সিস্টেম কয়েক সেকেন্ডে হাজার হাজার ডেটা বিশ্লেষণ করে টার্গেট নির্ধারণ করতে পারে। এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যদি একটি মেশিন ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, দায় নেবে কে? বিশ্বজুড়ে এখন “killer robots” নিয়ে নৈতিক বিতর্ক চলছে। কারণ ভবিষ্যতের যুদ্ধ হয়তো সৈনিকের নয়, অ্যালগরিদমের যুদ্ধ হবে। সাইবার যুদ্ধ, misinformation warfare, autonomous attack—এসব আগামী দিনের বাস্তবতা। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চিকিৎসা ও সামরিক—দুই ক্ষেত্রেই এআই-এর মূল শক্তি “ডেটা”। যার কাছে বেশি ডেটা, তার প্রযুক্তিগত ক্ষমতাও বেশি। ফলে ভবিষ্যতের ভূ-রাজনীতি অনেকটাই নির্ধারিত হবে AI supremacy দিয়ে।আমি মনে করি, মানবসভ্যতার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এআই-কে কতটা মানবিক নীতির মধ্যে রাখা যায়। প্রযুক্তি নিজে ভালো বা খারাপ নয়; এর ব্যবহারই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
৫। এই ডিজিটাল যুগে অনেক সময় দেখতে পাওয়া যায়, বিশেষত রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, প্রতিপক্ষকে হেনস্থা করার জন্য ভুয়ো ভিডিও ছাড়া হচ্ছে। জনমানসে এর প্রতিক্রিয়া মারাত্মক। ভাইরাল ভিডিও মুহূর্তে সমস্ত রাজনৈতিক পরিচয়কে ধুলিস্যাৎ করে দিতে পারে। কেননা, অধিকাংশ মিডিয়াই ভিডিওর সত্যতা যাচাই করে না। কিন্তু ভিডিও প্রচার করে। এতে অনেক মিথ্যে খবর রাজনৈতিক ভিত্তি টলিয়ে দিতে পারে। এর প্রতিকার কিছু আছে?
এটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক সংকটগুলোর একটি। আমরা এমন এক সময়ে পৌঁছেছি, যেখানে সত্যি-মিথ্যের ধারণাটিই ভেঙে পড়ছে। Deepfake প্রযুক্তি এত উন্নত হয়েছে যে একজন রাজনৈতিক নেতার কণ্ঠ, মুখভঙ্গি, এমনকি আবেগও নিখুঁতভাবে নকল করা সম্ভব। সমস্যা শুধু প্রযুক্তি নয়; সমস্যার বড় অংশ মানুষের মনস্তত্ত্ব। মানুষ এমন তথ্য দ্রুত বিশ্বাস করে, যা তার পূর্বধারণার সঙ্গে মিলে যায়। ফলে একটি ভুয়ো ভিডিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লক্ষ লক্ষ মানুষের রাজনৈতিক মনোভাব প্রভাবিত করতে পারে। প্রতিকার অবশ্যই আছে, কিন্তু তা বহুস্তরীয়। প্রথমত, প্রযুক্তিগত প্রতিকার। এখন AI-based deepfake detection system তৈরি হচ্ছে, যা ভিডিওর pixel inconsistency, audio waveform, facial movement analysis দেখে বুঝতে পারে ভিডিওটি কৃত্রিম কি না। ভবিষ্যতে সংবাদমাধ্যমে বাধ্যতামূলক verification pipeline থাকা উচিত। দ্বিতীয়ত, আইনি কাঠামো। Deepfake রাজনৈতিক প্রচারকে অনেক দেশে নির্বাচনী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হয়েছে। কারণ এটি সরাসরি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আঘাত করে। তৃতীয়ত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—ডিজিটাল সাক্ষরতা। মানুষকে শেখাতে হবে, ভাইরাল হলেই সত্যি হয় না। আজকের পৃথিবীতে মিডিয়া literacy আর বিলাসিতা নয়; এটি নাগরিক দক্ষতা। একটি বাস্তব ঘটনা বলি। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় একটি deepfake ভিডিও ছড়ানো হয়েছিল, যেখানে প্রেসিডেন্টকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানাতে দেখা যায়। ভিডিওটি অল্প সময়ের জন্য হলেও বিভ্রান্তি তৈরি করেছিল। ভবিষ্যতে এই ধরনের আক্রমণ আরও সূক্ষ্ম হবে। আমি মনে করি, আগামী কয়েক বছরে সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সম্পদ হবে “বিশ্বাসযোগ্যতা”। যে মিডিয়া দ্রুত নয়, সঠিক তথ্য দেবে—শেষ পর্যন্ত মানুষ তার কাছেই ফিরবে। কারণ এআই-এর যুগে তথ্যের অভাব হবে না; অভাব হবে সত্যের।
৬। ডিজিটাল ডাটা প্রোটেকশন অ্যাক্ট নিয়ে একটুবিশদে জানতে চাই।
ডিজিটাল ডাটা প্রোটেকশন অ্যাক্ট মূলত নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যকে সুরক্ষিত রাখার জন্য তৈরি একটি আইনগত কাঠামো। সহজভাবে বললে—আপনার ফোন নম্বর, আধার তথ্য, ব্যাংকিং ডেটা, লোকেশন, সার্চ হিস্ট্রি, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য—এসব কে কীভাবে ব্যবহার করবে, তার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলি আমাদের আচরণ, পছন্দ, সম্পর্ক, অর্থনৈতিক অবস্থা—সবকিছু বিশ্লেষণ করে ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—মানুষ কি নিজের ডেটার মালিক, নাকি কোম্পানিগুলি? এই আইনের মূল দর্শন হলো consent বা সম্মতি। অর্থাৎ, কোনও সংস্থা আপনার তথ্য সংগ্রহ বা ব্যবহার করার আগে আপনাকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে কেন সেই তথ্য নেওয়া হচ্ছে। নাগরিকের অধিকার থাকবে নিজের তথ্য মুছে ফেলার আবেদন করারও। আর, যে সংস্থা আপনার ডেটা ব্যবহার করছে, তার উপর বিশ্বাসভিত্তিক দায়িত্ব বর্তায়। তারা ইচ্ছেমতো তথ্য ব্যবহার করতে পারবে না। তবে সমালোচনাও আছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, আইনে সরকারি সংস্থার জন্য কিছু ছাড় রাখা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে নজরদারির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আবার সাধারণ মানুষ অনেক সময় না বুঝেই Terms & Conditions-এ সম্মতি দিয়ে দেয়। ফলে আইন থাকলেও সচেতনতার অভাব বড় সমস্যা। একটি সাধারণ উদাহরণ দিই। ধরুন, আপনি একটি মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করলেন। সেটি যদি আপনার contact list, microphone, location—সবকিছুর access চায়, তাহলে আপনার জানার অধিকার আছে কেন এগুলো প্রয়োজন। ডাটা প্রোটেকশন আইন সেই অধিকারকে আইনি শক্তি দেয়। ভবিষ্যতে AI economy যত বাড়বে, data protection তত গুরুত্বপূর্ণ হবে। কারণ এআই-এর খাদ্যই হলো ডেটা। যে সমাজ ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারবে না, সে সমাজ প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হলেও নাগরিক স্বাধীনতা হারাতে পারে।
৭। রক্ত মাংসের মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম, হতাশা, মৃত্যুভয়, সাংগীতিক বোধ—সবকিছুর নিয়ন্ত্রক বা শিক্ষক কি আগামী দিনে হতে পারে এআই?
এআই মানুষের আবেগকে বুঝতে, বিশ্লেষণ করতে, এমনকি প্রভাবিত করতে পারবে—এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু অনুভব আর অনুকরণ—এই দুইয়ের পার্থক্য আমাদের ভুললে চলবে না। আজকের এআই আপনার কণ্ঠস্বর, লেখার ধরন, মুখের অভিব্যক্তি বিশ্লেষণ করে অনুমান করতে পারে আপনি দুঃখিত কি না। Music recommendation system বুঝতে পারে আপনি বিষণ্ণ সময়ে কেমন গান শুনতে চান। Mental health chatbot অনেক মানুষের একাকীত্ব কমাতেও সাহায্য করছে। কিন্তু এআই-এর নিজের কোনও অস্তিত্বগত ভয় নেই। সে মৃত্যুকে তথ্য হিসেবে জানে, মানুষ যেভাবে অনুভব করে সেভাবে নয়। একজন মা সন্তানের জন্য যে উদ্বেগ অনুভব করে, একজন কবি বিচ্ছেদের রাতে যে শূন্যতা অনুভব করেন—এআই তা করতে পারে না। তবে বিপদ অন্য জায়গায়। মানুষ ধীরে ধীরে emotional dependency তৈরি করতে পারে। যদি ভবিষ্যতে কেউ মানুষের বদলে এআই-এর কাছেই সম্পর্ক, পরামর্শ, ভালোবাসা, স্বীকৃতি খুঁজতে শুরু করে, তাহলে সামাজিক কাঠামো বদলে যেতে পারে। জাপানে ইতিমধ্যেই এমন মানুষ আছেন, যারা AI companion-এর সঙ্গে মানসিক সম্পর্ক তৈরি করেছেন। পশ্চিমে কিছু AI chatbot ব্যবহারকারী emotional attachment-এর কারণে মনস্তাত্ত্বিক সমস্যায়ও পড়েছেন। অর্থাৎ, এআই মানুষের আবেগের “প্রতিফলন” হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু আমি এখনও বিশ্বাস করি, মানুষের চেতনার মধ্যে এমন কিছু আছে যা purely computational নয়। একটি গান শুনে হঠাৎ শৈশবের স্মৃতি ফিরে আসা, প্রিয়জনের মৃত্যুর পর নীরবতার ভার, কিংবা কোনও কবিতায় নিজের জীবনকে খুঁজে পাওয়া—এসব কেবল ডেটা প্রসেসিং নয়; এগুলো অস্তিত্বের অভিজ্ঞতা। এআই হয়তো শিক্ষক হতে পারে, সহকারী হতে পারে, এমনকি থেরাপিউটিক সঙ্গীও হতে পারে। কিন্তু মানুষের আত্মার পূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠতে পারবে কি না—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও মানবসভ্যতা জানে না। আমার তো মনে হয়, সম্ভবত, মানুষ শেষ পর্যন্ত মানুষকেই খুঁজবে।
৮। কর্পোরেট সংস্থা যত ব্যবহার করবে এআই-কে, ততই বেকারত্ব বাড়বে। কী মনে করেন?
এই প্রশ্নটা এখন পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশের মানুষের মনের ভেতরে নীরবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কারখানার শ্রমিক থেকে শুরু করে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক, গ্রাফিক ডিজাইনার—সবার মধ্যেই একটা অদৃশ্য আশঙ্কা কাজ করছে: “আমার জায়গাটা কি একদিন মেশিন নিয়ে নেবে?” আমি বিষয়টাকে একটু অন্যভাবে দেখি। প্রযুক্তির ইতিহাস বলছে, নতুন প্রযুক্তি পুরোনো কিছু কাজ কেড়ে নেয় ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের কাজও তৈরি করে। যখন এটিএম মেশিন এল, অনেকে বলেছিলেন ব্যাংককর্মীদের চাকরি শেষ। বাস্তবে কী হল? ব্যাংকিং আরও বিস্তৃত হল, নতুন ধরনের ফিনান্সিয়াল সার্ভিস তৈরি হল। ইন্টারনেট আসার পর অনেক কাজ কমেছে, কিন্তু ডিজিটাল মার্কেটিং, সাইবার সিকিউরিটি, অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট—অসংখ্য নতুন পেশা তৈরি হয়েছে। এআই-ও ঠিক তাই করবে। তবে পার্থক্য হলো—এবার পরিবর্তনের গতি অনেক বেশি। যে কাজগুলো repetitive, rule-based, predictable—যেমন basic data entry, routine customer support, simple content generation—এসব জায়গায় এআই দ্রুত মানুষের জায়গা নেবে। ইতিমধ্যেই বহু বহুজাতিক সংস্থা AI chatbot ব্যবহার করে হাজার হাজার customer query সামলাচ্ছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে “মানুষ অপ্রয়োজনীয়” হয়ে যাবে। বরং যে মানুষ AI-এর সঙ্গে কাজ করতে শিখবে, তার মূল্য আরও বাড়বে। আগামী পৃথিবীতে সবচেয়ে মূল্যবান হবে তিনটি জিনিস— প্রথমত, creativity। দ্বিতীয়ত, critical thinking। তৃতীয়ত, emotional intelligence। কারণ এআই তথ্য দিতে পারে, কিন্তু মানুষের মতো সম্পর্ক গড়তে পারে না। একজন দক্ষ শিক্ষক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সৃজনশীল পরিচালক, গবেষক, গল্পকার—এদের জায়গা এত সহজে মেশিন নিতে পারবে না। একটি বাস্তব উদাহরণ বলি। কয়েক বছর আগে অনেক কোম্পানি ভাবছিল AI দিয়ে পুরো customer service চালাবে। পরে দেখা গেল, জটিল বা আবেগপ্রবণ সমস্যায় মানুষ এখনও মানুষের সঙ্গই চায়। ফলে hybrid model এসেছে—AI প্রাথমিক কাজ করছে, আর মানুষ জটিল অংশ সামলাচ্ছে। আমার মতে, সবচেয়ে বড় সংকট “বেকারত্ব” নয়; সবচেয়ে বড় সংকট “skill transition”। যে সমাজ দ্রুত মানুষকে re-skill করতে পারবে, সেই সমাজ টিকে থাকবে। আর যে সমাজ শুধু ভয় পাবে, কিন্তু শিক্ষা বদলাবে না, সে পিছিয়ে পড়বে। এআই চাকরি নেবে—এটা আংশিক সত্যি। কিন্তু আরও বড় সত্যি হলো, এআই নতুন ক্ষমতার অর্থনীতি তৈরি করবে। প্রশ্ন হচ্ছে—আমরা কি নিজেদের সেই নতুন পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত করছি?
৯। এআই ভারতীয় অর্থনীতিকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে?
ভারত এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে এআই তার জন্য একই সঙ্গে বিরাট সুযোগ এবং বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা যদি ঠান্ডা মাথায় দেখি, ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি দুটি— এক, বিপুল তরুণ জনসংখ্যা। দুই, বিশাল ডিজিটাল ডেটা ইকোসিস্টেম। UPI, Aadhaar, ডিজিটাল পেমেন্ট, মোবাইল ইন্টারনেট—এই পুরো অবকাঠামো ভারতকে এমন একটি অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে AI-driven economy গড়ে তোলার বাস্তব সম্ভাবনা আছে। কৃষিক্ষেত্রে AI crop prediction করতে পারে। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে remote diagnosis করতে পারে। ছোট ব্যবসায় AI-based automation productivity বাড়াতে পারে। আদালতে document analysis থেকে traffic management—সবখানেই এর ব্যবহার সম্ভব। ধরুন, একজন ছোট চাষি আগে আবহাওয়া, মাটির অবস্থা বা বাজারদর সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পেতেন না। এখন AI-driven agricultural platform তাকে বলে দিতে পারে কোন ফসল কখন লাগানো উচিত, কোথায় রোগের সম্ভাবনা আছে। এর অর্থনৈতিক প্রভাব বিশাল। ভারতের BPO industry-ও বদলাবে। আগে আমরা “cheap labour economy” হিসেবে পরিচিত ছিলাম। এখন AI adoption-এর মাধ্যমে “knowledge economy”-তে রূপান্তর হওয়ার সুযোগ এসেছে। তবে বিপদও আছে। ভারতের workforce-এর বড় অংশ low-skill repetitive job-এর উপর নির্ভরশীল। যদি skill development দ্রুত না হয়, তাহলে automation বহু মানুষকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ফেলতে পারে। আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো data sovereignty। ভারতীয় নাগরিকদের ডেটা যদি বিদেশি কর্পোরেশনের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে ভবিষ্যতের AI economy-র মুনাফাও বাইরে চলে যেতে পারে। আমি মনে করি, ভারত যদি স্থানীয় ভাষাভিত্তিক AI, education reform এবং ethical AI governance-এর উপর জোর দেয়, তাহলে আগামী ২০ বছরে ভারত AI superpower হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রাখে। কারণ ভবিষ্যতের অর্থনীতি শুধু পেট্রোলিয়াম দিয়ে চলবে না; চলবে data, algorithm এবং human adaptability দিয়ে।
১০। ছাত্রছাত্রীরা কীভাবে এআই নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা করতে পারে?
আজকের দিনে AI শেখা মানে শুধু programming শেখা নয়; বরং “সমস্যা সমাধানের নতুন ভাষা” শেখা। অনেক ছাত্রছাত্রী মনে করে, AI মানেই অত্যন্ত কঠিন গণিত বা জটিল কোডিং। বাস্তবে বিষয়টি ধাপে ধাপে শেখা যায়। প্রথম স্তরে দরকার foundational understanding— AI কী? Machine Learning কীভাবে কাজ করে? Data কীভাবে decision তৈরি করে? এরপর আসে mathematics—বিশেষ করে statistics, probability, linear algebra। কারণ AI-এর ভিত আসলে গণিতের উপর দাঁড়িয়ে। Programming language হিসেবে Python এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অধিকাংশ AI framework—TensorFlow, PyTorch, Scikit-learn—Python-based। কিন্তু আমি ছাত্রছাত্রীদের একটা কথা সবসময় বলি— “শুধু কোডার হলে হবে না; problem thinker হতে হবে।” কারণ ভবিষ্যতের AI engineer শুধু software বানাবে না; তাকে বুঝতে হবে মানুষের আচরণ, অর্থনীতি, ভাষা, নৈতিকতা—সবকিছু। এখন ভারতের বহু IIT, IIIT, private university AI specialization শুরু করেছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকেও বিশ্বমানের কোর্স করা যায়। একটি বাস্তব উদাহরণ দিই। আমি এমন বহু ছাত্রকে দেখেছি, যারা ছোট শহর থেকে শুধুমাত্র online learning-এর মাধ্যমে AI model তৈরি করে আন্তর্জাতিক hackathon জিতেছে। অর্থাৎ, এখন geographical limitation অনেকটাই কমে গেছে। তবে আমি একটা জিনিস খুব গুরুত্ব দিয়ে বলব— AI শেখার পাশাপাশি philosophy এবং ethics-ও শেখা জরুরি। কারণ আপনি যদি এমন AI তৈরি করেন, যা technically brilliant কিন্তু socially harmful—তাহলে সেটি সভ্যতার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ভবিষ্যতের সেরা AI professional হবে সেই মানুষ, যার মধ্যে engineer-এর যুক্তি এবং মানবিক বোধ—দুটোই থাকবে।
১১। এবার অন্য প্রসঙ্গে আসি। সাম্প্রতিক কালে আমরা দেখি, একাকীত্ব এমন একটা প্রধান নাগরিক সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যা বহু আত্মহত্যার কারণ। একজন গল্পকার এবং প্রযুক্তিবিদ হিসেবে কীভাবে দেখছেন এই সমস্যাকে?
আমার মনে হয়, আধুনিক শহর মানুষকে যতটা connected করেছে, তার চেয়ে বেশি disconnected করেছে। আজ আমরা সারাক্ষণ অনলাইন, কিন্তু ভীষণভাবে একা। আগে মানুষের জীবন ছোট ছোট সম্পর্কের উপর দাঁড়িয়ে ছিল—পাড়ার চায়ের দোকান, বিকেলের আড্ডা, হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়া, ছাদের উপর গল্প। এখন মানুষ একই ফ্ল্যাটে বছরের পর বছর থাকে, অথচ পাশের মানুষের নামও জানে না। এই বিচ্ছিন্নতার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—এটা ধীরে ধীরে মানুষের মানসিক স্থিতি ভেঙে দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখছি, একাকীত্ব শুধু বিষণ্নতা নয়, বহু আত্মহত্যারও একটি বড় কারণ হয়ে উঠছে। কারণ মানুষ যখন দীর্ঘ সময় ধরে অনুভব করে যে তাকে কেউ বুঝছে না, তার কথা শোনার কেউ নেই, তখন তার ভিতরে এক ধরনের নীরব শূন্যতা তৈরি হয়। সেই শূন্যতা অনেক সময় এতটাই গভীর হয় যে মানুষ নিজের অস্তিত্বকেই অর্থহীন মনে করতে শুরু করে। তবে কি জানেন, আমার মনে হয়, আত্মহত্যা অনেক ক্ষেত্রেই মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা নয়; বরং অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণা থেকে পালানোর এক মরিয়া চেষ্টা। প্রযুক্তি এখানে একটা paradox তৈরি করেছে। আপনি হাজার মানুষের সঙ্গে digitally connected, কিন্তু গভীরভাবে কারও সঙ্গে emotionally connected নন। social media-তে আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের “ভালো থাকা”-র সংস্করণ দেখাই, কিন্তু নিজের ভাঙন, ভয়, হতাশা বা নিঃসঙ্গতার কথা খুব কমই বলি। ফলে চারপাশে সবাইকে সুখী মনে হয়, আর মানুষ নিজের কষ্টকে আরও একা হয়ে বহন করে। আমি অনেক সময় দেখি, মানুষ গভীর রাতে social media scroll করছে, শুধু এই জন্য যে নীরবতা তাকে ভয় দেখাচ্ছে। কারণ একা ঘরে মানুষ নিজের সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে যায়। একাকীত্ব আসলে শুধু “একা থাকা” নয়। একাকীত্ব হলো—নিজের ভেতরের কথাগুলো কাউকে বলতে না পারা। এমন একজন মানুষও ভীষণ একা হতে পারেন, যিনি প্রতিদিন শত মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। কারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কেবল communication নয়, emotional recognition—কেউ তাকে সত্যিই শুনুক, বুঝুক, অনুভব করুক। এআই ভবিষ্যতে companionship technology তৈরি করবে—AI friend, AI therapist, AI listener। এগুলো কিছু ক্ষেত্রে সাহায্যও করবে। বিশেষ করে এমন মানুষদের জন্য, যারা দীর্ঘদিন ধরে isolation-এর মধ্যে আছেন, তাদের কাছে অন্তত একটা responsive presence থাকবে। কিন্তু একটা সীমার পর মানুষ বুঝতে পারবে, programmed empathy আর বাস্তব মানবিক স্পর্শ এক নয়। একটি মেশিন আপনাকে উত্তর দিতে পারে, কিন্তু আপনার নীরবতার ওজন অনুভব করতে পারে না। একটি গল্প বলি। জাপানে এক বৃদ্ধ মানুষ প্রতিদিন একটি রোবটের সঙ্গে কথা বলতেন। সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আপনি কি এটাকে সত্যিই বন্ধু মনে করেন?” তিনি বলেছিলেন, “না। কিন্তু অন্তত এটা আমাকে interrupt করে না।” এই উত্তরটার মধ্যে আধুনিক সভ্যতার এক গভীর ক্লান্তি আছে। মানুষ আজ শুধু কথা বলতে চায় না, মানুষ চায়—বিনা বিচারে কেউ তাকে শুনুক। আমার মনে হয়, ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় মানসিক স্বাস্থ্য আন্দোলন হবে—মানুষকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনা। পরিবার, বন্ধুত্ব, প্রতিবেশ, community—এই জিনিসগুলোকে নতুন করে তৈরি করা। কারণ প্রযুক্তি যোগাযোগ দিতে পারে, কিন্তু সম্পর্ক তৈরি করতে পারে না। আর যেখানে সম্পর্ক ভেঙে যায়, সেখানে একাকীত্ব জন্ম নেয়; আর দীর্ঘস্থায়ী একাকীত্ব অনেক সময় মানুষকে আত্মবিনাশের দিকেও ঠেলে দেয়। তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় উপায় শুধু counselling বা medicine নয়, বরং এমন এক সমাজ তৈরি করা যেখানে মানুষ নির্ভয়ে বলতে পারে—“আমি ভালো নেই”—এবং তার উত্তরে কেউ সত্যিই পাশে এসে দাঁড়ায়।
১২। চা নিয়ে একটি নিবন্ধে, প্রায় এরকম বলছেন যে— চায়ের মধ্যে একটা নরম বিষণ্ণতা আছে। আপনার মতে, যারা খুব একা থাকে, তারা বিষয়টা বোঝে। একাকীত্ব কীভাবে এই চায়ের নরম বিষন্নতার সঙ্গে জড়িত? বিশদে এর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা শুনতে চাই।
চায়ের কাপের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে বোঝা যায়, পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃশব্দ সঙ্গগুলোর একটি হলো চা। চা কখনও হৈচৈয়ের পানীয় নয়। কফির মধ্যে শহুরে তাড়াহুড়ো আছে, মদের মধ্যে বিস্মৃতি আছে—কিন্তু চায়ের মধ্যে আছে অপেক্ষা। যারা খুব একা থাকে, তারা জানে সন্ধের পর একটা ধোঁয়া ওঠা কাপ কতখানি মানুষের অভাব ঢেকে রাখে। মনস্তত্ত্বের ভাষায় বললে, মানুষ যখন emotionally overwhelmed হয়, তখন সে ritual খোঁজে। ছোট ছোট পুনরাবৃত্ত আচরণ—যেমন চা বানানো, ধীরে ধীরে চুমুক দেওয়া—মস্তিষ্ককে temporary emotional stability দেয়। একে অনেক মনোবিজ্ঞানী self-soothing behaviour বলেন। কিন্তু আমার মনে হয়, বিষয়টা শুধু বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বৃষ্টির দিনে জানলার ধারে বসে যে মানুষ চা খায়, সে আসলে চা খায় না—সে নিজের ভেতরের নীরবতার সঙ্গে কথা বলে। চায়ের মধ্যে একটা অদ্ভুত ধীরতা আছে। সেই ধীরতা মানুষকে স্মৃতির দিকে নিয়ে যায়। পুরনো প্রেম, হারিয়ে যাওয়া মানুষ, না-পাওয়া জীবন—এসব চায়ের ধোঁয়ার সঙ্গে ধীরে ধীরে উঠে আসে। আমি বহু একা মানুষকে দেখেছি, যারা কথা বলতে পারে না, কিন্তু চায়ের কাপ সামনে রাখলে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে বসে থাকতে পারে। কারণ চা মানুষকে judge করে না। ঠিক মনে নেই, কে যেন বলেছিলেন, “মানুষ ছেড়ে চলে গেলে ঘরে যে নীরবতা পড়ে থাকে, চা সেই নীরবতাকে একটু উষ্ণ রাখে।” এই কথাটার মধ্যেই চায়ের নরম বিষণ্ণতা আছে।
১৩। আপনি চলচ্চিত্র প্রেমী মানুষ। ভারতের জাতীয় স্তরে এই মুহূর্তে বাংলা সিনেমা অভিনয়, প্লট, পরিচালনা, এডিটিং এবং প্রযুক্তিগত অন্যান্য বিষয় নিয়ে ঠিক কোন অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করেন?
বাংলা সিনেমা আজ এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে আমাদের ঐতিহ্য অসাধারণ—সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন—এই নামগুলো শুধু বাংলা নয়, বিশ্ব চলচ্চিত্রের ভাষা বদলে দিয়েছে। অন্যদিকে বর্তমান বাজার বাস্তবতা বাংলা সিনেমাকে ক্রমশ কঠিন লড়াইয়ের মধ্যে ফেলেছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, অভিনয়ের জায়গায় বাংলা সিনেমা এখনও ভারতের অন্যতম শক্তিশালী শিল্পভাষা। বাংলা অভিনেতারা এখনও চরিত্রের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। আমাদের অভিনয়ের মধ্যে theatrical loudness তুলনামূলক কম; একটা সাহিত্যিক সংযম আছে। প্লট ও screenplay-এর ক্ষেত্রেও বাংলা এখনও অনেক সময় সাহসী। ছোট সম্পর্ক, মানসিক ভাঙন, মধ্যবিত্তের নিঃসঙ্গতা—এসব সূক্ষ্ম বিষয় বাংলা সিনেমা এখনও ভালোভাবে ধরতে পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে scale এবং technology integration-এ। আজকের দর্শক Netflix, Korean cinema, Hollywood-এর visual grammar-এর সঙ্গে অভ্যস্ত। ফলে শুধু ভালো গল্প বললেই হবে না; cinematic experience-ও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক বাংলা সিনেমায় এখনও sound design, colour grading, VFX integration,—এই জায়গাগুলো দুর্বল থাকে। আবার funding limitation বড় সমস্যা। তবে আশার জায়গাও আছে। নতুন প্রজন্মের কিছু পরিচালক এখন global storytelling language বুঝছেন। OTT platform বাংলা content-কে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে নিয়ে যাচ্ছে। আমি মনে করি, বাংলা সিনেমার ভবিষ্যৎ “কম বাজেটে গভীর গল্প” নয়; বরং “গভীর গল্প + বিশ্বমানের execution”-এ। কারণ সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা শুধু সাহিত্য ছিল না; technically-ও extraordinary ছিল। বাংলা সিনেমাকে আবার সাহসী হতে হবে। নকল নয়, নিজস্বতা দিয়েই তাকে ফিরতে হবে। কারণ পৃথিবী শেষ পর্যন্ত authentic গল্পই মনে রাখে।
১৪। আন্তর্জাতিক কোন ব্যক্তিত্ব আপনাকে মানসিক ভাবে প্রাণিত করে। কীভাবে?
অনেকেই হয়তো ভাববেন আমি কোনও বিজ্ঞানীর নাম বলব, কোনও প্রযুক্তি উদ্যোক্তার নাম বলব। কিন্তু সত্যি বলতে কি— আমাকে গভীরভাবে প্রাণিত করেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। কারণ তিনি শুধু একজন ফুটবলার নন; তিনি শৃঙ্খলার এক জীবন্ত প্রতীক। দারিদ্র্য থেকে উঠে আসা এক কিশোর, যার কাছে প্রতিভা ছিল—কিন্তু প্রতিভার থেকেও বড় ছিল তার relentless discipline। পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ প্রতিভাবান হয়; কিন্তু খুব কম মানুষ প্রতিদিন নিজের সীমাকে ভাঙার জন্য একই রকম ক্ষুধা ধরে রাখতে পারে। রোনাল্ডো আমাকে একটা জিনিস শিখিয়েছেন— Success is a habit before it becomes a headline. মানুষ শুধু তার গোল দেখে। কিন্তু তার পিছনের হাজার ভোর, হাজার অনুশীলন, হাজার আত্মত্যাগ—সেগুলো দেখে না। আমি প্রযুক্তির মানুষ। AI, automation, data—এসব নিয়ে কাজ করি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি বিশ্বাস করি, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি এখনও তার willpower। রোনাল্ডো বয়সকে অস্বীকার করেননি; তিনি বয়সের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। পৃথিবী যখন বলেছে “শেষ”, তিনি তখনও নিজের শরীর, মন, দক্ষতাকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন। একবার একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “Talent without work means nothing.” এই একটি কথা শুধু খেলাধুলার জন্য নয়; গবেষণা, সাহিত্য, প্রযুক্তি—জীবনের সব ক্ষেত্রের জন্য সত্যি। আর একটা বিষয় আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়— বিশ্বের কোটি মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার পরও, তিনি মাঠে নামেন যেন এখনও নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। এই ক্ষুধা, এই অসম্ভব আত্মনিয়ন্ত্রণ, এই একাকী লড়াই—আমাকে অনুপ্রাণিত করে। কারণ জীবনের শেষ পর্যন্ত মানুষ আসলে নিজের সঙ্গেই প্রতিযোগিতা করে। আর সেই প্রতিযোগিতায় জিততে গেলে প্রতিভার থেকেও বেশি দরকার চরিত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *