সোমবার | ২৭ এপ্রিল ২০২৬

যুক্তির সূর্যাস্ত

 যুক্তির সূর্যাস্ত

১৮৪৮ সালের সেই বড়দিন।লন্ডনের রয়‍্যাল ইনস্টিটিউশনে এক স্বশিক্ষিত প্রাক্তন দপ্তরী দাউদাউ করে একটি মোমবাতি জ্বালিয়েছিলেন।মাইকেল ফ্যারাডে নামক সেই ‘দার্শনিক’ কেবল দহন বা অক্সিজেনের রসায়ন ব্যাখ্যা করেননি, তিনি বিজ্ঞানের রুদ্ধদ্বার উন্মোচন করেছিলেন একদল শিশুর সামনে। ফ্যারাডের সেই মোমবাতি আজও জ্বলছে তাঁর কালজয়ী রচনায়, কিন্তু যে আলোকবর্তিকা সাধারণ মানুষের মনে বিজ্ঞানের যুক্তি ও বিস্ময় পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল, আজ ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, সেই সলতেয় টান পড়েছে। বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞান-সাংবাদিকতার পরিসরটি আজ এক গভীর সংকটের সম্মুখীন।

ইতিহাস সাক্ষী, বিজ্ঞানের জ্ঞান কেবল গবেষণাগারের ‘পুরোহিত’ শ্রেণির কুক্ষিগত সম্পদ নয়। ১৬৬৫ সালের ‘ফিলজফিক্যাল ট্রানজ্যাকশনস’ থেকে শুরু করে ১৮৬৯-এর ‘নেচার’, পাশ্চাত্যের সংবাদমাধ্যম একদা এই প্রত্যয় নিয়ে পথ চলেছিল যে, সত্যের অধিকার সকলের। কিন্তু একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, সেই প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা কর্পোরেট ছাঁটাইয়ের কাঁচিতে ছিন্নভিন্ন। ‘পপুলার সায়েন্স’-এর মতো সার্ধশতবর্ষ-প্রাচীন পত্রিকা মুদ্রণ বন্ধ করেছে, ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’ তার লেখকগোষ্ঠীকে বিদায় জানিয়েছে। এমনকী খোদ ব্রিটেনেও বিজ্ঞানের জন্য নিবেদিতপ্রাণ সংবাদদাতার আকাল দেখা দিয়েছে। অথচ কৌতূহলী মানুষের অভাব নেই। ইউটিউবে ‘ভেরিটাসিয়াম’ বা ‘কার্জগেজাগট’-এর কোটি কোটি অনুসারী প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ আজও কৃষ্ণগহ্বর বা কোষতত্ত্ব বুঝতে উন্মুখ। সমস্যাটি চাহিদার নয়, বরং পরিবেশনের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর।

বিজ্ঞানের এই প্রাতিষ্ঠানিক পশ্চাদপসরণ কেবল সংবাদপত্রের ক্ষতি নয়, এটি সভ্যতার জন্য এক অশনিসংকেত। গত দুই দশকে মূলধারার সংবাদমাধ্যম থেকে বিজ্ঞান বিভাগগুলি লুপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই শূন্যস্থানে জেঁকে বসেছে ছদ্মবিজ্ঞান, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কুযুক্তি এবং টিকাবিরোধী অপপ্রচার। যখন সংবাদকক্ষ তথ্য যাচাইয়ের বিজ্ঞানমনস্ক পদ্ধতি থেকে পিছু হটে, তখন হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রাচীন উড়োজাহাজ’ তত্ত্ব কিংবা অলৌকিক নিদান জনমানসে ঠাঁই করে নেয়। বিজ্ঞান-সাংবাদিকতা কেবল আবিষ্কারের সংবাদ দেয় না, তা মূলত সাক্ষ্যপ্রমাণের বিচারপদ্ধতি শেখায়। জনমানসে সেই যুক্তির ব্যাকরণটি আজ বিলুপ্তপ্রায়। মনে রাখা প্রয়োজন, বিজ্ঞান-সাংবাদিকতা কেবল নতুন আবিষ্কারের সংবাদ পরিবেশন করে না, তা মূলত সাক্ষ্যপ্রমাণের বিচার পদ্ধতি ও সংশয়বাদ শেখায়। জনমানসে সেই যুক্তির চিরায়ত ব্যাকরণটি আজ বিলুপ্তপ্রায়, যার সুযোগ নিচ্ছে একদল মতাদর্শী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী।

ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে সি. রাধাকৃষ্ণণ কিংবা জয়ন্ত নার্লিকর, বাংলা সাংবাদিকতায় পথিক গুহদের অবদান স্মরণীয়। বিশেষত নার্লিকর যখন মারাঠি ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা করে সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন, তখন তা বিজ্ঞানের ‘গণতন্ত্রীকরণ’-এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু বর্তমানে হাতেগোনা কয়েকটি ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে ভারতীয় সংবাদজগতে বিজ্ঞান আজ প্রযুক্তি বা স্বাস্থ্যের মোড়কে একপেশে বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর রামচন্দ্রনের মতো একনিষ্ঠ কলমচিরা যখন অতিমারি বা হিগস বোসন কণা নিয়ে নিভৃতে লিখে যান, তখন বোঝা যায় যে লড়াইটা এখনও শেষ হয়নি। আসলে বিজ্ঞানের খবর পরিবেশন করা কোনও শৌখিন বিলাসিতা নয়, এটি এক সামাজিক পরিকাঠামো। পাঠাগার বা প্রাথমিক শিক্ষার মতোই সাধারণ মানুষের কাছে বিজ্ঞানের সহজবোধ্য ও নির্ভুল ব্যাখ্যা পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রের ও সংবাদমাধ্যমের আবশ্যিক কর্তব্য। ফ্যারাডের সেই মোমবাতিটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি শিখাকে কেন্দ্র করে গোটা বিশ্বের রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব, যদি সেই শিখাটিকে নিভে যেতে না দেওয়া হয়। তথ্যের আতিশয্য ও অপবিজ্ঞানের প্রাবল্যের এই যুগে বিজ্ঞানমনস্ক সাংবাদিকতা আজ আর কেবল পেশা নয়, বরং এক জরুরি প্রতিরোধ। সেই প্রতিরোধের আগুনে শান দেওয়া আজ সময়ের দাবি।

পরিশেষে প্রশ্ন জাগে, রাষ্ট্র যখন উন্নয়নের জয়গান গায়, তখন সেই উন্নয়নের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদ কি ব্রাত্যই থেকে যাবে?প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদের কি আজ ভাববার সময় আসেনি যে, বৈজ্ঞানিক সাক্ষ্যপ্রমাণের চেয়েও যদি অলীক কল্পনা বা ছদ্মবিজ্ঞানের আস্ফালন অধিক গুরুত্ব পায়, তবে তা কেবল সাংবাদিকতার বিনাশ নয়, বরং এক অন্ধকারাচ্ছন্ন ও যুক্তিহীন সমাজেরই অভ্যুদয় ঘটাবে। ফ্যারাডের সেই মোমবাতিটি আজও জ্বলছে ঠিকই, কিন্তু আমরা কি সজ্ঞানে সেই আলোর পথ ছেড়ে অন্ধকারের গহ্বরে অবগাহন করতে উন্মুখ হয়েছি? শাসক ও সমাজপতিরা কি তবে কেবল নীরব দর্শক হয়েই এই অবক্ষয় প্রত্যক্ষ করবেন, নাকি যুক্তির সেই নিভন্ত শিখায় পুনরায় প্রাণসঞ্চারের সদিচ্ছা দেখাবেন, উত্তরটি মহাকালের গর্ভে নিহিত হলেও সময়ের দাবি কিন্তু আজ অত্যন্ত স্পষ্ট এবং কঠোর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *