হিরণ্ময় সন্ধ্যায় সুকুমার সমারোহ
নন্দিতা দত্ত
প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যা আর রসায়নের সম্মানসহ স্নাতক হওয়ার পর ইংল্যান্ডে ফটোগ্রাফি আর প্রিন্টিং প্রযুক্তিতে উচ্চশিক্ষার জন্য তার বাবা তাকে বিলেত পাঠিয়েছিলেন। সেই
ছেলের প্রতিভা দেখেই বাবা ছেলেকে সন্দেশ পত্রিকার দায়িত্ব দেন। সেই ছেলেই উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ছেলে সুকুমার রায়। বাংলা সাহিত্যে তিনি এক নতুন ধারার সূচনা করেন, যেখানে মজার ছলে জীবনের গভীর সত্য ও সমাজের অসঙ্গতি ফুটে ওঠে। ছোটবেলায় বুঝে না বুঝেই তার ছড়া মুখস্থ করে স্কুলে সাহিত্যসভায় বলতাম। অনেক পরে বড় হয়ে যতকিছু পড়েছি বা এখনো পড়ি, তাতে বিস্মিত হই বারবার।
এখন সময় পাল্টে গিয়ে আবৃত্তির স্কুলগুলোতে সুকুমার চর্চা সিলেবাসে। কিন্তু একটা আস্ত সন্ধ্যা সুকুমার রায়কে নিয়ে! মানে তার লেখা নিয়ে অনবদ্য উপস্থাপনায় আমরা ভেসে গেলাম ১লা মে বুদ্ধজয়ন্তীর সন্ধ্যায় সুকান্ত একাডেমিতে।
সুকুমার রায়ের সৃষ্টি-নির্ভর আবৃত্তি, সংগীত, নৃত্য ও নাটক নিয়ে হিরণ্ময় চক্রবর্তী মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের আয়োজন ‘সুকুমার সমারোহ’।
আয়োজকদের এমন একটা ভাবনা-চিন্তা আমাদেরকে এক অন্য জগতে, অন্য সময়ে নিয়ে গিয়ে ভাবতে বাধ্য করিয়েছে।
প্রথাগতভাবে অনুষ্ঠানের শুরুতেই অতিথিবরণের পর স্বাগত ভাষণ রাখেন ফাউন্ডেশনের পক্ষে সুমন্ত চক্রবর্তী। অধ্যাপক কবি মিহির দেব, শুভাশিস তলাপাত্র (মাননীয় অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি, ওড়িশা হাইকোর্ট), শিশু সাহিত্যিক বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী, বিভাস দেবের (উপাচার্য, এম বিবি ইউনিভার্সিটি) স্মৃতিচারণে উঠে এলো হিরণ্ময় চক্রবর্তী ও তার পরিবারের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা, কর্মজীবন ও সমাজজীবনের নানাদিক। হিরণ্ময় চক্রবর্তী মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন শুধুমাত্র আলোচনাতেই থেমে থাকে না, বাস্তবেও নেমে আসে। কাজেই সমাজের উল্টো স্রোতে ভেসে যাওয়া গোবিনকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে রূপায়ণ ফাউন্ডেশনের কাজকে স্বীকৃতি জানানো হয়েছে। গোবিনের এই জীবনে ফিরে আসাকে সকলের সামনে তুলে এনে তার কথা শোনার সুযোগ করে দেওয়াকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হয়। জীবনে ইচ্ছাশক্তির জয়ই শেষ কথা।
জীবনে ফিরে আসা গোবিনের কথা শুনে ভাবছিলাম—এই তো জীবন।
আমাদের রাজ্যে সুকুমার রায়কে নিয়ে এত বড় অনুষ্ঠান আগে কোনোদিন হয়নি। সেখান থেকে অবশ্যই বাহবা পাবে হিরণ্ময় চক্রবর্তী মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন এবং তার যোগ্য সহযোগী হিসেবে শ্রুতি, কবিতালোক, উদয় শঙ্কর ভট্টাচার্য, শুভাশিস চৌধুরী, পিনাকপানি দেব, স্মিতা ভট্টাচার্য, শুভাশিস কর, তনুশ্রী দাস, তন্ময় দেবনাথ, ইন্দ্রাক্ষ্মী পোদ্দার, অংশুশ্রীয়া ঘোষ, অলকেশ চক্রবর্তী ও আলিশা চক্রবর্তী।
উদ্যোক্তারা প্রথমেই বলেছেন, কারোর একার কাজ নয়, যৌথ উদ্যোগেই এই আয়োজন। অনবদ্য এই আয়োজনে আমরা দেখেছি ব্যতিক্রমী নিরীক্ষামূলক উপস্থাপনা। দর্শক আসন থেকে বারবার বাহবা বর্ষিত হচ্ছিল মঞ্চের প্রতিটি উপস্থাপনার পর। বাহবা পাওয়ার মতোই এই অনুষ্ঠান। এমন অনুষ্ঠান প্রাণভরে দর্শক দেখেছেন, শুনেছেন, অনুধাবন করেছেন। হলে জায়গা ছিল না, সেটা বড় কথা নয়; যে যেখানে পেরেছেন দাঁড়িয়ে পড়েছেন অনবদ্য এই অনুষ্ঠান দেখার জন্য।
অনুষ্ঠান শেষে কথা বলছিলাম সাহিত্যিক সুতপা দাসের সঙ্গে। তার কথায়, “ব্যতিক্রমী এই উপস্থাপনায় বাচ্চারা ভীষণ ভালো করেছে। টেকনোলজি দুর্দান্ত প্রয়োগ। এক কথায় একটানা বসে তন্ময় হয়ে অনুষ্ঠান দেখেছি। তালটা কেটে গেল ‘সৎপাত্র’-এর উপস্থাপনায়। ‘সৎপাত্র’ লেখার সময় যে প্রচ্ছন্ন সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত ছিল—সেখানে উপস্থাপনাটি নিয়ে আয়োজকরা আরেকটু ভাবতে পারতেন। মেক-আপ এই আয়োজনে একটি বিশেষ মাত্রা বহন করেছে। অবশ্যই ধন্যবাদ দেবো পীযুষ কান্তি রায়কে। অনবদ্য এ সন্ধ্যা বহুকাল মনে থাকবে। শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞান ভাবনায় ঠাকুর পরিবারের মতো বাংলার রায় পরিবারের অবদান সমান বলেই আমাদের জীবনচর্চায় বারবার উচ্চারিত হোক তাদের কথা। সমস্ত উপস্থাপনার সঙ্গে সুকুমার রায়ের বিজ্ঞানচর্চার দিকটিও একটু তুলে ধরলে পরিপূর্ণ সুকুমারকে পেতাম। তবে আবারও ধন্যবাদ অবশ্যই দেবো সমস্ত আয়োজনে যারা সামনে এবং নেপথ্যে কাজ করেছেন। সুকুমার চর্চা আরও পল্লবিত হোক।”
আশা করছি সুকুমার চর্চা পল্লবিত হবে আয়োজকদের তরফে আগামীতে। দর্শক হিসেবে এ প্রতিবেদন লিখতে গিয়ে মনে হচ্ছে, আরও একটু বড় জায়গায় এবং আরও শিশুর উপস্থিতি আগামীতে উদ্যোক্তাদের ভাবতে হবে। জীবন যখন খাঁচায় বন্দী, ভাবনা যখন এআই-এর হাতে, সমাজজীবন নিয়ন্ত্রণে সমাজমাধ্যম—তখন আরও বেশি প্রয়োজন আজ থেকে এতদিন আগে লেখা রূপকের অন্তরালে আমাদের বিপন্নতার কথা। আগামী কী হবে জানি না, ‘গেলো গেলো’ রব তুলে অন্যের ভুলত্রুটিতে গা না ভাসিয়ে, যেটুকু সচেতনভাবে করা দরকার, সে বার্তা নয়—তার নির্যাস নিয়ে শুধু মঞ্চে নয়, যাপিত জীবনে তার আলোটুকু থাকুক। বুদ্ধপূর্ণিমার সন্ধ্যায় বৌদ্ধিক চেতনায় একটু হালকা করে আমাদের সজাগ করার দায়িত্ব নিলেন হিরণ্ময় চক্রবর্তী মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন।
সুশৃঙ্খল, সুচারুভাবে নিবেদিত অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে এতটাই মগ্ন হয়েছিলাম, ছেলেবেলা থেকে বড় হওয়ার ধাপগুলো যেন একের পর এক দরজা খুলে দিল। পিছন ফিরে দেখলাম শুধু নয়, সামনেও কীভাবে দেখব, সেই রাস্তাটা মেঘে ঢাকা হলেও আড়ালে একঝলক রোদ্দুর আলো দেখাচ্ছে। আর একবার অবশ্যই নাম উল্লেখ করতে হয়, সমগ্র অনুষ্ঠানটির গ্রন্থনায় যারা ছিলেন—উদয় শঙ্কর ভট্টাচার্য, শুভাশিস চৌধুরী, শুভাশিস কর ও পারিজাত দত্ত। তাদের কৃতিত্বের গভীরতা মাপার যোগ্য শব্দ নেই এই মুহূর্তে আমার কাছে। মনীষ ভট্টাচার্য কৃতি শিল্পী। সুনাম বজায় রেখে মন মাতানো মঞ্চ করেছেন। শব্দ সংযোজনায় (নন্দী ট্রায়ো) সৌম্যেন্দ্র, সৌম্যজিৎ, শুভ্রজিৎ—পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে মাতিয়ে রেখেছেন।
ভিডিও সম্পাদনায় নবজ্যোতি ভারতী তার কাজের মধ্য দিয়েই বুঝিয়েছেন—সুকুমার রায়ের কবিতা নিয়ে কাজ করতে গেলে কতটা শিশুকিশোর মনের কাছে পৌঁছতে হয়।
বকচ্ছপ, হাঁসজারু—কল্পনা থেকে চোখের সামনে। নবজ্যোতির কাজ তাই চোখে নয়, মস্তিষ্কেও থেকে গেল। প্রতিটি কবিতার অনুষঙ্গে কোরিওগ্রাফি, অভিনয়, কবিতা উচ্চারণে ‘সুকুমার সমারোহ’—অনবদ্য আয়োজন। সবশেষের আয়োজন ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’—কাকে ছেড়ে কার কথা বলি। চমকে দিয়ে সবাইকে এক করে মাতিয়েছেন যিনি, তার নাম আলাদা করে উচ্চারণ না করলেও খুড়োমশাই আমাদের চমকে দিয়েছেন তার অভিনয় আর গানের মধ্য দিয়ে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় মনীষা নাথ যোগ্য ভূমিকা সামলেছেন। সম্মিলিত প্রয়াস হলেও বলতে হয়—ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকেই নিজের কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান ছিলেন বলেই সম্মিলিত প্রয়াস সার্থক। আবারও প্রমাণ হল, এক একজন হয়তো ব্যক্তিগতভাবে সফল, কিন্তু সবাইকে নিয়ে একসাথে এক মঞ্চে একই ছন্দে পুরো অনুষ্ঠানের মান বজায় রাখা চ্যালেঞ্জের। সেখানেই সার্থক ও সফল ‘সুকুমার সমারোহ’। যেখানে চড়াই-উতরাই, বাধা-বিঘ্নকে একদিকে রেখে এগিয়ে যাওয়া শুধু স্বপ্ন বপন নয়, তা সার্থক করা সম্ভব স্বতঃস্ফূর্ত আন্তরিকতায়।