‘বাকি ইতিহাস’ : নারী পুরুষের সম্পর্ক ও সময়কে নতুনভাবে চেনায়
গত শনিবার ১৬ মে,২০২৬-এ গিরিশ (কলকাতা, বাগবাজার) মঞ্চে হয়ে গেল নোটো থিয়েটার ট্রুপের প্রযোজনায় বাদল সরকারের ‘বাকি ইতিহাস’ ।
গভীর নিরীক্ষামূলক এই নাটক মানুষের অবচেতনের অন্ধকারকে তুলে ধরে।পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনের সুখ -দুঃখ ছাড়িয়ে সময় , মানবিকতা, বিশ্বরাজনীতি সম্পর্কে সচেতন করে। তুলে ধরে মানুষের দায়বদ্ধতার কথাও।
এই নাটকে অভিনয়ে করেছেন—
সীতানাথ— অমর চট্টোপাধ্যায়, কণা— ময়ূরী মিত্র, শরদিন্দু— পল্লব চক্রবর্তী, বাসন্তী— রত্না নাথ,
বিজয়— শুভজিৎ সোম। বাসুদেব (শরদিন্দুর বন্ধু)— বিশ্বজিত মাইতি, কোর্ট পেয়াদা— দীপান্বিতা ঘোষ, কণার বাবা— মানস সাহা স্কুল সেক্রেটারি আলো ম্যাডাম— সুপর্ণা সোম।
আবহ ও মঞ্চ— অমর চট্টোপাধ্যায়, পোশাক— ময়ূরী মিত্র। নির্দেশনা— অমর চট্টোপাধ্যায় ও ময়ূরী মিত্র।
আগ্রহী, সচেতন নাট্যপ্রেমী মানুষ বাদল সরকারের ‘বাকি ইতিহাস’-এর মূল বিষয় সম্পর্কে সচেতন। তাই আর নতুন করে এর প্লট নিয়ে আলোচনায় যাচ্ছি না।
নাটকের আঙ্গিক,উপস্থাপনা ও অভিনয় নিয়ে যে দু’ কথা বলার—
১/ যে সময়ে এই নাটক বাদল সরকার লিখেছেন, তার পর থেকে বহু ঘটনা পৃথিবীতে ঘটে গেছে। পাল্টে গেছে নাটকের দর্শক। মঞ্চে নাটকের দৈর্ঘ্য একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আত্মহত্যার প্লট সাজাতে গিয়ে প্রথম যে ভাবে কারণ সাজানো হয়, সেই চারিত্রিক অবস্থানগুলো ততটা স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি।বরং দ্বিতীয় গল্প অনেক স্পষ্ট এবং পুরুষের অবচেতনকে ভীষণ ভাবে আলোকিত করে। বয়সের পার্থক্য থাকা সত্বেও নারী-পুরুষের সম্পর্কের যৌন জটিলতা সবটাই স্মৃতি এবং বর্তমানের দ্বন্দ্ব, স্বাভাবিকতা এবং মানসিক অসুখের ভিন্নতা নিয়ে গভীর যুক্তিপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। মানবমনের স্বাভাবিকতাকে নতুন ভাবে সংজ্ঞায়িত করার দিকে এগোয় এই নাটক। এই দিকটাকে অনেক বেশি করে গুরুত্ব দিয়ে নাটকের দৈর্ঘ্য অনেক কমানো যেত।
২/ বিশ্ববিক্ষার যে দিকেই গল্পে এগোতে চেয়েছে, তাতে বিশ্ব রাজনীতি যে ভাবে সাধারণ মানুষের জীবন, যাপনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে সেগুলো শুধু নামমাত্র উল্লেখ না করে, বরং আরও গভীরে গিয়ে সেই তথ্যের নাটকীয় প্রয়োগ আরও অনেক সময় উপযোগী করতে পারত এই নাটককে।
৩/ অভিনয়ে অমর চট্টোপাধ্যায়, ময়ূরী মিত্র সাবলীল। কিন্তু বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যে দু’জনেরই আরও সংবেদনশীল হওয়ার সুযোগ ছিল। মনস্তাত্বিক নাটকে অভিনয় একটা বড় ভূমিকা রাখে। ফলে মুখ্যচরিত্রদের সামনে অনেকটা সুযোগ রয়ে গেল। দায়িত্বও। কারণ মূলত তাদের অভিনয়ের ওপরেই নাটকের মূল ভাবনা দাঁড়িয়ে রয়েছে। এ বিষয়ে তারা আরো যত্নবান হবেন, এই প্রত্যাশা।
৪/ বিশ্বজিৎ মাইতির সাবলীল অভিনয় এই নাটকে বড় প্রাপ্তি।
৫/আবহ, মঞ্চ, পোশাক আলাদা করে প্রশংসার দাবি রাখে।
পরিশেষে এটাই বলার, শতবর্ষে এই নাটক বাদল সরকারের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য,হয়তো সেই কারণেই আমূল পরিবর্তনের সুযোগ থাকলেও নির্দেশকদ্বয় মূল কাঠামোকে পরিবর্তন করেননি।হয়তো। কিন্ত এই সময়ের নিরিখে মূল বিষয়কে অক্ষুণ্ন রেখে নাটককে নতুন আঙ্গিক দিলে তা এই নাটকের প্রতি সুবিচারই হতো।
বাসব মৈত্র