গল্প : নন্দিতা ভট্টাচার্য্য (চক্রবর্তী)
বিশ্বাস
‘ম্যাডাম, একটু সাহায্য করবেননি?’
রিক্সা ভাড়া দিয়ে নামতেই কানে এলো কথাগুলো। শ্রাবণী ফিরে তাকাতেই আবার, ‘ম্যাডাম, বড় বিপদে পড়ছি। একটু সাহায্য করেন না।’
‘কী হয়েছে?’
‘আমার সব টাকা চুরি হইয়া গেছে। বাড়িতে যাওনের টাকা নাই। একটু সাহায্য করেন না ম্যাডাম।’
বাইশ-তেইশের যুবক। গায়ে হালকা গোলাপি শার্ট আর কালো প্যান্ট। মলিন দুটোই। হাতে একটা কাপড়, হয়তো রুমালজাতীয় কিছু। ওটাকেই দু’হাতে চেপে ধরে আছে।
‘কত টাকা ছিল?’ শ্রাবণী জানতে চায়।
দিগন্ত এত দেরি করছে কেন! ওর এই স্বভাবটা আর শুধরাবে না কোনোদিন। সব সময় দেরি।
‘আটশো টাকা আছিল ম্যাডাম। পুরাটাই লইয়া গেছে গা। কেমনে বাড়িতে যামু অহনে’, কাতর কণ্ঠ ছেলেটির।
সত্যিই তো, কী অসহায়! এর টাকাটাও মেরে দিল! দেখেই বোঝা যাচ্ছে তার আর্থিক অবস্থা কেমন হতে পারে। না, দিগন্ত এলে আজ একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে। সব সময় ওর জন্য ওয়েট করতে হয়। কোথায় আছে দেখা দরকার। ফোনটা বের করে শ্রাবণী।
‘ম্যাডাম, বাড়ি যাওয়ার টাকাটা দেন না ম্যাডাম।’
‘হ্যালো— কোথায় তুমি? ও আচ্ছা, এসো এসো…’ ওই তো এসে গেছে দিগন্ত।
‘তোমার বাড়ি কোথায়? কত টাকা লাগবে বাড়ি যেতে?’
‘খোয়াই, জাম্বুরাত বাড়ি ম্যাডাম। আশি টাকা লাগব। আশি টাকা দিলেই হইব।’
আহারে, চোখে জল ছেলেটার। ‘টাকাটা রুমালে বাইন্ধা রাখছিলাম ম্যাডাম।’
‘নাম কী তোমার?’
‘সজল ম্যাডাম। সজল নাম।’
ওই তো দিগন্ত এসে গেছে। ব্যাগ থেকে পার্সটা বের করার আগেই দিগন্ত ওকে হাত ধরে টেনে নেয় রাস্তার পাশে দাঁড় করানো অটো, রিক্সাগুলোর দিকে।
‘দাঁড়াও, ওকে একশো টাকা দিয়ে দিই। ওর সব টাকা চুরি হয়ে গেছে।’
‘তুমি এসো না এদিকে—’
‘ম্যাডাম, ও ম্যাডাম, বাড়ি যাওনের টাকাটা খালি— ‘ছেলেটার গলা শোনা যাচ্ছে।
‘কী হলো?‘ একটু বিরক্ত হয় শ্রাবণী, ‘টাকাটা দিয়ে আসতাম।’
‘দেখো ওরা কী বলছে, শোনো—’
ওখানে দাঁড়ানো রিকশাচালক, অটোচালকের কথা শুনে হতবাক শ্রাবণী।
‘ম্যাডাম, হে মিছা কথা কইয়া হগ্গলের কাছ থাইক্যা টাকা লয়। নেশা করে। হে হইসে ডেনড্রাইট খাওইন্যা।’
‘কী বলছেন আপনারা?’
‘হ ম্যাডাম, আপনেতো পিছন দিয়া খাড়াইছেন, এর লাইগ্যা আপনারে কইতাম পারতাছিনা। অহনে স্যার আওনে ইশারা করছি তাইনেরে।’
‘তাই নাকি!’
‘হ ম্যাডাম, আমরা কষ্ট কইরা কয় টাকা পাই, আর হে মাগনা পাইয়া লয়।’
‘চলো চলো, আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে’, এবার দিগন্ত তাড়া দেয়।
মনটা খচখচ করে শ্রাবণীর। টাকাটা দিয়ে আসলেই পারত। ছেলেটার চোখে-মুখে কী আর্তি ছিল। আহারে! বাড়ি যাওয়ার ব্যবস্থা কী করে করবে কে জানে!
‘কী হলো ম্যাডাম, কী ভাবছ?’ দিগন্ত জানতে চায়।
‘টাকাটা দিয়ে দিলে পারতাম।’
‘আরে ধুর, যতসব নেশাখোর। শুনলে না ওরা কী বলল?’
‘ওরা যে সত্যি কথা বলেছে, তার কোনো গ্যারান্টি আছে?’
‘আরে, ওরা মিথ্যা কেন বলবে?’
‘বলতেই পারে। শুনলে না, বলল যে ওরা কষ্ট করে টাকা পায় আর ছেলেটা এমনি পেয়ে যাবে। ছেলেটাও তো রাস্তার কাজ করে বলল।’
‘ঠিকই তো বলেছে ওরা। তুমি না পারো বটে, শ্রাবণী। ওই ছেলেটাকে অন্যান্য স্পটেও ওরা দেখেছে। ও এভাবেই টাকা চায়। ওরা তোমার টাকাটা ফালতু খরচা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। আর তুমি!’
‘ফালতু খরচা! একটা ছেলে বিপদে পড়েছে, এটা ফালতু হল? আর একশো টাকা তোমার কাছে বড় হল? টাকাটা তো আমি দিচ্ছিলাম।’
‘কী বলছ তুমি, শ্রাবণী? হল কী তোমার?’
শ্রাবণী উত্তর দেয় না।
‘ছাড়ো তো এখন এসব।’
‘ছাড়ব? কেন ছাড়ব?‘ ঝাঁঝিয়ে ওঠে শ্রাবণী। ‘তুমি সামান্য ক’টা টাকার জন্য—’
‘কী বললে? টাকার জন্য— আমি—’ গুম হয়ে যায় দিগন্ত।
সুরটাই কেটে গেল। নাটকের একটা স্পেশাল প্রজেক্ট নিয়ে ওরা কাজ করছে। সেই ব্যাপারে আজ কয়েকজনের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। কোনো রকমে দুটো মিটিং সারল। এর মধ্যে আর কোনো কথাবার্তা হল না। শ্রাবণীকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে দিগন্ত চলে গেল। বাড়িতে এসেও শ্রাবণীর বারবার মনে পড়ছিল ছেলেটার কথা। নাম বলেছিল ছেলেটা সজল। কী হতো, অল্প টাকা ছেলেটাকে দিয়ে দিলে। দিগন্ত মাঝে মাঝে বড্ড ইয়ে করে। এসে তো আর একবারও ফোন করল না।
রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর প্রতিদিনই ওদের একবার কথা হয়। দিগন্তই বেশি ফোন করে, কখনো শ্রাবণী। আজ দিগন্তর ফোন এল না। শ্রাবণীও করল না। পরের দিনও না। শ্রাবণী দু’-একবার ফোন হাতে নিয়েও আবার রেখে দিল। না, দেখা যাক। ও কি একটু বেশি তাড়াতাড়ি ডিসিশন নিয়ে নিয়েছে দিগন্তর ব্যাপারে! ও আগেও দেখেছে দিগন্ত এমন ছোটোখাটো ব্যাপারে, বিশেষ করে টাকার ব্যাপারে উল্টোপাল্টা রিঅ্যাক্ট করে। শ্রাবণী একটু খরচা বেশি করে, তা ঠিক। সে কথা দিগন্ত ওকে বলেও সব সময়। কিন্তু তাই বলে একটা মানুষের প্রয়োজনে যদি ও সামান্য সাহায্য করতে না পারে, দিগন্ত ইন্টারফেয়ার করে, তাহলে সারাজীবন কীভাবে একসঙ্গে কাটাবে!
পাঁচ দিন হয়ে গেল দিগন্ত আর শ্রাবণীর দেখা হয়নি, কথাও হয়নি। প্রজেক্টটা নিয়ে কাজ করছে দু’জনেই, তবে বাড়িতে বসে। পরের মিটিংটা নেক্সট মঙ্গলবার হওয়ার কথা। ততদিনই কি কথা হবে না? শ্রাবণীকে কি কোনো বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে হবে? জানে না ও। বুঝতেই পারছে না। মনটা বড় অস্থির হয়ে আছে।
সকাল সকাল শ্রদ্ধার ফোন এলো। “কীরে, ‘পরবাসী’ দেখেছিস? আমার এখনও দেখা হয়নি। ত্রিপুরার প্রোডাকশন। দেখার খুব ইচ্ছে রে। চল না যাই আজ।”
প্রস্তাবটা লুফে নিল শ্রাবণী। ‘হ্যাঁ, যাব। আমারও দেখা হয়নি। আজই যাব বিকেলের শোতে।’
সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে কথা বলতে বলতে দু’জনে হাঁটছিল। ভালোই হয়েছে সিনেমাটা। গান, ফটোগ্রাফি দারুণ। হঠাৎ কানে এল, ‘ম্যাডাম, একটু সাহায্য করবেননি?’
চমকে তাকায় শ্রাবণী।
‘ম্যাডাম, আমার সব টাকা চুরি হইয়া গেছে। বাড়ি যাওনের টাকা নাই। একটু সাহায্য করেন না।’
সামনে দাঁড়িয়ে সজল নামের সেই যুবক। একইভাবে রুমাল হাতে, চোখে জল, কণ্ঠে আকুতি নিয়ে বলছে কথাগুলো। একটা খালি রিক্সা ডেকে সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়ল শ্রাবণী। শ্রদ্ধা অবাক— ‘ওমা, কী হলো রে?’
‘পরে কথা বলব তোর সঙ্গে। যাই রে।’
বাড়িতে গিয়েই দিগন্তকে ফোন করতে হবে। ইস্, কী ভুলটাই না করতে যাচ্ছিল ও। দিগন্তকে ফোন করে আজই একবার আসতে বলবে।