শনিবার | ১৬ মে ২০২৬

তরমুজ নিয়ে ভয়— সত্যি না গুজব?

 তরমুজ নিয়ে ভয়— সত্যি না গুজব?

এই গরমে ছোটো থেকে বড় প্রায় প্রত্যেকেরই তরমুজ প্রিয়, তা বলাই যায়। তবে সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়া ও সংবাদমাধ্যমে একটি খবর মানুষের মনে আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। মুম্বাইতে এক পরিবারের কয়েকজন মানুষ এই তরমুজ খেয়েই অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্দেহ করা হচ্ছে তারা তরমুজ খাওয়ার পর ফুড পয়জনিং বা খাদ্যে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। এই খবর অনেকের মধ্যেই যেমন আতঙ্ক তৈরি করেছে, তেমনই বাবা-মায়েরা ভাবছেন, তাহলে কি তরমুজ খাওয়ানো বিপজ্জনক? এই বিষয়ে আলোকপাত করেছেন বিশিষ্ট শিশুবিশেষজ্ঞ ডাঃ অর্পণ সাহা। তার সঙ্গে কথা বলেছেন আনন্দিতা সরকার

কোন জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে মানুষ ভয় পাচ্ছেন?
এই ধরনের ঘটনার পর সাধারণত কয়েকটি বিষয় ঘটে থাকে। অসম্পূর্ণ তথ্য ভাইরাল হয়, যেমন— ‘chemical injection’, ‘poison fruit’— এমন কথা ছড়ায়। এসব শোনার পর স্বভাবতই মানুষ আতঙ্কিত হয়ে সম্পূর্ণ দোষ খাবারের ওপর টেনে আনে।

বাস্তবতা তাহলে কী?
তরমুজ একটি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর ফল, যদি সঠিকভাবে খাওয়া হয়।

তরমুজের মতো ফল কি সত্যিই বিপজ্জনক হতে পারে?
হ্যাঁ— কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ঝুঁকি থাকতে পারে। যেমন— কাটা তরমুজ দীর্ঘক্ষণ বাইরে রাখা হলে, নোংরা ছুরি/হাতে কাটা হলে, রাস্তার ধারে আগে থেকে কাটা ফল খেলে, ঠিকভাবে ধোয়া না হলে— এসব ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু (যেমন Salmonella, Escherichia coli) ঢুকে খাদ্যে বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে।

নিরাপদে তরমুজ খাওয়ার সহজ নিয়ম কী?
কাটার আগে বাইরের খোসা ভালো করে ধুয়ে নিন। পরিষ্কার ছুরি ও হাত ব্যবহার করতে হবে। কাটা তরমুজ ২–৩ ঘণ্টার বেশি বাইরে রাখা যাবে না। ফ্রিজে সংরক্ষণ করুন। রাস্তার কাটা ফল এড়িয়ে চলুন— বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্য।

ছোটোদের ক্ষেত্রে কী করণীয়?
সবসময় টাটকা ফল কেটে দিন। বাইরের কাটা ফল দেবেন না। তবে গরমে হাইড্রেশনের জন্য তরমুজ খুবই ভালো।

ফল খাওয়ার আগে কী ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন?
সমস্যা আসলে ফলে নয়, বরং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর নির্ভর করে। এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, আতঙ্ক নয় বরং সচেতনতা প্রয়োজন। সঠিকভাবে খেলে তরমুজ গরমের সবচেয়ে সুরক্ষিত এবং স্বাস্থ্যকর ফলের মধ্যে একটি।

সিরিঞ্জ দিয়ে তরমুজে রং ঢোকানো হয়— এটা কি সত্যি?
প্রথমেই পরিষ্কার করে বলতে হবে, তরমুজ লাল করার জন্য সিরিঞ্জ দিয়ে রং প্রবেশ করানো খুব সাধারণ বা নিয়মিত ঘটনা নয়। তরমুজের ভেতরের লাল রং প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়, মূলত ‘Lycopene’ নামের এক ধরনের পিগমেন্টের জন্য। তাই বাজারে যে বেশিরভাগ তরমুজ পাওয়া যায়, সেগুলো স্বাভাবিকভাবেই লাল ও খাওয়ার জন্য নিরাপদ। তবে হ্যাঁ, অনেক সময় অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম রং বা কেমিক্যাল ব্যবহার করতে পারে— তাই কিছু জিনিস খেয়াল রাখা ভালো।

কীভাবে বোঝা সম্ভব বাজারের কোন তরমুজ আসল আর কোনটা সন্দেহজনক?
তরমুজ কাটার পর যদি দেখা যায় ভেতরের সম্পূর্ণ অংশই একই রকম ভাবে লাল ও উজ্জ্বল, তাহলে ভাবতে হবে। আরও পরিষ্কার করে বললে বলতে হবে, আসল তরমুজের ভেতরের অংশ লাল হলেও কোথাও কোথাও রঙের তফাৎ থাকে। কোথাও কোথাও হালকা গোলাপি রং থাকতে পারে। আর এটাই স্বাভাবিক। এছাড়াও টিস্যু বা সাদা কাগজে চেপে ধরলে যদি গাঢ় লাল রং ছড়িয়ে পড়ে (স্বাভাবিক হলে হালকা গোলাপি জলীয় দাগ হয়), স্বাদ যদি অদ্ভুত লাগে— খুব বেশি কৃত্রিম মিষ্টি বা হালকা কেমিক্যালের গন্ধ কিংবা বীজের গঠন যদি অস্বাভাবিক মনে হয়, তাহলে সেই তরমুজ না খাওয়াই উচিত।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
১) তরমুজের ভেতরের অংশ লাল দেখলে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। কারণ ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ স্বাভাবিক ভাবেই লাল হয়।
২) সবসময় বিশ্বাসযোগ্য দোকান বা পরিচিত বিক্রেতার থেকে কিনুন।
৩) রাস্তার কাটা তরমুজ এড়িয়ে চলুন।
৪) সন্দেহ হলে না খাওয়াই ভালো।
৫) সব লাল তরমুজই কেমিক্যাল দেওয়া— এই ধারণাটা ভুল, তবে সচেতন থাকা জরুরি।

তরমুজ কাটা অবস্থায় ফ্রিজে রাখার পর কি তা ছোটোদের খাওয়ানো যায়?
১) হ্যাঁ, কাটা তরমুজ ফ্রিজে রেখে পরের দিন সন্তানকে দেওয়া যেতে পারে। তবে কিছু শর্ত মানা খুব জরুরি। যেমন— ঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।
২) কাটা তরমুজ কখনওই খোলা অবস্থায় রাখবেন না।
৩) সবসময় ঢাকনা দেওয়া কন্টেনারে রাখা দরকার।
৪) ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তরমুজ খেয়ে নেওয়া উচিত। এর থেকে বেশিক্ষণ ফ্রিজে থাকলে ছোটোদের না দেওয়াই ভালো। কারণ ফ্রিজে রাখা থাকলেও তার মধ্যে ব্যাকটেরিয়া হতে পারে। ছোটোদের ক্ষেত্রে তা বিপজ্জনক হতে পারে।
৫) অবশ্যই ফল দেওয়ার আগে দেখে নেওয়া উচিত টক হয়েছে কিনা। খুব নরম বা পিচ্ছিল হয়ে গেলেও সেই তরমুজ বা অন্য যে কোনও ফল না দেওয়াই ভালো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *